তীরে গিয়ে তরি ডোবানোর মতো ঘটনা অহরহ আছে বাংলাদেশ শিবিরে। বিশেষ করে ভারতের বিপক্ষে খেলতে নামলেই খেই হারানোর মতো ঘটনা প্রায়ই ঘটে। সর্বশেষ অ্যাডিলেডেই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে জয় হাতছাড়া করেছে বাংলাদেশ! একের পর এক ম্যাচ শেষ করতে না পারার যে অবিশ্বাসের দেয়াল উঠেছিল, মিরপুরের হোম অব ক্রিকেটে বিশ্বাসের ভেলায় চড়ে অবিশ্বাসের সেই দেয়াল ভাঙলেন মেহেদী হাসান মিরাজ। শেষ উইকেটে ৫১ রানের অবিচ্ছিন্ন জুটির ওপর দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ জিতলো অবিশ্বাস্য এক ম্যাচ।
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের মঞ্চেই ভারতের বিপক্ষে দুটি হার এখনও পোড়াচ্ছে। যার একটি ২০১৬ সালে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে। ওই বিশ্বকাপে বেঙ্গালুরুতে ভারতের বিপক্ষে প্রায় জিতেই গিয়েছিল বাংলাদেশ! শেষ ওভারে জয়ের জন্য প্রয়োজন ছিল ১১ রানের। প্রথম ৩ বলে ৯ রান তুলে ফেললেও শেষ তিন বলে প্রয়োজনীয় ২ রান তো দূরে থাক, উল্টো তিনটি উইকেট হারায় বাংলাদেশ।
এক মাস আগে অস্ট্রেলিয়ায় অনুষ্ঠিত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে হারের ইতিহাস এখনও জ্বলজ্বলে। অ্যাডিলেডে বৃষ্টিবিঘ্নিত ম্যাচে ১৫১ রানের লক্ষ্য পেয়েছিল বাংলাদেশ। শেষ ৬ বলে ২০ রান প্রয়োজন ছিল, বাংলাদেশ করতে পারে ১৪ রান।
২০১৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের পর ২০১৮ সালে আরও একবার ভারতকে হারানোর সুযোগ পেয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু সেবারও ভারত-বাধা অতিক্রম করতে পারেনি সাকিবরা। নিদহাস ট্রফির গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচটিতে খুব একটা লড়াই করতে না পারলেও দ্বিতীয় ম্যাচে লড়াই করেছিলেন সাকিব-তামিমরা। ভারতের দেওয়া ১৭৬ রানের জবাবে বাংলাদেশ ১৫৯ রান করতে পেরেছিল।
ওই টুর্নামেন্টে ভারতের বিপক্ষে ফাইনালও খেলেছিল বাংলাদেশ। আগে ব্যাটিং করে বাংলাদেশ ১৬৬ রান সংগ্রহ করে। চ্যালেঞ্জিং এই স্কোরে, ভারতকে ভালোই চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছিল বাংলাদেশ। শেষ বলে ভারতের জয়ের জন্য প্রয়োজন ছিল ৬ রানের। সৌম্যকে ছক্কা মেরে অবিশ্বাস্য এক জয় তুলে নেন দীনেশ কার্তিক। ভারতের বিপক্ষে ৪ উইকেটে হেরে আরও একবার হতাশায় ডুবতে হয় বাংলাদেশকে।
টি-টোয়েন্টির মতো ওয়ানডে ফরম্যাটেও এমন গ্লানি আছে বাংলাদেশের। ২০১৮ সালে আরব আমিরাতে অনুষ্ঠিত এশিয়া কাপের ফাইনালে ভারত-বাধা পেরুতে পারেনি বাংলাদেশ। আগে ব্যাটিং করে বাংলাদেশ ২২২ রানের মাঝারি মানের স্কোর গড়লেও ভারত শেষ বলে গিয়ে জয় নিশ্চিত করে। শেষ ওভারে জয়ের জন্য প্রয়োজন ছিল ৬ রানের। ভারত অনায়াসেই ৭ উইকেট হারিয়ে মামুলি সেই লক্ষ্যে পৌঁছে যায়। ২০০৪ সালে শচীন-গাঙ্গুলিদের বিপক্ষেও দারুণ একটি সুযোগ তৈরি হয়েছিল। অভিজ্ঞতা আর বিশ্বাসের ঘাটতিতে সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয় বাংলাদেশ! ভারতের করা ২৪৬ রানের জবাবে হাবিবুল বাশার ও খালেদ মাসুদরা প্রায় জয়ের পথেই ছিল। ৪৭ ও ৪৮তম ওভারে বেশ কিছু রান তুলতে পারলেই ১১ রানের হার এড়ানো সম্ভব হতো।
কুড়ি ওভারের ক্রিকেটে অন্তত তিনটি এবং ওয়ানডে ফরম্যাটে অন্তত একটি ম্যাচ অনায়াসেই জিততে পারতো বাংলাদেশ। কিন্তু অবিশ্বাসের দেয়াল থাকায় জয়ের পথ খুঁজে পায়নি বাংলাদেশ। অবশেষে মিরপুরে অবিশ্বাস্য এক ম্যাচ জিতে অবিশ্বাসের দেয়াল ভাঙলো লাল-সবুজ জার্সিধারীরা। ভারতের বিপক্ষে জয়ের নায়ক মিরাজ তো বলেই দিলেন, ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ জয়ের বিশ্বাস আনতে এই ম্যাচটি জয়ের বিকল্প ছিল না, ‘এমন একটা ম্যাচ জেতা আমাদের জন্য দরকার ছিল। আমরা বারবার হারছিলাম। একদম শেষে গিয়ে আমরা অনেক ম্যাচ হেরেছি। কিন্তু আজকে বিশ্বাস ছিল বলে আমরা ম্যাচটা জিততে পেরেছি। এই জয় আমাদের উজ্জীবিত করবে। ক্লোজ ম্যাচগুলো জিততে ভূমিকা রাখবে।’
শেষ উইকেটে জয়ের জন্য বাংলাদেশের প্রয়োজন ৫১ রানের। এমন কঠিন সমীকরণে ম্যাচ জেতার ইতিহাস নেই বাংলাদেশের। কঠিন, অবিশ্বাস্য এই ম্যাচটি জেতালেন মিরাজ। তার সাপোর্ট দিয়েছেন মোস্তাফিজুর রহমান। এমন একটি ম্যাচে মিরাজ কি সত্যিই জয়ের কথা ভেবেছিলেন? ম্যাচসেরা মিরাজ বললেন, ‘সত্যি কথা হচ্ছে, আমার বিশ্বাস ছিল। অনেকে হয়তো পাগল বলবে। সত্যিই আমি বিশ্বাস করছিলাম। একবারও মনে হয়নি ম্যাচটা হারবো। নিজের সঙ্গে কথা বলছিলাম- আমি পারবো, আমি পারবো।’
মিরাজকে অবশ্য এই বিশ্বাসটা দিয়েছিলেন মোস্তাফিজ। শেষ উইকেটে যখন পাহাড়সম রান প্রয়োজন মিরাজকে তখন মোস্তাফিজই আশ্বস্ত করেন। সংবাদ সম্মেলনে মিরাজ বলেছেন, মোস্তাফিজ অনেক আত্মবিশ্বাসী ছিল। ও আমাকে একটা কথা বারবার বলছিল, ‘আমাকে নিয়ে চিন্তা করার কিছু নেই, আমি ঠেকিয়ে দিচ্ছি। আমি আউট হবো না। যদি গায়েও বল লাগে সমস্যা নাই।’ ওর ওই আত্মবিশ্বাস দেখেই আমার আত্মবিশ্বাসটা বেড়েছে। আমি বিশ্বাস করেছি, ম্যাচটা জেতা সম্ভব। যখন ১৪ রান ছিল তখন একটু উত্তেজনায় ছিলাম। তখন ভাবছিলাম এত কাছে এসে যদি হেরে যাই। এরকম এর আগে হয়েছে। কিন্তু মোস্তাফিজ আমাকে সাহস দিয়েছে। মোস্তাফিজ বলছিল এখন তাড়াহুড়োর কিছু নাই। এখন ছয় মারার দরকার নাই। নিচে নিচে খেললে গ্যাপ করলে রান হয়ে যাবে।
চলতি বছর আফগানিস্তানের বিপক্ষে ৮১ রানের ইনিংস খেলে দারুণ এক ম্যাচ জিতিয়ে ছিলেন মিরাজ। ৪৫ রানে ৬ উইকেট পড়ে যাওয়ার পর আফিফ-মিরাজ মিলে ১৭৪ রানের অবিচ্ছিন্ন জুটি করে ম্যাচ জেতান। যদিও মিরাজের কাছে আফগানিস্তানের বিপক্ষে ৮১ রানের ইনিংসের চেয়ে রবিবার চরম চাপে খেলা ৩৮ রানের ইনিংসই স্পেশাল, ‘আমার কাছে দুটো ইনিংসই ভালো লাগার। তবে এগিয়ে রাখার কথা বললে, আমি এই ইনিংসটাকেই এগিয়ে রাখবো।’









