বাংলাদেশ কী পারবে ম্যাচ জিততে? এমন প্রশ্ন শুনে কিছুটা হকচকিয়ে গিয়েছিলেন কুলদীপ যাদব। এরপর মুখে চওড়া হাসি নিয়ে বলেছিলেন, ‘কেউ ট্রিপল সেঞ্চুরি করতে পারলে, জিতবে অবশ্যই।’ কিন্তু চট্টগ্রাম টেস্টের চতুর্থ দিনে বাংলাদেশের কোন ব্যাটার ট্রিপল সেঞ্চুরিতো দূরে থাক; ডাবল সেঞ্চুরির পথেও হাঁটতে পারলেন না। জাকির হাসান শুধু একার লড়াইয়ে তিন অঙ্কের ম্যাজিক ফিগার স্পর্শে করে সাজঘরে ফিরেছেন।
আরেক ওপেনার নাজমুল হোসেন শান্ত দৃঢ়তা দেখিয়ে ব্যাটিং করলেও বাজে শটে উইকেট বিলিয়ে দিয়েছেন। সপ্তম উইকেটে এখন সাকিব আল হাসান (৪০) ও মেহেদী হাসান (৯) অবিচ্ছন্ন থেকে চতুর্থ দিন পার করে টেস্ট ম্যাচটা পঞ্চম দিনে নিয়ে গেছেন। তবু ম্যাচের যা অবস্থা, তাতে করে চট্টগ্রাম টেস্টে হারই চোখ রাঙাচ্ছে স্বাগতিকদের।
শুক্রবার শেষ বিকালে ৫১৩ রানের প্রায় অসম্ভব লক্ষ্যে খেলেতে নেমে বাংলাদেশ বিনা উইকেটে ৪২ রান তুলেই তৃতীয় দিন শেষ করেছিল। শনিবার প্রথম সেশনে দারুণ লড়াইয়ে ইতিবাচক বার্তা মিললেও দ্বিতীয় সেশনের পর চিরচেনা ভঙ্গিতে ভেঙে পড়ে প্রতিরোধ। পুরো দিন লড়াই করে ৬ উইকেট হারিয়ে স্বাগতিকরা ২৭২ রান করতে পেরেছে। জয় থেকে আর ২৪১ রান দূরে তারা। রবিবার পঞ্চম ও শেষ দিনে হাতে থাকা ৪ উইকেট নিয়েই নতুন দিনের লড়াইয়ে নামতে হবে। বিশেষজ্ঞ ব্যাটার বলতে ক্রিজে আছেন সাকিব আল হাসান ও মেহেদী হাসান মিরাজ। দু’জন ৩৪ রানের জুটিতে অবিচ্ছন্ন আছেন। নতুন সকালে এই দুই ব্যাটার কতদূর নিয়ে যেতে পারেন সেটাই দেখার।
তবে দিনশেষে আরও ভালো অবস্থানে থাকতে পারতো বাংলাদেশ। সেটি হয়নি ছোটখাটো কিছু ভু্লে। বিশেষ করে থিতু হয়ে শান্ত ও জাকিরের বড় ইনিংস খেলতে না পারাটা আক্ষেপ বাড়াচ্ছে। এরমধ্যে লিটন-মুশফিক-সোহানদের দায়িত্বজ্ঞানহীন ব্যাটিংতো আছেই।
প্রথম দুই ঘণ্টায় দারুণ একটি সেশন পার করে লাঞ্চে যান শান্ত-জাকির। বিরতি থেকে ফিরেই মনোযোগ হারিয়ে বসেন শান্ত। অথচ তিনিই কিনা ভারতীয় পেসার সিরাজের স্লেজিংকে পাত্তা না দিয়ে সাবলীল ব্যাটিং করে গেছেন।
শান্ত-জাকিরের ১২৪ রানের জুটির মাঝখানে চটিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন সিরাজ। ভারতীয় পেসার বার বার মনোযোগ নষ্ট করার চেষ্টা করলেও বাঁহাতি শান্ত তাকে বিন্দুমাত্র পাত্তা দেননি। জাকিরকে সঙ্গে নিয়ে ওপেনিং জুটিতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান তুলেছেন। কিন্তু বিরতি থেকে ফিরেই মনোযোগ হারিয়ে অফস্ট্যাম্পের বাইরের বল খেলতে গিয়ে সাজঘরের পথ ধরেছেন। তার আগে ১৫৬ বলে খেলেছেন ৬৭ রানে দৃঢ়চেতা ইনিংস।
শান্তর বিদায়ের পরই ভেঙে পড়ে প্রতিরোধ। প্রথম সেশনে বাংলাদেশের কোন ব্যাটারকে ফেরাতে না পারলেও দ্বিতীয় সেশনে বাংলাদেশর তিন ব্যাটারকে সাজঘরের পথ দেখায় ভারতীয় বোলাররা। শান্তর পর ক্রিজে নামা ইয়াসিরও বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি। অক্ষর প্যাটেলের গুড লেন্থের বলটি ডিফেন্স করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু লাইন মিস করলে ইয়াসির বোল্ড হয়েছেন। তাতে ১২ রানের মধ্যে কাটা পড়েন বাংলাদেশের দুই ব্যাটার। দ্রুত ২ উইকেট হারালে জাকির হাসান-লিটন দাস মিলে বড় জুটির সন্ধানে ছিলেন। জুটিটি ৪২ রান যোগ করতেই ক্ষ্যাপাটে শটে লিটনকে বিদায় নিতে হয়েছে। শুরু থেকে ভীষণ অস্বস্তি নিয়ে ব্যাট করতে দেখা গেছে তাকে। ৫৩তম ওভারে উমেশ যাদবের বলে শূন্য রানে জীবনও পেয়েছেন। ভারত আবেদন না করায় বিপদে পড়তে হয়নি। কিন্তু রিভিউতে দেখা গেছে ওভারের পঞ্চম বলটি লিটনের ব্যাট ছুঁয়ে চলে যায় উইকেটকিপার ঋষভ পান্তের গ্লাভসে। দ্বিতীয় জীবন পেয়েও লিটনকে স্বস্তিতে দেখা যায়নি। লংঅনে ফিল্ডার রেখে কুলদীপ বেশ কিছুক্ষণ ধরেই তাকে আউট করার চেষ্টা করছিলেন। শেষ পর্যন্ত চা বিরতির তিন ওভার আগে ৬৯তম ওভারের চতুর্থ বলে ভারতের ফাঁদে পা দিয়ে ১৯ রানে সাজঘরে ফিরেছেন।
লিটনের আউটে ইনিংস সমালানোর দায়িত্ব পড়ে মুশফিক ও জাকিরের কাঁধে। সেই দায়িত্ব ভালোভাবে সামলাচ্ছিলেন দুইজন। ছন্দে থেকে অভিষেকে সেঞ্চুরি করে নিজের নাম ইতিহাসেও লিখে ফেলেন সিলেট থেকে উঠে আসা জাকির। চতুর্থ ইনিংসে ওপেনিংয়ে নেমে বিশ্বের দ্বিতীয় ব্যাটার হিসেবে ৪৭ বছরের রেকর্ড ভেঙেছেন। তার আগে ১৯৭৫ সালে ক্যারিবীয় ওপেনার লিওনার্ড বাইচান অভিষেকে ওপেনার হিসেবে চতুর্থ ইনিংসে সেঞ্চুরি করেছিলেন। শুধু তাই নয়, ওপেনার হিসেবে বাংলাদেশের প্রথম এবং অভিষেকে বাংলাদেশের চতুর্থ ব্যাটার হিসেবে সেঞ্চুরি করার কীর্তি গড়েছেন। দারুণ টেম্পারমেন্টে সেঞ্চুরি তুলে নেওয়ার পর আশা করা হচ্ছিল তার ব্যাটেই হয়তো সম্ভাবনায় কিছুর দেখা মিলবে। কিন্তু অশ্বিনের দুর্দান্ত একটি ডেলিভারিতে সাজঘরে ফিরতে হয়েছে তাকে। আউট হওয়ার আগে জাকির ২২৪ বলে ১৩ চার ও ১ ছক্কায় ১০০ রানের ইনিংস খেলেছেন।
সেঞ্চুরিয়ানের আউট হওয়ার পর ভালো অবস্থানে থাকতে পারতো বাংলাদেশ। কিন্তু মুশফিক-সোহানের দায়িত্বজ্ঞানহীন ভূমিকায় দিনশেষে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়েছে। দিনের খেলা শেষ হতে বাকি ছিল ১৫ ওভার। অক্ষর প্যাটেলের বল ব্যাকফুটে গিয়ে মুশফিক ডিফেন্স করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বলের লাইনে যেতে না পারেননি, বল সরাসারি স্ট্যাম্প ভেঙে দিয়েছে। মুশফিক ৫০ বলে ২৩ রানের ইনিংস খেলে ফিরেছেন। মুশফিকের বিদায়ের পর নুরুল হাসান সোহানও তাড়াহুড়ো করার মাশুল দিয়েছেন। অফস্ট্যাম্পের বাইরের বল এগিয়ে খেলতে গেলে স্টাম্পড হয়ে ফিরতে হয়েছে তাকে। দিনের বাকি সময়টুকু কোনও মতে পার করে যেতে পেরেছে সাকিব-মিরাজ জুটি। দুইজন ৮৪ বল খেলে ৩৪ রানের জুটি গড়ে ড্রেসিংরুমে ফিরেছেন। এখন তাদের ওপরই নির্ভর করছে সব কিছু।
সংক্ষিপ্ত স্কোর (চতুর্থ দিন শেষে):
ভারত প্রথম ইনিংসে: ১৩৩.৫ ওভারে ৪০৪ (পূজারা ৯০, শ্রেয়াস ৮৬, অশ্বিন ৫৮, কুলদীপ ৪০; মিরাজ ৪/১১২, তাইজুল ৪/১৩৩), দ্বিতীয় ইনিংসে ৬১.৪ ওভারে ২৫৮/২ ডি. (গিল ১১০, পূজারা ১০২*, কোহলি ১৯*; খালেদ ১/৫১, মিরাজ ১/৮২)
বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে: ৫৫.৫ ওভারে ১৫০ (মুশফিক ২৮, মিরাজ ২৫, লিটন ২৪; কুলদীপ ৫/৪০, সিরাজ ৩/২০), দ্বিতীয় ইনিংসে: ১০২ ওভারে ২৭২/৬ (শান্ত ৬৭, জাকির ১০০, সাকিব ৪০*, মিরাজ ৯*; অক্ষর ৩/৫০, উমেশ ১/২৭, রবিচন্দ্রন ১/৭৫, কুলদীপ ১/৬৯)।









