সময়ের হিসাবে ১৫ বছর ৭ মাস ১২ দিন। ২০০৭ সালের ২৫ জুলাই শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সঙ্গে পরিচয় মাহমুদউল্লাহর। প্রায় ১৬ বছর ‘আনসাং হিরো’ হয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলেছেন মাহমুদউল্লাহ। ৩৭ বছর বয়সী এই ক্রিকেটারের ক্যারিয়ার এখন শেষলগ্নে। একটি একটি ফরম্যাট থেকে বাদ পড়তে পড়তে মাহমুদউল্লাহ এখন অতল গহ্বরে। সর্বশেষ আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজের দলেও তার জায়গা হয়নি, দেওয়া হয়েছে বিশ্রাম। এই বিশ্রাম যে দীর্ঘমেয়াদের সেটি আর বলার অপেক্ষা রাখে না!
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেকের পর থেকে ভালোই চলছিল মাহমুদউল্লাহর ক্যারিয়ার। মহাগুরুত্বপূর্ণ সময়ে সত্যিকারের একজন লড়াকু সৈনিক হয়ে উঠছিলেন সাবেক টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক। ভক্তরা তাইতো মাহমুদউল্লাহকে ‘সাইলেন্ট কিলার’ নাম দিয়েছেলেন। এই নামটা মাহমুদউল্লাহর সঙ্গে খুব একটা বেমানান নয়। ক্যারিয়ারে অনেক বড় বড় জয়ে অবদান রাখলেও কখনোই আলোয় ছিলেন না তিনি। নীরবেই সবার অলক্ষে নিজের কাজটুকু ঠিকঠাক করে গেছেন। দলের বিপদে ইনিংস মেরামত করায় মাহমুদউল্লাহর জুড়ি ছিলো না। তার ভক্তরা তাইতো তাকে ‘ক্রাইসিস ম্যান’ হিসেবে ডাকতেন। কিন্তু সেইসব এখন সুদূর অতীত।
প্রথমে টেস্ট দল থেকে বাদ পড়ে মাহমুদউল্লাহ খেলছিলেন সীমিত ওভারের দুই ফরম্যাটে। কয়েক টেস্ট বিরতির পর দলে ফিরে প্রত্যাবর্তনটা সেঞ্চুরিতে রাঙিয়েছিলেন। কিন্তু রাগে-ক্ষোভে টেস্ট থেকে অবসরের ঘোষণাই দিয়ে দিলেন তিনি। বাংলাদেশ ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিষয়টিকে ভালোভাবে নেয়নি। এরপর নিয়মিত ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি খেলছিলেন তিনি। কুড়ি ওভারের ক্রিকেটের অধিনায়কও নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু হতশ্রী পারফরম্যান্সের সঙ্গে টি-টোয়েন্টি দলের জায়গাও হারাতে হয়েছে তাকে। মুশফিক টি-টোয়েন্টি থেকে অবসরের ঘোষণা দিলেও মাহমুদউল্লাহ ফেরার চ্যালেঞ্জ নিয়েছেন। কিন্তু ফেরার প্রথম চ্যালেঞ্জেই সর্বশেষ বিপিএলে যাচ্ছেতাই পারফরম্যান্স এসেছে তার ব্যাট থেকে। এবার জায়গা হারালেন ওয়ানডে দল থেকে। যদিও বিসিবি বলছে মাহমুদউল্লাহর বিকল্পের খোঁজেই অভিজ্ঞ এই ক্রিকেটারদের বিশ্রাম দেওয়া হয়েছে! কিন্তু বাস্তবতা বলছে, মাহমুদউল্লাহর এই বিশ্রাম আজীবনের জন্যই!
এ ব্যাপারে নির্বাচক হাবিবুল বাশার সুমন বলেছেন, ‘মাহমুদউল্লাহকে বিশ্রাম দিয়েছি এই সিরিজে। কারণ, মাহমুদউল্লাহ পরীক্ষিত ক্রিকেটার। তাকে নিয়ে খুব বেশি কাজ করার নেই। যখন বড় টুর্নামেন্ট আসবে, সেখানে (বিশ্বকাপে) তারা আগেও খেলেছে, তার কিন্তু ওখানে গিয়ে পরীক্ষা দেওয়ার কিছু নেই।’
২০১৫ ওয়ানডে বিশ্বকাপে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে সেঞ্চুরি করে নিজের নামটা রেকর্ড বুকে তোলার পরও মাহমুদউল্লাহ পার্শ্বনায়ক হয়েই আছেন। এছাড়া আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সাকিবের সঙ্গে দারুণ এক জুটি গড়ে বাংলাদেশকে সেমিফাইনালে তোলেন এই ডানহাতি ব্যাটার। এমন অনেক বড় বড় জয়ে অবদান রেখেছিলেন তিনি।
কিন্তু সাম্প্রতিককালে ওয়ানডে ফরম্যাটে দলের জয়ে খুব একটা অবদান রাখতে পারছেন না মাহমুদউল্লাহ। ম্যাচ ফিনিশ করার যে দায়িত্ব ছিলো, সেই দায়িত্বটা ঠিকঠাক পালন করতে পারছিলেন না তিনি। উল্টো তার স্লো ব্যাটিংয়ে দলকে ভুগতে হয়েছে বেশ। নিয়মিত রান করলেও সেই রান দলে কোনও প্রভাব ফেলতো না। ভারতের অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই মূলত মাহমুদউল্লাহর বিকল্পের সন্ধানে ছিলেন নির্বাচকরা। আর জাকির হাসানকে আয়ারল্যান্ড সিরিজে মাহমুদউল্লাহর বিকল্প হিসেবে সুযোগ দেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে একটি ইম্প্যাক্ট ইনিংস খেলতে পারলেও মাহমুদউল্লাহকে নিয়ে দ্বিতীয়বার ভাবতে হতো!
কিন্তু মাহমুদউল্লাহ নিজেই নিজের পথে ‘কাঁটা’ হয়ে দাঁড়িয়েছেন। রান করলেও নিজের দায়িত্বটা ঠিকঠাক করতে পারছিলেন না। ২১৮ ওয়ানডে খেলে মাহমুদউল্লাহ ৩ সেঞ্চুরি ও ২৭ হাফ সেঞ্চুরিতে ৪ হাজার ৯৫০ রান করেছেন। গড় ৩৫ এর বেশি হলেও স্ট্রাইকরেট ৭৬.১৪। এমন ইম্প্যাক্টহীন ব্যাটিংয়ে দলকে আরও কঠিন পরিস্থিতিতে পড়তে হতো।
বাশার যুক্তি দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন মাহমুদউল্লাহকে বাদ দেওয়া হয়নি, ‘তার (মাহমুদউল্লাহ) জায়গায় কাউকে যদি নিতে হয় তাকে পরীক্ষা দিতে হবে। এই চিন্তাভাবনা থেকে বিশ্রাম দেওয়া হয়েছে। তাও খুব বেশি না, একজনকে বিশ্রাম দেওয়া হয়েছে।’
অক্টোবর-নভেম্বরে ভারতের বসবে বিশ্বকাপের আসর। ওই বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দলকে নিয়ে প্রত্যাশা অনেক। প্রত্যাশার সাথে প্রাপ্তির যোগসূত্র স্থাপন করতেই নানারকম পরীক্ষায়-নিরীক্ষায় টিম ম্যানেজমেন্ট। এরই অংশ হিসেবে মাহমুদউল্লাহকে বাদ দেওয়া। অভিজ্ঞ এই ক্রিকেটারের জায়গাতে সুযোগ পাওয়া জাকির পাশ মার্ক পেয়ে গেলে নির্বাচকদের পেছনে ফিরে তাকানোর সুযোগ নেই।
সরাসরি এমন কিছু না বললেও নির্বাচক বাশার অনেকটা এই সুরেই বলেছেন, ‘সম্ভবত তিনটি বিশ্বকাপ খেলে ফেলেছেন মাহমুদউল্লাহ, তার জন্য বিশ্বকাপ নতুন কিছু না। যদি কোনও কারণে বিশ্বকাপের আগে কেউ ইনজুরিতে পড়ে, আরও দুই একটা জায়গা হয়তো আমরা দেখবো সামনে, সেক্ষেত্রে যাকে নিয়ে যায় সে যেন প্রস্তুত হয়, সেটারই চেষ্টা চলছে এই সিরিজে।’
ওয়ানডে দল থেকে বাদ পড়ার আগে টি-টোয়েন্টি দল থেকেও বাদ পড়তে হয়েছিলো মাহমুদউল্লাহকে। অন্য ফরম্যাটের চেয়ে সংক্ষিপ্ত ফরম্যাটে মাহমুদউল্লাহর পারফরম্যান্স ছিল সবচেয়ে নাজুক। ১২১টি আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি খেলে ১১৭.৩০ স্ট্রাইকরেট ও ২৩.৫৭ গড়ে মাহমুদউল্লাহ ১ হাজার ৮০৯ রান করেছেন।
ছয়টি বিশ্বকাপ খেলার অভিজ্ঞতা নিয়ে ২০২১ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে গিয়েছিলেন ডানহাতি এই ক্রিকেটার। কিন্তু ৮ ইনিংসে করতে পারেন ১৬৯ রান। পাশাপাশি অধিনায়ক হিসেবেও দলকে উজ্জীবিত করতে পারছিলেন না তিনি। ২০২১ সালের বিশ্বকাপ থেকে ফিরে পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে তিনটি সিরিজে দলকে নেতৃত্ব দিলেও জিম্বাবুয়ে সফরের আগে অধিনায়কত্ব হারান মাহমুদউল্লাহ। যদিও সাধারণ ক্রিকেটার হিসেবে জিম্বাবুয়েতে একটি ম্যাচ খেলেছিলেন তিনি। এরপর আরব আমিরাতে দুটি এশিয়া কাপের ম্যাচ দিয়েই শেষ হয়ে যায় তার টি-টোয়েন্টি ক্যারিয়ার। মাহমুদউল্লাহকে ২০২২ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের দল থেকে বাদ দেওয়ার নেপথ্যে ছিলেন শ্রীধরন শ্রীরাম। যদিও মাহমুদউল্লাহ চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিলেন, তিনি পারফরম্যান্স করেই ফিরবেন!
অন্যদিকে সাদা পোশাক ও লাল বলের ক্রিকেটে মাহমুদউল্লাহ প্রথম ধাক্কা খান বাংলাদেশের শততম টেস্ট ম্যাচে। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে কলম্বোতে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ম্যাচে তাকে খেলানো হয়নি। তারপরও টেস্ট ক্যারিয়ার চলছিল। ২০২০ সালে পাকিস্তান সফরে ব্যর্থ হওয়ার পর টেস্ট থেকে বাদ পড়েন মাহমুদউল্লাহ। এরপর ২০২১ সালের জুলাইতে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সুযোগ হয় তার। হারারেতে ১৫০ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলেই নিয়ে নেন টেস্ট অবসর। তার এমন সিদ্ধান্তে বোর্ড বেশ ক্ষুব্ধই হয়। সবমিলিয়ে এই ফরম্যাটে ৫০ ম্যাচে ৫ সেঞ্চুরি ও ১৬ হাফ সেঞ্চুরিতে ২ হাজার ৯১৪ রান করেন মাহমুদউল্লাহ।
টেস্ট থেকে অবসর নিয়েছেন মাহমুদউল্লাহ। বাজে পারফরম্যান্সের কারণে টি-টোয়েন্টিতে জায়গা হারিয়েছেন। এবার একদিনের ক্রিকেটে হারালেন জায়গা। বিশ্বকাপ পরিকল্পনা সফল করতে মাহমুদউল্লাহকে বাদ দেওয়ার বিকল্প ছিল না টিম ম্যানেজমেন্টের হাতে! যদিও বাশার বলছেন বিশ্রামের কথা! বাশারের বক্তব্যকে কথার কথা ধরলে বলাই যায় মাহমুদউল্লাহর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ক্যারিয়ারের ‘এপিটাফ’ লেখা হয়ে গেছে।









