১১ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার ইমরুল কায়েসের। লম্বা সময় জাতীয় দলের জার্সিতে খেললেও এখন তিনি নির্বাচকদের দৃষ্টিসীমানার বাইরে। অদূর ভবিষ্যতে তার জাতীয় দলে ফেরার সম্ভাবনাও নেই। নিজের ক্যারিয়ারসহ নানান ইস্যু নিয়ে সম্প্রতি বাংলা ট্রিবিউনের মুখোমুখি হয়েছিলেন ইমরুল। দুই পর্বের সাক্ষাৎকারের প্রথম পর্ব প্রকাশিত হয়েছিল গতকাল (জাতীয় দলে খেলতে গেলে সাপোর্ট লাগে: ইমরুল )। আজ মঙ্গলবার প্রকাশিত হচ্ছে সাক্ষাৎকারের দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব।
প্রশ্ন: সমর্থকরা নানা সময়ে ক্রিকেটারদের নিয়ে ট্রল করে। আপনার কি মনে হয় সামাজিক মাধ্যমে করা এসব ট্রলের কারণে ক্রিকেটারদের পারফরম্যান্সে প্রভাব পড়ে?
ইমরুল: ২০০৮ সালে আমার যখন অভিষেক হয় তখনকার পরিবেশ, পারিপার্শ্বিক অবস্থা অনেক ভালো ছিল। এখন যেটা হচ্ছে ব্যক্তিগত ভাবে সমর্থকরা একজন ক্রিকেটারকে আক্রমণ করছে। এই জিনিসগুলো করা মানে নিজেদের ক্ষতি করা। জাতীয় দলে একটা ছেলে অনেক পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে আসে। এক রাতেই সে জাতীয় দলে সুযোগ পেয়ে যায় না। আপনি সাকিবের মতো ক্রিকেটারকে নিয়ে যখন ট্রল করছেন, তখন এখানে আমার মতো কিংবা তরুণ ক্রিকেটারদের অস্তিত্বটা কোথায় থাকে? আজকে সাকিবকে ছোট করা মানে দেশকে ছোট করা, জাতিকে ছোট করা। জাতীয় দলের ক্রিকেটার সব সময়ই দেশের সম্পদ। আমি সম্পদকে নষ্ট করার জন্যই ট্রল করছি! এগুলো বন্ধ হওয়া উচিত। এই ট্রলের কারণেই আমাদের ক্রিকেটাররা ধারাবাহিক হতে পারছে না।
প্রশ্ন: বাংলাদেশের ব্যাটারদের সমস্যাটা কোথায়, বিশেষ করে টেস্টে বাংলাদেশের ব্যাটাররা কেন ব্যর্থ হয়?
ইমরুল: অবকাঠামো, সিস্টেম এবং আর্থিক কাঠামোতে অনেক ত্রুটি আছে। আমাদের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের সময়টা পারফেক্ট নয়। ওই সময় উইকেট খুব ভালো থাকে না। প্লেয়ারদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। দোষটাতো যারা আয়োজক তাদের। বাংলাদেশের পরের টেস্ট কোথায় হবে, কেমন উইকেটে খেলা হবে-তার ওপর নির্ভর করে লিগের উইকেটগুলো তৈরি করা উচিত। ওই ধরনের উইকেটে জাতীয় দলের ক্রিকেটাররা খেলবে, তাদের প্রস্তুতি হবে। কিন্তু আপনি দেখবেন জাতীয় লিগে দুইশ করে জাতীয় দলে গিয়ে ৩০ রানও করতে পারছেন ব্যাটাররা। একমাত্র কারণ হচ্ছে প্রস্তুতির ঘাটতি। কারণ লিগে আপনি ফ্ল্যাট উইকেটে খেলে জাতীয় দলে হয়তো খুব টার্নিং উইকেট কিংবা খুব বাউন্সি উইকেটে খেলতে হচ্ছে। লিগেও আমাদের স্পোর্টিং উইকেট বানাতে হবে। কিউরেটর, গ্রাউন্ডসম্যান যারা কাজ করছেন, তারা অনেকদিন ধরে এক জায়গাতে কাজ করছেন। জানি না তারা কী করে। আপনি যখন প্রপার প্রফেশনাল একটা পরিবেশ তৈরি করবেন, তখন সবাই খেলতে পারবে। আরেকটা ব্যাপার হচ্ছে পারিশ্রমিক। একটা ছেলে চারটা দিন কষ্ট করছে, আপনি ৩০/৪০ হাজার টাকা তাকে ম্যাচ ফি দিচ্ছেন। অথচ ওই ক্রিকেটার টেপ টেনিসে খ্যাপ খেলে আসলেও এর চেয়ে বেশি পাবে। অবশ্যই পারিশ্রমিকটা বাড়িয়ে ক্রিকেটারদের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের প্রতি মনোযোগ বাড়াতে হবে। আমরা প্লেয়ারদের গালি দিচ্ছি, দোষ দিচ্ছি। কিন্তু গোড়া ঠিক থাকলে সব ঠিক হয়ে যাবে।
প্রশ্ন: তাহলে বলতে চাচ্ছেন ক্রিকেটারদের স্কিলের কোন ঘাটতি নেই?
ইমরুল: পুরোপুরি স্কিলের সমস্যার কারণে ব্যর্থ হচ্ছি সেটা নয়। ক্রিকেটারদের স্কিল তখনই, আপনি যখন ভালো উইকেটে অনুশীলনের ব্যবস্থা করে দিতে পারবেন। ভালো উইকেটে খেলতে খেলতে ব্যাটারদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়, শটস খেলার প্রবণতা তৈরি হয়। কিন্তু মিরপুরে অনুশীলন করে কোন ক্রিকেটার আত্মবিশ্বাস বাড়াতে পারবে না। একই উইকেটে উইম্যান্স, নাইনটিন, জাতীয় দল, বিপিএলের দল, ক্লাবের দল -সবাই যখন অনুশীলন করে ওই উইকেটেতো কিছু থাকে না। ওখানে আপনি কীভাবে স্কিলের উন্নতি করবেন? এই কারণেই আসলে জাতীয় দলে ঢুকে প্লেয়াররা খুব ভালো পারফর্ম করতে পারে না। আমি উন্নতি তখনই করবো, যখন ঘরোয়া ক্রিকেটের উইকেট, অনুশীলনের উইকেট ভালো হবে।
প্রশ্ন: গত বিশ্বকাপে ভরাডুবি হয়েছে বাংলাদেশের। অনেক কারণের মধ্যে সাকিব-তামিমের ইস্যুটি কতটা প্রভাব ফেলেছে?
ইমরুল: অবশ্যই বড় প্রভাব ফেলেছে। এটা অস্বীকার করার কিছু নেই। এটা কেউ যদি অস্বীকার করে থাকে, তাহলে আমি বলবো সে ভুল ভাবে ব্যাখ্যা করছে! কারণ একটা দেশ বড় স্বপ্ন নিয়ে বিশ্বকাপ খেলতে যাচ্ছে, যাওয়ার আগে দু’জনের কথা বার্তা নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, সেটা কোনওভাবেই দলের জন্য ভালো কিছু ছিল না। আমার মনে হয় দুজনকেই এই দায়ভার নিতে হবে। তাদের কারণে দলের পরিবেশ নষ্ট হয়ে গেছে। কম্বিনেশনও নষ্ট হয়ে গেছে। সবমিলিয়ে দায়টা দু’জনেরই।
প্রশ্ন: তামিমকে ফেরত আনা নিয়ে প্রায়ই আলোচনা হয়, আপনি কি মনে করেন তামিমের জাতীয় দলে ফিরে আসা উচিত?
ইমরুল: আমি তামিমের সঙ্গে ব্যক্তিগত ভাবে কথা বলেছি, ও আসলে জাতীয় দলের ড্রেসিংরুম উপভোগ করছে না। কারণ সে ড্রেসিংরুমে আগের মতো শ্রদ্ধা পাচ্ছে না। আমি পুরোপুরি তামিমের সাথে একমত। তামিম যতদিন ক্রিকেট খেলেছে ডমিনেট করে খেলেছে, নিজের লেভেলটা একটা জায়গায় রেখেছিল। ওখান থেকে অবসর নিল, আবার ফিরেও এলো। আসলে ফিরে আসার পর মানুষ খুব ভালো ভাবে নেয় না। এখন হয়তো মিডিয়া, বোর্ড অনেকেই তামিমকে চাচ্ছে। তামিম হয়তোবা আবেগ দিয়ে চিন্তা করে বলছে, ‘আমি হয়তো একটা ফরম্যাট খেলতে পারি।’ আমার মনে হয় তার আর আসাটা উচিত হবে না।
প্রশ্ন: এবার বলুন পেছনে ফিরে তাকালে কোন স্মৃতিগুলো আপনাকে ভালো অনুভূতি কিংবা কষ্ট দেয়?
ইমরুল: একজন প্লেয়ার হিসেবে জাতীয় দলে খেলতে পেরেছি, এটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন। আমার বাবার স্বপ্নটা পূরণ করতে পেরেছি- এইদিক থেকে খুব ভালো লাগে। বাংলাদেশ দলের হয়ে প্রায় ১০/১২ বছর খেলেছি। দুটি বিশ্বকাপ খেলেছি। এই জিনিসগুলো চিন্তা করলে খুব ভালো লাগে। আর খারাপ লাগার বিষয়টা হচ্ছে ২০১৯ বিশ্বকাপে সুযোগ না পাওয়া। সেবারের মতো আপসেট আমি কিছুতেই হইনি। কারণ বিশ্বকাপের আগে যতটা ভালো খেলা, যতটুকু পারফরম্যান্স দেওয়ার আমি দিয়েছি। কনফার্মও ছিলাম বিশ্বকাপে যাচ্ছি। ম্যানেজমেন্ট থেকে গ্রিন সিগনাল দিয়েছিল। কেন থাকলাম না, কী কারণে থাকলাম না। এটা আসলে তারাই (নির্বাচক) বলতে পারবে। অধিনায়ক যখন বলে, তখনও কনফিউশন থাকার কথা না। মাশরাফি ভাই আমাকে ডেকে বলেছিলেন, ‘তুই কিন্তু বিশ্বকাপে যাচ্ছিস। তুই আর তামিম ওপেন করবি।’ আমিই একমাত্র ব্যক্তি যে নিশ্চিত ছিলাম যাচ্ছি। তাই শতভাগ নিশ্চিত থেকেই যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। তারপরও ভেতরে ভেতরে কী হয়েছে, আমরা জানা নেই…..।
প্রশ্ন: সাধারণত কোনও ক্রিকেটারকে বাদ দিলে তার সঙ্গে আলাপ করে নেয় নির্বাচকরা, আপনার সঙ্গে কি তারা কোনও কথা বলেননি?
ইমরুল: নির্বাচকদের সঙ্গে কখনই আমার কথা হয়নি। কখনই জানতে পারিনি, কেন বাদ পড়েছি। আপনি নির্বাচকদের জিজ্ঞেস করতে পারেন, কেন বাদ দিয়েছে আমাকে। জিম্বাবুয়ে সিরিজে একশ করলাম, তার পরের সিরিজে কেন আমাকে বাদ দিল? আমি যখন নিউজিল্যান্ডে গিয়ে সেঞ্চুরি করলাম, সর্বোচ্চ রান করলাম। পরের সিরিজে আমাকে বাদ দেওয়ার কারণ কী? এর কোনও ব্যাখ্যা আমি পাইনি।
প্রশ্ন: সুজন ভাইয়ের ভূমিকা নিয়ে নানান প্রশ্ন আছে, তার জাতীয় দলের সঙ্গে যুক্ত থাকা জাতীয় দলে সত্যিকার অর্থে কতখানি প্রভাব রাখে?
ইমরুল: আমরা একজন বিশেষ কোচকে দেশসেরা কোচ বানাই। অথচ কয়জন খেলোয়াড় তৈরি করতে পেরেছে ওই কোচ। সেটা কেউ জানে? এটা যদি আপনি আমাকে দেখিয়ে দিতে পারেন, তাহলে আমি মেনে নিবো। সুজন ভাইকে নিয়ে প্রচুর আলোচনা হয়। তিনি একসাথে এতো কিছু কেন করেন? উনি ওনার কাজটা প্যাশন থেকেই করছেন। বাংলাদেশের অনেক কোচ আছে, অনেকে অনেক রকম ভাবে ক্রেডিট নিতে চায়, সুজন ভাই একমাত্র ব্যক্তি যার হাত ধরে বাংলাদেশের ক্রিকেট উপকৃত হয়েছে। ওনার হাত ধরে আজকে বাংলাদেশে অনেকগুলো খেলোয়াড় খেলছে। এটা কেউ যদি অস্বীকার করে, তবে অন্যায় হবে।
প্রশ্ন: বিশেষ কোন কোচের কথা বলছেন আপনি?
ইমরুল: আমার নাম বলার দরকার নেই। আশা করি, সবাই এটা বুঝতে পারবে!
প্রশ্ন: আরও একটি বিষয় নিয়ে ধোঁয়াশা আছে। আপনি অধিনায়ক হিসেবে কুমিল্লাকে চ্যাম্পিয়ন করিয়েছেন। অথচ সর্বশেষ আসরে মনে হচ্ছিল আপনাকে কিছুটা কোণঠাসা করে রাখা হয়েছে। কুমিল্লার ফ্র্যাঞ্চাইজির সঙ্গে আপনার কি কোনও বিষয় নিয়ে দ্বন্দ্ব ছিল?
ইমরুল: আমার আসলে জানা নেই। অনেক কিছু নিয়েই আমি বিস্মিত হয়েছি। ইনজুরিতে পড়ার পর আমি দ্রুত কামব্যাক করি। কিন্তু দুইটা ম্যাচ খারাপ করার পর আর সুযোগ পেলাম না। অথচ এই দলটির হয়ে আমি অতীতে কী করেছি, সবার জানা। কুমিল্লার সঙ্গে আমার সম্পর্ক এই সাত বছরই নয়। কুমিল্লার সঙ্গে সম্পর্ক কিন্তু তারও আগের। সিলেট রয়ল্যাস থেকেই এই ফ্র্যাঞ্চাইজির সঙ্গে আমার সম্পর্ক। আমি খুব হতাশ, সাথে বিস্মিতও হয়েছি। আমাকে অধিনায়কত্ব দেয়নি, হয়তো ওদের ব্যাকআপ মাইন্ডে আমাকে নিয়ে ভিন্ন প্ল্যান ছিল। জানি না আসলে এমনটা ওরা করলো কেন।
প্রশ্ন: তা অবসর পরবর্তী পরিকল্পনা নিশ্চয়ই করেছেন?
ইমরুল: আমি ক্রিকেটের সাথেই থাকবো। সেটা দেশের বাইরে হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। ক্রিকেট ছাড়াতো আসলে কিছুই ভাবিনি। আর আমার পক্ষে ক্রিকেটের বাইরে থাকা সম্ভবও না। অস্ট্রেলিয়াতে আমার পরিকল্পনা আছে একটা ক্রিকেট একাডেমি গড়ার। এটা নিয়ে ওয়ার্কআউট চলছে। কিছু কাজ এগিয়েও গেছে। আমি ইতোমধ্যে কোচিংয়ের লেভেল-টু কোর্সটা করেছি। খুব দ্রুতই লেভেল- থ্রিটা করে ফেলবো।
প্রশ্ন: সম্প্রতি ক্রিকেটের ব্যাট প্রস্তুতির সাথে জড়িয়েছেন, কতটা সাড়া পাচ্ছেন?
ইমরুল: আলহামদুলিল্লাহ। আমার প্রত্যাশার চেয়েও বেশি সাড়া পেয়েছি। মানুষের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া ছিল। প্রত্যেকেই বলেছে এটা একটা ভালো জিনিস দেশের ক্রিকেটের জন্য। এই কারণে অনেক বড় কিছু করার সাহস করছি। টেপ টেনিস ব্যাটসহ ক্রিকেটের অন্য সরঞ্জামগুলোও ইতোমধ্যেই বাজারে আসা শুরু করেছে। আমেরিকাতে আমাদের অনেক বেশি প্রচার, ওখানে দুইজনকে ডিলারশিপ দেওয়ার চেষ্টা করছি। এছাড়া ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়াতে ইতিবাচক রেসপন্স আছে। আমি এগুলো নিয়ে ওয়ার্কআউট করছি এই মুহূর্তে।









