আগামী রবিবার রিও ডি জেনিরোর মারাকানা স্টেডিয়ামে পরম আরাধ্যের বিশ্বকাপে ফাইনালে জার্মানির মুখোমুখি হচ্ছেন মেসি ও তার দল আর্জেন্টিনা। পরম আরাধ্য? হবে না কেন, দলের দীর্ঘ দুই যুগের বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল খরা মেটাতে মূল ভূমিকা তো তারই ছিল। তবে এর আগের দুইবারেও তার প্রচেষ্টা ছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর সাফল্যের সোনার হরিণ ধরা দেয়নি মেসির হাতে। কিন্তু এবার আর্জেন্টিনার ২৪ বছরের সেমির খরা তো মিটিয়েছেনই, ২৪ বছরের ফাইনালে না খেলার অতৃপ্তিও দূর করেছেন ত্রাণকর্তা মেসি। ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে ভাস্বর মেসির সাফল্যের সোকেসে আছে সবই। চারবারের ফিফা ব্যালন ডি’ওর, স্প্যানিশ ক্লাব বার্সেলোনার হয়ে ৬টি লা লিগার শিরোপা, তিন চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপাসহ অন্যান্য লিগ শিরোপা। এছাড়া এমনই সব কীর্তি গড়েছেন যা তাকে নিয়ে গেছে খ্যাতির চূড়ায়। এমনকি অসাধারণ ক্রীড়াশৈলীর জন্য 'ভিন গ্রহের' ফুটবলার তকমাটাও জুটেছে গেছে তার নামের সঙ্গে। তবে ব্যক্তি পর্যায়ে খ্যাতির চূড়ায় থাকলেও দেশের হয়ে সাফল্য খরায় রয়েছেন আর্জেন্টাইন এ অধিনায়ক। কারণ, এখনও যে ছুঁয়ে দেখা হয়নি পরম আরাধ্যের বিশ্বকাপটি। বার বার অধরাই রয়ে গেছে সোনালী এই ট্রফি। তবে দলের হয়ে কিছু প্রাপ্তি হয়তো সেই না পাওয়ার আক্ষেপ ঘুচিয়েছে কিছুটা। ২০০৮ সালে অলিম্পিকে গোল্ড মেডেল, ২০০৫ সালে অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ-- সবই আর্জেন্টিনার হয়ে জেতা হয়ে গেছে মেসির। আক্ষেপের জায়গা একটাই ম্যারাডোনা, পেলের মতো সোনালী স্বপ্ন কখনো বাস্তবে রূপ দিতে পারেননি আর্জেন্টাইন জাদুকর। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে দেশকে দ্বিতীয় শিরোপা এনে দিয়েছেন আর্জেন্টাইন গ্রেট ম্যারাডোনা। সেবার তিনি করেছিলেন ৫ গোল। বাকিদের দিয়ে করিয়েছেনও। অপরদিকে ফুটবল সম্রাট পেলে ব্রাজিলের হয়ে জিতেছেন তিন তিনটি বিশ্বকাপ। ১৯৫৮, ১৯৬২, ১৯৭০ সালে পেলের হাতে উঠেছে সোনার পরী। মেসির ফুটবলীয় নৈপুণ্য এসব কিংবদন্তিদের কাতারে ফেললেও বিশ্বকাপ না জেতায় এখনও যেন অভিজাত ওই গ্রেটদের তালিকায় ঠিকঠাক অভিষিক্ত হতে পারছেন না বিনয়ী এই ফুটবল মাস্টার। কিংবদন্তী হতে মেসির পথে চলা সেই ২০০৬ বিশ্বকাপে। তখন মাত্র কৈশোর পেরিয়ে ১৯ বছরে পা দিয়েছেন। বয়সটা কাঁচা ছিল, আর্জেন্টিনা দলও কাঁচা কাজ করে বসে সেই আসরে। বিদায় নিতে হয় কোয়ার্টার ফাইনালেই। ঘাতক এবারের প্রতিপক্ষ সেই জার্মানি। টাইব্রেকার ভাগ্যেই বিশ্বকাপ স্বপ্ন চূর্ণ হয়ে যায় মেসিদের। চার বছর পর ২০১০ বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকাতেও মেসির ভেলায় চরে বিশ্বকাপের যাত্রা শুরু করে আর্জেন্টিনা। এবারও সোনালী স্বপ্ন চূর্ণ হয় জার্মান ঝড়ে। আর্জেন্টিনাকে কোয়ার্টার ফাইনালে ৪-০ গোলে হারিয়ে শেষ চারে জায়গা করে নেয় ক্লোসার দল। চার বছর পর ২৭ বছরের মেসির সামনে আবারও সূবর্ণ সেই সুযোগ। জার্মানির কাছে আগের দুবারের হারের ক্ষতের প্রলেপ দেওয়ারও মোক্ষম এক সময়ে উপস্থিত মেসি। আরও সুযোগ আবারও একবার আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপের সোনালী ট্রফিটার মধুর স্বাদ পাইয়ে দেওয়ার। এবারের আসরে আগের বারের চেয়ে আরও পরিপূর্ণ তিনি। দক্ষিণ আফ্রিকায় নিষ্প্রভ থাকলেও ব্রাজিল বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার আক্রমণ ভাগের মূল সেনানী ছিলেন মেসিই। দলকে একাই টেনে তুলেছেন নক আউট পর্বে। যদিও কোয়ার্টার ফাইনাল ও সেমিফাইনালে সেভাবে আলো ছড়াতে পারেননি তিনি। তবে এখনও আলো ছড়াতে মেসির জন্য প্রস্তুত রয়েছে কিংবদন্তির সেই মঞ্চ। যেখান থেকে বলা যায়, মাত্র ৯০ মিনিট (কিংবা ১২০ মিনিট) দূরে রয়েছেন আর্জেন্টিনার এই ফুটবল জাদুকর। অর্থাৎ ১৩ জুলাই ফাইনাল খেলা শুরুর বাঁশি বাজার পর থেকে পরবর্তী দেড় বা দুই ঘণ্টায় মেসি কী যাদু দেখান-- তার জন্য উন্মুখ হয়ে আছে ফুটবল বিশ্ব। ম্যারাডোনার পরে অপর স্মরণীয় আর্জেন্টাইন ফুটবলার হওয়ার সুযোগ এবারের বিশ্বকাপ মঞ্চে তৈরি হয়েই আছে। এখন মেসি কি পারবেন তার দুই পায়ের জাদুর কাঠির ছোঁয়ায় আর্জেন্টিনার দীর্ঘ শিরোপা খরা ঘোচাতে? ফুটবলে চরম বৈরি প্রতিবেশী ব্রাজিলের মাটি থেকে আরেক পুরনো শত্রু জার্মানিকে হারিয়ে পরম আরাধ্য বিশ্বকাপের সোনালী ট্রফিটায় চুমু এঁকে দিতে পারবেন কি ভিনগ্রহের খেলোয়াড় মেসি! সেই অপেক্ষাতেই বিশ্বজুড়ে মেসির কোটি কোটি ভক্ত তৃষ্ণার্ত দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে রোববারের ফাইনালের দিকে!








