হঠাৎ করেই পাহাড় অশান্ত হয়ে পড়লো। ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল খাগড়াছড়ি জেলায়, এরপর দীঘিনালা হয়ে রাঙামাটি পর্যন্ত আতঙ্ক-সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়েছে। এখন পর্যন্ত দুই জেলাতে পাহাড়ি-বাঙালি সংঘর্ষে একাধিক মানুষের মৃত্যুর খবর বেরিয়েছে। আহত কম নয়। পুরো পাহাড় অঞ্চল এখন থমথমে। জাতীয় ফুটবল দলের গোলকিপার মিতুল মারমা রাঙামাটির মারিশ্যা থেকে পুরো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে আতঙ্ক অনুভব করছেন। নিরাপদে থাকলেও কখন কী ঘটে যায়, তা নিয়ে রয়েছেন আতঙ্ক-ভয়ে।
বেশ কিছু দিন ধরে জাতীয় দলের গোলবারের নিচে অতন্দ্র প্রহরী মিতুল। হাভিয়ের কাবরেরার অটো চয়েস। এবার খেলছেন আরেক ঐতিহ্যবাহী দল আবাহনী লিমিটেডের তেকাঠির নিচে। ভুটান থেকে প্রীতি ম্যাচ খেলতে এসে সরাসরি শ্বশুরবাড়ি মারিশ্যা বেড়াতে গিয়েছেন। যদিও তার বাড়ি রাঙামাটির বিলাইছড়িতে। মারিশ্যায় বেড়াতে এসে এবার চরম অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির মুখে পড়েছেন। চারদিকে আতঙ্কের পাশাপাশি নিরাপত্তা নিয়ে খারাপ অবস্থার মধ্যে আছেন। বিশেষ করে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের জীবন চিন্তা করে অস্থির হয়ে পড়ছেন।
মিতুল যেখানে আছেন, তা থেকে দীঘিনালার পথ বেশি দূর নয়। মারিশ্যা থেকে কাছাকাছি। তবে সংঘর্ষ কিংবা বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়ার অবস্থা তার শ্বশুরবাড়ি পর্যন্ত আসেনি। তবে পার্শ্ববর্তী বাজারে এ নিয়ে সবাই আতঙ্কে আছেন। মিতুল তার দুই চোখের পাতা এক করতে পারছেন না। সেখান থেকে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মারিশ্যা বেড়াতে এসে এবার চরম নেতিবাচক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এক চুরিকে কেন্দ্র করে চারদিকে সংঘর্ষ, ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া, এমনকি মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। আহত হয়ে অনেকে হাসপাতালে। আসলে এমনটি আমরা কখনও চাইনি। আমরা চাই সবাই শান্তিতে জীবনযাপন করুক। সবাই সবার প্রতি সহমর্মিতা দেখাক। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, যেকোনও কারণে হোক না কেন পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হয়ে যাচ্ছে। যার কারণে জীবনহানি হচ্ছে। সবার সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হচ্ছে।’
মারিশ্যার বাসা থেকে বের হতে পারছে না মিতুল। পরিবার-পরিজন ও গ্রামবাসী নিয়ে আতঙ্কে সময় কাটছে। তাই মিতুল বলেছেন, ‘আমার এখানে এখন পর্যন্ত কোনও সমস্যা হয়নি। তবে কখন কী ঘটে যায় তা নিয়ে আতঙ্কে আছি। এমনিতে আমাদের অনেকের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। হামলা হয়েছে। লুটপাটও। এই অবস্থা থেকে কখন উত্তরণ ঘটবে তা নিয়ে বেশ চিন্তিত আছি। মারিশ্যা থেকে দীঘিনালায় যাওয়ার কথা। সেটাও যেতে পারছি না। ওদিকে রাঙামাটিতে আত্মীয়-স্বজন আছে। সব মিলিয়ে আমরা ভালো নেই।’
দুয়েকদিনের মধ্যে আবাহনী লিমিটেডের অনুশীলন শুরু হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে আদৌ সামনের দিকে যোগ দিতে পারবেন কিনা সন্দিহান মিতুল, ‘আমাদের এখানে যা হচ্ছে তাতে ঢাকায় যাওয়া কঠিন। কারফিউ দেওয়া হয়েছে। মারিশ্যা থেকে রাঙামাটি কিংবা দীঘিনালা হয়ে যাওয়া তো যাবেই না। এখন পরিস্থিতির ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। সামনের দিকে কখন পরিস্থিতি ভালো হয় সেই অপেক্ষায় আছি।’
মিতুলের আরও একটি অভিযোগ বা অনুযোগ আছে। পাহাড়ে কোনও সমস্যা হলেই মোবাইল নেটওয়ার্কে সমস্যা দেখা দেয়। তার দাবি, ‘এখন এখানে মোবাইলে কথা বলতে সমস্যা হচ্ছে। ইন্টারনেটেও ঝামেলা হচ্ছে। কেন এমন হয় বোধগম্য নয়। আমার মনে হয় এই দিকটা সবার দেখা উচিত। আমি গাছের ওপরে থেকেও নেটওয়ার্ক পুরোপুরি পাইনি।’
বর্তমানে দুই জেলাতে কারফিউ জারি করা হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে স্থানীয় প্রশাসন কাজ করছে। মিতুল তাই আশাবাদী কণ্ঠে বলেছেন, ‘আমার মনে হয় বাঙালি কিংবা আদিবাসী যারা আছে তাদের মধ্যে মিলেমিশে থাকাটা বেশি প্রয়োজন। তুচ্ছ কারণে বড় কোনও নেতিবাচক ঘটনা না হওয়া উচিত। এখন তো শহরের দিকে ২০টি বাড়ির মধ্যে ৫টিতে আদিবাসী পাবেন। তাই তারা এই সময়ে বেশ নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে আছে। আমি মনে করি সবাই এই দেশের নাগরিক। সবাইকে দেশের উন্নয়নে এক হয়ে কাজ করা উচিত। এগিয়ে যাওয়া উচিত। নিজেদের মধ্যে সম্প্রীতি আরও বাড়ানো উচিত। তাহলে হয়তো এমন সমস্যা আর সামনের দিকে হবে না। এখন তো পাহাড় জ্বলছে, আমরা সবাই আতঙ্কে আছি।’








