আর্জেন্টিনার বিপক্ষে লিওনেল মেসির বিদায়ী ম্যাচে খেলার সুযোগ বেনিন ও বুরকিনা ফাসোর ফুটবলারদের জন্য হওয়ার কথা ছিল স্বপ্নের মতো অভিজ্ঞতা। কিন্তু আর্জেন্টিনায় গিয়ে সেই স্বপ্নই যেন পরিণত হয়েছে দুর্ভোগে। দীর্ঘ ভ্রমণ, হোটেলে গরম পানির অভাব, মানহীন অনুশীলন সুবিধা আর ম্যাচ আয়োজন নিয়ে নানা অভিযোগে প্রশ্নের মুখে পড়েছে পুরো আয়োজন। এমনকি ম্যাচ থেকে সম্ভাব্য বিপুল আয়ের কোনো ভাগও নাকি পায়নি আমন্ত্রিত আফ্রিকান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনগুলো।
বেনিন ও বুরকিনা ফাসোর বিপক্ষে আর্জেন্টিনার প্রীতি ম্যাচ আয়োজনের অভিজ্ঞতা নিয়ে বার্তা সংস্থা এএফপির কাছে এমন অভিযোগ করেছেন বেনিন দলের এক প্রতিনিধি।
বুয়েনস এইরেসে পৌঁছাতে দুই দলের ভ্রমণ করতে হয়েছে ঘণ্টার বদলে কয়েক দিন। হোটেলে ছিল না গরম পানির ব্যবস্থা। অনুশীলনের সুযোগ-সুবিধাও ছিল প্রত্যাশার চেয়ে অনেক নিচে। ওই প্রতিনিধির দাবি, ম্যাচ থেকে বিপুল অঙ্কের আয় ও টেলিভিশন স্বত্বের অর্থ আসার সম্ভাবনা থাকলেও আমন্ত্রিত আফ্রিকান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনগুলো লাভের কোনো অংশ পায়নি।
ম্যাচের আগে বেনিনের কোটোনু থেকে প্রকাশিত রাষ্ট্রীয় দৈনিক ‘লা নেশন’ উচ্ছ্বাসের সঙ্গে লিখেছিল, এই ম্যাচের মাধ্যমে পুরো বিশ্বের সামনে নিজেদের তুলে ধরবে দলটি। দেশটির ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনও আর্জেন্টিনার বিপক্ষে খেলার সুযোগ পাওয়াকে বিশেষ সুযোগ হিসেবে দেখেছিল।
আর্জেন্টিনার সংবাদমাধ্যমকে বেনিনের ডিফেন্ডার মোহামেদ তিজানি বলেছিলেন, ‘‘আমি মেসিকে বলব, ‘তুমি একজন ঈশ্বর।’ সে বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়।”
কিন্তু মাঠের ফল তাদের পক্ষে আসেনি। আর্জেন্টিনার কাছে ৩-০ গোলে হেরেছে বেনিন।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ের পেশাদার প্রীতি ম্যাচ আয়োজনের কোনো সর্বজনীন নিয়ম নেই। তবে আফ্রিকার ছোট দলগুলো সাধারণত দেশের বাইরে ম্যাচ আয়োজনের জন্য বিভিন্ন এজেন্সির ওপর নির্ভর করে। অনেক ক্ষেত্রে এসব ম্যাচ থেকে তাদের কোনো আর্থিক লাভও হয় না।
আফ্রিকান ফুটবল নিয়ে কাজ করা এক বিশেষজ্ঞ নাম প্রকাশ না করার শর্তে এএফপিকে বলেছেন, ‘আফ্রিকার ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনগুলো এসব চুক্তিতে রাজি হয়, কারণ সবকিছুর আয়োজন করে দেওয়া হয়। এতে প্রতিপক্ষ খোঁজা কিংবা প্রীতি ম্যাচ আয়োজনের ঝামেলা পোহাতে হয় না।’
তবে তিনি স্বীকার করেছেন, ভ্রমণ ও আবাসনের ব্যবস্থা প্রায়ই মানসম্মত হয় না। বুরকিনা ফাসোর ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও বিব্রতকর হয়ে ওঠে। ম্যাচের আগের দিনও দলটি মরক্কোয় আটকে ছিল। বুয়েনস এইরেসগামী ফ্লাইট বাতিল হয়ে যাওয়ায় তাদের যাত্রা থমকে যায়।
শেষ মুহূর্তে আয়োজকেরা অন্য একটি বিমানের ব্যবস্থা করলেও ক্ষুব্ধ সিনিয়র দলের খেলোয়াড়েরা তাতে উঠতে অস্বীকৃতি জানান। ফলে তড়িঘড়ি করে অনূর্ধ্ব-২৩ দলকে আর্জেন্টিনায় পাঠায় বুরকিনা ফাসো। ম্যাচের মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে ক্লান্ত ও সময়ের পার্থক্যজনিত ধকল নিয়ে পৌঁছানো তরুণেরা মাঠে নামেন। বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠা আর্জেন্টিনার কাছে তাদের ৭-০ গোলে হার তাই অনেকটাই অনুমেয় ছিল।
এই দুর্ভোগের জন্য দায়ী কে? এখন সেই প্রশ্নই তুলছেন সমর্থকেরা। একদিকে প্রশ্ন উঠছে, আফ্রিকার ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনগুলো কি একতরফা চুক্তিতে রাজি হয়ে নিজেরাই এমন পরিস্থিতির সুযোগ তৈরি করছে? অন্যদিকে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (এএফএ) বিরুদ্ধেও অভিযোগ, মেসির বিশ্বজোড়া জনপ্রিয়তা কাজে লাগিয়ে তারা কি আয় সর্বোচ্চ করার চেষ্টা করছে?
এসব অভিযোগের পেছনে প্রকৃত উদ্দেশ্য যা-ই থাকুক, এএফএ নিজেও আর্থিক সংকটে রয়েছে। সংস্থাটির বিরুদ্ধে অর্থপাচারের তদন্ত চলছে। সভাপতি ক্লদিও তাপিয়ার বিরুদ্ধেও কর ফাঁকির সন্দেহের অভিযোগ রয়েছে।
আর্জেন্টিনার কয়েকটি সংবাদপত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব ম্যাচ নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ চলছে। কিছু ম্যাচকে অবজ্ঞাসূচকভাবে চাতাররা বলা হচ্ছে, যার অর্থ নিম্নমানের বা সস্তা আয়োজন।
এ বছর বিশ্বকাপ প্রস্তুতির অংশ হিসেবে মেসির দল মৌরিতানিয়া ও জাম্বিয়ার বিপক্ষেও খেলেছে। ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে মৌরিতানিয়া ১১০তম এবং জাম্বিয়া ৯১তম স্থানে ছিল। আর্জেন্টিনা যথাক্রমে ২-১ ও ৫-০ গোলে জিতেছে।
এর আগে ২০২৫ সালের নভেম্বরে অ্যাঙ্গোলার স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত প্রীতি ম্যাচ খেলতে লুয়ান্ডায় গিয়েছিল আর্জেন্টিনা। ওই ম্যাচে অংশ নিয়ে কয়েক মিলিয়ন ডলার পেয়েছিল দলটি বলে জানা গেছে। আটবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী মেসির একটি গোল ও একটি অ্যাসিস্টে আফ্রিকান দলটির বিপক্ষে ২-০ গোলে জেতে আর্জেন্টিনা।
বুরকিনা ফাসোর জাতীয় দলের সঙ্গে আচরণ নিয়ে তীব্র সমালোচনার মুখে ম্যাচের আয়োজক ইউরোডাটা স্পোর্ট সংক্ষিপ্ত বিবৃতি দিয়েছে। এএফএর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত বিবৃতিতে সংস্থাটি দাবি করেছে, তারা চুক্তির সব দায়বদ্ধতা যথাযথভাবে পালন করেছে।