টেস্ট ম্যাচের আদর্শ আচরণ দেখাল মিরপুরের পিচ

Send
গাজী আশরাফ হোসেন লিপু
প্রকাশিত : ০০:৫৪, নভেম্বর ১২, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ০০:৫৬, নভেম্বর ১২, ২০১৮

গাজী আশরাফ হোসেন লিপুবিগত কয়েক বছর হোম অব ক্রিকেটে আমাদের সফলতার পাল্লা যথেষ্ট ভারী হলেও এই পিচের আচরণ নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। মিরপুরের মন্থর পিচের টার্ন, অধারাবাহিক ও অমসৃণ বাউন্স নিয়ে ব্যাটসম্যান ও পেস বোলাররা মোটেই সন্তুষ্ট ছিলেন না।

আদর্শ টেস্ট উইকেটে ‘প্রথম দিনের দুই ঘণ্টা পেস বোলারদের সম্মান করে’ এই প্রবাদটি বহু যুগ ধরে প্রচলিত আছে। কিন্তু সম্প্রতি বিশেষ করে এশিয়াতে প্রথম দিনের প্রথম ঘণ্টাতেও পেস বোলাররা পিচে প্রাণ খুঁজে পান না, এমন পিচ তৈরি করা হয় যে এক প্রান্ত স্পিন দিয়েই আক্রমণ শুরু হয়। এক টেস্টে পিছিয়ে থাকার পরও পিচের প্রথম দিনের এমন স্পোর্টিং আচরণ ছিল দারুণ উপভোগ্য।

নতুন বলের মুভমেন্টের সঙ্গে শক্ত বলের বাড়তি বাউন্সে কাইল জার্ভিস যেভাবে ইনফর্ম ইমরুল কায়েসকে আউট করলেন, সেটা ছিল ব্যাট বলের লড়াইয়ের উপভোগ্য অংশ। আর্দ্রতার পরশ মাখানো পিচে ব্যাটসম্যানদের টিকে থাকার জন্য অনেক সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়েছে। পেসারদের বাড়তি অনুপ্রেরণাকে উসকে দিয়েছেন লিটন দাস ও মোহাম্মদ মিঠুন। খাটো গড়নের লিটন দাস যে লেন্থের বলে অন দ্য রাইজ শট খেলেছেন, সেটা মাটিতে গড়ানো শটের চেয়ে বরাবরই আকাশে উঠে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি থাকে ও ঝুঁকির মাত্রা বাড়ায়। তার ফল তিনি হাতেনাতে পেয়েছেন এবং প্রতিপক্ষকে দারুণ সূচনায় সহায়তা করেন।

দলের একাদশে মিঠুনের ওপর আস্থার প্রতিদান যে তাকেই দিতে হবে এবং সেটা টেস্ট ম্যাচে চমত্কার বল ছাড়ার মাধ্যমেও যে হতে পারে সেই বিষয়টি সম্পর্কে তিনি কতটুকু নিজেকে তৈরি করতে পেরেছেন আমার যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। ৪ নম্বরে ব্যাট করতে আসা একজন ব্যাটসম্যান দলের এমন প্রাথমিক বিপর্যয়ে বল ব্যাট দিয়ে খেলার চেয়ে ছাড়ার ড্রিলে সামান্য পারদর্শিতা দেখালে তার উইকেটটি রাখতে পারতেন এবং মুমিনুল ও মুশফিকের মতো পরবর্তী সেশনের ব্যাটিং উপযোগী পিচের ফায়দা অতি সহজেই উপভোগ করতে পারতেন।

জিম্বাবুয়ে ক্যাচিংয়ে দক্ষতা দেখাতে পারলে ও মুমিনুলের দেওয়া প্রথম ক্যাচটি ধরতে পারলে বাংলাদেশ শিবিরে একটা আতঙ্ক ছড়াতে পারতো। কিন্তু প্রতিপক্ষ প্রাপ্ত একাধিক সুযোগকে তালুবন্দি করতে না পারায় লাঞ্চের পরেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশ নিতে শুরু করে। তারা দুজন ওভার প্রতি ৫ রান সংগ্রহ করে এবং এটা সম্ভব হওয়ার অন্যতম কারণ ছিল জিম্বাবুয়ের নিম্নমানের স্পিন বোলিং ইউনিটের পারফরম্যান্স। সিকান্দার রাজার লেন্থের ওপর কোনোই নিয়ন্ত্রণ ছিল না। লাইনও ছিল বড়ই অগোছালো। তরুণ মাভুতা বা শন উইলিয়ামসের বোলিংয়ে না ছিল কোনও ধার বা চতুরতা।

দিনের দ্বিতীয় ও তৃতীয় সেশনে আমাদের ব্যাটসম্যানরা প্রায় চ্যালেঞ্জহীন ব্যাট করেছেন এবং তার ফলাফল হিসাবে দুজনের ব্যাট থেকেই অনায়াসে এসেছে সেঞ্চুরি। দলে মুমিনুলের নড়বড়ে হতে থাকা স্থান পুনরুদ্ধার হয়তো হয়েছে। তবে শর্ট পিচ বলে গালি বা ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্ট অঞ্চল দিয়ে তিনি যে শটস খেলেছেন সেটা যে কোনও তুলনামূলক ভালো দলের গতিসম্পন্ন বোলিং আক্রমণের বিরুদ্ধে তার ক্যাচ দেওয়ার সম্ভাবনা আরও বাড়াবে। তার নিজের শটস বাছাই ও খেলার ব্যাপারে ব্যাটিং কোচের সঙ্গে তাকে আরও নিবিড়ভাবে অনুশীলন করা প্রয়োজন। অতিরিক্ত আগ্রাসী ব্যাটিং ভবিষ্যতে তার ইনিংসে বড় করার অন্যতম অন্তরায় হয়ে উঠতে পারে এবং উদ্ভুত সুযোগ থেকে তার ২০০ রানের মাইলফলক স্পর্শ করতে না পারাটা তার এক জ্বলন্ত উদহারণ এবং দিন শেষে দলের আরেকটি উইকেট পতনের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ার পেছনে একটি দায় মুমিনুলের ওপরও বর্তায়।

মিরপুরের আউটফিল্ডের ঘাসের ডিজাইন দারুণ লাগছিল। ভবিষ্যতে খেলার জন্য সবুজ ঘাসের চৌহদ্দি ইঙ্গিত দেয় পিচের পরিচর্যায় একটা পরিবর্তন আসছে। এই টেস্ট ম্যাচের প্রথম দিনের উইকেটের স্পোর্টিং আচরণ ভালো লেগেছে। সকালের প্রতিকূল ও পরের অনুকূল পিচে মুশফিকের ব্যাটিং কৌশল ও টেম্পারমেন্ট নিজের দলের অন্য ব্যাটসম্যানদের জন্য অনেক শিক্ষণীয়। তিনি নিজে সুস্থ থাকার পরও সাকিব ও তামিমের অনুপস্থিতির কারণে তার নিজের অর্জিত ৪ নম্বর ব্যাটিং অর্ডারের পরিবর্তে ৫ বা ৬ নম্বরে দলের চাহিদা মোতাবেক ক্যাপ্টেনকে নিয়ে ব্যাট হাতে যে সমর্থন দিচ্ছেন সেটা দারুণ দৃষ্টান্ত। ব্যক্তির চেয়ে দল বড় ভালো ফর্মে থাকলে কেউ কেউ খুশি মনে নিতে পারে না।

সিরিজে আমাদের সমতা আনার জন্য দ্বিতীয় দিনটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয় নতুন বলের সকালে প্রথম ১০টি ওভার ম্যাচে ফেরত আসার জন্য জিম্বাবুয়েও তাদের সর্বস্ব ঢেলে দেবে। এই সময়টা ব্যাট হাতে সফল হলে দ্বিতীয় দিনটিও বাংলাদেশ ব্যাটসম্যানদের দাপট না দেখানোর কোনও কারণ দেখছি না।

/এফএইচএম/

লাইভ

টপ