ক্রিকেটার নাজমুল হোসেনের একান্ত সাক্ষাৎকার‘ভাবি, এত ঝড়-তুফানের মধ্যেও ১০-১১ বছর কীভাবে খেললাম!’

Send
রবিউল ইসলাম
প্রকাশিত : ২০:৩২, জুলাই ১১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০৩:২১, জুলাই ১২, ২০২০

পেসার নাজমুল হোসেন- ফাইল ছবিমাত্র ৩১ বছর বয়সে গত বছর অনেকটা নীরবেই ক্রিকেটকে বিদায় বলে দিয়েছেন নাজমুল হোসেন। একসময় বাংলাদেশের অন্যতম সেরা পেসার ভাবা হতো তাকে। কিন্তু চোট ও দলীয় সমন্বয়ের অজুহাতে ম্যাচের পর পর দলের বাইরে রাখা হয়েছে তাকে। মাশরাফির চোটে খেলার সুযোগ পেলেও মাশরাফি ফেরার পর আবার উপেক্ষিত হন। ২০০৯-১০ মৌসুমে রুবেল ও শফিউলের উত্থান ও মিডিয়া-হাইপে তার পেছনে পড়ে যাওয়া যেন অনিবার্য ছিল। সবমিলিয়ে যতটা না ব্যর্থতা, তার চেয়ে বেশি দুর্ভাগ্যের শিকার হয়েছেন দেশের হয়ে ৪৪টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলা পেসার। কোচিং পেশায় নাম লেখানো নাজমুল মুখোমুখি হয়েছেন বাংলা ট্রিবিউনের-

বাংলা ট্রিবিউন: কেমন আছেন, কিভাবে সময় কাটছে?

নাজমুল হোসেন: সারাদিন বাসাতেই থাকি। পরিবারকে সময় দেওয়ার চেষ্টা করি। করোনার কারণে ধর্মে-কর্মে খানিকটা মনোযোগ বেড়েছে। এগুলো করতে করতেই সময় কেটে যাচ্ছে। পাশাপাশি নিজে ফিট থাকার জন্য বিকেলে বাড়ির আশপাশে দৌড়াদৌড়ি করি। হালকা ওয়ার্মআপ করছি।

বাংলা ট্রিবিউন: নিউজিল্যান্ড সিরিজে নিজের দ্বিতীয় ম্যাচেই চার উইকেট নিলেন? কিন্তু পরের ম্যাচেই একাদশে নেই। কী ঘটেছিল?

নাজমুল: নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম দুটি ম্যাচে আমাকে খেলানো হয়। প্রথম ম্যাচে ৪০ রান দিয়ে চার উইকেট নিই। পরের ম্যাচে উইকেট না পেলেও ৩০ রান দিই। কিন্তু নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম দুই ম্যাচে আমরা হেরে গেছি, তাই যারা সুযোগ পায়নি তাদের সুযোগ দিতেই একাদশের বাইরে রাখা হয় আমাকে। কেননা ওই সিরিজের দুই সপ্তাহ পরই ভারতের বিপক্ষে সিরিজ ছিল। দলের স্বার্থেই বিভিন্ন সময় আমি থেকেও না-থাকার মতো ছিলাম।

বাংলা ট্রিবিউন: ২০০৭ নিউজিল্যান্ড সফরে থেকেও একটি ম্যাচও খেলার সুযোগ হয়নি। শুনেছি জেমি সিডন্স আপনাকে পছন্দ করতেন না।

নাজমুল: ডেভ হোয়াটমোরের তত্ত্বাবধানে অনেকদিন খেলার পর মানিয়ে ফেলেছিলাম। কিন্তু নতুন কোচ জেমি সিডন্স আসার পর আমাকে আবার সমস্যায় পড়তে হয়। ওনার (সিডন্স) মতে আমার কিছুই হতো না। নতুন কোচকে দোষ দিয়ে লাভ নেই, নতুন কোচদের টিম ম্যানেজমেন্ট, নির্বাচকদের সহায়তা করতে হয়। তারা তো জানেন একটা ছেলে যে ৪-৫ বছর ধরে খেলছে, তার মধ্যে কিছু আছে কি না। সমস্যা হচ্ছে টিম ম্যানেজমেন্ট কিংবা নির্বাচকেরা এই দায়ভারটা নিতে চান না। সিডন্স সবসময়ই বলতেন, আমার বলে পেস কম আমাকে দিয়ে কিছু হবে না। অথচ দুই-তিন ম্যাচ পরে আবার আমাকেই ডাকা হতো। তাহলে কোচের ওই কথার মূল্য কী থাকলো!

বাংলা ট্রিবিউন: ২০০৯ সালের ত্রিদেশীয় সিরিজেও কি এমন কিছু হয়েছিল?

নাজমুল: ওই সিরিজেই অভিষেক হয় রুবেলের। আমি প্রথম ম্যাচ খেলি,তিনটি  উইকেটও নিই। কিন্তু পরের দুটি ম্যাচ আমাকে আর খেলানো হয়নি। তখন আমাদের অধিনায়ক মোহাম্মদ আশরাফুল। আশরাফুল ভাই বললেন, পরের ম্যাচ তুমি খেলবা। আমি বলি কী বলেন, ফাইনাল ম্যাচ জেমি সিডন্স আমাকে জীবনেও খেলাবে না! তারপরও আশরাফুল ভাই বলে ও (সিডন্স) না খেলালেও আমি খেলাবো। ম্যাচের দিন সকালে অধিনায়ক নিশ্চিত করেন আমি খেলছি।  মাঠে গিয়ে সিডন্সের গরম চোখের সামনে পড়লাম। ম্যাচের ২০ মিনিট আগে সিডন্স আমাকে বললেন, যদি খারাপ খেলো ধরে নাও এটাই তোমার শেষ ম্যাচ। আমি অবাক, ম্যাচ শুরুর আগে এভাবে কোনও কোচ বলে! তখন আমি অধিনায়ককে বলি, কীভাবে খেলবো- কোচ আমাকে এই কথা বলছে। আশরাফুল ভাই বলছিল, আরে ভাই খেলতে থাকো। আল্লাহর কী রহমত, ৬ রানে শ্রীলঙ্কার ৫ উইকেট নেই। সেখানে তিন উইকেটই আমার। এমন ঘটনা কিন্তু আরও আছে।

বাংলা ট্রিবিউন: কবে সেটা?

নাজমুল: আড়াই বছর পর ২০০৮ সালে অস্ট্রেলিয়া সফরে ফের সুযোগ পাই। প্রথম ম্যাচে তিন উইকেট নেওয়ার পর দ্বিতীয় ম্যাচে বোলিং করার সুযোগ পাইনি। প্রথম ম্যাচের পর বোলিং কোচ সারোয়ার ইমরানের কাছে জেমি সিডন্স জানতে চেয়েছিল, কাকে খেলাবে, শাহাদাত না নাজমুলকে। উনি বলেছিলেন নাজমুলকে। কোচের উত্তর, ওকে তো হেঁটে হেঁটে পেটাবে। পরে আমি ও শাহাদাত দুজনই খেলার সুযোগ পাই। কিন্তু আমাকে বোলিং দেওয়া হয়নি। ম্যাচটি আমরা ২২ ওভারেই হেরে যাই। এই কারণেই হয়তো বোলিং দেওয়া হয়নি। কিন্তু এখানে আমার দোষ কোথায়! পরের ম্যাচে আবার বাদ। আমার সঙ্গে পুরো ক্যারিয়ার জুড়েই এমন হয়েছে।আফতাবের সঙ্গে নাজমুল

বাংলা ট্রিবিউন: কোচের এমন আচরণের কথা নির্বাচক কিংবা ক্রিকেট অপারেশনসকে জানাননি?

নাজমুল: ২০১২ সালে এশিয়া কাপের সাতটা ম্যাচে দলে থাকলেও একাদশে ছিলাম না। তখন আমাদের কোচ হিসেবে নতুন যোগ দিয়েছেন রিচার্ড পাইবাস। উনি আসার পর আমি কোনও সুযোগই পাইনি। তখনই আমি আকরাম ভাইকে বলেছিলাম, ভাই আমাকে এভাবে রেখে তো লাভ নেই। তখনকার নির্বাচক রফিকুল আলম ভাইকেও বলেছিলাম। আমি এতটাই হতাশ ছিলাম, নির্বাচকদের সঙ্গে বিতর্কেও জড়িয়ে বলেছিলাম, আমার ক্যারিয়ারের গড়, রান রেট দেখেন। যখনই আমি একটা ম্যাচ ভালো করে নিজেকে প্রস্তুত করতাম, তখনই আমাকে বসিয়ে দেওয়া হতো। এই কারণেই আমার খেলাটা নষ্ট হয়েছে। আমার পুরো ক্যারিয়ারটা এভাবেই গেছে।

বাংলা ট্রিবিউন: এমন অনেক ঘটনাই আছে আপনার ক্যারিয়ার জুড়ে, নিজেকে কতটা দুর্ভাগা ভাবেন?

নাজমুল: ২০১৪ সালে যখন ইনজুরিতে পড়ি, আমার মনে হয় সবাই (নির্বাচক) তাতে খুশি হয়েছিলেন। যেহেতু আমাকে বাদও দেওয়া যায় না, আবার রেখে খেলাতেও পারে না। উভয়সংকটে ছিলেন তারা। প্রতিটি ম্যাচই আমাকে খেলতে হয়েছে পরের ম্যাচের চিন্তা করে। রাতে খেলবো জেনে পরের দিন এসে বহুবার শুনেছি, আমি একাদশে নেই। তারপরও ভাবি, এত ঝড়-তুফানের মধ্যেও ১০-১১ বছর কীভাবে ক্রিকেট খেললাম!

বাংলা ট্রিবিউন: ২০১১ বিশ্বকাপে দলে ছিলেন। কিন্তু ঘরের মাঠে বিশ্বকাপটা খেলতে না পারায় নিশ্চয়ই ভীষণ হতাশ আপনি?

নাজমুল: ভীষণ হতাশ। ঘরের মাঠে  এতো বড় একটা বিশ্বকাপ হলো, কিন্তু একটি ম্যাচেও আমি একাদশে ছিলাম না। কারণ টিম কম্বিনেশন! তবুও ঘরের মাঠে বাংলাদেশের প্রথম বিশ্বকাপের সদস্য হিসেবে গর্ববোধ করি, কিন্তু আড়ালে কষ্টটাই বেশি। কষ্টের একটা গল্প শুনবেন?

বাংলা ট্রিবিউন: কী সেই গল্প?

নাজমুল: ২০১০ ফেব্রুয়ারিতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বাংলাদেশের সিরিজ। আমি দল থেকে বাদ পড়ে সিলেটে চলে গেছি। আটমাস পর মাশরাফি ভাই ইনজুরি কাটিয়ে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ফিরে রাগ করে হোটেল ছেড়ে চলে আসেন। ওই সময় টিম ম্যানেজমেন্ট থেকে আমাকে ফোন দেওয়া হয়। যেহেতু আমি দলে নেই, সিলেটে গিয়ে দুই সপ্তাহ রিলাক্সড মুডে ছিলাম। কোনও অনুশীলন করিনি। আমাকে বলা হয় কাল ইংল্যান্ডের সঙ্গে ম্যাচ, তুমি ঢাকায় চলে আসো। মাশরাফি চলে গেছে, এখন যেহেতু পেস বোলার নেই, তোমাকে খেলতে হবে। আমাদের বোলিং কোচ শেন জার্গেনশন আমাকে পরামর্শ দেন, যেহেতু বোর্ড থেকে তোমাকে ডেকেছে, তুমি তো আর না করতে পারবে না, চলে আসো, যা হবার হবে। আমি রাতের ট্রেনে উঠে সকাল নয়টায় হোটেলে ঢুকেছি। ফ্রেশ হয়ে ১২টার সময় মাঠে চলে গেছি। টসের আগে আমাকে বলা হয়, সমস্যা নেই আমাদের পেসার আছে। তোমার খেলা লাগবে না। কতটা হতাশার ব্যাপার ভাবেন!

বাংলা ট্রিবিউন: ২০১২ এশিয়া কাপে দল ভালো করলো, আপনার পারফরম্যান্স মোটামুটি ভালোই ছিল। তবুও আর সুযোগ পেলেন না?

নাজমুল: ২০১২ সালে এশিয়া কাপ শেষে জিম্বাবুয়ে সিরিজে আবুল হাসান রাজু ও মাহবুবুল আলম রবিন খেলার সুযোগ পেলো। অথচ আমি এশিয়া কাপের সেরা বোলার ছিলাম। রাগে আমি আকরাম ভাইকে বলেছিলাম, ভাই আমি পরীক্ষা দিতে দিতে ক্লান্ত। আর কত পরীক্ষা আমাকে দিতে হবে? আমাকে আর খেলাবেন না।

বাংলা ট্রিবিউন: কোচিংকে পেশা করে নিয়েছেন, কোচিং নিয়ে কী পরিকল্পনা?

নাজমুল: গতবছর বিসিবি আমাকে যখন প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটারদের তালিকা থেকে বাদ দিয়ে দেয়, রাগ করে অবসরের সিদ্ধান্ত নিই। তবে কোচিং পেশা নিয়ে আমার কিছু স্বপ্ন আছে। লেভেল-১ কোচিং কমপ্লিট, সামনে আরও কিছু করবো। স্বপ্ন দেখি, জাতীয় দলের কোচ হওয়ার। তার আগে সিলেটের ছোট ছোট বাচ্চাদের সঙ্গে আমার অভিজ্ঞতা বিনিময় করতে চাই।

 

 

 

 

/আরআই/পিকে/

লাইভ

টপ