কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টেক জায়েন্টদের এআই মডেলগুলোকে ওপেন চ্যালেঞ্জ দিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে এখন চীনের স্টার্টআপ মুনশট এআই। প্রতিষ্ঠানটি সম্প্রতি উন্মোচন করেছে তাদের সর্বাধুনিক বৃহৎ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল ‘কিমি কে৩’; যা তাদের দাবি অনুযায়ী ওপেনএআই, অ্যানথ্রপিক ও গুগলের সর্বাধুনিক মডেল চ্যাটজিপিটি-৫.৬, ক্লড সনেট-৫, জেমিনাই-৩ দশমিক ৫ এর সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতা করতে সক্ষম।
ডিপসিকের পর কিমি কে৩-এর আগমন প্রমাণ করছে যে যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন ভ্যালির বাইরে, বিশেষ করে চীনে, কম খরচে উচ্চক্ষমতার ওপেন-ওয়েট এআই মডেল তৈরির প্রতিযোগিতা দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে।
মুনশট এআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, কিমি কে৩ একটি ২ হাজার ৮০০ বিলিয়ন প্যারামিটারের মিক্সচার অব এক্সপার্টস (এমওই) মডেল। তবে ব্যবহারকারীর প্রতিটি অনুরোধের বিপরীতে মডেলটির মাত্র ৩২ বিলিয়ন সক্রিয় প্যারামিটার কাজ করে। এই এমওই স্থাপত্যের ফলে বিশাল আকারের মডেল হওয়া সত্ত্বেও এটি তুলনামূলক কম কম্পিউটিং শক্তি ব্যবহার করে দ্রুত ও কম খরচে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল দিতে পারে। প্রতিষ্ঠানটি আরও জানিয়েছে, মডেলটি ১৫ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন টোকেন দিয়ে প্রশিক্ষিত হয়েছে, যা বর্তমানে উন্মুক্তভাবে প্রকাশিত বৃহৎ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলগুলোর মধ্যে অন্যতম বৃহৎ প্রশিক্ষণ ডেটাসেট।
মুনশট এআই এর প্রকাশিত বেঞ্চমার্ক অনুযায়ী, সফটওয়্যার কোড লেখা, জটিল গাণিতিক সমস্যা সমাধান, যুক্তিভিত্তিক বিশ্লেষণ এবং এআই এজেন্টভিত্তিক বিভিন্ন কাজে কিমি কে৩- এর পারফরম্যান্স চ্যাটজিপিটি-৫ দশমিক ৬, ক্লড সনেট-৫ ও জেমিনাই ৩ দশমিক ৫-এর সমপর্যায়ে বা কিছু ক্ষেত্রে এগিয়ে রয়েছে। বিশেষ করে এসডাব্লিউই-বেঞ্চ ভেরিফাইড, এআইএমই, লাইভ কোড বেঞ্চ, টাউ২ এবং হিউম্যানিটি’জ লাস্ট এক্সাম-এর মতো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বেঞ্চমার্কে মডেলটি ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিকের সর্বাধুনিক মডেলের সমমানের, এমনকি কিছু কোডিং ও এজেন্ট-ভিত্তিক পরীক্ষায় তাদের ছাড়িয়ে যাওয়ার দাবি করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
কিমি কে৩-এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এটি ওপেন-ওয়েট হিসেবে প্রকাশ করা হয়েছে। অর্থাৎ গবেষক, ডেভেলপার ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান মডেলটি নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন, ফাইন-টিউন এবং বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করতে পারবেন। যেখানে ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিক তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী মডেলগুলো সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করে না, সেখানে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো ওপেন-ওয়েট কৌশলকে প্রতিযোগিতার অন্যতম বড় অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, এতে উন্নয়ন ব্যয় কমবে, নতুন এআই অ্যাপ্লিকেশন তৈরির গতি বাড়বে এবং বিশ্বজুড়ে গবেষণাও আরও ত্বরান্বিত হবে।
মুনশট এআই জানিয়েছে, কিমি কে৩-এর এপিআই ব্যবহারের খরচও প্রতিদ্বন্দ্বী অনেক মডেলের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম রাখা হয়েছে, যাতে স্টার্টআপ ও সফটওয়্যার ডেভেলপাররা কম ব্যয়ে শক্তিশালী এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারেন। কম খরচ ও উন্মুক্ত ব্যবহারের সুযোগ মিলিয়ে এটি বিশ্বব্যাপী ডেভেলপারদের জন্য আকর্ষণীয় বিকল্প হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
মডেলটি উন্মোচনের পর ইতোমধ্যেই ব্যাপক সাড়া পেয়েছে। ব্যবহারকারীর চাপ এতটাই বেড়ে যায় যে পর্যাপ্ত জিপিইউ (গ্রাফিক্স প্রসেসিং ইউনিট) সক্ষমতার অভাবে মুনশট এআই সাময়িকভাবে নতুন এপিআই নিবন্ধন ও কিছু সাবস্ক্রিপশন স্থগিত করতে বাধ্য হয়। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, বিদ্যমান ব্যবহারকারীদের সেবা সচল রাখতে তারা অবকাঠামো সম্প্রসারণের কাজ করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের উন্নত চিপ রফতানিতে নানা বিধিনিষেধ সত্ত্বেও চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো সফটওয়্যার দক্ষতা, অ্যালগরিদমিক উদ্ভাবন এবং ওপেন-ওয়েট মডেলের মাধ্যমে দ্রুত সক্ষমতার ব্যবধান কমিয়ে আনছে।









