দেশি সফটওয়্যার কোম্পানির নতুন বাজার হতে পারে আফ্রিকা

Send
হিটলার এ. হালিম
প্রকাশিত : ১২:১৪, মার্চ ০৭, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:৫৪, মার্চ ০৭, ২০১৮

সফটওয়্যারপ্রায় দুই দশক ধরে বাংলাদেশের তথ্য-প্রযুক্তিভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশে বিভিন্ন সফটওয়্যার ও সেবাপণ্য রফতানি করছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বড় বড় কোম্পানির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে দেশীয় অনেক প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। বিভিন্ন দেশের সরকারি কাজের অটোমেশন, প্রযুক্তি প্রয়োগের কাজ করছে এসব প্রতিষ্ঠান। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারের পাশাপাশি বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো নিজ উদ্যোগে নতুন নতুন মার্কেট খুঁজে বের করে কাজ করছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের নতুন বাজার হতে পারে আফ্রিকা।

এ প্রসঙ্গে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বলেছেন, ‘বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো দেশের বাইরে ভালো কাজ করছে। এটা আমাদের জন্য সুখবর। সফটওয়্যার রফতানির বিষয়টি এভাবে এগিয়ে গেলে চলতি বছরের শেষ নাগাদ এ খাত থেকে রফতানি আয় এক বিলিয়ন ডলার (১০০ কোটি ডলার) দাঁড়াবে। আর ২০২১ সাল নাগাদ এ আয় ৫ বিলিয়ন ডলারে (৫০০ কোটি ডলার) পৌঁছাবে।’

তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, ‘ভাবা যায়, আমাদের দেশের একটি প্রতিষ্ঠানের তৈরি সফটওয়্যার বিশ্বের বহু দেশের মোবাইল অপারেটররা ব্যবহার করে। আমাদের দেশের প্রতিষ্ঠান বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারি কাজ অটোমেশন করছে।’

জানা গেছে, বাংলাদেশের ১০টির বেশি প্রতিষ্ঠান ভারত, নেপাল, ভুটান, মালয়েশিয়া, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, আফ্রিকাসহ বিভিন্ন দেশে অফিস খুলে কাজ করছে। এর মধ্যে রিভ সিস্টেমস, টাইগার আইটি, ডাটাসফট, দোহাটেক, ই-জেনারেশন, সাউথটেক, ড্রিম অ্যাপ, সিসটেক ডিজিটাল উল্লেখযোগ্য। বর্তমানে এ খাত থেকে আয়ের পরিমাণ ৮০০ মিলিয়ন ডলার (৮০ কোটি ডলার)। তবে এই আয়ে সন্তুষ্ট নয় বাংলাদেশ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বেসিস সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবীর বলেন, ‘দেশের ১৫-২০টা কোম্পানি দেশের বাইরে কাজ করছে। প্রতিষ্ঠানগুলো ভালো কাজ করছে। আয়ের পাশাপাশি দেশের জন্য সুনামও বয়ে আনছে। দেশের ব্র্যান্ডিং ভালো হচ্ছে। একইসঙ্গে দেশের ইতিবাচক ইমেজ প্রতিষ্ঠা হচ্ছে।’

বিদেশে অফিস খুলতে কিছু সমস্যা এখনও আছে। এসব সমস্যা দূর করা গেলে আরও অনেক প্রতিষ্ঠান কাজ করতে পারবে বলে তিনি মনে করেন।

তিনি বলেন, ‘দেশের বাইরে কোনও অফিস খুলতে গেলে ১০ হাজার ডলারের বেশি নিয়ে যাওয়া যায় না। এখন কোনও প্রতিষ্ঠান যদি বিদেশে তার লিয়াজোঁ অফিস, সাপোর্ট সেন্টার বা অফিস খুলতে চায় তাহলে ওই টাকায় তা সম্ভব নয়। টাকার পরিমাণ বাড়ানো না গেলে দেশীয় প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়বে না।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘২০২৪ সাল পর্যন্ত সরকার সফটওয়্যার খাতে ট্যাক্স হলিডে (কর অবকাশ) ঘোষণা করেছে। ফলে বিদেশ থেকে এ খাতে অর্জিত আয়ের অর্থ আনতে সরকারকে কোনও কর দিতে হয় না ব্যবসায়ীদের। কেবল ভ্যাট (মূল্য সংযোজন কর) সংক্রান্ত কোনও বিষয় থাকলে সেটা দিতে হয়।’

বেসিস সভাপতি আরও জানান, সরকার সম্প্রতি সফটওয়্যার ও সেবাপণ্য রফতানিতে ১০ শতাংশ নগদ অর্থ সহায়তা (ক্যাশ ইনসেনটিভ) ঘোষণা করেছে। এর ফলে এ খাত সংশ্লিষ্টরা সফটওয়্যার ও সেবাপণ্য রফতানিতে আরও মনোযোগী হবেন।

ডাটাসফট কোম্পানি জাপানে আইওটি (ইন্টারনেট অব থিংস) নিয়ে কাজ করছে। তারা অটোমোবাইল (গাড়ি) ও ইলেক্ট্রনিকস, বিশেষ করে হোম অ্যাপ্লায়েন্স আইটেম আইওটি নির্ভর করতে কাজ করছে। এতে ভালো সাড়া পাচ্ছেন বলে জানালেন ডাটাসফট সিস্টেম বাংলাদেশ লিমিটেডের প্রধান মাহবুব জামান।

তিনি বলেন, ‘আমরা যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মার্কেট এক্সপ্লোর করেছি। এখন আমাদের নতুন বাজার খুঁজতে হবে। জাপান হতে পারে আগামী দিনের জন্য খুবই ভালো একটি বাজার।’ চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের কারণে দেশটির জনসংখ্যা, প্রযুক্তি আমাদের জন্য সহায়ক হবে বলে তিনি মনে করেন।

আফ্রিকাতেও অফিস খুলবেন বলে জানান মাহবুব জামান। এরই মধ্যে তিনি কঙ্গো ও কেনিয়াতে টোল কালেকশনে (সংগ্রহ) আইওটি প্রযুক্তি ব্যবহারে সহায়তা করছেন বলে জানান। 

বাংলাদেশের প্রথম বহুজাতিক তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান রিভ সিস্টেম। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বহু দেশে রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির অফিস। ঢাকা ও দিল্লিতে রয়েছে পণ্য ও সেবার ডেভেলপমেন্ট সেন্টার। প্রধান কার্যালয় সিঙ্গাপুরে। প্রতিষ্ঠানটির জনপ্রিয় পণ্য ও অ্যাপ্লিকেশনের মধ্যে রয়েছে রিভ আইটেল ডায়লার, রিভ চ্যাট, রিভ অ্যান্টি-ভাইরাস ও এন্টারপ্রাইজ কমিউনিকেশন অ্যাপ। প্রতিষ্ঠানটির গ্রুপ প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এম রেজাউল হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, এ ধরনের উদ্যোগে সরকারের সমর্থন খুবই জরুরি। যা সরকারের কাছ থেকে তিনি ও তার প্রতিষ্ঠান বরাবরই পেয়ে আসছেন।

দেশের সফটওয়্যার ও সেবাপণ্যের নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ই-জেনারেশন জাপানে আইওটি, মধ্যপ্রাচ্যে ব্লক চেইন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডাটা সায়েন্স নিয়ে কাজ করছে। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান শামীম আহসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “দেশের বাইরে গিয়ে কাজ করার ফলে বাংলাদেশের একটা ইতিবাচক ইমেজ তৈরি হচ্ছে। আমরা আগে ছিলাম ‘লো কস্ট সার্ভিস প্রোভাইডার’। সেখান থেকে আমরা ‘সলিউশন্স প্রোভাইডার’ হতে পেরেছি। এটা আমাদের আত্মবিশ্বাস তৈরি করেছে।”

তিনি জানান, দেশের বাইরে যেসব প্রতিষ্ঠান কাজ করছে এবং আয়ের অর্থ দেশে আনছে তা সফটওয়্যার খাতের রফতানি আয়ের সঙ্গে যুক্ত হবে। ফলে ২০১৮ সালের মধ্যে এক বিলিয়ন এবং ২০২১ সালের মধ্যে পাঁচ বিলিয়ন ডলার আয়ের লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব হবে।

বেসিস ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দেশীয় প্রতিষ্ঠান দোহাটেক নিউ মিডিয়া ভুটান সরকারের ই-জিপি বাস্তবায়নের কাজ করছে। টাইগার আইটি নেপাল সরকারের যানবাহন নিবন্ধন ডিজিটালাইজেশন ও এনআইডির (জাতীয় পরিচয়পত্র) অটোমেশন নিয়ে কাজ করেছে। সিসটেক ডিজিটাল ইন্টারন্যাশনাল বিডিংয়ের মাধ্যমে ভুটান সরকারের ক্লাউড-ভিত্তিক অ্যাপ্লিকেশন তৈরি কাজ পেয়েছে। সফটওয়্যার ও সেবা-পণ্য নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ড্রিম অ্যাপ মালয়েশিয়া ও ভারতে কাজ করছে বলে জানা গেছে।

সিসটেক ডিজিটাল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী এম রাশিদুল হাসান জানান, দেশে নিজেদের তৈরি  সফটওয়্যারের ভালো কাজ পেলে বা করলে সেটাকে বিদেশে উদাহরণ হিসেবে দেখানো যায়।

ইন্টারন্যাশনাল বিডিংয়ে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে আগের অভিজ্ঞতা অনেক কাজে দেয় উল্লেখ করে তিনি বলেন,‘ডাটাসফট দেশে পোর্টের (বন্দরের) অটোমেশনের কাজ করেছে, টাইগার আইটি বায়োমেট্রিক (আঙুলের ছাপ) সিম নিবন্ধনের পেছনে কারিগরি কাজ করেছে, দোহাটেক ই-জিপি বাস্তবায়নে কাজ করেছে।’

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ থেকে ১৯৯৯-২০০০ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো ২৮ লাখ (২.৮ মিলিয়ন) ডলারের সফটওয়্যার রফতানি হয়। তবে ২০০৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ সফটওয়্যার রফতানি শুরু করে। ওই বছর রফতানির পরিমাণ ছিল ৭২ লাখ ডলার। এরপর থেকে ক্রমে তা বাড়তে থাকে। ২০১২-১৩ অর্থবছরে ১০০ মিলিয়ন (১০ কোটি) ডলার অতিক্রম করে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে এই খাত থেকে সর্বোচ্চ ৭০০ মিলিয়ন ডলার রফতানি আয় হয়। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে আয় হয়েছে ৮০০ মিলিন তথা ৮০ কোটি ডলার।

 

 

/এইচআই/এসটি/চেক-এমওএফ/

লাইভ

টপ
X