কোন বিদ্যুতের দাম কত?

Send
সঞ্চিতা সীতু
প্রকাশিত : ২৩:৪৭, সেপ্টেম্বর ১০, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:২০, সেপ্টেম্বর ১১, ২০১৮

বিদ্যুৎভারত থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের দাম দেশে উৎপাদিত তরল জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুতের তুলনায় কম। তবে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুতের তুলনায় বেশি। দেশীয় উদ্যোক্তাদের কাছ থেতে তরল (ফার্নেস অয়েল) জ্বালানিনির্ভর প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ কেনা হচ্ছে ১০ টাকা থেকে ২৭ টাকায়। অন্যদিকে ভারত থেকে আমদানি বিদ্যুতের দাম পড়ছে ৬ টাকা ৪৮ পয়সা। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) বার্ষিক প্রতিবেদনে এই তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি হিসেবে এখন তরল জ্বালানিকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। গত আট বছরে দেশে মিশ্র জ্বালানিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কথা বলা হলেও মূলত তেলচালিত বিদ্যুতের উৎপাদন যে হারে বেড়েছে, অন্য জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুতের উৎপাদন সেই হারে বাড়েনি। জ্বালানির দরের ভারসাম্য রক্ষায় কয়লাকে প্রাধান্য দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত কয়লাচালিত কোনও বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে আসেনি। এজন্যই বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ এখনও নিয়ন্ত্রণের বাইরে রয়ে গেছে।

পিডিবির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত দুই অর্থ বছরে দেশে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক আইপিপি বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাছ থেকে যথাক্রমে (২০১৫-১৬) ১১ দশমিক ৬৭ টাকা এবং (২০১৬-১৭) ১১ দশমিক ২৩ টাকায় বিদ্যুৎ কিনেছে। একই জ্বালানিতে একই সময়ে দেশের ভাড়ায় চালিত ও দ্রুত ভাড়াভিত্তিক (রেন্টাল) বিদ্যুতের দাম পড়ছে প্রতি ইউনিট যথাক্রমে ১০ টাকা এবং ৯ দশমিক ৬৪ টাকা। অন্যদিকে ডিজেলচালিত বিদ্যুতের দাম পড়েছে আরও বেশি। ভাড়ায় চালিত ডিজেলনির্ভর একই ধরনের বিদ্যুতের দর ছিল ২০১৫-১৬ অর্থ বছরে ২৬ দশমিক ৫৭ টাকা,  ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দাম আরও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৭ দশমিক ২৭ টাকা।

এর বিপরীতে পিডিবির বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ভারত থেকে আমদানি করা প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দর পড়েছে ৫ দশমিক ০৪ টাকা। পরবর্তী বছর এই দরের পরিমাণ কিছুটা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৫২ টাকা।

কম দামে গ্যাস সরবরাহ করেও কমে বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। তেল ও গ্যাসে উৎপাদিত বেসরকারি ভাড়া ও দ্রুত ভাড়ায় চালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৬ দশমিক ৯২ টাকায় এবং ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৭ দশমিক ৩৬ টাকায় প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ কিনেছে। গড় বিদ্যুতের দামও আমদানি করা বিদ্যুতের দামের তুলনায় বেশি।

তবে, শুধু গ্যাসে উৎপাদিত বিদ্যুতের দাম বেসরকারি পর্যায়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যুতের দাম পড়ছে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৩ দশমিক ৩৮ টাকা এবং ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৩ দশমিক ৭৫ টাকা।

অন্যদিকে সরকার গত অর্থবছরে ভারতের এনভিভিএন লিমিটেড-এর কাছ থেকে ২৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কিনেছে প্রতি ইউনিট ৩ দশমিক ৭৯ টাকায়। পিটিসি ইন্ডিয়ার কাছ থেকে ২৫০ মেগাওয়াট কিনেছে ৬ টাকা ৮১ পয়সা এবং ৪০ মেগাওয়াট কিনেছে ৫ দশমিক ১২ টাকায়। ভেড়ামারা দিয়ে এই বিদ্যুৎ আমদানি করা হয়। মোট ৫০০ মেগাওয়াটের মধ্যে সঞ্চালন ক্ষতি পোষাতে ৪০ মেগাওয়াট অতিরিক্ত কেনা হয়।

এছাড়া ত্রিপুরা থেকে এনভিভিএনের কাছ থেকে বিদ্যুৎ কেনা হয় ৬ দশমিক ৮০ টাকায়। এই বিদ্যুতের গড় দাম পড়ছে ৫ দশমিক ৫২ টাকা।

অন্যদিকে যে ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি শুরু হলো তার দাম দুইভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকার স্বল্প ও দীর্ঘ—দুই মেয়াদে ভারত থেকে বিদ্যুৎ কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ২০১৮ সাল থেকে ২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত স্বল্পমেয়াদ এবং ২০২০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০৩৩ সালের ৩১ মে পর্যন্ত মেয়াদকে দীর্ঘমেয়াদ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে।

সূত্র আরও জানায়, এনভিভিএন (ইন্ডিয়া) থেকে স্বল্পমেয়াদে প্রতি ইউনিট ৪ টাকা ৭১ পয়সা দামে প্রতিদিন ৩০০ মেগাওয়াট ও পিটিসি ইন্ডিয়া থেকে প্রতি ইউনিট ৪ টাকা ৮৬ পয়সা দামে প্রতিদিন ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করা হবে। তবে, দীর্ঘমেয়াদে এনভিভিএন প্রতি ইউনিট ৬ টাকা ৪৮ পয়সা মূল্যে ৩০০ মেগাওয়াট ও পিটিসি থেকে প্রতি ইউনিট ৬ টাকা ৫৪ পয়সা মূল্যে ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করা হবে।

বাংলাদেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের মধ্যে এখন সাত ভাগ আসছে আমদানি থেকে আর প্রায় ৩০ ভাগ আসছে তরল জ্বালানি থেকে।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) সদস্য মিজানুর রহমান বলেন, ‘ভারতের বিদ্যুতের দাম কম হওয়ার কারণেই আমরা আমদানি করছি। তাদের ওখানে দাম বেশি হলে তো আমরা দেশেও উৎপাদন করতে পারতাম।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের জ্বালানির দর বেশ পড়ার কারণে বিদ্যুতের দাম বেশি পড়ছে।’

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শামসুল আলম বলেন, ‘ভারতের বিদ্যুতের দাম আমাদের দেশে উৎপাদিত বিদ্যুতের তুলনায় কম। কারণ তাদের জ্বালানির দাম কম।আমাদের জ্বালানির দাম বেশি হওয়ার কারণে বিদ্যুতের দাম বেশি পড়ছে।সরকারের কৌশলের কারণেও এই অবস্থা তৈরি হয়েছে।ভারতের মধ্যেও বিদ্যুতের দামের পার্থক্য রয়েছে। আমরা সমঝোতা করতে পারলে আরও কম দামে বিদ্যুৎ পেতে পারি।’ তিনি বলেন, ‘জ্বালানিখাতে নিজেরা সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। তা না হলে জ্বাতীয় স্বার্থের ক্ষতি হবে।’ এসব বিষয়ে আরও সচেতন হওয়া দরকার বলেও তিনি মনে করেন।

 

/এমএনএইচ/

লাইভ

টপ