বিদ্যুতের মহাপরিকল্পনায় বিনিয়োগ হতে পারে বড় বাধা

Send
সঞ্চিতা সীতু
প্রকাশিত : ০৭:৫৯, মার্চ ১৯, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:৫১, মার্চ ১৯, ২০১৯

বিদ্যুৎবিদ্যুৎ উৎপাদনের মহাপরিকল্পনায় উৎপাদন আর সঞ্চালনেই প্রয়োজন ১৭৫ বিলিয়ন বা ১৭ হাজার ৫০০ কোটি মার্কিন ডলার। বিপুল এই অর্থের সংস্থান কী করে হবে, তা পরিষ্কার করা হয়নি। এ পটভূমিতে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিনিয়োগই বড় বাধা হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আলাদাভাবে বিনিয়োগ পরিকল্পনা করা দরকার বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদও স্বীকার করেছেন, সরকারের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ অর্থায়ন নিশ্চিত করা। যদিও তিনি এ-ও বলছেন, আমাদের অর্থনৈতিক অগ্রগতি সন্তোষজনক। ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে। এতে করে বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠছে। ফলে বিনিয়োগ কোনও সমস্যা হওয়ার কথা নয়।

২০১৬ সালে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করে সরকার। এর মধ্যে অবশ্য এতে কয়েক দফা কাটছাঁট করা হয়েছে।

বিদ্যুৎ বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, সরকার ও বিদ্যুৎ বিভাগ মূলত অর্থায়নের ক্ষেত্রে যৌথ বিনিয়োগকে প্রাধান্য দিচ্ছে। যেসব দেশে অলস অর্থ পড়ে রয়েছে, বিনিয়োগ করার জায়গা নেই, তাদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানানো হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে খুব শিগগিরই আমেরিকাতে দেশটির বিনিয়োগকারীদের সামনে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা তুলে ধরা হবে। এ জন্য সংলাপের আয়োজন করা হবে। একইভাবে সিঙ্গাপুরেও বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। এছাড়া চীন, ভারত ও ইউরোপের কিছু দেশেও বিনিয়োগকারী খোঁজা হচ্ছে। কোনও রাষ্ট্রীয় বা বড় বেসরকারি কোম্পানির সঙ্গে যৌথ মূলধনী কোম্পানি গঠন করে সেই দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে প্রকল্প করার পক্ষে সরকার। এই প্রক্রিয়ায় বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ এমনকী এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) কাছ থেকে ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে যে পরিমাণ সময় ব্যয় হয়, এ ক্ষেত্রে তা হয় না। তবে যেভাবেই যা করা হোক অর্থায়ন সংস্থানকে কঠিন একটি প্রক্রিয়া বলে মানছেন সবাই।

পাওয়ার সিস্টেম মাস্টার প্ল্যানে (পিএসএমপি) দেখানো হচ্ছে, ২০৪১ সালে বাংলাদেশের প্রয়োজন হবে ৮২ হাজার মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্র। এই সময়ের মধ্যে প্রতিবছরই একটু একটু করে উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। এভাবে ২০৪১ সালে গিয়ে মোট ৭৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎ চাহিদা তৈরি হবে। এই পরিমাণ বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে হলে ৮২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা থাকতে হবে।

পিএসএমপিতে বলা হচ্ছে বিদ্যুৎ খাতে উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য চার ধাপে ১৫০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। এর মধ্যে ২০১৭ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে প্রয়োজন হবে ৫৬ বিলিয়ন ডলার; এরপরের ধাপ ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালে প্রয়োজন পড়বে ৩৮ বিলিয়ন ডলার; ২০৩১ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে প্রয়োজন হবে ২৭ বিলিয়ন ডলার আর বাকি ২০ বিলিয়ন ডলার খরচ করতে হবে শেষ ধাপে, অর্থাৎ ২০৩৬ থেকে ২০৪১ সালের মধ্যে।

অন্যদিকে সঞ্চালনের ক্ষেত্রে ২৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের কথা বলা হচ্ছে। এর মধ্যে ২০১৭ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ১৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার; ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালে ৪ বিলিয়ন; ২০৩১ থেকে ২০৩৫ সালে আরও ৪ বিলিয়ন এবং শেষ ৬ বছরে ২০৩৬ থেকে ২০৪১ সাল পর্যন্ত আরও ৪ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হবে।

বিনিয়োগ সংস্থানের ব্যাপারে জানতে চাইলে পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক মোহম্মদ হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে তেমন কোনও চ্যালেঞ্জ দেখতে পাচ্ছি না। এই বিনিয়োগের জন্য যা যা করা প্রয়োজন তার অনেকগুলোই আমরা এক্সপ্লোর করেছি। এর মধ্যে প্রথমত, এডিপির (বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি) ৫০ ভাগ এখন নিজেদের বাজেট থেকেই আমরা পাই। প্রায় ৩০ বিলিয়ন (৩ হাজার কোটি) ডলার আমরা সরকার থেকেই পাচ্ছি। দ্বিতীয়ত, আমরা উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা যেমন, এডিবি (এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক), বিশ্বব্যাংক, জাইকার  কাছ থেকে আমরা এখনই অর্থ পাচ্ছি। অন্যদিকে দ্বিপক্ষীয় দাতাদের মাধ্যমে কিছু অর্থ আসছে, যেমন, ভারত, সৌদি আরবসহ বেশ কয়েকটি দেশ থেকে আমরা অর্থ পাচ্ছি। এছাড়া জিটুজি-এর মাধ্যমে আমরা বেশ কিছু প্রকল্পের কাজ করছি। ইসিএ’র (এক্সপোর্ট ক্রেডিট এজেন্সি) ফাইন্যান্সিংয়ের মাধ্যমে অর্থ আসছে। তৃতীয়ত, আমরা আন্তর্জাতিক বন্ড মার্কেটেও যাচ্ছি।’

তিনি বলেন, ‘কাজ করলে অর্থের প্রয়োজন হবেই। বিনিয়োগের চ্যালেঞ্জটাকে আমরা এরই মধ্যে মোকাবিলা করার মতো পরিকল্পনা তৈরি করেছি।’

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ম. তামিম বলেন,  ‘জ্বালানি খাতের পরিকল্পনার বিপরীতে যেসব বিনিয়োগের চিন্তা করা হচ্ছে তার বেশির ভাগই ঋণ। এই ‍ঋণ কীভাবে আমরা পরিশোধ করবো, সেই চিন্তা করা হচ্ছে না।’ তার মতে, এই মহাপরিকল্পনার পাশাপাশি বিনিয়োগের জন্য আলাদা একটি পরিকল্পনা করা দরকার। যার মাধ্যমে টাকা কোথা থেকে আসবে তার যেমন পরিকল্পনা থাকবে, তেমনি এই টাকা কীভাবে শোধ করা হবে, তারও পরিকল্পনা থাকতে হবে।

ম. তামিম বলেন, ‘জ্বালানির বেশির ভাগ এখন আমদানিনির্ভর হয়ে পড়ছে। এভাবে আমদানিনির্ভর হয়ে পড়লে বছরে ২০ বিলিয়ন ডলার আমদানি খরচই পড়বে। ফলে সেই টাকা ডলারে শোধ করতে হবে। দাম বাড়িয়েও এই টাকা পরিশোধ করা যাবে না।’ তাই আমদানির পাশাপাশি রফতানি বাড়ানোর পরামর্শ দেন তিনি। এতে আয় বাড়বে। সঙ্গে সঙ্গে শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতেরও ব্যাপক উন্নয়ন করতে হবে বলেও মনে করেন ম. তামিম। এতে নিজেদের আয় বাড়বে বলে তিনি মনে করেন।

বন্ডের বিষয়ে ম. তামিম বলেন, ‘বাংলাদেশ বন্ড ছাড়বে কিন্তু বিদেশিরা সেই বন্ড কিনবে কিনা, আমাদের ওপর তাদের কতখানি আস্থা আছে, তা কিন্তু নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। তাই শুধু ঋণ আর বন্ডের ওপর বসে না থেকে নিজেদের আয় বাড়াতে হবে। সঙ্গে নিজেদের সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার প্রয়োজন।’

জানতে চাইলে বুয়েটের অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বলেন, ‘২০৪০ সাল পর্যন্ত চিন্তা এখনই আমি করছি না। এর মধ্যে অনেক কিছু হতে পারে। দেখা যাচ্ছে যে, বিদ্যুতের এই মহাপরিকল্পনা বার বার পরিবর্তন করা হচ্ছে। তবে যদি উন্নয়ন হতে থাকে তাহলে বিনিয়োগ পাবে সরকার।’

তিনি বলেন, ‘আমরা অনেক কিছু বলছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত আমরা সর্বোচ্চ সাড়ে ১১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পেরেছি। ২০২০ সাল এসেই গেলো। ২০২০-এরই টার্গেটের তুলনায় আমরা অনেক পেছনে পড়ে আছি। এরপর সবচেয়ে বড় ভয়ের বিষয় হচ্ছে আগামীতে দেখা যাবে আমাদের হাতে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ দেওয়ার ক্ষমতা থাকবে কিন্তু সেই বিদ্যুৎ নেওয়ার মতো পরিস্থিতি নেই।’

ড. ইজাজ বলেন, ‘বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। ফলে অর্থ ওঠাতে পারবে। কিন্তু ভবিষ্যতে আমাদের যে চাহিদা সেটি ওঠাতে পারবে কিনা, প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।’

 

/এইচআই/

লাইভ

টপ