সাবিরারাই কি সমাজের তারুণ্য?

Send
লীনা পারভীন
প্রকাশিত : ১২:০৬, মে ২৭, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:১৫, মে ২৭, ২০১৬

লীনা পারভীনএকটি মেয়ে অনেকদিন ধরে ভালোবেসে আসছিল একটি ছেলেকে। নিজের প্রাণের চেয়েও বেশি সে ভালোবাসা! হঠাৎ একদিন ছেলেটিকে মেয়েটি জানালো তার পক্ষে আর ভালোবাসা সম্ভব নয়। প্রত্যাখ্যাত  ছেলেটির সামনে দুনিয়া অন্ধকার মনে হতে লাগলো। মেয়েটিকে ছাড়া এ জীবন রেখে আর কী হবে? জীবনের কোনও মানে খুঁজে পাচ্ছিল না ছেলেটি। হঠাৎ একদিন ছেলেটি একটা সুইসাইড নোট লিখে অত্যন্ত নৃশংসভাবে ছুরি দিয়ে নিজেকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে তুলে দিলো জম দেবতার হাতে। ভাবছেন এ আবার কোন গল্প? জি এটা গল্পই বটে, কারণ এ পর্যন্ত প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হয়ে কোনও ছেলে এভাবে জীবন দিয়েছে তার উদাহরণ খুব কমই শুনেছি। আমি অবশ্য মনে করতে পারছি না।
সাবিরা নামক একজন মডেলের আত্মহত্যাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলছে তোলপাড়। কেন এই আত্মহত্যা? তার নিজের ফেসবুকে তিনি আত্মহত্যার কারণ বর্ণনা করে গেছেন। অবশ্যই এ ধরনের মৃত্যু কষ্টের। কতটা অসহায়ত্ব থেকে এই বয়সী একজন নারী এমন অমূল্য জীবন বিসর্জন দিতে দ্বিধা করেন না। সরলভাবে আমরা ঘটনাটিকে এভাবেই দেখতে পারি। কিন্তু ফেসবুকের কল্যাণে তার আত্মহত্যা প্রক্রিয়ার যে ভিডিও দেখলাম, মনে হচ্ছিল যেন আত্মহত্যাবিষয়ক ডেমনস্ট্রেশন বা টিউটোরিয়াল। স্যরি টু সে, এটা কোনও সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়।
প্রেম সবার জীবনেই আসে। এটি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কেউ সফল হয় কেউ হয় না। তাই বলে এভাবে জীবন দেওয়াটা কোনওভাবেই একজন প্রকৃত প্রেমিক হিসেবে তাকে প্রমাণ করে না। আমি জানি না সাবিরার পরিবারে আর কেউ আছে কিনা, তার পারিবারিক শিক্ষাই বা কী? তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কতদূর। জেনেছি তিনি একজন মডেল।

আরও পড়তে পারেন: ধর্মভিত্তিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে সখ্য বাড়াতে চায় আ. লীগ

মডেল হিসেবে তো তার নিজের জীবনে ছিল আর্থিক নিশ্চয়তা, যা অনেক মেয়েরই থাকে না।

তাহলে কিসের অভাব তাকে এই জঘন্য পথে টেনে নিল? হিন্দি সিনেমার স্ক্রিপ্টও ফেল। তিনি তার ফেসবুকে আত্মহত্যা করার পুরো প্রক্রিয়াটি ভিডিও করে তা আবার পোস্ট করেছেন।

কৌতূহলী চোখে ভিডিওটি ওপেন করেছিলাম কিন্তু কয়েক সেকেন্ড দেখেই আর দেখার রুচি হলো না।

অনেকে হয়তো ভাবছেন আমি মানুষ না অমানুষ? একজন মানুষ আত্মহত্যা করলেন, আর আমি তার প্রতি আহা উহু দেখাচ্ছি না! না, আমি দেখাচ্ছি না আর তা খুব সচেতনভাবেই করছি।

এ সব বোকা মেয়ে প্রেমে পড়তেও জানেন না। প্রেমিক হিসেবে যদি কোনও ভুল মানুষকেও নির্বাচন করে থাকেন তাহলে তা শুধরে নেওয়ার সুযোগ থাকে। আরে, আমার জীবন কি অন্যের দান? কোনও একজনের জন্য আমি আমার এই জীবন এত সহজে শেষ করে দেব? বোকা ছাড়া কেউ করে এ সব? আরে বাবা পারলে অই বেটাকে শিক্ষা দিয়ে ছাড়ব।

তাই সাবিরারা সমাজের নারীর প্রতীক হতে পারেন না, তারুণের নিশানা হতে পারেন না।

আমি মনে করি সাবিরার মতো যারা প্রেমে ব্যর্থ হয়ে জীবন নাশের মতো বিলাসিতা দেখান, তারা করুণার পাত্র। মায়া এসেও প্রশ্ন হয়ে যায়।

এই ঘটনা আবারও আমাদের মনে করিয়ে দেয় পারিবারিক শিক্ষা ও মূল্যবোধের প্রয়োজনের কথা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মূল্যবোধ ভিত্তিক আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার প্রয়োজনের কথা।

ছোটবেলা থেকেই সন্তানদের শেখাতে হবে সঠিক-বেঠিকের মাপকাঠি। বিশেষ করে কন্যা শিশুদেরকে সামাজিক বাস্তবতার ওপর জ্ঞান দেওয়াটা অত্যন্ত জরুরি। একজব নারীর জীবনের স্বার্থকতা কখনওই একজন পুরুষকে পাওয়া না পাওয়ায় নিহিত হতে পারে না।

আরও পড়তে পারেন: শিশুরা বেড়ে উঠছে মানসিক টানাপড়েনে

একজন পুরুষ তার মর্জি আমার ওপর চাপিয়ে দিল আর আমি কেবল একজন নারী বলেই তার খেসারত দেব নিজের জীবনের বিনিময়ে? প্রকৃত প্রেম কখনোই মানুষকে দুর্বল করে না। বিরহ ছাড়া প্রেমে কী সুখ! প্রেম থাকলে বিরহ আসবে আবার প্রেম আসবে। অত্যন্ত স্বাভাবিক নিয়মেই আসবে। একবার ভেবে দেখুনতো ঘটনাটা যদি উল্টা ঘটতো তাহলে কী হতে পারত? সাবিরা তার প্রেমে প্রত্যাখ্যানের প্রতিশোধ নিচ্ছে নিজেকে সমাজে প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে। আরও বেশি করে সে তার কাজে ডুবে থাকছে। কখনও কেউ বুঝলই না কোনও কালে কবে কোন ছেলে তাকে ভালোবাসি না বলে অপমান করেছিলেন।

প্রতিটা মানুষের জীবন তার নিজের। তাই এই ধরনের সিনেমাটিক ঘটনা কখনোই উদাহরণ হতে পারে না। তরুণ ও যুব সমাজকে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সৃজনশীল কাজের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে। যেন তারা নিজেকে নিয়ে স্বপ্ন দেখে। সাবিরাদের সময়মতো চিকিৎসার প্রয়োজন। তাহলেই আমরা পাব একটি সুস্থ সবল তরুণ সমাজ। তারুণ্য কখনও হার মানে না। মাথা উঁচু করে পথ দেখায়। তাই আমরা চাই সেই তারুণ্যের জয়গান। আর কোনও সাবিরাকে  হারাতে চাই না। সাবিরা তুমি বোকা তাই জানলেনা যার জন্য তোমার এই জীবনদানের আয়োজন সে হয়তো বেছে নিয়েছে তোমার মতো আরেকটি সাবিরার জীবন নষ্ট করার সিদ্ধান্ত কারণ তুমি তাকে করে গেছ ক্ষমতাবান।

লেখক: কলাম লেখক, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তা

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ