বিবিসি বাংলা’র দুঃখ প্রকাশ ও সংবাদের বস্তুনিষ্ঠতা

Send
তানভীর আহমেদ
প্রকাশিত : ১৫:২৯, জুন ১০, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১১:৫৪, জুন ২৩, ২০১৬

তানভীর আহমেদপ্রধানমন্ত্রীর ছেলে ও তার তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের সঙ্গে ইসরায়েল সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মেনদি সাফাদির কথিত বৈঠক নিয়ে বিবিসি বাংলা বিভাগের সংবাদ প্রচার নিয়ে দুঃখ প্রকাশের পর বিবিসি’র মতো সংবাদ মাধ্যমের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাটাই স্বাভাবিক। তবে যে বিষয়গুলো বিবিসি বাংলা বরাবরই এড়িয়ে যাচ্ছে তা নিয়ে আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে বটে। বিবিসি’র ওই প্রতিবেদন প্রকাশের প্রতিবাদে যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগ বিবিসি’র কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ করে স্মারকলিপি প্রদানের পর আমি বিবিসি’র প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে, বিবিসি’র করপোরেট কমিউনিকেশন্স বিভাগের ম্যানেজার পল রাসমুসেন আমাকে ই-মেইলে জানান, প্রতিবেদনটি প্রকাশের আগে সজীব ওয়াজেদ জয়ের সাক্ষাৎকার নিতে না পারায় বিবিসি দুঃখ প্রকাশ করছে। ভবিষ্যতে বিবিসি বাংলা তাদের সম্পাদকীয় নীতি আরও শক্তিশালী করবে।
৯ জুন, বিবিসি’র সম্পাদক সাবির মুস্তাফা বিবিসি বাংলা’র সম্পাদকীয় ব্লগে লিখেছেন-
‘তবে একটি জিনিস আমার কাছে পরিষ্কার যে, আমরা খবরটা যথেষ্ট যত্মের সঙ্গে তৈরি করি নাই। মেনদি সাফাদির সাক্ষাৎকার নেওয়ার সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। খবর হিসেবে মি. সাফাদির দাবির যথেষ্ট গুরুত্ব ছিল, সেটাও অনস্বীকার্য। কিন্তু মি. সাফাদির দাবির অপর পক্ষ, সজীব ওয়াজেদের বক্তব্য ছাড়া-অথবা দ্বিতীয় কোনও সূত্র দিয়ে খবরটি যাচাই না করার ফলে খবরটি দুর্বল হয়ে পরে এবং অসম্পূর্ণ রয়ে যায়।’
তাহলে এখানেও বিবিসি স্বীকার করে নিলো যে, দ্বিতীয় সূত্র দিয়ে খবরটি যাচাই না করা ছিল ওই রিপোর্টের মস্ত বড় ভুল। প্রতিবেদকের হাতে কিন্তু আরও একটি অপশন ছিল। প্রতিবেদক সংশ্লিষ্ট তথ্যদাতা মেনদি সাফাদির কাছে তার দেওয়া তথ্যের সপক্ষে কী প্রমাণ রয়েছে সে সম্পর্কে জানতে চাইতে পারতেন কিন্তু প্রতিবেদক এই ধরনের কোনও অনুসন্ধানে যাননি। ২৭ তারিখে বিবিসি বাংলা’র ওয়েবসাইটে লেখা হয়-
‘বাংলাদেশে সরকার উৎখাত ষড়যন্ত্রের অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা ইসরায়েলি নাগরিক মেনদি এন সাফাদি দাবি করেছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে ও তার তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের সঙ্গে গত বছর তার সাক্ষাৎ হয়েছিল।’
পাঠক খেয়াল করুন, গত বছর জয়-মেনদি’র সাক্ষাৎ হয়েছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে, অর্থাৎ ২০১৫ সালের কোনও এক সময়। প্রতিবেদক কি জানতে চাইতে পারতেন না যে, ২০১৫ সালের কোন তারিখে? স্থানটি নির্দিষ্ট করে কোথায়? কিংবা ওই বৈঠক সম্পর্কে মেনদি সাফাদির কাছে কী এমন অকাট্য দলিল রয়েছে যা দেখে পাঠক বা শ্রোতারা রিপোর্টের বস্তুনিষ্ঠতা সম্পর্কে আশ্বস্ত হবেন? প্রতিবেদক সেই অনুসন্ধানে যাননি। মজার ব্যাপার হলো, প্রতিবেদনের শুরুতে লেখা হয়েছে ‘গত বছর কোনও এক সময়’ আবার প্রতিবেদনে নিচের অংশে ‘কেন এই বৈঠক’ হেডিং দিয়ে বলা হয়েছে-

‘এই বৈঠকের পটভূমি ব্যাখ্যা করে মেনদি এন. সাফাদি জানান- ৪/৫ মাস আগে তিনি যখন শেষবার ওয়াশিংটন ডিসিতে যান, সে সময় একজন আমেরিকান বন্ধু দু‘জনের মধ্যে এই বৈঠকটির আয়োজন করেন।’

পাঠক খেয়াল করুন, যদি ৪/৫ মাস আগে বৈঠক হয় আর সাক্ষাৎকার যদি নেওয়া হয় ২৭ মে তাহলে তো সাফাদির সঙ্গে জয়ের চলতি বছর জানুয়ারি অথবা ফেব্রুয়ারিতে বৈঠক হওয়ার কথা। কিন্তু প্রতিবেদনের শুরুতে বলা হয়েছিল ‘গত বছর!’ শুধু তাই নয়, প্রতিবেদক যখন জানলেন মেনদি সাফাদি কোন আমেরিকান বন্ধুর মাধ্যমে জয়ের সঙ্গে দেখা করেছেন- সেটি বলতে চাইলেন না, তখনও বিবিসি’র প্রতিবেদক মেনদির বক্তব্য যে সত্য নাও হতে পারে সে ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করলেন না!

সংবাদের বস্তুনিষ্ঠতা নিয়ে বিবিসি’র আরও কিছু দুর্বলতা স্পষ্ট। বিবিসি বাংলা’র সম্পাদক নিজেই স্বীকার করেছেন, ‘খবর হিসেবে মি. সাফাদির দাবির যথেষ্ট গুরুত্ব ছিল, সেটাও অনস্বীকার্য।’ কিন্তু খবরটি বস্তুনিষ্ঠ কিনা সেটাও খতিয়ে দেখা বিবিসি অনস্বীকার্য মনে করেনি। এখন দুঃখ প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে বিবিসি’র এটিও অনুসন্ধান করা উচিত, কেন সেইদিন মেনদি সাফাদির বক্তব্যটি যাচাই না করেই বিবিসি প্রকাশ করেছিল। তার পেছনে উদ্দেশ্যটি আসলে কী ছিল? পাঠকের মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে, সাক্ষাৎকার নেওয়া হলো মেনদি সাফাদির আর বড় করে ছবি আসলো সজীব ওয়াজেদ জয়ের! আর এ কারণেই সজীব ওয়াজেদ জয় যদি বলেন, তাকে হেয় প্রতিপন্ন করাই ছিল ওই প্রতিবেদনের উদ্দেশ্য, তাহলে মোটেও ভুল বলা হবে না।

এখানেই শেষ নয়, বিবিসি বাংলা’র সম্পাদক বলছেন- বিবিসি গত ১৬ মে মেনদি সাফাদির একটি সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছিল। তাহলে ২৭ মে মেনদি সাফাদির নেওয়া সাক্ষাৎকারটি ছিল বিবিসি’র দ্বিতীয় সাক্ষাৎকার। যদি তাই হয়, তাহলে মেনদি সাফাদি বিবিসিকে দেওয়া ১৬ তারিখের সাক্ষাৎকারে কেন বললেন না তার সঙ্গে সজীব ওয়াজেদ জয়ের সাক্ষাৎ হয়েছিল? হঠাৎ করে ১১ দিন পর ২৬ তারিখে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে বসে (টাইম টিভি) একটি রাজনৈতিক দলের বিতর্কিত ব্যক্তির কাছে সাক্ষাৎকার দিয়ে জয়ের সঙ্গে বৈঠকের খবর ফাঁস করতে হলো কেন? বিতর্কিত বলছি এ কারণেই, ভিডিও সাক্ষাৎকার গ্রহণের নেপথ্যে কাজ করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসনের সাবেক উপদেষ্টা সরদার এফ সাদি, যার বিরুদ্ধে ইতিপূর্বে যুক্তরাষ্ট্রের ছয় কনগ্রেসম্যানের স্বাক্ষর জালিয়াতির অভিযোগ রয়েছে। জেকব নামে যে ব্যক্তি মেনদি সাফাদির সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন তিনিও বিএনপির কর্মী। দুজনের কেউই পেশাদার সাংবাদিক নন! এমন ব্যক্তিদ্বয়ের শুট করা ভিডিও সাক্ষাৎকারের সূত্র ধরে বিবিসি বাংলা’র মতো গণমাধ্যম কেমন করে মেনদির কথা দ্বিতীয় সূত্র থেকে যাচাই না করে তাদের গণমাধ্যমে প্রকাশ করে দিলো? এখানেই বিবিসি’র সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদক ও সম্পাদকীয় পেশাদারিত্বের দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে উঠে।

বিবিসি বাংলা সার্ভিস মূলত রেডিও। সম্প্রতি তারা মাল্টিমিডিয়া ও অনলাইনও চালু করেছে। তাই ভিজ্যুয়াল মিডিয়া নিয়ে বিবিসি বাংলা’র প্রতিবেদকদের অভিজ্ঞতা বা বিশ্লেষণী ক্ষমতা খুব বেশি থাকার কথা নয়, থাকলে তারা যুক্তরাষ্ট্রে একটি টেলিভিশনকে দেওয়া মেনদি সাফাদির সাক্ষাৎকারটি যে পূর্বপরিকল্পিত সেটি উপলব্ধি করতে পারতেন এবং সেই ভিডিওটি দিয়ে বিবিসি’র রিপোর্ট প্রভাবিত হতো না। এ সংক্রান্ত একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন আমি একাত্তর টেলিভিশন ও বাংলা ট্রিবিউনে করেছিলাম। সেটি নিয়ে এখানে আর বিশদ লিখতে চাই না।

আরও পড়তে পারেন: জয়ের বক্তব্য না নিয়ে সংবাদ প্রচার: বিবিসির দুঃখ প্রকাশ

একটি কথা না বললেই নয়, মেনদি সাফাদি হলেন ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ডিপ্লোম্যাসি অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স নামে একটি লবিস্ট কোম্পানির স্বত্বাধিকারী। তাহলে তার কোম্পানির সঙ্গে কোনও ব্যক্তি কিংবা রাজনৈতিক দলের যেকোনও ধরনের চুক্তি হয়নি সেই সন্দেহও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এ বিষয়টিও বিবিসি’র বিবেচনায় আনা প্রয়োজন ছিল। যে ব্যক্তি ১৬ তারিখে বিবিসি’র সঙ্গে সাক্ষাৎকারে জয়ের সঙ্গে বৈঠক সম্পর্কে কিছু বললেন না, তিনি ঠিক ১১ দিন পর বললেন কেন? এই ১১ দিনে কি কারো সঙ্গে কোনও চুক্তি হয়েছিল?

তবে বিবিসি বাংলা যেহেতু তাদের প্রতিবেদনটি প্রকাশের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেই ফেলেছে, এখন বিবিসি’র উচিৎ তাদের ওয়েব পোর্টাল থেকে সেই দুর্বল ও পক্ষপাতদুষ্ট প্রতিবেদনটি সরিয়ে ফেলা। সেইসঙ্গে বিবিসি গণমাধ্যম কর্মীদের কাছে যে দুঃখ প্রকাশের বিবৃতিটি ব্যক্তিগতভাবে ই-মেইলের মাধ্যমে পাঠাচ্ছে, সেটি তাদের নিজস্ব ওয়েব পোর্টাল এবং রেডিওতেও গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করা।

বিবিসি ও এর ব্লগে প্রকাশিত দুটি লেখা ক্রমানুসারে যুক্ত হলো:

লিংক ১

লিংক ২ 

লেখক: সাংবাদিক ও গবেষক

বাংলা ট্রিবিউনের বিশেষ প্রতিনিধি ও একাত্তর টিভির লন্ডন প্রতিনিধি

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ