নিখোঁজ সমাচার

Send
সালেক উদ্দিন
প্রকাশিত : ১০:২৫, আগস্ট ০৫, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১০:৩১, আগস্ট ০৫, ২০১৬

Salek Uddinযুক্তিসঙ্গত কারণেই জঙ্গি খুঁজে বের করা রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ নিয়ে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যেমন স্বস্তিতে নেই তেমনি স্বস্তিতে নেই সাধারণ মানুষ। বলতে দ্বিধা নেই এ ব্যাপারে স্বস্তিতে নেই সরকারও। বিরোধী দলের বিশেষ করে বিএনপি জামায়াতের নেতা কর্মীরা শুধু অস্বস্তিতেই নেই, রীতিমত আতঙ্কে আছেন। কখন কে কোথায় গ্রেফতার হন, কার নামের পেছনে জঙ্গি বা জঙ্গির মদদদাতার তখমা পড়ে এ নিয়ে ঘুম হারাম হয়ে গেছে অনেকেরই।
সাধারণ মানুষের অস্বস্তিতে থাকার নানাবিধ কারণের মধ্যে প্রধানতম কারণগুলো হলো, কখন কোথায় আবার কী হয় কে জানে! কোথায় যাওয়া ঠিক হবে আর কোথায় যাওয়া ঠিক হবে না! পুলিশ বাহিনীকেও বলতে হয়, ‘গুজবে কান দেবেন না’। কার ছেলে আবার কার প্ররোচনায় ভ্রান্ত পথে পা দেয় কে জানে? এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কারণে বাড়ি ছেড়ে যাওয়া মানুষগুলো ফিরে আসার পরও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রস্তুতকৃত ২৬২ জনের নিখোঁজ তালিকায় নাম থাকার কারণে তাদের চলছিল জীবন-মরণ সমস্যা।
প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করা যেতে পারে যে,  গুলশান ও শোলাকিয়া হামলায় জড়িত জঙ্গিরা দীর্ঘদিন নিখোঁজ থাকার সংবাদের ভিত্তিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো নিখোঁজদের তালিকা তৈরি শুরু করে। যতদূর জেনেছি শুধুমাত্র নিখোঁজ জিডির ভিত্তিতে ১৯ জুলাই প্রথম দফায় ২৬২ জনের তালিকা তৈরি করা হয়েছিল। তালিকা প্রকাশের পর বাংলা ট্রিবিউন দেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকা দেশব্যাপী অনুসন্ধান চালিয়ে যে তথ্য প্রকাশ করে তাতে প্রতীয়মান হয় যে, এই তালিকা তৈরিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো যত্নবান ছিল না বা কোনও রকম বাছ বিচার করেনি।      
এতে পরিবারের অমতে বিয়ে করে পালিয়ে থাকা এবং পরে ফিরে আসা ওমর ফারুকের নাম ছিল। একই কারণে কিশোরগঞ্জ কালিপুরের মামুন মিয়াও নিখোঁজ হয়ে তালিকা ভুক্ত হয়েছিল, যদিও সে ১৫ দিনের মাথায় নতুন বউ নিয়ে বাড়িতে ফিরে এসেছিল। বাড়িতে ঝগড়া করে বাড়ি ছাড়া কমলাপুরের রহমতউল্লাহ কদিন পরে বাড়ি ফিরলেও নিখোঁজ তালিকা তার কথা ভুলেনি। এই তালিকায় আরও যাদের  নাম ছিল তাদের মধ্যে ছিল দালালের খপ্পরে পড়ে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে নিখোঁজ হওয়া যশোর মনিরামপুরের ১৪ জনের নামও। বাবার সঙ্গে অভিমান করে আত্মীয়বাড়ি পালিয়ে থেকে ফিরে আসা উত্তরার রোমিও, উত্তর শাহজাহানপুরের মানসিক রোগী সাইফুল ইসলাম, মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র থেকে পালিয়ে যাওয়ার পর দিন ফিরে আসা রিসাত, ছিনতাইকারীর কবল থেকে ৩ দিন পরে উদ্ধার হওয়া মিরসরাই বরাইহাট বাজারের মাছ ব্যবসায়ী নুরুল হুদা সহ আরও অনেকেই এই নিখোঁজ তালিকাকে ভারি করেছিল। ঢাকায় ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে দুইদিন নিখোঁজ থেকে উদ্ধার পাওয়া চাঁদপুর হাজীগঞ্জের সানাউল্লাহও ছিল এই তালিকায়। প্রেম ঘটিত কারণে বাড়ি থেকে বের হয়ে কদিন পর ফরে এসেও তালিকাভুক্তই রয়ে গিয়েছিল কুষ্টিয়া ভেড়ামারার ১৬ বছরের হায়দার জাহিন। রাজধানীর উত্তরা থেকে আটককৃত জেলে থাকা যুবক রাশেদ গাজীর এবং জেলে থাকা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র  মো. রহমতুল্লাহর নামও ছিল নিখোঁজ তালিকায়। এমনকি তালিকায় বেশকজন মৃত ব্যক্তির নামও বাদ পড়েনি। ফলে তালিকার নির্ভরযোগ্যতার বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ হয়। এ ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বক্তব্য ছিল, তাদের প্রস্তুতকৃত তালিকা সঠিক। এইসব নিখোঁজের ঘটনা সব অফিসিয়াল ডকুমেন্ট। এই তালিকা যাচাই বাছাইয়ের বিষয়ে যে দাবি উঠেছে তা করতে হলে একবছর সময় লেগে যেত।

ওদিকে তাদের নিখোঁজ তালিকাটি প্রকাশের পর দেশের সংবাদ মাধ্যমগুলো দেশজুড়ে অনুসন্ধান চালিয়ে ৫ দিনে নিখোঁজ ২৬২ জনের মধ্যে ১৩৯ জনেরই সন্ধান পায় এবং এরা যে নিখোঁজ নয় তা প্রমাণের জন্য তাদের নাম ঠিকানা সহ প্রকৃত ঘটনার বিবরণ প্রকাশ করে। বিষয়টি সকল মহলের মতো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীরও দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়। ফলে তারাও এক বছরের কাজ দ্রুত শেষ করার কাজে নামে এবং এক সপ্তাহের মাথায় পূর্বপ্রকাশিত ২৬২ জনের তালিকা যাচাই বাছাই করে নতুন তালিকা প্রকাশ করে। সেই তালিকায় প্রকৃত নিখোঁজের সংখ্যা ২৬২ থেকে নেমে হয় ৬৮জন।

সংবাদ মাধ্যমের পাশাপাশি আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও ধন্যবাদ জানাবো এ কারণেই যে নিখোঁজ না হয়েও জঙ্গি সন্দেহের নিখোঁজ তালিকায় নাম থাকায় তালিকাভুক্তরা এবং তাদের পরিবার পরিজনরা যে ভয়াবহ দূরাবস্থার দিন কাটাচ্ছিল এর মধ্যদিয়ে তার আপাতত অবসান হলো।

যতদূর জেনেছি এই তলিকা প্রস্তুত হয়েছিল দেশের সব থানার জিডির সূত্র ধরে। বাড়ি থেকে কেউ না বলে চলে গেলে এবং তার খোঁজখবর না পাওয়া গেলে স্বাভাবিকভাবেই নিকটস্থ থানায় আত্নীয় স্বজনরা জিডি করে। আবার খোঁজ পাওয়ার পর কেউ কেউ থানাকে অবগত করে, কেউবা আবার করে না। সুতরাং শুধুমাত্র জিডির ওপর ভিত্তি করে কোনরকম বাছবিচার ছাড়াই জঙ্গির মতো এমন একটি স্পর্শকাতর ইস্যুতে তড়িঘড়ি করে দীর্ঘ নিখোঁজ তালিকা প্রস্তুত ও তা জনসন্মুখে প্রকাশ করা যে যুক্তিসঙ্গত ছিল না তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। যারা বাড়ি থেকে বিভিন্ন কারণে পালিয়েছিলেন এবং পরে ফিরে এসেছেন তাদের অনেকেই নিখোঁজ তালিকায় নিজেদের নাম দেখে ভয়ে নতুন করে নিখোঁজ হয়েছেন। কেউ কেউ আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে আত্মগোপন করে আছেন। তারা সামাজিকভাবে হেয় হচ্ছেন, মানুষের সন্দেহের চোখ ঘৃণার চোখ পড়ছে তাদের ওপর। তারা এবং তাদের অভিভাবকরা ভীত সন্ত্রস্ত এই ভেবে যে, কোনও রকম বাছবিচার ছাড়াই যেভাবে তালিকায় তাদের নাম এসেছে সেভাবেই তারা যেকোনও মুহূর্তে গ্রেফতার হয়ে পড়ে কিনা! আবারও দেশে শুরু হয় কিনা গ্রেফতার বাণিজ্যের!

দেশের মানুষের আস্থা অর্জন ও মানুষকে নির্ভয়ে রাখা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাজ। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, এ ক্ষেত্রে এর ব্যত্যয় ঘটেছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে এটা অসতর্কতাবসত বা তড়িঘড়ির কারণে ঘটেছে। তারপরও বলব এটা উচিৎ হয়নি। এদেশের মানুষ তাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও দায়িত্বশীল দেখতে চায় এবং তাদের নিয়ে গর্ব করতে চায়।

যাহোক এই প্রতিবেদনটি এই পর্যন্ত লেখার পরই আজকের জাতীয় দৈনিকে এ প্রসঙ্গে যে খবরটি ছাপা হলো তাতে পুলিশের সর্বশেষ তালিকায় সন্দেহভাজন নিখোঁজের সংখ্যা ৪০ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে দুই জন গুলশান হামলার ঘটনায় নিহত হয়েছে। সে হিসেবে দেশে সন্দেহভাজন নিখোঁজের সংখ্যা দাঁড়ালো ৩৮জন। এরমধ্যে ঢাকা মহানগরের ১১জন, রাজশাহী অঞ্চলের ১৭জন, রংপুর অঞ্চলের ৭জন, চট্টগ্রামের ২জন ও খুলনার ১ জনের কথা উল্লেখ রয়েছে। পুলিশের সংশ্লিষ্ট দফতর জানিয়েছে তারা সারাদেশে সন্দেহভাজনদের ব্যাপারে কঠোর নজরদারি শুরু করেছে এবং তার অংশ হিসেবে এই তালিকা তৈরি করা হয়েছে। তালিকা সব সময় হালনাগাদ করা হচ্ছে।

এখানে হালনাগাদ শব্দটির ওপর জোর দিতে চাই। এই শব্দটি ব্যবহার করার আগে মেধা ও যাচাই বাছাইয়ের সঠিক সংমিশ্রণ করতে হবে। তা না হলে অর্থাৎ যাচাই বাছাই ছাড়াই ২৬২জনের যে তালিকা প্রকাশ করা হয়েছিল, সাধারণ মানুষের ভেতরে যে ভয় তৈরি হয়েছিল তা চলতে থাকলে জঙ্গিনিরোধ কাজ কঠিন হয়ে পড়বে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি মানুষ আস্থা হারিয়ে ফেলবে যা পুনরুদ্ধার করা আরও বেশি কঠিন কাজ।

আমাদের প্রত্যাশা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আমাদের কাছে বস্তুনিষ্ঠ তথ্যই উপস্থাপন করবেন। কারণ কোনও কোনও সময় ছোট ভুলেরও অনেক বড় মাশুল দিতে হয়।

পরিশেষে যে কথা না বললেই নয় তা হলো, ধর্মের দোহাই দিক বা ধর্মান্ধতার যে অস্ত্রই ব্যবহার করুক এ দেশের মানুষ জঙ্গিবাদের কর্মকাণ্ডকে প্রত্যাখ্যান করেছে। প্রত্যাখ্যান করেছে বললে ভুল হবে একবারের জন্যও গ্রহণ করেনি। তাইতো দল মত নির্বিশেষে সকলেই জঙ্গি বিরোধী কার্যক্রমে অংশ নিতে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে এগিয়ে এসেছে। জঙ্গি সন্তানের পিতাও স্বীয় সন্তানের অপকর্মের জন্য জাতির কাছে ক্ষমা চাইতে এক মুহূর্তও দেরি করেনি। তাইতো দেশের প্রধানমন্ত্রী বুক ফুলিয়ে বলতে পারেন, ‘বাংলাদেশ জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে’। 

লেখক: কথাসাহিত্যিক

আরও খবর: যেমন হতে পারে জিয়া ও তামিমের এখনকার চেহারা

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ