behind the news
Vision  ad on bangla Tribune

তবে কি সরকার আত্মসমর্পণ করবে?

চিররঞ্জন সরকার১২:০২, এপ্রিল ২১, ২০১৭

চিররঞ্জনআইনে না থাকলেও পরিবহন মালিকদের চাপের মুখে রাজধানীতে বাসে ১৫ দিনের জন্য সিটিং সার্ভিস চালানোর ‘অনুমতি’ দিয়েছে পরিবহন নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিআরটিএ।  আর এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ হিসেবে জনভোগান্তি কমানোর কথা বলেছে।  সাধারণ যাত্রীদের পকেট কাটার ‘সিটিং সার্ভিস’ নিয়ে জনঅসন্তোষের মুখে চলতি মাসের শুরুর দিকে এই সার্ভিস থাকবে না বলে প্রকাশ্যে ঘোষণা দেয় পরিবহন মালিক সমিতি।  আর ঘোষণার বাস্তবায়নে গত ১৬ এপ্রিল থেকে ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান পরিচালনা করে।  কিন্তু অভিযান শুরুর দিন থেকে শুরু হয় নৈরাজ্য।  ‘সিটিং সার্ভিস’ নামে যে বাড়তি ভাড়া আদায় করা হচ্ছিল, লোকালেও শ্রমিকরা আদায় করতে থাকে একই ভাড়া।  আবার যাত্রীদের ‘শিক্ষা’ দিতে মাত্রাতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন, স্টপেজে স্টপেজে বাড়তি সময় দাঁড়িয়ে থাকার পাশাপাশি বাসের সংখ্যা কমিয়ে দেয় পরিবহন মালিকরা।
রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থায় শুরু হয় নজিরবিহীন অচলাবস্থা।  সীমাহীন যাত্রী ভোগান্তি, ভাড়া নিয়ে মারামারি, ক্ষোভের মুখে এবং সিটিং সার্ভিসের বিরুদ্ধে বিআরটিএর অভিযান শুরুর চতুর্থ দিনে গত ১৯ এপ্রিল বিআরটিএর পক্ষ থেকে ‘জনস্বার্থের কথা চিন্তা করে ১৫ দিনের জন্য সিটিং বিরোধী অভিযান বন্ধ করা’র ঘোষণা দেওয়া হয়।  এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে কার্যত বৈধতা পেয়ে গেলো পকেট কাটার সিটিং সার্ভিস।  আবারও নৈতিক পরাজয় ঘটল সরকারের!
সরকারকে কতটা বুড়ো আঙুল দেখানো যায়, সাধারণ মানুষকে কতটা ‘ভেড়া’ বানানো যায়- রাজধানীতে যেন তারই একটা ‘প্রদর্শনী’ হয়ে গেলো।  আর এই কাজটি করলেন পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা যৌথভাবে।  গ্রীষ্মের তপ্ত রোদে দীর্ঘক্ষণ রাস্তায় দাঁড়িয়ে থেকেও যাত্রীরা বাসের অভাবে  গন্তব্যে যেতে পারেননি।  দীর্ঘ অপেক্ষার পর বাসের দেখা মিললেও ভিড় আর ঠেলাঠেলির কারণে অনেকেই বাসে চড়তে ব্যর্থ হয়েছেন।  বিশেষ করে নারী, শিশু এবং বৃদ্ধদের কাছে বাসে ওঠা একেবারেই নাগালের বাইরে চলে যায়। যে অল্পসংখ্যক বাস চলাচল করেছে, তারা সেবার মান কমিয়ে দিয়েছে ইচ্ছে মতো। সিটিং সার্ভিস বন্ধ হওয়ার পর স্টপেজে-স্টপেজে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সময় দাঁড়িয়ে যাত্রীর জন্য ডাকাডাকি, ঠাসাঠাসি করে যাত্রী তোলা, ভেতরের ফ্যান বন্ধ করে রাখাসহ যাত্রীদের হয়রানি করছে পরিবহন শ্রমিকরা।  ভাড়াও আদায় করেছে বেশি।  এসব নিয়ে যাত্রীরা প্রতিবাদ করলেই তাদের ওপর চড়াও হয়েছে।  অনেক জায়গাতেই প্রতিবাদী যাত্রীরা শ্রমিকদের হাতে লাঞ্ছিত হয়েছেন।  মালিক-শ্রমিকদের এই দৌরাত্ম বন্ধ করতে আমাদের সদাশয় সরকারকে ন্যূনতম কোনও উদ্যোগই গ্রহণ করতে দেখা যায়নি!
অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা সরকারের সিদ্ধান্ত মানেন না।  সরকারিভাবে যে ভাড়া নির্ধারণ করে দেওয়া হয়, তা মানা হয় না।  সরকার অবশ্য মাঝে মাঝে কিছু ব্যবস্থা নেয় বটে, কিন্তু সেগুলো কোনও যৌক্তিক পরিণতির দিকে যেতে পারে না।  অধিক ভাড়া আদায় বন্ধ, ফিটনেসবিহীন গাড়ি ও ভুয়া লাইসেন্সের বিরুদ্ধে সরকার পরিচালিত অভিযানগুলো সরবে শুরু হয়ে নীরবে বন্ধ হয়ে যায়।  গত বছরের ৫ আগস্ট হাইকোর্টের নির্দেশে ফিটনেসবিহীন যানবাহন ও ভুয়া লাইসেন্স জব্দে অভিযান শুরু করে পুলিশ।  ধরা পড়ার ভয়ে রাস্তায় নামা বন্ধ করে দেয় ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন।  চরম দুর্ভোগে পড়েন যাত্রীরা। তাই কদিন পরই অভিযান গতি হারায়।  নৈরাজ্য-অভিযান-নৈরাজ্য-রাজধানীর গণপরিবহন ঘুরপাক খাচ্ছে এই বৃত্তে।  নৈরাজ্য বন্ধে কয়েক মাস পরপর সরকারের বিভিন্ন সংস্থা অভিযানে নামে।  তখন কয়েক দিন পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকে।  কিন্তু সপ্তাহ পার না হতেই অভিযানের তেজ কমে আসে।  আবারও নৈরাজ্য ফিরে আসে।  এখানে অভিযানের নামে চোর-পুলিশ খেলা চলে এবং তা দীর্ঘদিন ধরে চলছে!

এ খাতে দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।  কিন্তু পরিবহন সেক্টরে কার্যত তার কোনও নিয়ন্ত্রণ বা ক্ষমতাই নেই।  তিনি ভালো ভালো কথা বলেন, মাঝে মাঝে হুঙ্কার ছাড়েন। ব্যস, এ পর্যন্তই।  এর বাইরে কোনও দৃশ্যমান পরিবর্তনই তিনি এ খাতে আনতে পারেননি।  এবারও চরম সংকটের মুহূর্তে তিনি বলেছেন, ‘পরিবহন মালিকদের ডাকলেও আসেন না। আর চাইলেই পরিবহন মালিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায় না।’ তিনি আরও বলেছেন, ‘পরিবহন মালিকরা অনেক প্রভাবশালী। গাড়ি না নামালে দেশের বাস্তবতা অনুযায়ী চাইলেই তাদের বিরুদ্ধে কি কিছু করা যায়? তারা সংখ্যায় অনেক। বাস্তবতার নিরিখে চাইলেই ব্যবস্থা নেওয়া যায় না।  চালক-মালিকরা যখন অন্যায় করে তখন সরকার ব্যবস্থা নিলে তারা গাড়ি নামায় না।  তখন জনদুর্ভোগের পুরো দায়ভারটা মন্ত্রণালয়ের ঘাড়ে চাপে।’

ওবায়দুল কাদেরের কথা শুনে মনে হয়, তিনি কোনও মন্ত্রী নন, যেন ‘উজিরে খামোখা!’ তার কথা শুনে মনে প্রশ্ন জাগে, রাষ্ট্রের প্রভাবশালী ব্যক্তি কারা? রাষ্ট্র যারা পরিচালনা করে তারা? না পরিহন মালিক-শ্রমিকরা? আর তারা অন্যায় করলেও যদি সরকার তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে না পারে, তাহলে এই সরকারের ক্ষমতায় থাকার নৈতিক অধিকার থাকে কি?

যে কথাটি তিনি বলেননি বা বলতে পারেননি, তা হলো, তিনি বা তার সরকার আসলে গোষ্ঠীস্বার্থের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে অপারগ! গোষ্ঠীস্বার্থের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হলে একটি সরকারের যে রকম জনসম্পৃক্ততা, জনগণের প্রতি মমত্ববোধ থাকা দরকার, তা আসলে এই সরকারের নেই।  আর এ কথা বলার মতো সৎসাহসও তাদের নেই! পরিবহন সেক্টর পুরোটাই এখন সরকার সমর্থক মাফিয়াদের দখলে।  পরিবহন মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির মহাসচিব হচ্ছেন ঢাকা মহানগর (দক্ষিণ) আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি খন্দকার এনায়েত উল্লাহ।  ওদিকে পুরো পরিবহন সেক্টর নিয়ন্ত্রণ করছে সরকারের আরেকজন মন্ত্রী, শাজাহান খান।  যিনি দেশের দোর্দণ্ড প্রতাপশালী একজন শ্রমিক নেতা।  সরকারের মন্ত্রী হয়েও যিনি সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি।  মালিকদের সংগঠন, শ্রমিকদের সংগঠন, সব সংগঠনেই দলীয় নেতাদের প্রভাব, কর্তৃত্ব, দাপট।  এমনকি যারা পরিবহন খাতে নিয়মিত চাঁদাবাজি করে, গুণ্ডামি-মস্তানি করে, তারাও ক্ষমতাসীন দলের কর্মী-সমর্থক অথবা নেতা। এ কারণে পরিবহন খাতে যা কিছুই ঘটুক না কেন, সরকার তাতে কোনও ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে না।  কারণ ক্ষমতাসীনদের কাছে জনস্বার্থের চেয়ে গোষ্ঠী স্বার্থ সব সময়ই অধিক গুরুত্বপূর্ণ।  তাইতো ‘সিটিং সার্ভিসের’ নামে গণপরিবহনে নৈরাজ্য বন্ধের উদ্যোগ ‘গোষ্ঠী স্বার্থের’ কারণে ভেস্তে যেতে বসেছে!

দীর্ঘদিন ধরে পরিবহন সেক্টরের মালিকদের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ রয়েছে।  তারা না মানছেন আইন-কানুন, না মানছেন সরকারের নিষেধাজ্ঞা।  মোটরযান আইনে না থাকলেও বছরের পর বছর তারা ‘সিটিং সার্ভিস’ ও ‘গেটলক’ নাম দিয়ে স্বল্প দূরত্বে দ্বিগুণ-তিনগুণ ভাড়া আদায় করে আসছেন।  সরকার তাদের কিছু বলতে ভয় পায়! কারণ একে তারা দলের লোক, তার ওপর আবার ‘সংগঠিত।’  কোনও একটা ছুতো পেলেই তারা পরিবহন বন্ধ করে দেয়।  যাত্রীরা তাদের হাতে জিম্মি।  যাত্রীরা যেহেতেু অসংগঠিত, কাজেই তারা সব কিছু মেনে নিতে বাধ্য হন।  তাদের পক্ষে কথা বলার তো আর কেউ নেই!

প্রশ্ন হলো, পরিবহনখাতের সমস্যা সমাধানে সরকার কি সত্যিই আন্তরিক? আসলেই কি এ ব্যাপারে সরকারের কিছু করার নেই? জনগণের কাছে তাদের কোনও জবাবদিহির প্রয়োজন নেই? দেশের মানুষের জন্য সেবার অঙ্গীকার নিয়ে ক্ষমতাসীনরা দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পালন করছেন, সেই মানুষের দুঃখ-দুর্দশা কি তাদের বিবেককে এতটুকু আলোড়িত করে না? না কি তারা তাদের ‘সক্ষমতা’ টুকু হারিয়ে ফেলেছেন? নতুবা স্বল্পআয়ের মানুষের কথা বিবেচনা করে সরকার পরিবহন সেক্টরের নৈরাজ্য কেন বন্ধ করতে পারছে না? সাধারণ মানুষের জন্য নির্বিঘ্নে চলাচলের একটুখানি সুযোগ করে দেয়া কি সরকারের দায়িত্ব নয়? একটি ট্রান্সপোর্ট কমিশন গঠন করা, তাদের মাধ্যমে পরিবহন ভাড়া নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি করা, গণপরিবহনের মালিক ও চালকদের নির্দেশনা মানতে বাধ্য করা, নির্দেশনা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে অসুবিধা কোথায়? গণপরিবহনের অব্যবস্থাপনা ও নৈরাজ্য বন্ধ করা কি সরকারের পক্ষে একেবারেই অসম্ভব?

তবে তাদের কাছেই সরকার আত্মসমর্পণ করবে?

লেখক: কলামিস্ট

 

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

Global Brand  ad on Bangla Tribune

লাইভ

টপ