ব্যাংকিং খাতের বেহাল দশা

Send
বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী
প্রকাশিত : ১৪:০৫, ডিসেম্বর ১৪, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:১২, ডিসেম্বর ১৪, ২০১৭

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরীবাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর রিজার্ভ ব্যাংক যখন গঠন করা হয় তখন মতিঝিলে একটা দালান ছাড়া আর কিছুই ছিল না। শূন্য হাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের যাত্রা শুরু। কোনও রিজার্ভ ছিল না। সব রিজার্ভ ছিল পাকিস্তান স্টেট ব্যাংকের হাতে। বাংলাদেশ এক কানাকড়িও রিজার্ভের টাকার অংশ পায়নি। বাংলাদেশ ব্যাংক কোনও রিজার্ভের বরাবরে কোনও মুদ্রা ইস্যু করেনি।
প্রথম মুদ্রা ইস্যু করেছিলো সম্পদের বরাবরে। পুরনো ব্যাংকিং ব্যবস্থার ন্যাশনাল ব্যাংকে সোনালী ব্যাংক, হাবিব ব্যাংকে অগ্রণী ব্যাংক, ইউনাইটেড ব্যাংককে জনতা ব্যাংক, মুসলিম কমার্শিয়াল ব্যাংককে রূপালী ব্যাংক, ইস্টার্ন মার্কেন্টাইল ব্যাংককে পূবালী ব্যাংক আর ইস্টার্ন ব্যাংকিং করপোরেশনকে উত্তরা ব্যাংক নাম দিয়ে ব্যাংকিং ব্যবস্থার পুনবিন্যাস করা হয়েছিল।
নতুন প্রতিষ্ঠিত অনভিজ্ঞ সরকার যখন মুদ্রা ব্যবস্থা, ব্যাংকিং ব্যবস্থা পুনর্গঠন করেছিলেন তখন দেশের মানুষ কোনোভাবে কোনও প্রকারে কোনও কষ্ট পায়নি। স্বাধীনতার দুশমনেরা জাল মুদ্রা ছেড়ে মুদ্রা ব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত করার চেষ্টা করেছিলো। তখন অর্থমন্ত্রী এআর মল্লিক দ্রুত নোট পরিবর্তন করে এবং জার্মানি থেকে নতুন নোট ছাপিয়ে এনে তা প্রতিরোধের উত্তম ব্যবস্থা নিয়েছিলেন। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতে নোট পরিবর্তনের সময় মানুষ যে সংকটে পড়েছিলো বাংলাদেশের তখনকার অর্থমন্ত্রী এআর মল্লিকের সুদক্ষ পরিচালনায় বাংলাদেশের মানুষকে অনুরূপ কোনও ঝামেলা পোহাতে হয়নি।

১৯৮০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা ছিল রাষ্ট্রায়ত্ত্ব খাতে। পরবর্তী সময়ে প্রাইভেট সেক্টরেও ব্যাংক করার অনুমতি প্রদান করা হয়। রাষ্ট্রায়ত্ত্ব ব্যাংকগুলোতে অনয়িম আসে গত শতাব্দীর আট দশকে যখন সৎ-দক্ষ অফিসারগুলো অবসরে চলে যান আর অর্থললুপ নতুন প্রজন্মের অফিসারগুলো উচ্চস্বরে উঠে আসে তখন থেকে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীন একটা ব্যাংকিং ডিভিশন রয়েছে যার কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত্ব ব্যাংকিংগুলো দ্বৈত শাসনের মাঝে রয়েছে। দ্বৈত শাসন সব সময় দুর্বল শাসন হয়ে থাকে। এ ডিভিশনটা অনতিবিলম্বে বিলুপ্ত করা উচিত।

আসলে এ ডিভিশনটা সৃষ্টি করা হয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত্ব ব্যাংকগুলোর ওপর রাজনৈতিক প্রতিপত্তি খাটানোর জন্য। রাষ্ট্রায়ত্ত্ব ব্যাংকে পরিচালনা পরিষদ গঠন, ম্যানেজিং ডাইরেক্টর নিয়োগ, চেয়ারম্যান নিয়োগ সবই হলো ব্যাংকিং ডিভিশনের দায়িত্বে। রাজনৈতিক বিবেচনায় এসব নিয়োগ হয় বলে অসততা এবং অনভিজ্ঞতার প্রাদুর্ভাব হয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত্ব সেক্টরে সঙ্গে সঙ্গে ঋণ প্রদানে রক্ষণশীলতা যাচাই-বাছাইয়ের নিয়ম-কানুনও তিরোহিত হয়েছে।

ব্যাংকিং সেক্টরে রাষ্ট্রায়ত্ত্ব ব্যাংকগুলোতেই সিংহভাগ ব্যবসা-বাণিজ্য হয়ে থাকে। এখানে যদি মৌলিক দুর্বলতাগুলো প্রচলিত থাকে তবে ঋণ খেলাপির সংখ্যাতো দিন দিন বৃদ্ধি পাবেই। বর্তমানে রাষ্ট্রায়ত্ত্ব আর্থিকখাতের অবস্থাটা হয়েছে তাই। কু-ঋণের পরিমাণ বেড়েছে বড় আকারে।

রফতানির ভুয়া তথ্য দিয়ে ব্যাংক থেকে টাকা হাতিয়ে নেয় বিসমিল্লাহ্ গ্রুপ, হলমার্ক ও ভুয়া এলসিকে প্রতারণার হাতিয়ার বানিয়েছিলো। বেসিক ব্যাংক কাড়ি কাড়ি টাকা ঋণের নামে ব্যাংক থেকে বের করে নিয়েছে। এ তিন জালিয়াতিতে ব্যাংকের বিরাট এক চক্র জড়িত। এবং তারা ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। দুদকের উচিত এ চক্রটির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা। কঠিন শাস্তি ছাড়া ব্যাংকে সুস্থিতি আনা সম্ভব নয়।

ইন্দোনেশিয়ায় অনুরূপ পরিস্থিতে সুকর্নো মৃত্যুদণ্ডের আইন করতে চেয়েছিলেন। সুকর্নোর পতনের আগে ইন্দোনেশিয়ার অর্থব্যবস্থা বিশৃঙ্খলায় পতিত হয়েছিলো। নতুন ব্যাংকগুলোর মাঝে ফার্মার্স ব্যাংক আর এনআরবিসি ব্যাংক কঠিন সমস্যায় পড়েছে। ফার্মার্স ব্যাংকের চেয়ারম্যান এবং এমডি পদত্যাগ করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত ছিল পরিচালনা পরিষদ ভেঙে দিয়ে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া। প্রশাসক নিয়োগ করে কঠিনভাবে নিয়মশৃঙ্খলার মাঝে ব্যাংকটা পরিচালনা করে কাস্টমারের আস্থা অর্জন করলে হয়তো ব্যাংকটা সংকট থেকে মুক্তি পেতো।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রশাসক নিয়োগ ছাড়া ফার্মার্স ব্যাংকে কাস্টমারের আস্থা ফিরবে বলে মনে হয় না। ফার্মার্স ব্যাংকে ৭৫ কোটি টাকা মূলধন ঘাটতি হয়েছে। অংকটা ছোট মনে হলেও নতুন ব্যাংক হিসাবে ফার্মার্স ব্যাংকের জন্য বড়। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে পরিচালকদের অতিরিক্ত ডিপোজিট রাখতে হবে। অতিরিক্ত ডিপোজিট রেখে ব্যাংকটাকে বাঁচাতে পারলেতো ভালো।

বিসিসিআই ব্যাংকে মানি লন্ডারিংয়ের জন্য ১৯৯২ সালে ব্রিটিশ সরকার তার লাইসেন্স বাতিল করেছিলো। পাকিস্তানি আগা হাসান আবিদী ব্যাংকটা ১৯৭২ সালে লন্ডনে আরম্ভ করেছিলেন। বাংলাদেশে বিসিসিআই এর জমজমাট ব্যবসা ছিল। হাজার হাজার সাধারণ কাস্টমারও ছিল। হঠাৎ করে ব্রিটিশ সরকার ব্যাংকটা বন্ধ করে দেওয়ায় বাংলাদেশে ব্যাংকটা লিকুইডেট হওয়াই ছিল স্বাভাবিক পরিণতি। লিকুইডেট হলে কাস্টমারেরা প্রচুর কষ্ট পেতো। কিন্তু অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান সাহেব লিকুইডেট না করে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী শওকত সাহেবের নেতৃত্বে এক গ্রুপ উদ্যোক্তা নিয়ে বিসিসিআই এর শাখা সমূহের সব এসেস্ট লাইবিলিটি সমেত ইস্টার্ন ব্যাংকের জন্ম দিয়েছিলেন। এখন ব্যাংকটা খুব ভালোভাবেই চলছে বর্তমান তার শাখা রয়েছে ৮৬টি।

ব্যাংক দেউলিয়া হলে খুবই কষ্ট পোহাতে হয় কাস্টমারদের। ভারত বিভক্তির পর দেউলিয়া হওয়া পাইওনিয়ার ব্যাংক এবং ক্যালকাটা মর্ডান ব্যাংকের লিকুইডেশনের সমস্যা এখনও সমাধান হয়নি। চট্টগ্রামে এ দু’ব্যাংকের দুই শাখা সদরঘাট রোডে এখনও লিকুইডেটর নিয়ে পুরনো ঝামেলা সামাল দিচ্ছে। লিকুইডেটর নিয়োগ দেয় রিজার্ভ ব্যাংক।

এনআরবিসি ব্যাংক তার চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান, এমডি সব পরিবর্তন করে নতুন পরিষদ গঠন করেছে। এখন তমাল এসএম পারভেজকে চেয়ারম্যান করা হয়েছে। তিনি বলেছেন তারা সবাই বিদেশে থাকায় অনুরূপ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। এখন নতুন ম্যানেজমেন্টের অধিনে সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে। উদ্যোক্তারা সবাই বিদেশে থাকেন। তারা বিদেশে টাকা রোজগার করে বাংলাদেশে পাঠায়। পারভেজ সাহেব প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তারা খুব তাড়াতাড়ি অবস্থার উন্নতি ঘটাবে। এর পরও অত্র ব্যাংকে বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠিন মনিটরিং প্রয়োজন।

প্রাপ্ত তথ্যমতে রাষ্ট্রায়ত্ত্ব ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি হলো (১) কৃষি ব্যাংক ৭৫৪০ কোটি টাকা, (২) সোনালী ব্যাংক ৩১৪০ কোটি টাকা (৩) বেসিক ব্যাংক ২৫২৩ কেটি টাকা (৪) রূপালী ব্যাংক ৬৮৯ কোটি টাকা (৫) রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক ৭৪৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ সর্বমোট ১৪৬৩৫ কোটি টাকা। এছাড়া বেসরকারি আইসিবি ইসলামী ব্যাংক ১৪৮৫ কোটি টাকা এবং ফার্মার্স ব্যাংক ৭৫ কোটি টাকা। সরকার এ যাবৎ গত তিন অর্থবছরে ৯৬০৯ কোটি টাকা মূলধন সরবরাহ করেছে। রাষ্ট্রায়াত্ত্ব ব্যাংকগুলো সাড়ে চৌদ্দ হাজার কোটি টাকা মূলধন খাতে চেয়েছিলো।

বেসিক ব্যাংকের দুর্নীতি তদন্ত চলছে। সরকার মনোনিত বোর্ডের ডাইরেক্টরদের এবং চেয়ারম্যান শেখ আব্দুল হাই বাচ্চুকে তদন্তের আওতায় আনতে দুদককে হাইকোর্ট তাগিদ দিতে হলো কেন বুঝে আসলো না। এরাই তো ঋণ বরাদ্দের মূল লোক। এখন তো তারা পরস্পর পরস্পরকে দোষারোপ করছে। যা স্বাভাবিক বিষয়। তাদের সকলের কঠোর শাস্তি হওয়া উচিত- প্রয়োজনে সকলের নামে, বেনামে সকল স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তিও বায়েজাপ্ত হওয়া উচিত।

আমাদের অর্থমন্ত্রী বলেছেন আরো তিনটি ব্যাংকের নাকি অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে। দেশি-বিদেশি ৫৭টি তফসিলি ব্যাংক রয়েছে–এর পরও নতুন ব্যাংকের প্রয়োজন কী? তিনি বলেছেন দেশের বহু জায়গায় নাকি ব্যাংক নেই। দেশের প্রত্যেক অঞ্চলে ব্যাংক সেবা পৌঁছানোর জন্যই নাকি নতুন অনুমোদন। বাংলাদেশ ব্রিটিশ ব্যাংক ব্যবস্থা অনুসরণ করে আমেরিকান ব্যাংক ব্যবস্থা নয়। ব্রিটিশ ব্যবস্থায় অসংখ্য ব্রাঞ্চ নিয়ে একটা ব্যাংক হয়। যুক্তরাষ্ট্রে একটা ব্রাঞ্চ মানেই একটা ব্যাংক। তাই আমরা দেখি যুক্তরাষ্ট্রের ২০০৮ সালের মন্দার সময় ১৩৩টি ব্যাংক দেওলিয়া হয়েছিলো।

দেশে যে অঞ্চলে ব্যাংক নেই সে অঞ্চলে পুরনো ব্যাংকগুলো শাখা খুলবে। আর ব্যাংক ব্যবসাতো চাল-ডালের ব্যবসা নয় যে সর্বত্র প্রয়োজন অলাভজনক স্থানে ব্যাংকতো কখনও শাখা খুলতে পারে না। ব্যবসা ছাড়া ব্যাংক টিকতে পারে না। বাংলাদেশে কত ব্যবসা আছে যে ডজন ডজন ব্যাংক প্রয়োজন। ফার্মার্স ব্যাংক সাহস করে শিপ ব্রেকিং ব্যবসায় জড়িত হয়ে ডুবেছে। ৭০০ ডলারের বুকিংয়ের জাহাজ যখন ৪০০ ডলারে বিক্রি করতে হয় তখন মালিক ব্যাংক সবাইকে তো দেউলিয়া হতে হয়।

সরকার যখন কোনও কিছুর অনুমোদন দেয় তখন হিতাহীত জ্ঞান থাকে না। অনুমোদনের ভারে সেক্টরটাই নুয়ে পড়ে। বিশৃঙ্খরা সৃষ্টি হয়। দেশে ৩০টির অধিক টিভি চ্যানেল রয়েছে। কত শত কোটি টাকার বিজ্ঞাপন ব্যবসা রয়েছে দেশে! টিভিতো চলে বিজ্ঞাপনের ওপর। এখন অনেক টিভি স্টাফদের নিয়মিত বেতন দিতে পারে না। পত্রিকাতে দেশ বোঝাই হয়ে গেছে। তারাও স্টাফের বেতন দিতে পারছে না। এখন বড় বড় বিল্ডিংয়ের ছাদে ছাদে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। শিক্ষার মান কমছে। দেশের উন্নয়ন দেখানোর নামে দেশের সব সেক্টরে ধ্বংস ডেকে আনা সরকারের উচিত হচ্ছে না। সব কিছুতে মাত্রা জ্ঞানের সীমা থাকা দরকার।

যাক। লিখছিলাম ব্যাংক সম্পর্কে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্ষমতা বাড়ানো, স্বায়ত্ত্বশাসন প্রদান সম্পর্কে আমরা বারে বারে লিখেছি। বাংলাদেশ ব্যাংক তফসিলি ব্যাংক সম্পর্কে আরও সতর্ক হতে হবে। সতর্কতা বিপর্যয় প্রতিরোধ করবেই। অর্থমন্ত্রীকে অনুরোধ করবো অর্থদফতর জনপ্রিয়তা অর্জনের দফতর নয়। দেশের অর্থনীতিকে সঠিক পথে চালাতে গেলে বহু অজনপ্রিয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হয়। অর্থদফতরে বসলে নিন্দা কুড়াতে হয়। এখানে নিন্দার চাইতে প্রশংসা অধিকতর অবাঞ্ছিত। বাংলাদেশ মানুষের ভারে জর্জরিত। এখানে যে কোনও বিশৃঙ্খলা বিশেষ করে অর্থ ক্ষেত্রে সর্বনাশ ডেকে আনবে।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

bakhtiaruddinchowdhury@gmail.com

 

/এসএএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ