বিদেশে ধরনা দিয়ে কি উপকার হবে বিএনপির?

Send
বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী
প্রকাশিত : ১৩:৩০, জুন ১৪, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:৩২, জুন ১৪, ২০১৮

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরীবিএনপি নেতা আব্দুল আউয়াল মিন্টু, আমির খসরু মাহমুদ আর আন্তর্জাতিক বিষয়ক দফতরের দায়িত্বপ্রাপ্ত সম্পাদক হুমায়ুন কবির দিল্লি সফরে গিয়েছিলেন তাদের দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক জিয়ার প্রতিনিধি হিসেবে। রাজনৈতিক দল হিসেবে বিদেশিদের কাছে নিজ দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সালিশ-নালিশ দেওয়ার ‘কুঅভ্যাস’ রয়েছে বিএনপির। এখনও প্রতিনিধি দলটি সে কর্মসূচি নিয়েই ভারতে গিয়েছিলেন।
তারা ক্ষমতাসীন দলের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এম.জে. আকবর, শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি ফাউন্ডেশনের অধিকর্তা অনির্বাণ গাঙ্গুলি এবং কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। শাসক দল বিজেপি এবং বিরোধী দল কংগ্রেস উভয়ের কাছে অভিযোগ পেশ করে তেমন কোনও সুবিধা করতে পারেনি তারেক জিয়ার প্রতিনিধি দলটি। বিজেপি এবং কংগ্রেস উভয়ে নাকি প্রতিনিধি দলটিকে বলেছে বিএনপিকে জামায়াত ইসলামীর সঙ্গ ত্যাগ করতে হবে এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাদের গণতান্ত্রিক চরিত্রের প্রমাণ রাখতে হবে। তারপরই তারা ভারতের সাধারণ মানুষের সহানুভূতি প্রত্যাশা করতে পারে।

প্রতিনিধি দলটি নাকি তাদের সফরের ফলাফল লন্ডনে অবস্থানরত তারেক জিয়াকে অবহিত করেছেন। বিএনপি এ বিষয়ে মুখ ফুটে কিছু বলেনি বা প্রতিনিধি দলটিও কোথাও কোনও কথাবার্তা বলেনি। তবে বিজেপি, কংগ্রেস আর শ্যামা প্রসাদ মুখার্জি ফাউন্ডেশনের অধিকর্তা অনির্বাণ গাঙ্গুলিসহ সবাই প্রতিনিধি দলের বিষয়টি প্রকাশ করেছেন।

অখণ্ড ভারতে ১৮৮৫ সালে কংগ্রেস দল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আর ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সে থেকেই দলীয় রাজনীতির কর্মকাণ্ড শুরু। সেই প্রাচীনকাল থেকে আজকের আধুনিক সময় পর্যন্ত বিএনপির মতো কোনও রাজনৈতিক দলই ইজ্জতের বস্ত্র হারিয়ে রাজনীতি করেছে বলে মনে পড়ে না। পাকিস্তান ফেরত সামরিক অফিসারদের ইচ্ছানুসারে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান দলটি গঠন করেছিলেন। বহু দল থেকে লোক এনে এই দল গঠন করা হয়েছিল।

সামরিক জান্তা ক্ষমতা দখল করে যেভাবে দল গঠন করে, এই দলটির জন্ম কাহিনিও অনুরূপ। দলটিতে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের প্রতি প্রতিহিংসাপরায়ণ ব্যক্তিদের সমাবেশ হয়েছিল বেশি। শাহ আজিজ, মশিউর রহমান, আব্দুর রহমান বিশ্বাস, বিচারপতি আব্দুস ছাত্তার, আব্দুল আলিম প্রমুখ বিএনপি গঠনকালীন যারা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তারা সবাই ছিলেন পাকিস্তান পক্ষের লোক। দালাল আইনে বিচারপতি ছাত্তার সাহেব ছাড়া সবাই জেলে ছিলেন।

শুধু বিএনপির গঠনকালীন মহাসচিব বদরুদোজ্জা চৌধুরী দালালও ছিলেন না মুক্তিযোদ্ধাও ছিলেন না। তার পিতা মরহুম কফিল উদ্দিন চৌধুরী ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের টিকেটে জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। ডা. বদরুদোজ্জা চৌধুরী তার পিতাকে ইন্ডিয়া পৌঁছে দেওয়ার জন্য সীমান্ত পর্যন্ত নাকি গিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি সীমান্ত অতিক্রম করেননি। তার পিতা মুক্তিযুদ্ধের প্রক্রিয়ায় সক্রিয় অংশগ্রহণকারী একজন আওয়ামী লীগ নেতা। বদরুদ্দোজ্জা চৌধুরী সৎ লোক ছিলেন। বিএনপি তাকে রাষ্ট্রপতিও করেছিলেন। কিন্তু বেগম জিয়া এবং তারেক জিয়ার কোপানলে পড়ে ছয় মাসের মাঝে পদত্যাগ করে বঙ্গভবন ছেড়ে চলে যেতে হয়েছিল। তিনি পরবর্তী সময়ে বিকল্প ধারা নামে ভিন্ন একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেছেন।

 

জিয়ার জীবদ্দশায় জিয়া রাষ্ট্র পরিচালনায় ভারসাম্য রক্ষা করে চলার চেষ্টা করেছিলেন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোকে নিয়ে সার্ক গঠনের প্রাথমিক কাজের উদ্যোগ কিন্তু নিয়েছিলেন জিয়াউর রহমান। ভারত পাকিস্তানকে এক ফোরামে এনে সার্ক গঠন কিন্তু জিয়ার কৃতিত্বের পরিচায়ক। ১৯৯১ সালের পর বেগম জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি দুই দফা ১০ বছর ক্ষমতায় ছিল। ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য ভারত বিরোধিতার পথ অবলম্বন করেছিলেন বিএনপি নেতারা। জিয়ার সময়ের ভারসাম্যের রাজনীতির অবসান হওয়ায় পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই  বেগম জিয়ার সরকারের ওপর ভর করে পূর্ব ভারতের ছোট ছোট রাজ্যগুলোর অশান্তির সুযোগ ব্যবহারের ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করে।

এমনকি বাংলাদেশের অভ্যন্তরে উলফার জন্য ট্রেনিং ক্যাম্প পর্যন্ত খুলে বসে। উলফাকে ব্যাপক অস্ত্র সরবরাহের উদ্যোগ নেয় আইএসআই এবং এর মাঝে ১০ ট্রাক অস্ত্রের চালান জানাজানি হয়ে যাওয়ায় চালান জব্দ করতে সরকার বাধ্য হয়। পরবর্তী সরকারের সময় যে ইনকোয়ারি হয় তাতে দেখা যায়  বাংলাদেশ সরকারের সক্রিয় সহযোগিতায়  উলফাকে অস্ত্র সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। বিচারে এনএসআই ও ডিজিএফআই প্রধান যথাক্রমে ব্রিডিয়ার জেনারেল আব্দুর রহিম ও মেজর জেনারেল রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বাবর ও শিল্পমন্ত্রী মতিউর রহমান নিজামীসহ বহু লোকের ফাঁসির হুকম হয়। অনুরূপ একটা ঘটনার দৃষ্টান্ত বিদ্যমান থাকার পর ভারতের সহযোগিতা প্রত্যাশা করা বিএনপির জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে।

ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির বাংলাদেশ সফরের সময় বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে বৈঠকের যে কর্মসূচি ছিল, জামায়াতে ইসলামীর হরতালের কর্মসূচির অজুহাতে খালেদা জিয়া তা একতরফাভাবে বাতিল করে দিয়েছিলেন। ভারতের সরকারি দল কংগ্রেস ও বিরোধী দল বিজেপি এতে বিব্রতবোধ করে এবং তারা তাদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদাহানি হয়েছে বলেও মনে করেছিল।

চীনের সঙ্গেও বেগম খালেদা জিয়ার সরকার ভালো ব্যবহার করেননি। আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী যখন বাণিজ্যমন্ত্রী তখন তাইওয়ানের সঙ্গে প্রাথমিক কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্যোগ হিসেবে বাংলাদেশে তাইওয়ানকে বাণিজ্যিক অফিস খোলার অনুমতি প্রদান করেছিল। আর এ উদ্যোগের সঙ্গে নাকি তারেক রহমানও জড়িত ছিল। চীন কখনও দুই চীন নীতি সহ্য করে না। যদিওবা চীনের প্রেসারে তাইওয়ান ঢাকায় কোনও বাণিজ্যিক অফিস খুলতে পারেনি। কিন্তু বিএনপি সম্পর্কে তো চীনের কাছে একটা খারাপ বার্তা পৌঁছে গেলো।

চীন আর ভারত বাংলাদেশের দুই বৃহৎ প্রতিবেশী রাষ্ট্র। এই দুই রাষ্ট্রের তুলনায় বাংলাদেশ অতি ক্ষুদ্র একটা দেশ। সুতরাং এ দুই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যাওয়া বাংলাদেশের জন্য দায়িত্বজ্ঞানহীন কাজ। সুতরাং উত্তম হলো ব্যাপক সমঝোতার মাঝে থেকে কৌশলী অবস্থানে থাকা। ভারতের ইন্টিগ্রিটি বিনষ্ট করার যে ভূমিকায় বিএনপি সরকার অবতীর্ণ হয়েছিল তা দিবালোকের মতো স্পষ্ট হওয়ার পর বিএনপি ভারতের কোনও সহানুভূতি প্রত্যাশা করতে পারে না।

ক্ষমতাসীন থাকার সময় বেগম খালেদা জিয়া পূর্ব ভারতীয় রাজ্যসমূহের অশান্তিকে স্বাধীনতা সংগ্রামও বলেছিলেন। চীনও যে বিএনপিকে ক্ষমতায় আনার জন্য কোনও কৌশল খাটাবে তেমন নয়। এমনিই চীন কারো অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করে না। সর্বোপরি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ভারত ও চীনের সঙ্গে সুসম্পর্ক রক্ষা করে চলছে দীর্ঘদিন ধরে। এবং উভয় রাষ্ট্রের কাছে শেখ হাসিনার বিশ্বাসযোগ্যতা রয়েছে উত্তম পর্যায়ে।

সুতরাং পরিস্থিতি বিবেচনা করে বলা যায়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিএনপির অবস্থান খুব ভালো নয়। বিএনপির এই বিপর্যয়কর অবস্থা সৃষ্টির জন্য বিএনপি নিজেই দায়ী। তাই এই অবস্থায় দেশে দেশে ধরনা না দিয়ে বিএনপির উচিত আগামী নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া। বিএনপি প্রতিটি বিষয় নিয়ে অতি বাড়াবাড়িতে জড়িত হয়ে পড়ে। বেগম জিয়া জেলে অসুস্থ। তাকে সরকার বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে নিতে চেয়েছে। কিন্তু বেগম জিয়া নাকি ইউনাইটেড হসপিটাল ছাড়া অন্য কোনও হসপিটালে যাবেন না। অথচ বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাক্তাররাই সর্বত্র রোগী দেখেন। সেটা পছন্দ না হলে সিএমএইচে যেতে পারেন তিনি। তাদের চিকিৎসা তো উত্তম। বেগম জিয়াকে সরকার কোনও নিরাপত্তা আইনে জেলে নেয়নি, বিচারে তার জেল হয়েছে। অনুরূপ অবস্থায় এতো একগুঁয়েমি করা বেগম জিয়ার উচিত নয়।

আমরা এটা উপলব্ধি করেছি যে শেখ হাসিনা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে কখনও শত্রু জ্ঞান করেন না, যেটা বিএনপি করে থাকে। ২০০২ সালের ২১ আগস্ট শেখ হাসিনার জনসভায় গ্রেনেড নিক্ষেপ করে শেখ হাসিনাকে হত্যা করতে চেয়েছিল বিএনপি সরকার। কিন্তু গত ১০ বছর ক্ষমতায় থাকার পরও শেখ হাসিনার সরকার তার কোনও প্রতিশোধ নেননি। হত্যা মামলার বিচার চলছে বিচারের পথে। বিচারটা তাড়াতাড়ি করারও কোনও তাগিদ নেই। সুতরাং চিকিৎসার ব্যাপারে বেগম জিয়া আতঙ্কিত হওয়ার তো কিছুই দেখি না। বেগম জিয়াকে আমরা অনুরোধ করব দেশের আইন মেনে চলার জন্য।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

bakhtiaruddinchowdhury@gmail.com

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ