আমরা কি তবে বাঁচতে ভুলে যাচ্ছি?

Send
চিররঞ্জন সরকার
প্রকাশিত : ১৬:০৯, সেপ্টেম্বর ০৪, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:১১, সেপ্টেম্বর ০৪, ২০১৮

চিররঞ্জন সরকারময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে চুরির অভিযোগে গত ২৯ আগস্ট ১৫ বছরের এক স্কুলছাত্র রিয়াদকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। রিয়াদের বাবা সৌদি প্রবাসী এবং মা বাক্প্রতিবন্ধী। রিয়াদের কিছুটা মানসিক সমস্যা ছিল। প্রায়ই সে রাতের বেলা কাউকে কিছু না বলে বাড়ি থেকে চলে যেত। পরে আবার ফিরে আসত। ঘটনার দিন ভোর ৫টার আগে কাউকে কিছু না বলে রিয়াদ বাড়ি থেকে চলে যায়। পরে চোর সন্দেহে তাকে রাস্তা থেকে ধরে নিয়ে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।
এ দেশে কত শত চুরির ঘটনা ঘটছে। রাষ্ট্রের শত শত কোটি টাকা চুরি করে কতজন নিরাপদে আছে। বগুড়ার টিপু সুলতানের কথাই ধরা যাক। কোনও জামানত ছাড়া জনতা ব্যাংক থেকে ২৫০ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে দুদকের মামলায় জামিন পেয়ে এখন লাপাত্তা। আরেক ‘গুণধর’ চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী মোরশেদ মুরাদ ইব্রাহিম। দেশের আটটি ব্যাংক ও চার আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রায় হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে খেলাপি হয়ে পড়া এই মহাজন ফারমার্স ব্যাংকের অন্যতম উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক। বিসমিল্লাহ গ্রুপ প্রাইম ব্যাংক মতিঝিল শাখা থেকে ৩২৬ কোটি ২৮ লাখ টাকাসহ বিভিন্ন ব্যাংক থেকে প্রায় ১২০০ কোটি টাকা ঋণ জালিয়াতি করে উধাও। তাদের টিকিটিও আমরা স্পর্শ করতে পারি না! অথচ শিশু রিয়াদকে আমরা সামান্য চুরির ঘটনায় পিটিয়ে মেরে ফেললাম। একজন-দুজন নয়, দলবেঁধে, অনেকে, মিলেমিশে! এই নিয়ে কারও কোনও অনুশোচনা নেই, ক্রন্দন নেই, ভাবান্তর নেই। চুরি করলে তাকে থানায় দেওয়া যেত। কিন্তু মেরে ফেলতে হবে? এটা কোন শিক্ষা? কোথায় আমাদের মানবিকতা, বিবেক, অনুভূতি?

সবচেয়ে হতাশার কথা হলো এমন একটা পৈশাচিক সামাজিক হত্যাকাণ্ডের পরও আমাদের ভাবলেশহীনতা। যেন আমরা অনুভূতিশূন্য কতগুলো জড়বস্তুতে পরিণত হয়েছি। কোথাও কোনও ক্রন্দন নেই, হাহাকার নেই, আন্দোলন নেই, প্রতিবাদ নেই! আমরা আসলে কোন পথে চলেছি? এ কোন বিকার আমাদের অস্তিত্বমূলে বাসা গেড়েছে? আমরা কি তবে বাঁচতে ভুলে যাচ্ছি? আমরা কি তবে ওই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলা নামক ভাস্কর্যের মূর্তির মতো হয়ে উঠছি? আশপাশের কিছু দেখব না বলে কোনও দিকে তাকাচ্ছি না? মূর্তির মতো কেবল সোজা তাকিয়ে থাকাই কি আমাদের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়াচ্ছে?

সমাজটা যত খোলামেলা হয়ে ওঠার চেষ্টা করছে, ভেতরে ভেতরে আমরা কেমন যেন সিঁটিয়ে যাচ্ছি। বোবা হয়ে যাচ্ছি। এই দোটানায় পড়ে সামাজিক ভারসাম্যে এক অদ্ভুত টালমাটাল তৈরি হয়েছে বলে বোধ হয়। কিছু শব্দ, যেগুলো আগেও ছিল, সে সবের অতিরিক্ত ব্যবহারে আমরা দু’হাত মেলে বাঁচার আনন্দ থেকে ক্রমশ বিচ্ছিন্ন করে নিচ্ছি যেন। যেমন,‘ফোকাসড’, ‘পজিটিভিটি’, ‘কনস্ট্রাকটিভ আইডিয়া’– এমন কিছু ভারি ভারি শব্দের নিগড়ে আমাদের দৈনন্দিন চিন্তাভাবনা বাঁধা পড়ে যাচ্ছে। ভালোবাসা, সহানুভূতি, সমানুভূতি, মানবিকতা, আস্থা, নির্ভরশীলতার মতো নিত্যবন্ধুদের দূরে ঠেলে দিচ্ছি।

কারও সঙ্গে মন খুলে কথা বলতে গেলে, নিজের সুখ-দুঃখ ভাগ করে নিতে গেলে আজকাল মনে হয় সামনের লোকটা কি আমার কথা মন দিয়ে শুনছে? শুনে ভেতরে ভেতরে হাসছে? হয়তো ভাবছে, এর জীবনে কোনও লক্ষ্য নেই। এই মাথাখারাপ লোকটা আমাকে কি পাগল ভাবছে?

বুঝতে পারি, এই বিশ্বাসহীনতা আমার একার নয়। কেউ কারও সামনে অকপট হতেই এখন ভয় পায়। নিজের ইমেজ বা ভাবমূর্তির বিষয়ে সমাজ আমাদের অতিরিক্ত সতর্ক করে তুলছে। মনন, ভাবাবেগ, কষ্ট পাওয়া, আনন্দ হলে কলকলিয়ে ওঠার সাবলীলতা থেকে দূরে সরে যাচ্ছি আমরা। নিজেদের ‘ফোকাসড’, ‘পজিটিভ’, ‘কনস্ট্রাকটিভ’ প্রমাণ করার দায় থেকে, নিজেদের দারুণ শক্তিমান, প্রগতিশীল প্রমাণ করার নিরন্তর দায় থেকে।

কোনও একদিন যদি মনে করি আজ আমার কিচ্ছু করতে ইচ্ছে হচ্ছে না। জাস্ট নিজেকে নিয়ে কাটাছেঁড়া করার তাগিদে আজ আমি জনবিচ্ছিন্ন থাকব। সে কথাটা কর্মক্ষেত্রে যেমন কাউকে বোঝানো যাবে না, ব্যক্তিগত স্তরেও এমন কথা খোলাখুলি কাউকে বলতে পারবেন না আপনি। সেটা ওই একটা কারণেই, আশপাশের লোকের কাছে নিজের শিরদাঁড়ার সোজা ছবি সারাক্ষণ ধরে রাখার অদৃশ্য তাগিদে। সকলের সামনে ‘হাফছিট’, ‘তারছেঁড়া’ দুর্নাম কিনে ফেলার ভয়ে।

ভেবে দেখুন, ফেসবুকের মতো খোলা আঙিনায় কিন্তু খুব কম পোস্টেই কেউ নিজের ভেঙে পড়ার কথা বলে। বেশিরভাগ পোস্টই ‘আমি কত ভালো আছি’ সেই প্রচার করছে। ওই একটাই ভয়, কেউ যেন আমাকে দুর্বল না ভাবে, কেউ যেন আমাকে অসহায় ভেবে সুযোগ নেওয়ার খেলায় মেতে না ওঠে।

কী দমবন্ধকর এই পরিস্থিতি। চারপাশে এত মানুষ, কেউ অকপট নয়। কেউ আনন্দ হলে হা-হা করে হাসে না, কারও দুঃখ হলে নিভৃতেও সে কথা বলতে ভয় পায়, এমনকি কোনও কারণে ভয় পেলেও সে কথা ভাগ করে নিতে সাহস করে না।

নিশ্চিন্তে মৃত্যুর আঙিনায় পৌঁছনোর জন্যই যেন সযত্নে জীবনের গলা টিপে ধরে এগোনোর এক নিষ্ঠুর সমারোহে মেতেছি আমরা। সবকিছুর পেছনে নিজের ইমেজ রক্ষার কাটাকুটি খেলা। নিজের কাছেও নিজেকে ভেঙে পড়তে না দেওয়ার ট্র্যাপিজের দড়িঝোলা আমাদের নিয়তি হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

হয়তো আশপাশের অসহিষ্ণুতা, সেই অসহিষ্ণুতার আঁচ থেকে নিজেদের বাঁচানো, অসম্ভব অসুস্থ এক প্রতিযোগিতা, যা শেষ পর্যন্ত কোথাও পৌঁছে দেয় না, নিজেকে সব স্তরে, সর্বক্ষেত্রে উদার-আধুনিক প্রমাণ করার লক্ষ্যেই আমরা স্থির। তাই অন্য কারও দিকে হাত বাড়াই না, কারও হাত নিজের দিকে টেনে নিতে চাই না, কারও কানের কাছে মুখ খুলি না, কারও মুখের কাছে কান নিয়ে যাই না।

ভয় হয়, আমরা বোধহয় জীবন কাটানোর উছিলায় বাঁচতেই ভুলে যাচ্ছি। ভালো বাসতে ভুলে যাচ্ছি, বিশ্বাসে আস্থা হারাচ্ছি, ভাগাভাগির ভাবের ঘরে দরজা তুলে বন্ধ করে নিচ্ছি নিজেদের।

একে একে ভিড় জমিয়েছিল সকলে, খানিক পরে চলেও গেল একে একে। দুয়ে-তিনে-দশে নয়। একে একে ফিরে গেলো যে যার আস্তানায়। নিজের জগতে, নিজের একাকিত্বে, নিজের যাপনে, নিজের দহনে। যৌথ পরিবারের চিলেকোঠা ঘরের মতো বিশিষ্ট সেই যাপন। এ কথা স্বীকার করতে কোনও খেদ, আক্ষেপ, দুঃখ থাকার কথা নয় কিন্তু। স্কুলের বইয়ে পড়া ‘মানুষ সমাজবদ্ধ জীব’-এর ধারণার সঙ্গে এর কোনও বিবাদ নেই। শুধু উপলব্ধি হয়, ওই একে একে ভিড় জমানোর ঢঙে সমাজ গড়েছে মানুষ। কারণ সে একা।

ক্রিকেট ম্যাচ শেষ হয়ে গেলে যেমন একে একে ভিড় কমে যায়, সার্চলাইটগুলো একে একে নিভে গিয়ে নিঃসঙ্গ দাঁড়িয়ে থাকে, তেমনই একা মানুষ। চারপাশে আছে সবাই, আছে সবকিছু, তবু একা। জয়ে-পরাজয়ে, অতীতে-বর্তমানে-ভবিষ্যতে, লাভে-ক্ষতিতে, ইচ্ছা-অনিচ্ছায়, যুদ্ধে-শান্তিতে, দুঃখে-আনন্দে, ভালোবাসা-বিরহে, জীবনে-মরণে।

জন্মের পরে মায়ের কোলের নিরাপদ আশ্রয়ের ফাঁকে একলা শিশুর কচি দু’হাত খোঁজে আরও একটু শক্ত অবলম্বন, আঁকড়ে ধরে শাড়ির ভাঁজ। সেই শুরু। তারপর সারা জীবন চলে সেই অবলম্বনের সন্ধান। একদিন হঠাৎ উপলব্ধি হয়, এক মিথ্যা সন্ধানের পেছনে নিজেকে নিদারুণভাবে অপচয় করা হচ্ছে। যে মানুষ নিজেই অনন্ত, তাকে অবলম্বন জোগাবে কে? নিজের চেয়ে বড় আশ্রয় আর কোথায়?

ছোট থেকে শিখেছি একসঙ্গে থাকা, স্বার্থহীন হওয়া, একে অন্যের পাশে দাঁড়ানোই মানুষের আসল কাজ। জেনেছি যে হাসার জন্য, কাঁদার জন্য কেউ পাশে থাকা দরকার। কিন্তু কই, কেউ তো কখনও বলে দেয়নি নিজেকে ভালোবাসতে, নিজেকে ভালো রাখতে, নিজের প্রতি যত্নবান হতে!

বলে দেয়নি ঠিকই। কিন্তু ভালো তো নিজেকেই সবচেয়ে বেশি বেসেছি। অজান্তে নিজের যত্ন নিয়েছি, সচেতন থেকেছি, নিজেকে বাঁচিয়েছি যতদূর সম্ভব। কারণ ওই একটাই- ‘একলা তুমি ভাবাদর্শে একলা চিন্তায়, তোমার ভাবনা সূর্য হয়ে ডুববে যে চিন্তায়… একলা মানুষ মাতৃগর্ভে একলা মানুষ চিতায়, একলা পুরুষ কর্তব্যে একলা পুরুষ পিতায়।’

এই একলার বোধ থেকে উপলব্ধি হয়, অতি ভালোবাসার পরমাত্মীয়ের সঙ্গেও নিজেকে সংযুক্ত করতে নেই। হাওয়ার ঢেউয়ে ভেসে চলা তুলোর মতো নির্ভার, নিজের ভারটুকু বহন করার মতো নির্ভার হতে পারার নামই জীবন। বাঁধনহীন হওয়া, মুক্ত থাকা, মুক্ত রাখার নাম জীবন। যেভাবে গর্ভের দেয়াল ভেঙে বেরোনো শিশুকে নাড়ি কেটে মুক্ত করে দেওয়া হয়, তেমনভাবে। নিজের গতিতে, নিজের সময়ে সে শিশু একদিন ঠিক আবিষ্কার করে নেবে নিজেকে–ভিড়ের মধ্যে একা।

আর এভাবে চলতে গিয়ে বাঁচা, বাঁচার মতো বাঁচা, নিজের মতো বাঁচা-এই জিনিসগুলো আমরা সত্যিই যেন ভুলে যাচ্ছি! ভুলে যাচ্ছি একজন শিশু রিয়াদকে বাঁচানোর দায়িত্বটিও!

লেখক: কলামিস্ট

 

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ