হ্যাশ ট্যাগ ‘মি-টু’: ভেবে দেখার ও করার আছে অনেক কিছু

Send
শারমিন শামস্
প্রকাশিত : ১৭:৩৬, নভেম্বর ০৩, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:৪০, নভেম্বর ০৩, ২০১৮

শারমিন শামস্‘মি-টু’র ঝামেলার দিকটা হলো, এটি প্রমাণের কোনও সুযোগ নেই।  প্রথম কারণ, বেশিরভাগ যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটে সবার অগোচরে, গোপনে। এর কোনও সাক্ষী থাকে না। দ্বিতীয়ত, ঘটনাগুলোর কোনও আলামত নেই। ধর্ষণ ছাড়া বেশিরভাগ যৌন হয়রানিরই আলামত থাকে না। এছাড়া সাধারণত ঘটনাগুলো বহু আগের। মেয়েটির শৈশবে বা কৈশোরে ঘটে গেছে। ফলে আলামত আরও নেই। তৃতীয়ত মি-টু লেখা হয় সাধারণত প্রভাবশালী ক্ষমতাধর ব্যক্তির বিরুদ্ধে। ফলে মেয়েটিকে নানাভাবে হুমকি দিয়ে তার কণ্ঠস্বর স্থিমিত করে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। মূলত এটিই মি-টু’র সবচেয়ে বড় বাধা। মেয়ে এই ভয়েই সহজে সব প্রকাশ করতে চায় না, বিশেষ করে হয়রানিকারী ব্যক্তির নাম-পরিচয়। মি-টু’র আরেকটি বড় বাধা হলো—এই সমাজের মানসিকতা। মি-টু প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে একটি দল ঝাঁপিয়ে পড়বে মেয়েটির চরিত্র বিশ্লেষণে, তার পোশাক আশাক, ব্যক্তিজীবন ইত্যাদি ব্যবচ্ছেদ করে রায় ঘোষণা করবে আপামর জনগণ। বলাই বাহুল্য রায়টি হলো– ‘এই মেয়ে নিজেই খারাপ। একাধিক বিয়ে করেছে। জামা কাপড় অত্যন্ত খারাপ। এই মেয়ে সুবিধা নিতে চেয়েছিল ওই লোকের কাছে। নিতে না পেরে এখনে এসব কাহিনি ছড়াচ্ছে ইত্যাদি।’

মজাটা হলো, মি-টু যে মেয়েটি লিখছে, অর্থাৎ যৌন হয়রানির শিকার যে মেয়েটি, তাকে এই সমাজের একটি বিরাট অংশ বিশ্বাস করে না। বরং বিশ্বাস করে হয়রানির অভিযোগে অভিযুক্ত পুরুষটিকে। এর কারণ কী?

এর কারণ আর কিছুই নয়। এদেশে পুরুষের যৌন বিকৃতিকে একটি স্বাভাবিক কর্ম বলে ধরে নেওয়া হয়। আর নারী হলো ভোগের বস্তু। পুরুষের যৌনতায় নারীকে ব্যবহার করা হবে, তাতে নারীর ইচ্ছা-অনিচ্ছার কোনও সুযোগ নেই। তাই যৌন নিপীড়ক পুরুষ এদেশে অপরাধী নয়। অপরাধী সেই মেয়ে, যে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেয়, তার ওপরে ঘটা নিপীড়নের কথা। এই দেশে এমন মেয়ে নির্লজ্জ, বেয়াদপ ও শেষ পর্যন্ত মিথ্যুক। কারণ পুরুষতন্ত্র ওই নিপীড়ক পুরুষকে রক্ষা করতে প্রস্তুত যেকোনও উপায়ে।

মি-টু নিয়ে এদেশের সমাজ বেশি একটা চিন্তিত ছিল না। তারা ভেবেছিল, এদেশের ভীরু, মুখচোরা, অবলা নারীরা কোনোদিন মুখ খুলবে না। পশ্চিমা দেশে, এমনকি ভারতেও যখন মি-টু ঝড় তুলছে, তখনও নাকে তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছিল বাংলাদেশের যৌন হয়রানিকারী পুরুষেরা। তারা ধরেই নিয়েছিল, কবে কখন কে গায়ে হাত দিয়েছে, নোংরা প্রস্তাব দিয়েছে, ধর্ষণের চেষ্টা করেছে, তা প্রকাশ করা এদেশের লজ্জাবনত মেয়েদের পক্ষে কখনও সম্ভব হবে না।

নারীবাদ আন্দোলন এদেশে যখন শুরু হলো, তখন একই রকমভাবে বিষয়টিকে দেখেছিল এদেশের পুরুষতান্ত্রিক সমাজ। তারা গা করেনি। কিন্তু ধীরে ধীরে নারীবাদ মুভমেন্ট সক্রিয় হয়ে উঠেছে, আগুন জ্বলতে শুরু করেছে। এখন অসংখ্য মেয়ে তাদের অধিকার বিষয়ে সচেতন। তার বিরুদ্ধে পুরুষতন্ত্রের ষড়যন্ত্র আর নোংরামির ব্যাপারে সতর্ক। এখন যেকোনও মেয়েকে নিপীড়ন করা আগের চেয়ে কিছুটা হলেও কঠিন হয়ে উঠেছে। অন্তত পক্ষে প্রতিবাদের ভাষাটা মেয়েরা শিখতে শুরু করেছে। প্রতিবাদ শুধু সে একাই করছে না, তার হয়ে আরও দশটি নারী পুরুষ প্রতিবাদে তার সঙ্গে সামিল হচ্ছে,  নারীবাদের সাফল্য এখানেই।

মি-টু নারীবাদেরই ফসল। মি-টু মানে প্রকাশ করে দেওয়া। মি-টু মানে নারীর বোধোদয় হচ্ছে যে যৌন নিপীড়নের ঘটনা লুকিয়ে রাখা মানে আরও নিপীড়িত হওয়া। নারী বুঝতে শিখেছে, তার ওপর ঘটা অন্যায়ের জন্য সে দায়ী নয়। দায়ী যে পুরুষ, তাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে। হয়তো দেরি হয়েছে অনেক। কিন্তু দেরি মানেই শেষ নয়। মি-টু মানে অপরাধী যেই হোক, তাকে শাস্তি পেতে হবে।

এখন পর্যন্ত মি-টু’র বিষয়ে দুটি জিনিস লক্ষণীয়। একটি হলো, প্রতিটি ঘটনাই যৌন হয়রানি। এবং দ্বিতীয়টি হলো, প্রতিটা ঘটনাই ঘটিয়েছে প্রভাবশালী কোনও পুরুষ। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত দু’টি মি-টু প্রকাশ পেয়েছে।

একটি  হলো, মডেল তারকা প্রিয়তি একজন প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছেন।  অন্যটি হলো সীমন্তি নামে একজন নারী অভিযোগ এনেছেন একজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে। প্রিয়তি যে অভিযোগ করেছেন, তাতে ওই ব্যবসায়ী তাকে ধর্ষণ করতে উদ্যত ছিল। আর সীমন্তির অভিযোগ, ওই সাংবাদিক সেক্সুয়ালি অ্যাবিউজ করতেন।

শিশু যৌন নির্যাতন এই দেশে যেমন দুর্লভ নয়, তেমনি মিডিয়া জগতে নারীকে পণ্য ভেবে তার ওপর সুযোগ নেওয়ার ঘটনাও অহরহ ঘটে। আমরা সবাই তা জানি। কে কতটা মানি, তা অন্য হিসাব।

মি-টু’কে এদেশে যারা গুরুত্ব দিয়ে দেখেননি এতদিন, তারা হয়তো এবার নড়েচড়ে বসেছেন। বিশেষ করে যেসব পুরুষ বহুকাল ধরে মেয়েদের যৌন নিপীড়ন করছে, তারা হয়তো ভাবছে। হয়তো এও ভাবছে একই সঙ্গে যে, যাদের সে নির্যাতন করেছে, তারা হয়তো মি-টু লিখবে না। ব্যাপারটা অনেকটা এমন, ‘সবাই জানি মৃত্যু আসবে, কিন্তু আমার মরার দেরি আছে!’

অথচ এদের আরও আগেই সতর্ক হওয়ার কথা ছিল। পাশের দেশ ভারতের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আকবর তো ছাড় পেলেন না। পদ ছাড়তে হলো তাকে। মানহানির মামলা করেই রেহাই পেলেন না। এখন তো তার বিরুদ্ধে এক সাংবাদিক ধর্ষণের অভিযোগ দিয়েছে। অভিযোগকারী যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল পাবলিক রেডিওতে কর্মরত পল্লবী গগৈ। মার্কিন সংবাদপত্র দ্য ওয়াশিংটন পোস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দুই দশক আগের ঘটনার বিস্তারিত বলেছেন তিনি।

মানে, শুধু পদ ছেড়েই রক্ষা হবে না আকবরের। আরও অনেক কিছু বাকি আছে।

আমাদের দেশে কোনও মন্ত্রীর বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ আসলে ঘটনা কোন খাতে যেতো?

প্রথমত মন্ত্রীর রাজনৈতিক শিষ্যরা হামলে পড়তো অভিযোগকারী মেয়েটির ওপর। এরপর নানা ধরনের হুমকি ধমকি। নানাভাবে মেয়েটিকে হয়রানি করা হতো। হয়তো মামলা দিয়ে মেয়েটিকেই তুলে নিয়ে যাওয়া হতো! কে জানে!

বাংলাদেশে এ দুটি অভিযোগ বিশ্বজুড়ে গড়ে ওঠা মি-টু আন্দোলনের ধারাবাহিকতারই অংশ। একে এড়িয়ে যাওয়ার কোনও সুযোগ নেই। ভারতের তনুশ্রী দত্ত, স্বপ্না কিংবা প্রিয়া রামানির মতো সাহসী মেয়ে এদেশেও আছে। শত শত আছে। যতদিন যাবে এই সাহসী মেয়েদের সংখ্যা আরও বাড়বে। একই সঙ্গে চলবে স্লাট শেইমিংও। তবে সমাজের মনে রাখতে হবে, স্লাট শেইমিং নামের প্রাগৈতিহাসিক অস্ত্রটি আস্তে আস্তে ভোঁতা হয়ে যাচ্ছে। এই ভোঁতা অস্ত্রে মেয়ের মনে আপাতত আঘাত দেওয়া যায়, কিন্তু তার চলার পথকে রুখে দেওয়া যায় না। উল্টো তার পদক্ষেপ আরও সুদৃঢ় হয় আজকাল।

তবে এদেশের মেয়েদের মি-টু নিয়ে আরও গভীর ভাবনা ভাবা ও পদক্ষেপ নেওয়ার আছে। কারণ এদেশে নারীদের প্রতি নির্যাতনে যৌন নিপীড়ন একটা বড় অংশ জুড়ে আছে এ যেমন সত্য, তেমনি আরও নানাভাবে মেয়েদের হয়রানি করা হয়, এও সত্য। জেন্ডারগত কারণে নারীর প্রতি বৈষম্য করা, অপদস্ত করা, অপমান করার ঘটনা অহরহ ঘটে। এসব ঘটনা ছোট করে দেখার কোনও কারণ নেই। কারণ এগুলো ঘটে তার নারীত্বের কারণেই। একইসঙ্গে আরেকটি বিষয় উল্লেখযোগ্য।

আমাদের বুঝতে হবে যৌন হয়রানি বিষয়টি খুব সামান্য ও ছোট নয়। যৌন হয়রানি করার নানা ধরন আছে। শুধু শরীরে স্পর্শ করা বা ধর্ষণের চেষ্টাই নয়, মুখে আপত্তিকর শব্দ উচ্চারণ, ইঙ্গিতপূর্ণ কথা, নোংরা প্রস্তাব দেওয়া, জোর করে বারবার কোথাও আসতে বলা, বারবার কোথাও কফি খেতে ডাকা, মেয়েটির আপত্তি সত্ত্বেও তাকে ফোনে, ফেসবুকে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা, কথা বলার চেষ্টা ইত্যাদিও হয়রানির মধ্যে পড়ে। আবার এসবে মেয়ে যখন আপত্তি জানায়, তাকে নানা ধরনের অসুবিধায় ফেলার চেষ্টা একটি বড় অপরাধ। তাই, মেয়েদের এসব ঘটনার বিরুদ্ধেও মুখ খুলতে হবে। যেসব পুরুষ তাদের সঙ্গে এ ধরনের ঘটনা ঘটিয়েছে, তাদের মুখোশ উন্মোচন করতে হবে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, আজ যে ক্রান্তিকাল আমরা পেরোচ্ছি, তা সুন্দর একটি আগামীর জন্যই। সেই জন্য আজ এত রক্তক্ষয়, এত অশ্রুপাত। কিন্তু সান্ত্বনা এখানেই, আজ আমার একটি সাহসী উচ্চারণ ভবিষ্যতে আমার সন্তানের জন্য একটি লিঙ্গবৈষম্যহীন, সুস্থ সুন্দর সমাজ বিনির্মানে সাহায্য করবে। আর আজ যদি আমি ভয়ে মুখ লুকাই, লজ্জায় নত হই, তবে আগামী প্রজন্মকে একইভাবে হেনস্তা হতে হবে, যা কোনোভাবেই আমরা চাই না। এই দেশে এ সমাজে নারীর প্রতি সব ধরনের নির্যাতন, নিপীড়ন, হয়রানির চির অবসান হতে হবে। হতেই হবে। 

লেখক: সাংবাদিক ও নির্মাতা

 

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ