নৌকা প্রতীকে শূন্য ভোট!

Send
প্রভাষ আমিন
প্রকাশিত : ১৪:৫৮, এপ্রিল ১৯, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:২২, এপ্রিল ১৯, ২০১৯

প্রভাষ আমিনএক দলে কখনও খেলা হয় না। প্রতিপক্ষ সমান না হলেও প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য একটা প্রতিপক্ষ লাগে। নির্বাচনও একটা খেলার মতো। ভালো খেলার মতো ভালো নির্বাচনের জন্যও লাগে সমতল মাঠ, লাগে প্রতিপক্ষ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা। কিন্তু দেশজুড়ে চলমান উপজেলা নির্বাচনে এসবের কোনও বালাই ছিল না। মাঠে আওয়ামী লীগ একাই খেলোয়াড়। কিন্তু একমাত্র খেলোয়াড় হলেও উপজেলা নির্বাচন ছিল বেশ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। জমজমাট লড়াই হচ্ছে আওয়ামী লীগ বনাম আওয়ামী লীগে। একদিকে দলীয় মনোনয়ন পাওয়া ‘নৌকা’ প্রতীকের আওয়ামী লীগ। অপরদিকে বিদ্রোহী আওয়ামী লীগ। পাঁচ ধাপের উপজেলা নির্বাচনের প্রথম চার ধাপে অনুষ্ঠিত ৪৪৫টি উপজেলার মধ্যে নির্বাচনে ৩৩০টি উপজেলায় আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীর সঙ্গে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীদের। এরমধ্যে নৌকা হেরেছে ১৩৬টি উপজেলায়, যেখানে জিতেছেন বিদ্রোহী প্রার্থীরা। বিদ্রোহী প্রার্থীদের জয়ের পেছনে ছিল আওয়ামী লীগ নেতা, এমপি বা মন্ত্রীদের আশীর্বাদ।

প্রথমে আমি ভেবেছিলাম আওয়ামী লীগ বনাম আওয়ামী লীগের এ লড়াই বুঝি পাতানো। মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ভাব আনতে কেন্দ্র থেকেই বুঝি বিদ্রোহীদের ছাড় দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখন দেখছি বিদ্রোহীদের ব্যাপারে আওয়ামী লীগ বেশ সিরিয়াস। এরইমধ্যে অন্তত ৫০ জন মন্ত্রী-এমপিকে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাদের কাছে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার কথাও হচ্ছে। এখন যতই সিরিয়াস হোন, তৃণমূলে আওয়ামী লীগের ক্ষতি যা হওয়ার হয়ে গেছে। দলের কোন্দল প্রকাশ্যে চলে এসেছে। ইচ্ছাকৃত হোক আর অনিচ্ছাকৃত, বিদ্রোহীদের এই স্রোত সামাল দিতে না পারাটা বা নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারাটা অবশ্যই আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক দুর্বলতা। বিএনপি বা কার্যকর কোনও বিরোধী দল মাঠে না থাকার পরও যদি আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক অবস্থা বেহাল হয়, তাহলে সামনে অনেক বিপদ আছে।

এখন যত কঠোরই হোক, বিদ্রোহীদের ব্যাপারে দলের মনোভাব আওয়ামী লীগাররা ভালো করেই জানেন। অতীতে অনেকবার দেখা গেছে, তর্জন গর্জনই সার। জিতে আসতে পারলে তো কোনও কথাই নেই। হেরে গেলেও কিছুদিন পর দলে ঠাঁই হয়ে যায়। বিভিন্ন সময়ে অনেকে আওয়ামী লীগ ছেড়েছেন বটে, কিন্তু দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে নির্বাচন করা বা বিদ্রোহী প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়ার কারণে কাউকে দল ছাড়তে হয়েছে, এমন উদাহরণ খুব বেশি নেই। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে শুরু করে জাতীয় নির্বাচন সব ক্ষেত্রেই এই নীতি প্রযোজ্য। একটা টাটকা উদাহরণ দেই। হাজী সেলিম দশম সংসদে ছিলেন স্বতন্ত্র সাংসদ। বিদ্রোহী হয়ে জিতে এসেছিলেন তিনি। এবার কিন্তু দলীয় মনোনয়ন পেতে বা জিততে তার কোনও সমস্যা হয়নি। এটা জানেন বলেই, দলের নেতারা ফ্রি স্টাইলে দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে নির্বাচনে অংশ নেন। কিন্তু সবসময় এই কৌশল কাজ নাও করতে পারে। যেমন, এবারের উপজেলা নির্বাচন। এবারের নির্বাচনে দলের তৃণমূল পর্যায়ে দলীয় অন্তর্দ্বন্দ্বের বিষাক্ত প্রকাশ ঘটেছে। এই ক্ষত সামলে ওঠা সহজ হবে না। আরেকটি কাউন্সিলকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগে যখন ঘর গোছানোর তোড়জোড় হওয়ার কথা, তখন ঘরে ঘরে এমন আগুন লাগার আগেই সাবধান হওয়া উচিত ছিল।

১৩৬ উপজেলায় আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীদের জয়ের রহস্য কী? মানুষ কি আওয়ামী লীগ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে? নাকি মনোনয়নে গলদ ছিল? এই প্রশ্নে আবারও চলে আসে আওয়ামী লীগ মহলে চলা পুরনো বিতর্ক- আওয়ামী লীগ বনাম হাইব্রিড আওয়ামী লীগ। ২০০৮ সালের পর যারা ক্ষমতার মধুর লোভে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছেন, পুরনো আওয়ামী লীগাররা তাদের আদর করে ‘হাইব্রিড’ ডাকেন। আওয়ামী লীগ সাধারণ সস্পাদক ওবায়দুল কাদের তাদের ডাকেন ‘কাউয়া’ বলে। সবাই সমালোচনা করেন, বিদ্রুপ করেন; কিন্তু কেউই এই হাইব্রিডদের ঠেকানোর চেষ্টা করেননি, বাধা দেননি। তাই সারাদেশ এখন আওয়ামী লীগারে ভর্তি। বিএনপি তো বটেই, এমনকি জামায়াতের লোকও আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে আখের গুছিয়ে নিচ্ছে। শুধু যোগ দেওয়াই নয়, হাইব্রিডরাই এখন আওয়ামী লীগের সামনের কাতারে, এদের জন্য জায়গা পান না ত্যাগী নেতারা। দলে হাইব্রিডরাই যে আপারহ্যান্ড তা প্রমাণ হয়েছে এবারের উপজেলা নির্বাচনেও। চকচকে মুজিব কোট পরা হাইব্রিডরাই মনোনয়ন পেয়েছেন বেশি, হেরেছেনও বেশি। অভিমানে বিদ্রোহী নির্বাচন করা ব্যাকবেঞ্চাররা দলের কর্মীদের সমর্থনে জিতে এসেছেন।

আওয়ামী লীগ বনাম আওয়ামী লীগের এই লড়াইয়ে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে নৌকার। গত ৩১ মার্চ অনুষ্ঠিত উপজেলা নির্বাচনে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলায় ১৩৯টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ব্রাহ্মণহাতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ‘নৌকা’ প্রতীক কোনও ভোট পায়নি। ঠিক পড়েছেন, ‘নৌকা’ সেখানে শূন্য ভোট পেয়েছে। একই উপজেলায় বার আউলিয়া সিনিয়র মাদ্রাসা কেন্দ্রে ও রুদ্রাক্ষবাড়ি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে নৌকা প্রতীক পেয়েছে দুই ভোট। সারাদেশে আওয়ামী লীগ নেতায় গিজগিজ করলেও বাস্তবতা হলো টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় থাকায় স্বাভাবিকভাবেই আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা অনেক কমেছে। কিন্তু জনপ্রিয়তা যতই কমুক, বাংলাদেশের কোনও কেন্দ্রে নৌকা প্রতীক শূন্য ভোট পাবে, এটা এখনও বাস্তবতা নয়। তাহলে কীভাবে হলো? হলো দলীয় কোন্দলে। স্থানীয় সাংসদ প্রকাশ্যেই বিদ্রোহী প্রার্থীকে সমর্থন দিয়েছিলেন।

কে, কাকে সমর্থন দিয়েছে; কে, কার বিপক্ষে ছিল; সে তর্কে না গেলেও বাস্তবতা হলো একটি কেন্দ্রে ‘নৌকা’ শূন্য ভোট পেয়েছে। শোনা যাচ্ছে, ভবিষ্যতে নৌকার শূন্য ভোট পাওয়া ঠেকাতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীকের ব্যবহার তুলে দেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে।  এ যে দেখি মাথাব্যথার জন্য মাথা কেটে ফেলার দশা। ২১ বছর ক্ষমতার বাইরে থেকে নির্মম দমন-পীড়নেও কোনও নির্বাচনে কোনও কেন্দ্রে ‘নৌকা’ শূন্য ভোট পেয়েছে বলে মনে হয় না। কিন্তু টানা ১১ বছর ক্ষমতা থাকা আওয়ামী লীগকে সংগঠন হিসেবে অনেক নড়বড়ে লাগছে। মাথা কাটার মতো না করে কোন এমপির এলাকায় নৌকা শূন্য ভোট পেলো, কাদের জন্য ফাঁকা মাঠেও আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা হারলো, তাদের খুঁজে বের করতে হবে।

তৃণমূল পর্যায়ে কোন্দল মেটাতে হবে, সঠিক লোককে মনোনয়ন দিতে হবে, আনস্মার্ট ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন করতে হবে, কাউয়া-হাইব্রিডদের দলে অনুপ্রবেশ বন্ধ করতে হবে, ২০০৮ সালের পর যারা স্রেফ পিঠ বাঁচাতে আর ক্ষমতার লোভে দলে ভিড়েছে তাদের খুঁজে বের করতে হবে। সর্বোপরি তৃণমূলকে মূল্যায়ন করতে হবে, সংগঠনকে তৃণমূলে সংগঠিত করতে হবে। তাহলেই যে কোনও সময় যে কোনও ঝড় দল সামাল দিতে পারবে, অতীতের মতো তৃণমূল শিকড় আকড়ে পড়ে থাকবে। নইলে স্রেফ ক্ষমতা আকড়ে থাকতে চাইলে ‘নৌকা’র শূন্য ভোট পাওয়া কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়বে, সংক্রমিত হবে। জনপ্রিয়তা না থাকলে, আগের রাতের ভোট দিয়ে কি আর সবসময় জেতা যাবে?

 

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ