বগুড়া-৬ উপনির্বাচন: বিএনপি কি অংশ নেবে?

Send
আমীন আল রশীদ
প্রকাশিত : ১৫:২৯, মে ১২, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৩০, মে ১২, ২০১৯

আমীন আল রশীদ২০০৬ সালে ক্ষমতা ছাড়ার পর থেকে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি যে সংকটের ভেতরে পড়েছে, তা থেকে তাদের উত্তরণ দূরে থাক, ক্রমশ এই সংকট ঘনীভূত হয়েছে; কখনও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ না নিয়ে সংসদের বাইরে থাকা, কখনও নির্বাচনে অংশ নিয়ে গোটা ছয়েক আসনে জয়ী হয়ে সংখ্যানুপাতে জাতীয় পার্টির চেয়েও ‘দুর্বল’ দলে পরিণত হওয়া। আবার এই সামান্য সংখ্যক সদস্য সংসদে যোগ দেবেন কী দেবেন না তা নিয়ে শেষদিন পর্যন্ত যে সিদ্ধান্তহীনতা, তাতেও দলটির ভেতরকার দোটানা স্পষ্ট হয়েছে। সবকিছুর মূলে তাদের নেতৃত্ব সংকটজনিত যে সিদ্ধান্তহীনতা বারবারই প্রকাশিত হয়েছে, তাতে এখন সবশেষ প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে, আগামী ২৪ জুন বগুড়া ৬ আসনের উপনির্বাচনে তারা অংশ নেবে কিনা?
এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে বিএনপিকে এই প্রশ্নেরও মোকাবিলা করতে হচ্ছে, গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী তাদের ছয় প্রার্থীর মধ্যে পাঁচ জনই যেখানে শপথ নিলেন এবং যেখানে দলের পক্ষ থেকে জানানো হলো, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পরামর্শেই তারা সংসদে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সেখানে দলের একমাত্র হাইপ্রোফাইল এমপি এবং মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কেন শপথ নিলেন না? 

প্রসঙ্গত, ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের ফল প্রত্যাখ্যানের ঘোষণা এবং এই সংসদকে বৈধতা দিতে বিএনপি ও তাদের জোটের এমপিরা শপথ নেবেন না বলে জানানোর পরও শেষ মুহূর্তে এসে দলের পাঁচ এমপি শপথ নেন। এই ঘটনাকে মির্জা ফখরুল ‘রাজনীতিতে চমক’ এবং তাদের ‘কৌশলের অংশ’ বললেও কোন কৌশলের অংশ হিসেবে তিনি নিজে শপথ নিলেন না, সেটি এক বিরাট প্রশ্ন। 

এই ঘটনার দিনকয়েক পরে রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে নির্বাচিত এমপিদের সংসদে যাওয়া নিয়ে তারেক রহমানের সিদ্ধান্তকে সঠিক উল্লেখ করে ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্বীকার করেন, এর আগে তারা সংসদে যাবেন না বলে যে সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন, সেটি ভুল ছিল। কারণ তারা মনে করেন, সংসদে এবং সংসদের বাইরে—উভয় ক্ষেত্রেই আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে। 

বাস্তবতা হলো, সংসদে যাওয়া-না যাওয়া নিয়ে বিএনপির এই দোটানার মধ্য দিয়ে তাদের দলের ভেতরের দুর্বলতা, নেতৃত্বহীনতা আর দল যে সুদূর লন্ডন থেকে পরিচালিত হচ্ছে, সেটিই স্পষ্ট হয়। রাজনীতিতে স্থির সিদ্ধান্ত বলে যে কিছু নেই, বিএনপির অবস্থান সেটিও মনে করিয়ে দেয়। 

মির্জা ফখরুলের ভাষ্য, তারা ন্যূনতম কোনও সুযোগ হাতছাড়া করতে চান না। তাহলে এই উপলব্ধিটা হতে তাদের সংসদের যাত্রা শুরুর পর তিন মাস সময় লাগলো কেন? তাদের এই উপলব্ধি কি জোটের ভেতরে আলোচিত হয়েছে বা এটি কি তাদের জোটবদ্ধ সিদ্ধান্ত?

এই সিদ্ধান্ত যে জোটবদ্ধ নয় বরং এককভাবে তারেক রহমানের, সেটি স্পষ্ট অন্তত দু’জন নেতার প্রতিক্রিয়ায়। বিএনপির এমপিদের শপথ নেওয়ার পর জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শরিক নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না সাংবাদিকদের বলেছেন, এটি জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের জোটবদ্ধ সিদ্ধান্ত নয়। এমনকি তিনি এও বলেছেন, যদি সরকারের সঙ্গে বিএনপির কোনও সমঝোতা হয়ে থাকে, তাহলে সেটি পরিষ্কার করা উচিত। 

বিএনপির এমপিদের শপথ নেওয়ার এক সপ্তাহ পরে ২০ দলীয় জোট থেকে বেরিয়ে যায় আন্দালিভ রহমান পার্থর বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি)। তার স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠিত হওয়ার পর হতে ২০ দলীয় জোটের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ক্রমশই স্থবির হয়ে পড়ে। বিরোধীদলীয় রাজনীতি অতিমাত্রায় ঐক্যফ্রন্টমুখী হওয়ায় ২০১৮ সালে ৩০ ডিসেম্বরের জাতীয় নির্বাচনের আগে এবং পরবর্তী সময়ে সরকারের সঙ্গে সংলাপসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে ২০ দলীয় জোটের বিএনপি ছাড়া অন্য কোনও দলের সম্পৃক্ততা ছিল না। কেবল সংহতি এবং সহমত পোষণের জন্য ২০ দলীয় জোটের সভা ডাকা হতো। ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের প্রহসনের ও ভোট ডাকাতির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর ২০ দলীয় জোটের সবার সম্মতিক্রমে এই নির্বাচনকে প্রত্যাখ্যান করা হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে প্রথমে ঐক্যফ্রন্টের দুই এবং বিএনপির পাঁচ সংসদ সদস্য শপথ নেওয়ায় দেশবাসীর মতো বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপিও অবাক ও হতবাক।’ বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ‘শপথ নেওয়ার এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে বিএনপি ছাড়া ২০ দলের অন্য কোনো দলের সম্পৃক্ততা নেই। বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) মনে করে এই শপথের মাধ্যমে বিএনপি এবং ঐক্যফ্রন্ট ৩০ ডিসেম্বরের প্রহসনের নির্বাচনকে প্রত্যাখ্যান করার নৈতিক অধিকার হারিয়েছে।’

বিজেপির এই অবস্থানে এটি স্পষ্ট, বিএনপির সঙ্গে তার ২০ দলীয় জোটের শরিক অন্যান্য দলের সম্পর্ক এখন খুব একটা সুখকর নয়। এখন দেখার অপেক্ষা, এই ইস্যুতে জোটের অন্যান্য দলের কী প্রতিক্রিয়া হয় বা আরও কেউ বেরিয়ে যায় কিনা? এই ইস্যুতে এখনও ২০ দলীয় জোটের শরিক এলডিপির প্রধান অলি আহমেদের প্রতিক্রিয়া জানা যায়নি।

তবে শুধু ২০ দলীয় জোটই নয়, নির্বাচন সামনে রেখে চারটি দলের (বিএনপি, গণফোরাম, নাগরিক ঐক্য, জেএসডি-রব) সমন্বয়ে যে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট হয়েছিল, তারও একটি দলের প্রধান মাহমুদুর রহমান মান্নাও যে বিএনপির ওপর নাখোশ, তা তিনি এরইমধ্যে প্রকাশ করেছেন। প্রশ্ন হলো, রাজনীতি ও ভোটের মাঠে পরাক্রমশালী আওয়ামী লীগের বোলিং দাপটে কোণঠাসা বিএনপির ব্যাটসম্যানরা কি তাহলে বারবারই ভুল শট খেলছেন? একদিকে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কৌশলের কাছে হেরে যাওয়া এবং এখন নিজেদের জোটের ভেতরেও ভাঙন বা বিরোধিতা সামলাতে গিয়ে আখেরে দলটির কী পরিণতি হবে—তাও এখন রাজনীতি সচেতন মহলের জন্য বিশেষ ভাবনার বিষয়।

কথা হচ্ছে, বগুড়া-৬ উপনির্বাচনে বিএনপির কৌশল কী হবে? তারা নিজেরা কোনও প্রার্থী না দিলেও ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীর বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র কাউকে দাঁড় করিয়ে কি তাকে নেপথ্যে সমর্থন দেবে? 

বগুড়া-৬ অর্থাৎ সদর আসনকে বিএনপি তাদের মর্যাদার আসন বলে মনে করে। কেননা ১৯৯৬ থেকে ২০০১ পর্যন্ত তিনবার বিপুল ব্যবধানে এই আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন বগুড়ার পুত্রবধূ বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। এর আগে ১৯৯১ সালে এখান থেকে নির্বাচিত হন বিএনপির মজিবর রহমান। কিন্তু বিএনপি অংশ না নেওয়ায় ২০১৪ সালে এই আসন থেকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন জাতীয় পার্টির নূরুল ইসলাম ওমর।  একাদশ সংসদ নির্বাচনে এই আসন থেকে খালেদা জিয়ার প্রার্থী হওয়ার কথা থাকলেও দুই মামলায় ১৭ বছরের সাজা হওয়ায় তার প্রার্থিতা বাতিল হয়ে যায়। ফলে এখানে ধানের শীষ প্রতীকে প্রার্থী হন দলের মহাসচিব। 

বিএনপি এই আসনের উপনির্বাচনে অংশ নেবে? যদি উপনির্বাচনেই অংশ নেবে তাহলে নির্বাচিত এমপি শপথ নিলেন না কেন? এই কেনর উত্তর খুঁজতে গেলে এটি স্পষ্ট হয়, বিএনপি উপনির্বাচনে অংশ নেবে না। কারণ সেটি তাদের আরেকটি স্ববিরোধিতার উদাহরণ তৈরি করবে। নাকি বিএনপি এমন একটি স্বপ্নে বিভোর যে সরকারের সঙ্গে তাদের একটা সমঝোতা হবে এবং দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার রায় স্থগিত হবে এবং প্যারোলে মুক্ত হয়ে তিনি উপনির্বাচনে প্রার্থী হবেন? এটি ঠিক, এই আসনে খালেদা জিয়া প্রার্থী হলে তার বিজয় সুনিশ্চিত। কিন্তু সেই পথ বন্ধুর। ১৭ বছরের সাজা পাওয়া একজন আসামির সাজা স্থগিত হওয়া এবং তারপর জামিনে মুক্ত হয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়ে সংসদে যাওয়া নিতান্তই সিনেম্যাটিক ব্যাপার। রাজনীতিতে এরকম সিনেমা অসম্ভব না হলেও খালেদা জিয়া ও বিএনপির ক্ষেত্রে এমনটি ঘটবে বলে আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে না। অর্থাৎ আইনি প্রক্রিয়ায় খালেদা জিয়ার এখনই মুক্তি পাওয়া অত্যন্ত কঠিন এবং সরকার সেই সুযোগ বিএনপিকে দেবেই বা কেন? সরকারের সঙ্গে বিএনপির একটি সমঝোতা হচ্ছে বলে অনেক দিন ধরেই গুঞ্জন ছিল। কিন্তু বিএনপি বরাবরই এসব গুঞ্জন উড়িয়ে দিয়েছে। 

এরকম বাস্তবতায় বিএনপি আরেকটি যুক্তিতে এই উপনির্বাচনে অংশ নিতে পারে, তা হলো– বগুড়ার স্থানীয় কোনও নেতাকে নির্বাচনে জিতিয়ে এনে সংসদে তাদের ছয়টি আসনই বহাল রাখবে; পক্ষান্তরে যে কৌশলের কথা তারা বলছে, তার অংশ হিসেবে মহাসচিব সংসদের বাইরে থাকবেন।

যদিও বিএনপির মর্যাদার এই আসনের উপনির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর বিজয়কে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে স্থানীয় আওয়ামী লীগ। দশম সংসদ নির্বাচনে এই আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী জয়ী হওয়ায় তাদেরও চোখ আছে এখানে। জেলা বিএনপির সভাপতি ভিপি সাইফুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেছেন, বগুড়া-৬ আসনে আওয়ামী লীগের বিজয়ী হওয়া অসম্ভব।

উপনির্বাচনে মনোনয়ন পাওয়ার আশায় এরইমধ্যে মাঠে নেমেছেন জেলা আওয়ামী লীগের তিনজন যুগ্ম সম্পাদক। তারা হলেন রাগেবুল আহসান রিপু, টি জামান নিকেতা ও মঞ্জুরুল আলম মোহন। এছাড়া দলটির তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক শাহাদৎ আলম ঝুনু, প্রয়াত সভাপতি মমতাজ উদ্দিনের ছেলে ও বগুড়া চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি মাসুদুর রহমান মিলন এবং কেন্দ্রীয় উপকমিটির সহ-সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন শফিকও প্রার্থী হতে আগ্রহী। অন্যদিকে জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা জানিয়েছেন, দলের সাধারণ সম্পাদক সাবেক এমপি নূরুল ইসলাম ওমর এবারও মহাজোটের মনোনয়ন চাইবেন।

এটা ঠিক, বিএনপি বগুড়া ৬ উপনির্বাচনে প্রার্থী দিলে ভোটের যে সমীকরণ দাঁড়াবে, প্রার্থী না দিলে বা কাউকে সমর্থন না করলে সেই সমীকরণ একেবারেই ভিন্ন। যদি তারা শেষমেশ এখানে প্রার্থী দেয়, তাহলে মির্জা ফখরুল নির্বাচিত হয়েও কেন শপথ নিলেন না, সেই প্রশ্নের খুব যৌক্তিক এবং গ্রহণযোগ্য উত্তরও তাদের ঠিক করে রাখতে হবে।

লেখক: বার্তা সম্পাদক, চ্যানেল টোয়েন্টিফোর

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ