আমাদের উন্নয়ন মিশ্রণ

Send
রাশেক রহমান
প্রকাশিত : ১৬:৩৬, মে ২২, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৩৭, মে ২২, ২০১৯

রাশেক রহমানআমাদের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য প্রতিনিয়ত স্বপ্ন দেখেন এবং সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে নিজেই উদ্যোগী হয়ে কাজ করছেন। তার পারিবারিক পরিচয়ের যে শক্তি আছে সেই স্থান থেকে এবং তার পরিবারের বাংলাদেশের মানুষের জন্য আত্মত্যাগের যে ইতিহাস আছে তা থেকে মনোবল নিয়ে তিনি এগিয়ে যাচ্ছেন। নিজের ওপর ১৯ বার প্রাণঘাতী হামলা হলেও তাকে দমাতে পারেনি কোনও অপশক্তি। তিনি বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য নবোদ্যমে কাজ করে যান সবসময়।
১৭ কোটি মানুষের বাস এই দেশে। সমস্যা থাকবেই। কিন্তু প্রতিটি সমস্যাতে আমরা আমাদের দায়িত্বের জায়গা উপেক্ষা করার কারণেই হয়তোবা প্রধানমন্ত্রীকে নিতে হয় সব দায়িত্ব। কেউ সাহায্য করুক আর নাই করুক তিনি তার পিতার মতোই বাংলাদেশের মানুষের কল্যাণের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন দৃঢ় পদক্ষেপ নিয়ে। বাংলাদেশকে নিয়ে যাচ্ছেন উন্নয়নের অগ্রযাত্রার পথে। কিন্তু সবকিছুর শেষে নাগরিক হিসেবে আমাদের কিছু দায়িত্ব থেকেই যায়।

একটি ঘটনা উল্লেখ করে প্রবন্ধটির উদ্দেশ্য উন্মোচন করি–

অনেকেই হয়তো জানেন ২০১৮ সালে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা সৈকত ও গুলশান আরা উর্মী দম্পতির সন্তান সৈমি ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। যদিও একটু দেরি হলো কিন্তু  ‘মা’ দিবসে সন্তান হারানো সেই মা উর্মী ও বাবা সৈকতের কথা ভেবে এই লেখাটা লিখছি আমি। আমেরিকা থেকে আসা আমার এক বন্ধু ড. আসাদ জামানকে নিয়ে একটি হাসপাতালে গিয়েছিলাম। সেখানে আইসিইউতে শুয়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত শিশুদের দেখে হতবাক আমার সেই ডাক্তার বন্ধুও। সেই ডাক্তারের আমেরিকায় ২২ হাজার রেজিস্টার্ড রোগী আছেন। তিনি কখনো ভাবতে পারেন না একটা মশার কামড়ে এক বছরের একটি শিশু নিথর হয়ে শুয়ে থাকবে হাসপাতালে। ডাক্তার বন্ধুটিও এক সময় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ছাত্রলীগ শাখার সভাপতি ছিলেন। এই শিশুরা এভাবে আজকে অসুস্থ হচ্ছে এর জন্য দায়ী কে? আমি যখন তাদের পরিবারের সদস্যদের অশ্রুজল দেখি তখন নিজেকে স্থির রাখতে পারি না। এরা কেন আজকে এমন পরিস্থিতির শিকার, কার কাছে এই প্রশ্নের জবাব চাইবো? আজকে অনেকেই নিজের সন্তানকে প্রতিদিন একটি করে মসকিউটো রিপিলেন্ট তার কাপড়ের সঙ্গে লাগিয়ে রাখেন ডেঙ্গুর ভয়ে। কিন্তু  সেটা কি সবার পক্ষে সম্ভব? আর এটা কখনও কোনও সমাধানও হতে পারে না।

আমার মা রেহানা আশিকুর রহমান। তিনি আমার মা; এটাই শাশ্বত, এটাই সত্য। ‘মা’ দিবসে সবাই মা’কে স্মরণ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন ছবি পোস্ট করছিল। ব্যক্তিগতভাবে আমি না চিনলেও যখন আমি সন্তান হারানো সেই মা উর্মীর কথা ভাবছিলাম তখন নিজেকে অসহায় লাগছিল। নিঃসন্দেহে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। এখন বাংলাদেশে মানুষকে বিদ্যুতের জন্য হাহাকার করতে হয় না। বিদ্যুৎ খাতে এই উন্নয়নের দাবিদার অবশ্যই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের। প্রতিমন্ত্রী হিসেবে এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আছেন বাংলাদেশের তরুণ ও চৌকস প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু। সেই মন্ত্রণালয়ের অগ্রযাত্রা নিয়ে খুব স্বাভাবিকভাবেই একটা গর্ববোধের জায়গা অবশ্যই থাকে প্রতিমন্ত্রীর একান্ত ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যাওয়া সৈকতের।

সৈকতের সহধর্মিণীর এখানে গর্বের জায়গা থাকে এই ভেবে যে তার স্বামী এমন এক মন্ত্রণালয়ে কাজ করছেন যারা সমগ্র বাংলাদেশকে আলোকিত করছেন, দূর করছেন দেশের অন্ধকার। কিন্তু যখন একজন ‘মা’-এর দৃষ্টিকোণ থেকে সন্তান হারানোর কথা ভাবি তখন সেই মায়ের পৃথিবী অন্ধকার হয়ে আসে সন্তান হারানোর বেদনা অনুভব করে। বাঘ নয়, ভাল্লুক নয়, সাপ নয়, কুমিরও নয়, শুধু একটি এডিস মশার কামড়ে ২০১৮ সালে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে তার শিশু। সেই মা তার হৃদয়ের ভেতরে তখন কোনটাকে প্রাধান্য দেবে?

নির্মোহভাবে যদি চিন্তা করা যায় বা কোনও সন্তানের মাকে যদি আজ জিজ্ঞেস করা হয় তার সন্তানকে স্কুলে পাঠিয়ে দিয়ে তিনি নিশ্চিন্তে বাড়িতে বসে থাকতে পারেন কিনা তবে এর উত্তরে কোনও মা’ই হয়তোবা হ্যাঁ সূচক সাড়া দেবেন না। কারণ এখানে আমাদের প্রয়োজন মানুষের জীবন থেকে ‘অনিশ্চয়তা’ দূর করা। সুনির্দিষ্টভাবে কার দোষ সেটা নিয়ে অনেক ভাবনাই থাকতে পারে, তবে বাংলাদেশের উন্নত হওয়ার অন্যতম শর্তই হবে ‘অনিশ্চয়তা’কে মানুষের জীবন থেকে ‘মুছে’ দেওয়া। ‘মুছে’ দেওয়া শব্দটা হতে পারে ইউটোপিয়ান ধারণা। কিন্তু  এই ‘অনিশ্চয়তা’ হ্রাস পাবে সেটা বাস্তবিক ধারণা নিশ্চয়। যেখানে ধর্ষণ, ছিনতাই, অপহরণের ভয় থাকবে না, যেখানে একটি মশার কামড়ে কোনও মাকে হারাতে হবে না সন্তান, সড়কে থাকবে নিরাপদে চলাচলের নিশ্চয়তা। এসব খাতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে ‘অনিশ্চয়তা’ দূর করা যায়। ‘অনিশ্চয়তা’র ব্যাপ্তি ব্যাপক। কিন্তু  উপরোল্লিখিত ক্ষেত্রগুলোতে প্রাধান্য দিয়ে কাজ করা অতীব প্রয়োজন।

একটি পদ্মা সেতু নির্মাণ বাংলাদেশের সক্ষমতার জায়গাটা অনেক দূর নিয়ে গেছে। আজ থেকে এক বছর আগে যখন বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করা হয় তখন সেখানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সজীব ওয়াজেদ জয়। আমারও সেখানে উপস্থিত থাকার সৌভাগ্য হয়েছিল। চোখ থেকে গর্বের, আনন্দের, তৃপ্তির অশ্রুজল বেরিয়েছিল সেদিন। তারও এক বছর পূর্তি হয়ে গেলো। মনে পড়ছে সেইসব কথা। কিন্তু  ‘মা’ দিবসে আমি যখন অগণিত মায়ের কথা ভাবি যাদের সন্তান হয়তোবা ডেঙ্গু রোগের বাহক এডিস মশা অথবা কোনও ধর্ষণকারী অথবা কোনও বেপরোয়া গাড়িচালকের কারণে প্রাণ হারায় তখন আসলে জীবন নামের সমীকরণের ডান দিক (RHS-Right Hand Side) ও বাম দিক (LHS-Left Hand Side) মেলানো কষ্ট হয়ে যায়।

দেশ ও জাতির বেড়ে ওঠা অনেকটা মানুষের শরীরের বেড়ে ওঠার মতো। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় ডেঙ্গু এমন একটি রোগ যা এই নামে না হলেও হয়তো ভিন্নভাবে মহামারী আকার ধারণ করবে বাংলাদেশে। হয়তোবা ডেঙ্গু নামে না, অন্য কোনও নামে বা অন্য কোনও উপায়ে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে CDC (Center for Disease Control) নামে একটি সংস্থা আছে যার কাজ হচ্ছে সেই দেশটির কোথায় কখন কোনও নতুন জায়গায় নতুন কোনও রোগের আবির্ভাব ঘটছে, সেই রোগকে কীভাবে প্রতিহত করা যায় এবং দেশের জনগণকে এগুলো মোকাবিলায় প্রস্তুত করা যায় তা নিয়ে কাজ করা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যখন অভিবাসী বৃদ্ধি পায় তখন সেখানে স্থল, আকাশ ও নদীবন্দরগুলো দিয়ে প্রচুর মানুষ আসা শুরু করলো। দেশের বাইরে থেকে আসা মানুষ অনেক সময়েই বহন করে বিভিন্ন রোগের জীবাণু। সেই বিষয়টি মাথায় রেখে তৈরি হলো সেন্টার ফর কমিউনিকেবল ডিজিস, যা পরে CDC নামে কাজ শুরু করে। যদি এই সংস্থাটি চায় কোনও রোগ প্রতিরোধের জন্য একটি শহরের পূর্ণ কর্তৃত্ব নিতে হবে তবে সেটার জন্য তারা চাইলেই সেই জায়গার প্রশাসনকে নির্দেশ দিতে পারে প্রয়োজনীয় সবকিছু করার জন্য। এটা খুবই জরুরি। প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধের যে বিষয়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ সেখানে CDC’র মতো সংস্থাগুলো খুবই জরুরি। যারা নীরবে, নিভৃতে কাজ করে যায় একটি দেশ ও জাতিকে রোগবালাই মুক্ত রাখতে। টিভি বা পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রচার করেই রোগমুক্ত করার আহ্বান জানানোর চেয়েও তাই CDC’র মতো সংস্থাকে রোগ প্রতিরোধের জন্য কাজ করতে দেওয়াটা জরুরি। যারা গবেষণা করে বের করবে কী কারণে কী রোগের সূত্র ঘটছে, কীভাবে এটাকে প্রতিহত করা যায়। ভাবনার বিষয় হলো এই ডেঙ্গু রোগের জন্য যে এডিস মশাকে দায়ী করা হয় সেই মশা কি আমেরিকায় নেই? আমেরিকার ফ্লোরিডাতেও তো মশা আছে। তাহলে সেখানে কেন ডেঙ্গু নেই? তাহলে সেখানে কেউ মারা যাচ্ছে না কেন? কারণ তাদের সেই প্রতিরোধ ব্যবস্থা করে দিচ্ছে CDC।

আশির দশক ছিল ব্রেইনড্রেইনের। যখন কর্মের পরিবেশ ছিল না, ছিল না কর্মও। মেধাবী ছেলেমেয়েরা যে কারণে অনেকেই দেশ ছেড়ে বিদেশে চলে যেতো। বঙ্গবন্ধু কন্যার বাংলাদেশে আজ মেধাবীরা বাংলাদেশে থাকতে চায়। কিন্তু  যদি বিভিন্ন ‘অনিশ্চয়তার’ জায়গা হ্রাস না করা যায় তখন আবারও মানুষের মাঝে দেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি দেওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পাবে বৈকি। আর ঠিক তখন অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে সফলতার মানদণ্ডে আমরা আসলে কতটা সক্ষম। কারণ তারা দেখছে পদ্মা সেতুসহ অনেক বড় বড় অবকাঠামো আমাদের থাকলেও আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করার জন্য পরিবেশ ও তাদের সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার নিশ্চয়তা এখনও এখানে নেই। সিটি করপোরেশনে মেয়রদের কাজ নিয়ে জনমনে একটা প্রশ্ন প্রায়ই দেখা যায়। এই মেয়র মহোদয়দের নিজ নিজ সিটি করপোরেশনের এলাকা পরিষ্কার রাখাসহ সুস্থ পরিবেশ নিশ্চিত করার দায়িত্ব যেমন আছে ঠিক একইভাবে যাদের জন্য মেয়র তাদের কি কোনও দায়িত্ব নেই? অর্থাৎ কারও বাসাবাড়ির সামনে বা ভেতরে জলাবদ্ধতার কারণে যখন মশার বংশবৃদ্ধি ঘটে তখন সেখানে জনগণ হিসেবেও দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগ থাকে না। সবাইকে নিজ নিজ স্থান থেকেই সচেতন হয়ে কাজ করতে হবে দেশের জন্য, দশের জন্য এবং সহযোগিতা করতে হবে তাকে যিনি দেশের নেতৃত্বে আছেন। তেমনটা না হলে যে প্রশ্ন জাগে মনে তা হলো আমরা কি সেই অপেক্ষায় আছি যে প্রধানমন্ত্রী পদ্মা সেতু বানিয়ে দেবেন, বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটও তিনি করে দেবেন, মেট্রোরেল করে দেবেন আবার মশাও কি তাকে মেরে দিতে হবে?

আমেরিকার প্রেক্ষাপটে ডক্টর জোসেফ মাউন্টিন CDC’র সূচনা করেছিলেন সেই দেশের ভবিষ্যতের কথা ভেবে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটা সিটি করপোরেশন যখন ঠিকভাবে কাজ করে না বা অনেক অধিদফতর যখন ঠিকভাবে কাজ করে না তখন জোসেফ মাউন্টিনের মতো কে দায়িত্ব নেবে? বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থায় এমন একটি প্রতিষ্ঠান দরকার বলে মনে করি যার ওপর ভরসা করে আমাদের দেশে লুকায়িত বিভিন্ন রোগের সমস্যা সমাধান করা যায়। বাংলাদেশের বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দরগুলো দিয়ে প্রতিদিন সহস্রাধিক মানুষ যাওয়া-আসা করছে। বিভিন্ন বর্ডার দিয়েও আসছে অনেকে। এগুলো বিবেচনায় রেখে আমি চিরাচরিত পন্থায় সব রোগজীবাণু মোকাবিলা করবো ভাবাটাও বোকামি হয়ে যায়। মনে রাখতে হবে সোয়াইন ফ্লুর একজন রোগী বাংলাদেশে আসার কয়েক দিন পর ধরা পড়েছিল। অথচ সিডিসির মতো দায়িত্বপ্রাপ্ত একটা প্রতিষ্ঠান থাকলে এই রোগ বিমানবন্দরেই শনাক্ত করা সম্ভব হতো। আরেকটি উদাহরণ দিই আমাদের দৈনিক জীবন থেকেই। ঢাকা শহরে সত্যিকার অর্থে ১৫ মিনিটের রাস্তা পার হতে আমাদের প্রায়ই ২-৩ ঘণ্টাও লেগে যায়। একটা গাড়ির চালক যখন ড্রাইভিং সিটে বসে থাকেন তখন বা একজন যাত্রী যখন বসে থাকেন তখন তাদের স্নায়ুর ওপর যে চাপ সৃষ্টি হয় সেটাকেও একটা গবেষণা বা পরিসংখ্যান বের করে প্রয়োজন। সেই প্রয়োজনের কাজটাও কিন্তু  CDC’র কাজের আওতায় আসে। না, আমি বলছি না যে CDC’র ট্রাফিক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করবে না। কিন্তু  তারা সরকারের যেকোনও মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপচারিতা করতে পারে যাতে একটি জাতিকে সুস্থ রাখা যায়।

৫৫ হাজার ৫৯৮ বর্গমাইলের বাংলাদেশে ১৭ কোটি মানুষের অনস্বীকার্য বাস্তবতায় যে প্রশ্ন মোটেও সুখকর নয় আমাদের জন্য তা হলো আমাদের দেশের CDC কোথায়? বাংলাদেশের প্রায় ৯০ লাখ মানুষ ডায়াবেটিক রোগে আক্রান্ত। এটাকে আমি মহামারী থেকে কোনও অংশে কম বলবো না। বাংলাদেশের নাগরিকদের একটা বিশাল অংশ হৃদরোগে আক্রান্ত, যেটাকে আমি মহামারী হিসেবে যদি বলি তবে ভুল হবে কী? বাংলাদেশের একটা বিশাল অংশের জনগণ ব্লাড-প্রেসারের সমস্যায় আক্রান্ত, এটাকেও আমি একটা মহামারী হিসেবেই দেখি। আর নুসরাতসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে যৌন-নিপীড়ন বা ধর্ষণসহ যেসব সামাজিক অপরাধ ঘটছে তার সবই যে শুধু স্বার্থ-চরিতার্থের কারণে হচ্ছে তা কিন্তু  নয়। বরং এক ধরনের মানসিক বিকৃতি বা অসুস্থতা দায়ী এমন অপরাধের পেছনে। এই মানসিক বিকৃতি বা অসুস্থতাও তো একটি রোগ। ডেঙ্গু বলি বা চিকুনগুনিয়া, ডায়াবেটিক বলি বা হৃদরোগ, ব্লাড-প্রেসার বলি বা মানসিক অসুস্থতার মতো রোগগুলো প্রতিরোধে যে সমন্বিত ব্যবস্থাপনা সেটি কি আছে আমাদের দেশে বর্তমানে? ইউরোপের মধ্যযুগের সময়ে অথবা বাংলার সেই ১৮ শতকের মাঝামাঝি বা ১৯ শতকের প্রারম্ভিকে মহামারীর সঙ্গে হয়তোবা তুলনা করা যাবে না, কিন্তু  ভাবতে গেলে বাংলাদেশে এখন অসুখের সংখ্যা একেবারে কমও বলা যাবে না। প্রতিটি ঘরেই যেখানে ডায়াবেটিক রোগী, হৃদরোগী, ব্লাড প্রেসারের রোগী কমবেশি দেখা যায়, সেক্ষেত্রে এটাকে আমরা বলতেই পারি এক ধরনের মহামারীর মাঝেই আছি। আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিক ফেডারেশন বলছে ২০৪৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ ১০ ডায়াবেটিকপ্রবণ দেশের একটি হবে। তখন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা হবে ১৩ কোটি ৭০ লাখ। এটাকে কি মহামারী বলবো না? এই ডায়াবেটিক রোগের সঙ্গে অনেকেই কিডনি, হৃদরোগসহ নানা সমস্যায়ও ভুগে থাকেন। এক সময় যদি এই সংখ্যা ১৩ কোটিই ছাড়িয়ে যায় তবে এই রোগ মোকাবিলা করতে সরকারকে কত বড় বোঝা টানতে হবে তা কি কল্পনা করা যায়? অথচ CDC’র মতো করে যদি কাউকে বা কোনও সংস্থাকে দায়িত্ব দেওয়া যায় তবে তারাই তো দায়িত্ব নিয়ে সেই অবস্থা থেকে রক্ষা করবে সরকারকে এক ধরনের অচিন্তনীয় বোঝার হাত থেকে। সেই ধরনের রোগ প্রতিরোধের জন্য কোনও রূপরেখা বা নীতিমালা কি আছে? সেই সমন্বিত ব্যবস্থাপনার জন্য বাংলাদেশে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি কারা? মেয়র নাকি স্বাস্থ্যমন্ত্রী নাকি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নাকি স্বাস্থ্য-অধিদফতরের ডিজি নাকি জননিরাপত্তা অধিদফতরের ডিজি? কে?

বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন বলেছিলেন, ‘Justice will not be served until those who are unaffected are as outraged as those who are.’ অর্থাৎ ‘ততক্ষণ পর্যন্ত সুবিচার সমাজে প্রতিষ্ঠিত হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত অন্যের ওপর ঘটে যাওয়া অন্যায়ের ব্যাপারে তুমি একইরকম ভাবে সংক্ষুব্ধ হবে।’ আজকে আমার, আপনার সন্তানের কিছু হয়নি বলে যাদের সন্তানরা আক্রান্ত হয়েছে তাদের ব্যথাটা যদি নিজেদের মনে না করতে পারি তবে নিজেদের অবস্থানকেও নিরাপদ করা যাবে না। অনেকে ভাবতে পারে তাদের সন্তানের সঙ্গে যে ঘটনা ঘটেছে তা নিয়ে আমার এত ভাবনার কী আছে? আমি ভাবছি কারণ আমারও সন্তান আছে। আমিও তাকে নিয়ে ততটাই ভাবি যতটা সন্তান হারানো সেই বাবা-মা ভাবেন। আর তাই আমি এই বিষয়ে সংক্ষুব্ধ। তাদের বাচ্চা যখন হাসপাতালে কাতরাচ্ছে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির কারণে তখন সেখানে চুপ থাকাটা অন্যায়।

সম্প্রতি আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাই শেখ সেলিমের নাতি জায়ান চৌধুরী শ্রীলংকার বোমা হামলায় মারা গেছে। যেহেতু আমার আপনার সন্তান বোমার আঘাতে মারা যায়নি বা মারা যাচ্ছে না তাই আমাদের সন্তানের স্কুলে কারা পড়াচ্ছে বা কী পড়ানো হচ্ছে বা আমাদের পাড়া বা সমাজে কারা বসবাস করছে তা নিয়ে আমরা খুব একটা চিন্তিত না। আমরা অনেক কথা বললেও অন্যের দুঃখকে আমরা নিজের কষ্ট বলে মানতে পারি না। আমাদের গানে, কবিতায়, উপন্যাসেও অপরের কষ্টকে নিজের কষ্ট বলে কথা বলি। কিন্তু বাস্তবিক জীবনে আমরা অন্যের ওপর ঘটে যাওয়া অন্যায়কে কি নিজের ওপর অন্যায় বলে মনে করছি? বাংলাদেশের প্রতিটি শিশুই একটি সম্ভাবনা। শিশু জায়ানও আমাদের একটি সম্ভাবনা ছিল। আগামী দিনে যাতে বাংলাদেশে কোনও শিশুকে জঙ্গিবাদের থাবার কাছে হারাতে না হয় সেই পরিমাণ ব্যক্তি-সচেতনতা বা ব্যক্তি-দায়িত্বের জায়গায় কি আমরা এখনও পৌঁছাতে পেরেছি বা পৌঁছানোর জন্য প্রস্তুত আছি?

যেই মানুষকে শ্রেষ্ঠ জীব বলে পৃথিবীতে স্বীকৃতি দেওয়া হয়ে থাকে তাকে আর যাই হোক ডেঙ্গু মশা হারিয়ে দেওয়ার শক্তি রাখে না। আদিম যুগের গুহার ভেতর বাস করা থেকে শুরু করে প্রস্তর যুগ পেরিয়ে তাম্র যুগসহ বিভিন্ন ধাপ পার হয়ে আগুন দিয়ে লোহা গলিয়ে আজ যারা অত্যাধুনিক মেশিন বানিয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে সেই মানুষের অনাগত ভবিষ্যৎ, ভালোবাসার স্থান, স্বপ্নের জায়গা অর্থাৎ তার সন্তানকে হারাতে হচ্ছে একটা মশার কামড়ে অথবা নিত্যদিনের কিছু ঘটনা বা ‘অনিশ্চয়তা’য় যেখানে আমরা ঐক্যবদ্ধ হলেই পারতাম সেই ঘটনা বা ‘অনিশ্চয়তা’গুলোকে দূর করতে।

যে জাতি বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে খালি হাতে নয় মাস যুদ্ধ করে অকাতরে প্রাণ দিয়ে বাংলাদেশকে স্বাধীন করেছে সে জাতি মশা নির্মূল করতে পারবে না, রাস্তায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পারবে না, ধর্ষণকারীদের বিতাড়িত করতে পারবে না, মৌলবাদ বা জঙ্গিবাদীদের বিদায় জানাতে পারবে না, আর যাই হোক আমি তা বিশ্বাস করার জন্য প্রস্তুত নই, আমি তা বিশ্বাস করি না।

বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের সফলতা অনেক। আজকে বাংলাদেশে খাদ্যাভাবে কেউ মারা যায় না, মঙ্গাও দূর হয়ে গেছে, বাংলাদেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ কিন্তু ডেঙ্গুর ইস্যুতে আমাদের কাঠামোগত ব্যর্থতা আমাকে হতাশ করে তোলে।

আমার দেশে যদি আজ CDC’র মতো প্রতিষ্ঠান থাকতো তবে সুনির্দিষ্ট প্রয়োজনে রোগ নির্ণয় ও নির্মূলে প্রশাসনিক ব্যবস্থাও গ্রহণ করতে পারতো। ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে এমন একটি রোগকে প্রতিহত করার জন্য তারা প্রয়োজনে রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোকেও কমান্ড করার ক্ষমতা রাখতো। সেক্ষেত্রে সিটি করপোরেশন যদি কাজ নাও করে তবে CDC পারতো বিভিন্ন রোগ মোকাবিলায় কাজ করতে। এই CDC আবার যাকে তাকে দিয়ে গঠন করলেই হবে না। আমাদের ঢাকা শহরের দুই মেয়র কি এখন পর্যন্ত একবারও এই মশার সমস্যা নিয়ে নিজেদের মধ্যে কোনও আলাপ আলোচনা করেছেন? করে থাকলে ফল হবে না বা হচ্ছে সেটা বিশ্বাস করা কঠিন হয়ে যায়। আমি বিশ্বাস করি তাদের সদিচ্ছা থাকলে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব। শরীরের যেমন রোগ প্রতিরোধের ব্যবস্থা আছে ঠিক একইভাবে রাষ্ট্রেরও রোগ প্রতিরোধের ব্যবস্থা আছে। স্বাস্থ্যসেবা মানে সব স্থানেই হাসপাতাল থাকা নয়। বরং একই সঙ্গে এমন একটি প্রতিষ্ঠান থাকা যেটা সব ধরনের রোগ নির্ণয় করে আগাম প্রতিরোধের ব্যবস্থা নেবে। আর সেই ব্যবস্থাই করে CDC।

আজকে আয়োজনে বাংলাদেশ অনেক এগিয়ে, আনুষ্ঠানিকতাতেও অনেক এগিয়ে, কিন্তু জীবনের গুণগত মানের উন্নয়নের দিক বিবেচনায় মনে হয় বেশ পিছিয়ে। আর এখানে এসেই মনে হয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই  একমাত্র আলোকবর্তিকা। কিন্তু এটাও সত্য, আমরা আমাদের দায়িত্বের জায়গায় তাকে সহযোগিতা করবো, সহযোগিতা করার জন্য প্রস্তুত থাকবো। কারণ তিনি হয়তো চেষ্টা করে গেলেন, কিন্তু  আমরা যদি পরিবর্তন না চাই তবে পরিবর্তন কি সম্ভব? প্রধানমন্ত্রী নেতৃত্ব দিতে পারবেন, পরিশ্রম করতে পারবেন, কিন্তু আমরা যদি বদলাতে না চাই তবে কেউ কি জোর করে আমাদের বদলাতে পারবে? আমরা যদি নিজেই সুন্দর না হতে চাই তবে আমাদের কি কেউ সুন্দর বানাতে পারবে? এটাই বাস্তবতা। আমাদের যার যেখানে যে দায়িত্ব সেই জায়গা থেকেই একটা সুন্দর ভবিষ্যৎ একতাবদ্ধভাবেই তৈরি করতে হবে। আমরা মানুষের জীবনযাত্রার মান ও জীবনযাত্রার নিরাপত্তা যদি নিশ্চিত করতে না পারি তবে যত উন্নয়নই হোক না কেন সবই মূল্যহীন (Futile) হয়ে যায় অনেক ক্ষেত্রে।

অর্থনীতির ভাষায় একজন মানুষের বেঁচে থাকার জন্য বিভিন্ন পরিমাপে যা নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী দরকার সেটাকে ‘কনজাম্পশান মিক্স’ বা ‘খরচ মিশ্রণ’ বলা হয়ে থাকে। সেই একই ধারাবাহিকতায় যেসব ক্ষেত্রে উন্নয়নকে কেন্দ্র করে আমাদের সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া তাকে হয়তো আমরা বলবো ‘ডেভেলপমেন্ট মিক্স’ বা ‘উন্নয়ন মিশ্রণ’। তাহলে বঙ্গবন্ধু কন্যার বাংলাদেশের ‘ডেভেলপমেন্ট মিক্স’ বা ‘অগ্রগতি মিশ্রণে’ ১টা পদ্মা সেতু, বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট, মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, কর্ণফুলী টানেলের মতো বিভিন্ন মেগা প্রজেক্টের পাশাপাশি মশা মুক্ত নগরী তো আশা করাই যায়। অর্থাৎ নাগরিক জীবনে মানুষের আরও উন্নত জীবনযাত্রা নিরাপদ করাটাও এই ‘ডেভেলপমেন্ট মিক্স’ বা ‘উন্নয়ন মিশ্রণের’ আওতায় আনা যায়। এই উন্নত জীবনযাত্রার মানে থাকছে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, আইনশৃঙ্খলাসহ নাগরিক জীবনে মৌলিক চাহিদাগুলোর উন্নয়নও। উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় যখন আমরা রাষ্ট্রীয়ভাবে এগিয়ে যাই তখন আমাদের ‘ডেভেলপমেন্ট মিক্স’ বা ‘উন্নয়ন মিশ্রণকে’ আরও উন্নত করা খুব জরুরি। উন্নত বাংলাদেশের দুটো দিক থাকবে। একটি হচ্ছে সক্ষমতার দিক, অন্যটি হচ্ছে ‘অনিশ্চয়তাকে’ দূর করে নিত্যজীবনের নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত করার দিক। এই ‘অনিশ্চয়তা’ দূরীকরণের মধ্যে থাকবে ধর্ষণ, হত্যা, অনিরাপদ সড়ক, মশার আক্রমণে হওয়া ডেঙ্গুর মতো রোগ প্রতিরোধ করা ও সব ধরনের অপরাধপ্রবণতা রোধসহ সব ‘অনিশ্চয়তা’ দূর করে নিত্যজীবনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। যেখানে নিরাপদ সড়কে হারাবে না কোনও প্রাণ, মশার কামড়ে সন্তান হারানোর বেদনায় কাঁদতে হবে না কোনও মা’কে এবং সবার মন থেকে দূর হবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আশংকা। এই ‘মা’ দিবসে আমি মনে করি তখনই নিজেদের উন্নত বলে দাবি করা যাবে যেদিন নিত্যজীবনে বাংলাদেশের সব ‘মা’ই বলবেন ‘আমরা নিরাপদ,আমরা নিশ্চিন্ত।’

লেখক: রাজনীতিবিদ

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

সম্পর্কিত সংবাদ

লাইভ

টপ