উৎকোচ সমাচার ও দুদক

Send
বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী
প্রকাশিত : ১৬:৪৮, জুন ১৩, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৫৪, জুন ১৩, ২০১৯

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরীউৎকোচ লেনদেন নবীনকালের বিষয় নয়। প্রাচীনকালেও এটি প্রচলিত ছিল। প্রাচীন বইপত্রে এ বিষয়ে উল্লেখ আছে। এমনকি খ্রিস্টপূর্বেও উৎকোচের প্রচলন ছিল। সম্রাট চন্দ্রগুপ্তের প্রধান পরামর্শদাতা  সাহায্যকারী চাণক্য তার ‘অর্থশাস্ত্র’ নামক বইয়ে রাজকর্মচারীদের উৎকোচ লেনদেনের বিষয়ে উল্লেখ করেছেন। আমার মনে হয়, উৎকোচের বয়স আর সভ্যতার বয়স প্রায় সমান হবে। দেখেশুনে অভ্যস্ত হয়ে গেছে বলে উৎকোচের বিষয়টা কেউ আর তেমন গায়ে মাখে না।
উৎকোচের প্রচলনটা কোথায় নেই? তথ্য তালাশ করলে দেখা যাবে, উৎকোচটা সবচেয়ে বেশি প্রচলিত বিষয়। একবার এক জেলাপর্যায়ের রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে তাদের হেড অফিসে গিয়েছিলাম। নেতাটা মফস্বলের জেলা থেকে এসেছেন, তাদের জেলার ক’টা কমিটি নাকি অনুমোদন করানোর কাজে। তিনি হেড অফিসের এক নেতাকে কাগজপত্রগুলো বুঝিয়ে দিলেন, আবার এক বান্ডেল টাকাও দিলেন। জিজ্ঞেস করলাম, টাকা কেন দিলেন? নেতা বললেন, টাকাগুলো না দিলে কমিটি নাকি অ্যাপ্রুভ হবে না। জিজ্ঞেস করেছি, টাকাগুলো দিলো কে? নেতা জানালেন, কমিটিতে যারা আছেন, তারাই পদবি অনুসারে দিয়েছেন।

নমিনেশনের জন্য যান, সেখানেও যারা নমিনেশন দেওয়ার মালিক, তাদের উৎকোচ দিতে হয়। এবার নমিনেশনের ব্যাপার নিয়ে আরও অভিনব এক অভিজ্ঞতার সঞ্চয় করেছি। আওয়ামী লীগের এক প্রার্থী ঐক্যফ্রন্টের নেতাকে ৩৫ লাখ টাকা দিয়ে তার চয়েস করা এক লোককে তার নিজ কেন্দ্রে মনোনয়ন দিতে ব্যবস্থা করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত ঐক্যফ্রন্টের নেতা তার দলের প্রার্থী হিসেবে ওই লোকের মনোনয়ন ব্যবস্থা করতে পেরেছিলেন।

আওয়ামী লীগ প্রার্থীকে জিজ্ঞেস করলে বলেছিলেন, বিএনপি আসল প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে তার পক্ষে জিতে আসা কষ্টসাধ্য হবে এবং কয়েক কোটি টাকা খরচ হবে। এখন ৩৫ লাখ টাকা খরচ করে আমার নিজস্ব লোককে নমিনেশন কিনে দিলাম, তিনি নির্বাচনের সময় কেন্দ্রেও যাবেন না। ৩৫ লাখ টাকা উৎকোচের কী লীলা সৃষ্টি করতে পারে, বুঝে দেখুন!

জাতীয় পার্টির একজন ৫ কোটি টাকা উৎকোচ দিলেন তার স্ত্রীকে মহিলা এমপি করার জন্য। লোকে বলে এবার বিএনপির তিনশ’ নমিনেশনে কয়েকশ’ কোটি টাকা উৎকোচ বাণিজ্য হয়েছে। টাকার নৌকা পাহাড় দিয়ে যায়। এরা রাজনীতি করে, এরা নির্বাচন করে, এরা এমপি হয়, মন্ত্রী হয়—এরাই দেশ চালায়। আল্লাহ যে দেশটাকে এখনও টিকিয়ে রেখেছেন, তার জন্য হাজারো শুকরিয়া।

উৎকোচ ব্যবস্থাটা অফিসে নিয়ম মেনে চলে। নিয়ম মোতাবেক উৎকোচ দিতে পারলে কাজ নিশ্চিত হয়। শুনেছি প্রাইমারি স্কুলের মাস্টারের চাকরির জন্য ৮ লাখ টাকা, পুলিশের কনস্টেবলের চাকরির জন্য ৪ লাখ টাকা, কাস্টমসের জন্য ১৫ লাখ টাকা। সবকিছু নির্ধারিত। মামলায় হাজিরার জন্য পেশকারকে দিতে হয় ১০০ টাকা। বেঞ্চ অফিসারকেও টাকা দিতে হয়।

সরকারি ব্যাংকগুলোতে এমডি সাহেব, চেয়ারম্যান সাহেবদের দালালই আছে বাজারে। উৎকোচ নির্ধারিত ১০ শতাংশ। দালালরা ঋণগ্রহীতাকে অত্যন্ত আত্ম-প্রত্যয়ের সঙ্গে কথা বলেন, ‘আপনাকে চেয়ারম্যান, এমডি সাহেবের সঙ্গে বৈঠকে বসিয়ে দেবো।’ এভাবে এক লাখ কোটি টাকা খেলাপি হয়েছে। আমি আগে ব্যাংকের ওপর কয়েকটা লেখা লিখেছি। সেখানেও বলছি, এখনও আবার বলি, ব্যাংক ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে বর্তমান অর্থমন্ত্রী অপারগ হলে জাতির বরাতে দুর্ভোগ আছে। প্রত্যেক বছর বাজেটে ব্যাংক খাতে মূলধন সরবরাহ করা হচ্ছে। কোনও বছরই সরবরাহ বন্ধ হচ্ছে না। টাকাগুলো গিয়ে খেলাপির খাতায় যোগ হচ্ছে, এভাবে তো অনাদি অনন্তকাল চলতে পারে না।

আগে শুনতাম, পুলিশ ডিপার্টমেন্ট সবচেয়ে বেশি ঘুষ নেয়। গত পঞ্চাশ বছর দুনিয়াদারি করতে গিয়ে দেখলাম আরও বহু ডিপার্টমেন্ট আছে, তাদের সামনে পুলিশের ঘুষ কিছুই না। অথচ পুলিশের নাম ছড়িয়েছে বেশি। আমার গ্রামে এক প্রকাণ্ড প্রাচীন পুকুর আছে। তাকে লোকে তালগাছিয়া পুকুর বলে, অথচ তার পাড়ে কোনও তালগাছ নেই। আমি গত ৭০ বছরের মাঝে কোনও তালগাছ দেখিনি। আমার চেয়েও প্রাচীন লোকেরা তালগাছ দেখেনি। কিন্তু পুকুরটার নাম তালগাছিয়া পুকুর। পুলিশের অবস্থাও হয়েছে তালগাছিয়া পুকুরের মতো। সম্ভবত জন্মলগ্ন থেকে যেখানেসেখানে কিছু টাকা নেওয়ার অভ্যাস ছিল বলে এ বদনাম স্থায়ী হয়ে তালগাছিয়া পুকুর হয়ে গেছে।

অথচ এখন দেখি দুদক, শিক্ষা অধিদফতর, কাস্টমস—এরা এক একটা ঘুষের বটবৃক্ষ। ট্রাফিক পুলিশের মতো বিশ টাকা নয়। প্রথম দাবি করতেই বিশ লাখ টাকা, ত্রিশ লাখ টাকা।  প্রত্যেক ধর্মে ঘুষ নিতে বারণ করা হয়েছে। একটা হাদিসে আছে, ঘুষ দাতা ও ঘুষ গ্রহীতা উভয়ই জাহান্নামে যাবে’। চোরে না শুনে ধর্মের কাহিনি।

তাবলিগ জামাতওয়ালারা প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে কিছু কিছু লোকের মনে আল্লাহভীতি সৃষ্টি করে ঘুষের রমরমা ভাব লাগিয়ে কিছু সফলকাম হয়েছিলেন। এখন তাবলিগওয়ালাও দ্বিধাবিভক্ত হয়ে মারামারিতে লিপ্ত হয়েছেন। সম্প্রতি দেখলাম এক গ্রুপ অন্য গ্রুপের একজনকে হত্যা করেছে। সমাজ সর্বত্র ভরসা হারাচ্ছে। তাবলিগওয়ালাদের অনুরোধ করব, যেন মানব কল্যাণের ধারাটাকে আর বিধ্বস্ত না করেন।

দুদকের চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ হরহামেশা শক্ত শক্ত কথা বলেন, অথচ এখন দেখছি তার প্রতিষ্ঠানের সমগ্র শরীর ক্যানসার আক্রান্ত। আইন করে দুদককে বহু ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। জাতীয় চরিত্রের ত্রুটি সরানোর জন্য দুদকের সৃষ্টি, অথচ কার্যত দেখছি জাতীয় ভ্রষ্ট চরিত্রের লোকের সমাবেশ হয়েছে দুদকে।

সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনের এক পরিচালক একজন পুলিশ কর্মকর্তার কাছ থেকে ৪০ লাখ টাকা ঘুষ গ্রহণ করেছেন, এই অভিযোগ মিডিয়ায় তোলপাড় শুরু হওয়ার পর আবারও প্রশ্ন উঠেছে—দুর্নীতি দমনের জন্য কতটা কাজ করছে এই কমিশন? জন্ম থেকেই এই দুর্নীতি দমন কমিশন কখনোই বিতর্কমুক্ত হতে পারেনি। এক/এগারোকালে যে দাপট তারা শুরু করেছিল, তা ক্রমান্বয়ে হারিয়ে গেছে। তখনও কর্মকর্তারা দুর্নীতি করেছে, অথবা কাউকে কাউকে দুর্নীতিতে জড়ানোর ভয় দেখিয়ে টাকা কামিয়েছে। এখন তো মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে দুর্নীতিতে নিমজ্জিত কিছু ব্যক্তিকে দুদক মামলাই করছে ‘ক্লিন সার্টিফিকেট’ দিয়ে সমাজে ছেড়ে দেওয়ার জন্য।

ইকবাল সাহেবকে অনুরোধ করব, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ করে দুদকে পরিবর্তন আনুন। ভালো চরিত্রের লোকের অনুসন্ধান করে বিভিন্ন ডিপার্টমেন্ট থেকে প্রেষণে লোক এনে আপনার দুদকের মুমূর্ষু অবস্থা দূর করুন। নব সাজে সাজান। দুদকের কোনও এক ব্যক্তি বলেছেন, কোনও ব্যক্তির মন্দ কাজের জন্য দুদকের ভাবমূর্তি নষ্ট হবে না। পরিচালক আর উপপরিচালকের লাখ লাখ টাকা ঘুষ লেনদেনের সঙ্গে জড়িত থাকার পর যদি ভাবমূর্তি নষ্ট না হয়, তবে নষ্ট হবে কিসে? এসব ভ্রষ্টাচারী অফিসার নিয়েই তো দুদক। বিরাট অট্টালিকাটা নিয়ে তো দুদক নয়।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অনুরোধ করব, ব্যাংক, দুদক, শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ বিশৃঙ্খলায় জড়িয়ে পড়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে সঠিক পথে টেনে তোলার চেষ্টা করুন। সমগ্র খ্যাতি আপনাকে নিয়ে আবর্তিত হচ্ছে কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রের জন্য সফলতা যেন ম্লান না হয়ে যায়।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

bakhtiaruddinchowdhury@gmail.com

 

 

/এসএএস/এমএমজে/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ