ভারতের বিতর্কিত নাগরিক পঞ্জি এবং তিন তালাক আইন

Send
আনিস আলমগীর
প্রকাশিত : ১৪:২৯, জুন ২৫, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:২৫, জুন ২৫, ২০১৯

আনিস আলমগীরসপ্তদশ লোকসভার উদ্বোধনী বক্তৃতায় ভারতের রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ তাদের সীমান্তবর্তী অন্যান্য রাজ্যেও নাগরিক পঞ্জি হবে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার লোকসভা এবং রাজ্যসভার সদস্যদের উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেন, “আমার সরকার ‘ন্যাশনাল রেজিস্টার অব সিটিজেনস’ বা জাতীয় নাগরিক পঞ্জি প্রক্রিয়া রূপায়ণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে সেইসব এলাকায়, যেখানে অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটেছে ব্যাপক হারে। অনুপ্রবেশ রুখতে সীমান্ত বরাবর নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হবে। একদিকে সরকার অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করতে কাজ করছে, অন্যদিকে ধর্মীয় বিশ্বাসের ঘটনায় নিপীড়িতদের নিরাপত্তা দিতেও সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এই সূত্রে নাগরিক আইনে সংশোধন করার প্রয়াস নেওয়া হবে, যা হবে ভাষা, সংস্কৃতি এবং সামাজিক পরিচিতি রক্ষা করেই।”
সংসদে রাষ্ট্রপতি সাধারণত যে ভাষণ দিয়ে থাকেন তা কখনও রাষ্ট্রপতির নিজস্ব বক্তব্য নয়, সরকারের কথার প্রতিধ্বনি মাত্র। এটি সংসদীয় পদ্ধতির সরকারের নিয়ম। বাংলাদেশও তাই। রাষ্ট্রপতি সংসদে যে ভাষণ দেন, তা মন্ত্রিসভার তৈরি। সুতরাং ২০ জুন ২০১৯-এর ভাষণে রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ যে নাগরিক পঞ্জির কথা বলেছেন, তা মূলত নরেন্দ্র মোদি সরকারেরই সিদ্ধান্ত।

সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচনের প্রচারকালে বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ নাগরিক পঞ্জি করার কথা বারবার উল্লেখ করতেন। অনেক বিশ্লেষক মনে করেছিলেন এটা নির্বাচনের সময়ের দশ কথার এক কথা। ভারতীয় বিশ্লেষকরাও এমন ধারণা পোষণ করতেন, অনেকে তাদের লেখায় তা বলেছেনও। কিন্তু রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ সংসদের উদ্বোধনী বক্তৃতায় পুনরায় নাগরিক পঞ্জির কথা উল্লেখ করায় মনে হচ্ছে, নরেন্দ্র মোদি সরকার নাগরিক পঞ্জির ব্যাপারে স্থির প্রতিজ্ঞ।

আসামের ৪০ লাখ লোকের নাগরিকত্ব ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। অসমিয়ারা ‘বাঙালি খেদাও’ আন্দোলন করছে ভারত স্বাধীন হওয়ার পর থেকে। আসাম গণপরিষদ নামে যে দলটি আসামের রাজনীতিতে সক্রিয়, সে দলটি বাঙালি খেদাও আন্দোলনের সন্তান। এ দল প্রফুল্ল মহন্তের নেতৃত্বে একবার সরকার গঠন করেছিল। আসলে ‘বাঙালি খেদাও’ আন্দোলনের সময় নাগরিক পঞ্জির এই সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন ভারতীয় সুপ্রিমকোর্ট। এটা একটা অদূরদর্শী সিদ্ধান্ত ছিল।

আসামে রাজ্য সরকারের কর্মচারীদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ হচ্ছে অসমিয়া। নাগরিক পঞ্জির কর্মকাণ্ডে তারাই সম্পৃক্ত। এই কাজ করতে গিয়ে এখন তারা ৪০ লাখ লোককে নাগরিক পঞ্জির বাইরে রেখেছে। অসমিয়ার খসড়া নাগরিক পঞ্জি থেকে বাদ পড়া ৪০ লাখ মানুষের মধ্যে এ পর্যন্ত মাত্র ৬ লাখ মানুষ তাদের নাম তোলার জন্য তথ্যপ্রমাণসহ কাগজপত্র জমা দিয়েছেন। সপ্তদশ লোকসভার ভোট শেষ। সুতরাং নাগরিক পঞ্জির কাজ পুনরায় চালু হবে।

চল্লিশ লাখ লোককে নিজ দেশ থেকে ধাক্কা দিয়ে বের করে দেবে এমন ক্ষমতা কার আছে? এমন কাজ যদি আসাম রাজ্যের বিজেপির রাজ্য সরকার করার চেষ্টা করে, তবে পুরো পশ্চিমবাংলা, আসাম অগ্নিসম হয়ে উঠবে। চল্লিশ লাখ ঝুলে থাকা মানুষের মাঝে নাকি ২৭ লাখ হিন্দু আর ১৩ লাখ মুসলমান। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, পাশের যে কোনও দেশ থেকে হিন্দুরা ভারতে প্রবেশ করলে তারা তাৎক্ষণিক নাগরিকত্ব পাবে। খ্রিস্টান আর বৌদ্ধরাও নাগরিকত্ব পাবে। শুধু নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত হবে মুসলমানরা। রাষ্ট্রপতির ভাষণেও সেই কথা প্রতিধ্বনিত হয়েছে।

প্রত্যেক জাতীয়তাবাদী শক্তির একটা প্রতিপক্ষ লাগে। ভারতেই হিন্দুত্ববাদীদের প্রতিপক্ষ হচ্ছে মুসলমান। সাতশ’ বছর মুসলমানরা ভারত শাসন করেছে। এত দীর্ঘ সময় যারা একটা দেশ শাসন করেছে, তাদের কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকাই স্বাভাবিক। সুতরাং সবাই যে মুসলমানদের পছন্দ করত, তা তো নয়। এখন মোদিরা সেই মুসলমানদের প্রতিপক্ষ বানিয়ে ফায়দা লোটার চেষ্টা করছেন। অথচ বাঙালি খেদাও আন্দোলন যারা আসামে করেছিল, তাদের কাছে হিন্দু মুসলমান বিষয় ছিল না। কেউ নন-অসমিয়া হলেই তারা আসামে থাকতে পারবে না, এটাই চেয়েছে তারা। এখন মোদিরা ১৩ লাখ মুসলমানকে নাগরিকত্বহীন ভাসমান নাগরিক করার চেষ্টা করবে, অথবা বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ারও চেষ্টা করতে পারে। যার পরিণতিতে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক খারাপ হবে। তখন ‘প্রতিবেশীই প্রথম’–এমন গালভরা বুলি অসার প্রমাণিত হবে।

বাংলাদেশের মানুষ ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ভারতে গিয়েছিল। স্বাধীনতার পর সব লোক ফেরত এসেছে। কোনও বাংলাদেশি এখন স্থায়ীভাবে ভারতে বসবাস করে না। যারা যারা এখন ভারতে বসবাস করে, তারা ব্রিটিশ আমলে পশ্চিমবাংলায় গিয়েছিল। যেমন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরিবার, যারা মূলত খুলনার লোক। অমর্ত্য সেনের পরিবার, যারা ঢাকার লোক। জ্যোতি বসুর পরিবার, তারা নারায়ণগঞ্জের লোক। বিমান বসুর পরিবার, তারা বরিশালের লোক। পশ্চিমবঙ্গের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল চন্দ্র ঘোষের পরিবারও ছিল মানিকগঞ্জের।
সীমান্তবর্তী সব রাজ্যে নাগরিক পঞ্জি হলে সবার আগে এখন পশ্চিমবাংলা ও ত্রিপুরায় নাগরিক পঞ্জির কাজ আরম্ভ হবে। পশ্চিমবাংলার প্রতি নরেন্দ্র মোদির আর অমিত শাহের শ্যান দৃষ্টি আছে। বিজেপিতে যোগদানকারী মুকুল রায় বলেছেন, তারা তৃণমূলের অনেক বিধানসভা সদস্যের সঙ্গে কথাবার্তা বলে রেখেছেন। তারা তৃণমূল ত্যাগ করলেই তৃণমূল নাকি বিধানসভার সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারাবে। সম্ভবত নরেন্দ্র মোদি, অমিত সাহা এবং মুকুল রায় এখন দোটানায় আছেন—মমতাকে কী ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচন পর্যন্ত টিকিয়ে রাখবেন, নাকি ৩৫৬ ধারা প্রয়োগ করে মমতার সরকার ভেঙে দিয়ে রাষ্ট্রপতির শাসন কায়েম করবেন! তৃণমূল কংগ্রেস, বামফ্রন্ট আর কংগ্রেস বলেছে ৩৫৬ ধারা প্রয়োগ করলে তারা আন্দোলনে যাবে।

যা হোক, আর কিছু না করলেও নাগরিক পঞ্জির ধুয়া তুলে মমতার ভোট ব্যাংককে বিধ্বস্ত করে ফেলার চেষ্টা করবে বিজেপি। নাগরিক পঞ্জি আরম্ভ হলে পশ্চিমবাংলার মুসলমানরা বিশেষ করে হয়রানির শিকার হবে। বর্তমানে প্রায় আড়াই কোটি মুসলিম নাগরিক রয়েছে সেখানে। তাদের মধ্যে কমপক্ষে ৩০ অথবা ৪০ লাখ মুসলমানের নাগরিকত্ব ঝুলিয়ে দেওয়ার আশংকা আছে।

এদিকে লোকসভার প্রথম অধিবেশনে বিরোধীদের হইচই ও প্রতিবাদের মুখে নতুন তিন তালাক বিল পেশ করা হয়েছে। বিজেপি এর আগের সংসদেও বিলটি পাস করে রাজ্যসভায় পাঠিয়েছিল, কিন্তু রাজ্যসভায় বিজেপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় বিলটি তখন পাস হয়নি। নিয়ম অনুসারে ষষ্ঠদশ লোকসভা ভেঙে দেওয়ার পর এই বিল বাতিল হয়ে যায়। সপ্তদশ লোকসভা গঠন হওয়ার পর এই বিল পুনরায় লোকসভায় পেশ করা হয়েছে। বিলের বয়ান মতে, যদি কোনও মুসলিম পুরুষ তাৎক্ষণিক তার স্ত্রীকে তিন তালাক শব্দটি উচ্চারণ করে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটান, তার তিন বছরের কারাদণ্ড হবে।

অবশ্য বিজেপির নিজস্ব চিন্তাপ্রসূত কোনও বিল ছিল না এটি। ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট আগেই সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতিদের রায়ে তিন তালাক প্রথা অসাংবিধানিক বলে ঘোষণা করেছে। এই তিন তালাক প্রথা ইসলাম ধর্ম পালনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত নয় বলেও জানিয়েছে ভারতের সর্বোচ্চ আদালত এবং তিন তালাক প্রথা বন্ধ রেখে নির্দিষ্ট আইন তৈরির জন্য সরকারকে নির্দেশ দিয়েছিল। তারা একে অ-ইসলামিক বলেও ঘোষণা করেন।

বিরোধীদের অভিযোগ, এটি ‘পক্ষপাতমূলক বিল’। এদিন বিল নিয়ে আলোচনা শুরু হলে কংগ্রেস নেতা শশী তারুর বলেন, ‘সরকারের উচিত একটা অভিন্ন আইন প্রণয়ন করা। তা যেন শুধুই মুসলিমদের লক্ষ্য করে না হয়। অন্য ধর্মের মানুষও তাদের স্ত্রীদের পরিত্যাগ করেন’। 

অনেকে মনে করেন, সুপ্রিম কোর্ট মুসলমানদের ধর্মীয় পারিবারিক আইনে হস্তক্ষেপ করা ঠিক হয়নি। নানান সমস্যায় জর্জরিত দেশে ধর্ম নিয়ে কথা বলা ঠিক নয়, কারণ কথা বললেই আরেকটা সমস্যা মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে পারে। ভারতে এখনও ‘জয় শ্রী রাম’ না বললে গণধোলাই দিয়ে মুসলমান হত্যা করা হচ্ছে। ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে বাড়িতে গরুর মাংস রেখেছেন, এই অভিযোগে উত্তর প্রদেশের দাদরিতে মহম্মদ আখলাক নামে এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে মারা হয়েছিল। আখলাকের মামলার তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তা সুবোধ কুমার সিংকেও গোরক্ষক বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে খুন হতে হয়েছিল। বুলন্দশহরে মারমুখী জনতা তাকে গুলি করে ও পিটিয়ে নৃশংসভাবে খুন করার পর তার পরিবারের অনেকেই সন্দেহ করছেন, ওই মামলার তদন্তের জেরেই তাকে প্রাণ দিতে হলো।

আখলাকের ঘটনার পর থেকে সারা দেশে এ ধরনের প্রায় ৪০টি ঘটনা ঘটেছে। গত ২৩ জুন ২০১৯ ঝাড়খণ্ডেও এমন ঘটনায় পিটিয়ে মারা হয়েছে তাবরেজ আনসারি নামের এক মুসলমান তরুণকে। সরকার ‘মব লিঞ্চিং’ (Mob lynching) থামানোর কোনও ফলপ্রসূ সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। গত তিন বছর ফসলের ন্যায্য দাম না পেয়ে, ঋণগ্রস্ত হয়ে ভারতে হাজার হাজার কৃষক আত্মহত্যা করেছে। গত ২০ জুন একটি সরকারি রিপোর্ট অনুসারে (NITI Aayog) ভারতে পানির এতো তীব্র সংকট হবে যে ব্যবস্থা না নিলে ২০৩০ সালে পানযোগ্য পানি পাওয়া কঠিন হবে।

এতো সব সমস্যা ফেলে রেখে তালাকের মতো একটা সমস্যা নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট আদেশ দিতে গেলেন কেন, বুঝে আসে না। তালাকের বিষয়টা পাকিস্তান, ভারত এবং বাংলাদেশ কোথাও বিব্রতকর সমস্যা কখনও সৃষ্টি করেনি। বাংলাদেশে মুখে তিন তালাক বললে তালাক হয় না, তার জন্য আইনি প্রক্রিয়ায় যেতে হয়। ভারত বাংলাদেশের আইনটিকে অনুসরণ করতে পারতো, নয়তো অভিন্ন আইন প্রণয়ন করতে পারতো। তালাকের কারণে তিন বছরের জেল দেওয়ার বিধান থাকলে এর মাধ্যমে মুসলিমদের চক্রান্তের শিকার হতে হবে।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট। ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত
anisalamgir@gmail.com

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ