রায় বেচাকেনা

Send
বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী
প্রকাশিত : ১৫:১৯, সেপ্টেম্বর ০৫, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:২৬, সেপ্টেম্বর ০৫, ২০১৯





বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরীপাকিস্তানের সময়ে বিচার বিভাগ এবং সামরিক বাহিনী নিয়ে কেউ কিছু লিখতেন না। অবশ্য তাদের বিষয়ে লেখার বিষয়বস্তু খুঁজে পাওয়া মুশকিল ছিল। এখন কিন্তু সেরূপ অবস্থা আর নেই। হাইকোর্ট তলব করবেন, সেই ভয় এড়িয়ে এখন লেখকরা লিখতে দ্বিধা করেন না, বিষয়বস্তুটা সত্য হলেই হয়। সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার দুর্নীতি নিয়েও মিডিয়া চুপ ছিল না। সম্প্রতি হাইকোর্টের তিনজন বিচারপতিকে মহামান্য রাষ্ট্রপতি এবং প্রধান বিচারপতি মিলে পরামর্শ করে বিচারকার্য থেকে বিরত রেখেছেন। নিশ্চয়ই বিষয়টা তদন্ত হচ্ছে। হয়তো তারপর চূড়ান্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
তদন্তাধীন বিষয় তাই পত্রিকায় দেখলেও এই নিয়ে কিছু লিখিনি। কিন্তু দেশের বিচার ব্যবস্থায় ঘুণ ধরলে নিশ্চুপ থাকাও কোনও বিবেকবান লোকের পক্ষে সম্ভব না। উনিশে আগস্ট ২০১৯ পত্রিকায় দেখলাম সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন আরও কয়েকজন বিচারপতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করেছেন। যেসব বিচারপতিকে বিচার কার্য থেকে সাময়িক বিরত রেখেছেন ওই তিন বিচারপতি হলেন—বিচারপতি সালমা মাসুদ চৌধুরী, বিচারপতি কাজী রেজাউল হক ও বিচারপতি একেএম জহুরুল হক। সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন, মহামান্য রাষ্ট্রপতি এবং প্রধান বিচারপতির প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন আরও যেসব বিচারপতির বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধেও যেন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। শুধু বিচারপতি নয়, সুপ্রিম কোর্ট এবং হাইকোর্টের কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও অসদাচরণের অভিযোগ আছে। 

আমি ব্যক্তিগতভাবে খোঁজখবর নিয়ে দেখেছি। বারের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, সর্বমোট ১১ জন বিচারপতি রায় প্রদানে অসদাচরণের সঙ্গে জড়িত। এর মাঝে তিনজনকে সরানো হয়েছে। আরও নাকি আট জন এখনো বহাল তবিয়তে আছেন। পুরনো দার্শনিকরা বলেছেন, যেখানে ন্যায়বিচার রাজত্ব করে, সেখানে আজ্ঞা পালনই স্বাধীনতা। এক ইহুদির বিরুদ্ধে হজরত আলীর (রা.) মামলা গৃহীত হয়নি, কারণ তার মামলার একমাত্র চাক্ষুষ সাক্ষী তার ছেলে। পিতার পক্ষে পুত্রের সাক্ষী ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।
সম্রাট আলাউদ্দিন খিলজির রাজত্বের সময় এক সাধারণ ধোপানী কাজীর দরবারে সম্রাটের বিরুদ্ধে নালিশ করেছিলেন। তখন কাজী সম্রাটকে যথাবিহিত সমন প্রদান করেন। সম্রাট কাজীর দরবারে উপস্থিত হয়ে যথাযথভাবে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। বিচার প্রক্রিয়া শেষে সম্রাট আলাউদ্দিন খিলজি কাজীকে তার পোশাকের ভেতর থেকে একটা চাবুক বের করে বলেছিলেন, আপনি যদি আমার সঙ্গে সাধারণ আসামির মতো আচরণ না করে রাজকীয় সম্মান দেখাতেন তাহলে এই চাবুক দিয়ে আপনাকে বেত্রাঘাত করতাম। তখন কাজীও তার আসনে রক্ষিত চাবুক বের করে সম্রাটকে বলেছিলেন আপনিও যদি সাধারণ কয়েদির আচরণ না দেখিয়ে বিচার প্রক্রিয়া চলার সময় রাজ সম্মান প্রত্যাশা করতেন, তবে আমিও এই চাবুক দিয়ে আপনাকে আঘাত করতাম। বিচারাসনে সম্রাট আর একজন ধোপানী সমান। কোনও ব্যবধান নেই। এই হচ্ছে বিচার ব্যবস্থার সার্বভৌমত্ব।
১৯৭৫ সালের দিকে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি ছিলেন সৈয়দ এ বি মাহমুদ হোসেন। একদিন সকালে তার ছেলে মারা যায়। তিনি তার ছেলের মৃতদেহের গোসল দিয়ে কফিনে কাপড় পরিয়ে লাশ রেখে সুপ্রিম কোর্ট ভবনে আসেন। সহকর্মীরা জিজ্ঞেস করলেন, লাশ দাফন না করে চলে আসলেন কেন স্যার! তখন তিনি বলেছিলেন, আমার মা বাড়ি থেকে আসছেন। তিনি এসে পৌঁছালে দাফন সম্পন্ন করা হবে। সিলেট থেকে আমার মা আসতে ৫-৬ ঘণ্টা সময় লাগবে। এর মধ্যে কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ শুনানি আছে, তা সেরে ফেলতে পারবো। না হয় মানুষ কষ্ট পাবে।
সৈয়দ মাহমুদ হোসেনরা ছিলেন আদর্শস্থানীয় বিচারপতি। নিজের আবেগকে সংযত রেখে মৃত পুত্রের কফিন ঘরে রেখে মানুষের কষ্ট লাঘবের জন্য মামলার শুনানি করতে আদালতে এসেছিলেন। এমন বিচারপতিরা বিচারকের আসন অলংকৃত করলে বিচারব্যবস্থায় স্বর্ণযুগ বিরাজ করে।
পাকিস্তান আমলে একবার দেখেছিলাম পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসের মধ্যে যারা দুর্নীতিবাজ, অকর্মণ্য, তাদের পোস্ট রিটায়ারমেন্টে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তাদের সংখ্যা ছিল ৩০৩ জন। তাদের বলা হতো থ্রি নট থ্রি। বিএনপির মন্ত্রী এম কে আনোয়ার এমন একজন থ্রি-নট-থ্রি ছিলেন। অবশ্য পরে জিয়া তাকে পুনরায় চাকরিতে নিয়েছিলেন। ঢাকার ডিসি থাকার সময় তার দুর্নীতির কুখ্যাতি ছিল। এখন তো দুর্নীতি সর্বস্তরে। পাকিস্তানের সময়ে দুর্নীতি আরও সীমিত ছিল। সে সময় বাছাইয়ে যদি ৩০৩ জন দুর্নীতিবাজ সিএসপি অফিসার পাওয়া যায়, এখন তো কয়েক হাজার পাওয়া যাবে।
আমার মনে হয় প্রশাসন থেকে দুর্নীতি তাড়ানোর জন্য তেমন একটি উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। যাচাই-বাছাই করে দুর্নীতিগ্রস্ত অফিসারদের বিতাড়িত করা উচিত। প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করবো বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে ৪৮ বছর হয়েছে। দুর্নীতিবাজ অফিসার বিতাড়নের কোনও উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। যেসব বিচারপতির বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে, তাদের বিতাড়িত করে প্রশাসনেও দুর্নীতিবাজ, অকর্মণ্য অফিসারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নিন। তাতে হয়তো সমাজ জীবনে প্রাণ সঞ্চার হবে। ক’দিন আগে পত্রিকায় ফটো দেখেছি নির্মাণাধীন ব্রিজের গার্ডার ভেঙে পড়ে গেছে। যে গার্ডার নিজের ওজন নিজে সহ্য করতে পারে না, সে গার্ডার ব্রিজ সম্পন্ন হলে যানবাহনের ওজন সহ্য করত কীভাবে! এখানে নিশ্চয়ই অনেক ত্রুটি-বিচ্যুতি ছিল, যা ঠিকাদার এবং অফিসারের যোগসাজশে হয়েছিল। যারা মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে ছেলেখেলা করে, তাদের তো কঠিন শাস্তি হওয়া উচিত।
যাহোক লিখেছিলাম রায় বেচাকেনা নিয়ে। যেসব বিচারপতির বিরুদ্ধে কথা উঠেছে তাদের সম্পর্কে রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রী এবং প্রধান বিচারপতির প্রতি আমাদের সবিনয় অনুরোধ—তাদের অনতিবিলম্বে অপসারণ করে বিচার ব্যবস্থার স্বচ্ছতা আনয়ন করুন। দেশের বিচার ব্যবস্থা ভেঙে পড়লে কিন্তু জাতির বিনাশ অনিবার্য হয়ে উঠবে।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক
bakhtiaruddinchowdhury@gmail.com

/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ