শিক্ষার্থীদের ‘তুমি’-‘আপনি’ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্ঞানচর্চার সংস্কৃতি

Send
মো. সামসুল ইসলাম
প্রকাশিত : ১৬:৫০, অক্টোবর ১৭, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৫২, অক্টোবর ১৭, ২০১৯

মো. সামসুল ইসলামকিছুদিন আগে দেশে-বিদেশে একটি টকশোর কিছু অংশের ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। সেখানে অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ‘আপনি’ সম্বোধন না করে ‘তুমি’ সম্বোধনে আপত্তি জানিয়েছেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখলাম, এর পক্ষে-বিপক্ষে অনেকেই তর্কযুদ্ধে লিপ্ত হয়েছেন। 
বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার সময়ে আমিও শিক্ষার্থীদের তুমি বলে সম্বোধন করেছি, যদিও এখন আমি বুঝতে পারি, এটি আমার ভুল ছিল। তবে আমি এও মনে করি, এই ব্যাপারটিকে তুলে ধরে তিনি আসলে আমাদের দেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষার পরিবেশ আর পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার এক প্যান্ডোরার বাক্স খুলে ধরেছেন। শিক্ষার্থীদের ‘তুমি’ বা ‘আপনি’ সম্বোধন হয়তো খুব গুরত্ববহ কোনও ব্যাপার নয়। কিন্তু শুধু এই বিতর্কে আবদ্ধ না থেকে আমরা আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পড়ালেখার সংস্কৃতির সামগ্রিক  মূল্যায়ন করতে পারি।   
শিক্ষা বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সার্বিক পরিবেশ বোঝাতে school climate ও school culture—এই টার্ম দুটি ব্যবহার করেন। আলাদাভাবে বিস্তারিত আলোচনায় না গিয়ে আমরা সংক্ষেপে বলতে পারি শিক্ষক, শিক্ষাপ্রশাসক, শিক্ষার্থী, অভিভাবকের পারস্পরিক সম্পর্ক, মূল্যবোধ, শিক্ষাদান পদ্ধতি কাজের পরিবেশ হলো school climate। আর school culture হলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ ও সংস্কৃতি নিয়ে আলোচনার অংশ। অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান একটি উদাহরণ দিয়েছেন আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জ্ঞানচর্চার সামগ্রিক সংস্কৃতি নিয়ে। এসব আলোচনার মাধ্যমে আমাদের শিক্ষাঙ্গনে জ্ঞানচর্চার নামে বিভিন্ন অপসংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসার প্রচেষ্টা নিতে পারি।         

আমাদের ছাত্রাবস্থা থেকেই দেখে আসছি, উচ্চশিক্ষার বিভিন্ন ক্ষেত্রের বেহাল অবস্থা। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোয় শিক্ষার্থীদের ছিল না থাকা-খাওয়ার নিশ্চয়তা। শিক্ষকদের পারস্পরিক দলাদলির কারণে শিক্ষার্থীরা থাকতেন আতঙ্কিত। আমরা অনেক শিক্ষকের সঙ্গে করিডোরে সামনাসামনি কথা না বলে গোপনে  দেখা-সাক্ষাৎ করতাম। পাছে কেউ দেখে ফেলেন এবং অন্যপক্ষের সমর্থক ভাবেন। আমার মাস্টার্সের থিসিস সুপারভাইজার যিনি ছিলেন, তার প্রতি পরিপূর্ণ সম্মান রেখেই বলছি, তার গবেষণা, পরিসংখ্যান ইত্যাদি বিষয়ে কোনও দক্ষতা ছিল না। সম্ভবত সিনিয়র হওয়ার কারণে তিনি সুপারভিশনের দায়িত্ব পেয়েছিলেন। সেজন্য আমাকে লুকিয়ে আরেক দক্ষ শিক্ষকের সাহায্য নিয়ে থিসিস সমাপ্ত করতে হয়েছিল।  

পরবর্তী সময়ে নিজে শিক্ষকতা করতে গিয়ে দেখেছি বা শিক্ষক বন্ধুদের কাছে এখনও শুনি ক্যাম্পাসগুলোতে এসব পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হয়নি। কার সঙ্গে কে ঘনিষ্ঠ, কে কোন লবি মেনে চলছেন, তা রেজাল্ট থেকে শিক্ষক নিয়োগ পর্যন্ত নাকি  উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। সব শিক্ষক নিঃসন্দেহে একই রকম নন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেক ক্ষেত্রেই এই হচ্ছে আমাদের জ্ঞানচর্চার এক অন্যতম সংস্কৃতি। 

বুয়েটে আবরার হত্যাকাণ্ডের পর শিক্ষাঙ্গনে রাজনীতি থাকবে কিনা, তা নিয়ে  বিতর্কে হারিয়ে যাচ্ছে শিক্ষাঙ্গনে রাজনীতি আসলে জ্ঞানচর্চার পরিবেশকে কতটুকু প্রভাবিত করছে এই আলোচনা। একপক্ষ জোর দিচ্ছে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার ওপর, অন্যপক্ষ শিক্ষাঙ্গনে রাজনীতিকে দেখছেন দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক নেতৃত্ব সৃষ্টির প্রয়োজনীয়তা হিসেবে।  আবরার হত্যাকাণ্ড-পরবর্তী আলোচনায় রাজনীতির কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জ্ঞানচর্চার পরিবেশ যে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তা মোটামুটি অনুচ্চারিতই দেখছি। 

আমি আগেও এখানে বা অন্যত্র বিভিন্ন লেখায় বলেছি, পৃথিবীব্যাপী উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এক বৈশ্বিক শিক্ষাপদ্ধতি বা সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে যা আমাদের এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। অনেক বছর আগে আমি এবারের বিশ্বব্যাপী র‍্যাংকিংয়ের শীর্ষস্থান অধিকারী অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগের একটি সেন্টারে ভিজিটিং ফেলো হিসেবে মাসতিনেক ছিলাম। এর আগে যুক্তরাজ্যেই মাস্টার্স করেছি। আমি যখন তাদের অ্যাকাডেমিক কালচারের সঙ্গে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের কালচারের তুলনা করি, তখন পরিষ্কার বুঝতে পারি, আমরা শিক্ষাক্ষেত্রে পারস্পরিক সম্মান, বিশ্বাস, আস্থা, আদর্শিক শিক্ষাদান পদ্ধতিতে এখনও তাদের থেকে যোজন যোজন দূরে। 

শিক্ষকদের একটা জিনিস ভালো লাগতো, তাহলো গবেষণায় নিমগ্ন তাদের অনাড়ম্বর জীবনযাপন। ক্যাফেটারিয়ায় সবাই লাইন দিয়ে খাবার নিচ্ছেন। সেখানে অনেক বিশিষ্ট অধ্যাপককেও আমার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে জায়গা ছাড়তে গিয়ে অপমানিত হয়েছি। তারা এ ধরনের সম্মান পছন্দ করেন না। পাইক, পেয়াদা, বরকন্দাজ নিয়ে ভিসি, প্রোভিসি,  ডিন, ছাত্রনেতারা বিশ্ববিদ্যালয় দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন, এ রকম কোনও ব্যাপার কোনও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে  চোখে পড়েনি। কে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি বা প্রোভিসি– সাধারণ মানুষজন এসব খবরও রাখে না। জাতীয় পর্যায়ে শিক্ষকদের কেউ চিনেও না আর তারা নিজেরাও এত খ্যাতির প্রত্যাশীও নন। আর আমাদের দেশে তো শিক্ষা মানে তো এক এলাহি কাণ্ড!          

আমার কাছে আরেকটি ব্যাপার ইদানীং বিস্ময়কর ঠেকে। তা হলো—উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে দেশে বেসরকারি আর সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ধীরে ধীরে দুই ধরনের সংস্কৃতির উদ্ভব ঘটছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর  কিন্তু সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের হাতেই শুরু হয়েছিল। এখনও বেশিরভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ পর্যায়ে শিক্ষকরাই রয়েছেন। 

মজার ব্যাপার হলো, অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি, এই শিক্ষকরা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকার সময়ে উচ্চশিক্ষার সাম্প্রতিক যেসব নিয়মের বিরোধিতা করেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে তারা সেসব নিয়ম চালু করেন। এর মধ্যে রয়েছে শিক্ষকদের জবাবদিহিতা, তাদের অফিস টাইম, শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন বা স্টুডেন্ট ইভালুয়েশন, প্রতিটি শিক্ষকের ন্যূনতম কোর্স লোড, বাৎসরিক গবেষণার বিবরণী, স্টুডেন্ট কাউন্সেলিং, ক্যারিয়ার ফেয়ার ইত্যাদি। কারও বিপক্ষে শিক্ষার্থীদের নির্যাতন বা যৌন নির্যাতন বা গবেষণা চৌর্যবৃত্তির অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে তার চাকরি টিকে থাকার তো কোনও প্রশ্নই আসে না।  

সুতরাং সাম্প্রতিক আদর্শ শিক্ষাপদ্ধতি ও শিক্ষার সংস্কৃতি সম্পর্কে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা যে অবহিত নন, তা নয়। কিন্তু রাজনীতির ঊর্ধ্বে থেকে এই একই ব্যাপারগুলো তারা যদি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে চালু করতেন, তবে আমি নিশ্চিত সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞানচর্চার সংস্কৃতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হতো। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের চেয়ে অনেক মেধাবি হলেও গবেষণায় দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন কারণে তারা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের চেয়ে চাকরি-বাকরিসহ সবক্ষেত্রেই পিছিয়ে পড়ছেন। এ প্রবণতা চলতে থাকলে দেশে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও ডিজিটাল ডিভাইডের মতো এডুকেশনাল ডিভাইড দেখা দেবে, যা অবশ্যই আমাদের কাম্য নয়। 

গত ১১ অক্টোবরের পত্রিকায় দেশের শিক্ষা ও চাকরি নিয়ে বিশ্বব্যাংকের অতি সাম্প্রতিক একটি রিপোর্ট পড়লাম। রিপোর্টে দেশের সব ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গ্র্যাজুয়েটদের প্রতি তিনজনের মধ্যে একজন বেকার তা উল্লেখ করা হয়েছে। তারা গ্র্যাজুয়েশনের এক থেকে দুই বছরের মধ্যেও চাকরি জোগাড় করতে পারছেন না। এটা হয়তো নতুন কোনও তথ্য নয়। কিন্তু যেটা আশ্চর্যজনক, তা হলো  ৬৯ ভাগ চাকরিদাতাই দেশে দক্ষ পেশাজীবীর স্বল্পতার কথা উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ চাকরি আছে, দক্ষ লোক নেই। 

আরও মজার ব্যাপার হলো—তারা আমাদের গ্র্যাজুয়েটদের যে তিনটি দক্ষতার অভাবের কথা বলছেন, সেগুলো হচ্ছে–সমস্যা সমাধান ও স্বাধীন চিন্তার যোগ্যতা, কাজের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি ও ইতিবাচক ব্যক্তিত্ব। বলাবাহুল্য তারা  কিন্তু আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে আইনস্টাইন চাইছেন না। আর শিক্ষার্থীদের ইতিবাচক চিন্তা, ব্যক্তিত্বের বিকাশ আর কাজের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি নিশ্চিত করতে পারে শুধু ক্যাম্পাসগুলোতে সত্যিকারের জ্ঞানচর্চার পরিবেশ আর সংস্কৃতি।                  

লেখক: কলামিস্ট

ইমেইল: shamsulbkk@gmail.com

 

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ