নাঈমুল আবরারের মৃত্যুর দায় কার?

Send
অঞ্জন রায়
প্রকাশিত : ১৮:৫০, নভেম্বর ০২, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:৪৬, নভেম্বর ০২, ২০১৯

অঞ্জন রায়‘কি আনন্দ’ দেখতে গিয়ে নাঈমুল আবরার বিদ্যুতায়িত হয়ে শেষপর্যন্ত মারা গেলো। অনুষ্ঠান চলা অবস্থায় বিদ্যুতায়িত হওয়ার ঘটনা ঘটলো। মাঠে থাকা হাজারো শিশুকে মাইকে একবারও সতর্ক করা হলো না। শেষ হলো আয়োজন। সবাই ফিরতে থাকলো নিজ-নিজ গন্তব্যে। এরপর জানা গেলো—সেই মাঠে, যেখানে তাহসান, অর্ণবদের গানের তালে-তালে হাজারো শিশু গলা মিলিয়েছে, সেখানেই একটি শিশুমৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।  সেই ঘটনা কার্পেটের নিচে চাপা দিয়ে অনুষ্ঠান শেষ করেছে আয়োজক প্রতিষ্ঠান দেশের প্রভাবশালী দৈনিকের কিশোর কাগজটি। অবশ্য তাদের দাবি, মৃত্যুর খবর তারা জেনেছেন অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর। 
মেনে নিলাম, সেই জানার সত্যতা। এরপরও একজন বাবা ও নাগরিক হিসেবে প্রশ্ন, তখনপর্যন্ত মারা না গেলেও বিদ্যুতায়িত হয়েছে একজন পড়ুয়া, সেটা তারা জানতে পেরেছিলেন এটা তো সত্য। তাহলে মাঠে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় ত্রুটির কথা কেন অন্য বাচ্চাদের জানানো হলো না? তাহলে কি একজন শিশুর মৃত্যুর বা আহতের ঘটনার চেয়ে  তাদের ইভেন্ট নির্বিঘ্নে শেষ করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ প্রথম আলোর কাছে?
আলোচিত কাগজটির সম্পাদক সমাজের বিভিন্ন বিষয়ে অসাধারণ সব মন্তব্য কলাম লেখেন। সেখানে রাজনীতিক, আমলা, ব্যবসায়ী—সবার বিরুদ্ধে তার কলম সচল। নাইমুল আবরার যে অবহেলাজনিত কারণে মারা গেলো, সেই প্রসঙ্গে কি কিছু লিখবেন সেই সম্পাদক? পত্রিকাটির একাধিক সহ-সম্পাদক, যারা যেকোনও ইস্যুতে আগুন ঝরানো লেখা লেখেন, তারা কি এবার কলম বা কি বোর্ডে হাত রাখবেন না? নাকি পাকস্থলীর কাছে তাদের বিবেকবোধ বন্ধক দিয়ে রেখেছেন?

সেই মেরুদণ্ড আছে তাদের এখনও, সেটা মানে হচ্ছে না। যেমন গা বাঁচানো সংস্কৃতিতে অনেকেই এই বিষয়ে নীরব, তেমন তাদেরও এই নীরবতা। হয়তো শ্রেণির গন্ধ তাদের পরস্পরের কাছে টানার মূল কারণ, অথবা ক্ষমতাধর এই কাগজটির পরিধি বা শক্তিকে তারা ভয় পান। ভয় পান বলেই এক আবরারের মৃত্যুতে সরব হয়ে আরেক আবরারের মৃত্যুতে উটপাখির মতো বালিতে মুখ গুঁজে অন্ধ সাজেন।

আমরা সভা-সমিতি-সেমিনারে মানবিক সমাজের কথা বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলি। সমাজের দূরপ্রান্তের যেকোনও ঘটনায় ফেসবুকে ঝড় তুলি। সরকার বা রাজনীতির কোনও বিষয়ে একটু কিছু ঘটলে হয়ে যাই বিপ্লবী। অথচ যেখানে মিডিয়ার দাপট দেখানোর ভয় আছে,  সেখানে হই ফুলপাখি লতাপাতার ফেসবুকার। কারণ এসব নিয়ে লিখলে ‘যদি’ নিজের কোনও ঘটনায়ও তারা নিউজ হয়ে যান, সেই আতঙ্কে মননের যে মেরুদণ্ডহীনতা,  তা প্রকাশিত হয়ে যায় নিজের অজান্তেই নিজের ওয়ালে।

সাংবাদিকতা পেশা নিয়ে সাধারণ মানুষের যে শ্রদ্ধা এক দশক আগেও ছিল, রাষ্ট্রের যে গুরুত্ব ছিল, সেখানে এখন ভাটির টান। কতিপয় সাংবাদিকদের কারণে ক্যাসিনো থেকে চাঁদাবাজি—সবখানেই শোনা যায় সাংবাদিকরাও সুবিধাভোগী। এই সুযোগে যারা এসবে নেই, তাদের নামও জুড়িয়ে দেয় নামসর্বস্ব অনলাইনে। কাউকে ঘায়েল করার এটাও একটা খেলা।

কয়েকদিন আগে সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, একজন সম্পাদক কোনও একজন ব্যাংক কর্মকর্তার কাছে টাকা দাবি করেছেন। এমন যখন পরিস্থিতি, তখন একজন সংবাদকর্মী হিসেবে নিজেকেও ঊনমানুষ মনে হয়। মনে হয় কতিপয়ের কারণে সাধারণের তোলা আঙুল কি আমার বা আমাদের দিকে নয়? তেমন সময়েই যখন একটি বড় কাগজের সহযোগী কাগজের আয়োজনে অবহেলাজনিত মৃত্যুর মতো ঘটনা আলোচনায়, তখন দায়টা শুধু রাষ্ট্রর নয়। আমাদেরও। 

কারণ আজ মিডিয়া যদি এই মৃত্যুর ঘটনা কার্পেটের নিচে রেখে ইস্যুটি চাপা দেয়, তাহলে প্রথম আলো বা তাদের সহযোগী কাগজ কিশোর আলো হয়তো বাঁচবে, কিন্তু পেশার প্রতি যে দায়বদ্ধতার কথা আমরা বলি, সেই দায়বদ্ধতার মৃত্যু ঘটবে। ঘটছেও। যে কারণেই অধিকাংশ মিডিয়ার শিরোনাম নিহত কিশোরটি নেই, নেই তেমন কোনও অনুসন্ধানী প্রতিবেদন। নেই সর্বশেষ বা অন্য কিছু।

অনেকেই প্রশ্ন করতে পারেন, অধিকাংশের যখন শীতঘুম, তখন আমি কেন লিখছি? প্রশ্ন করবেন, প্রথম আলোর মতো কাগজ, যা নিজেই একটি প্রতিষ্ঠান। তার বিরুদ্ধে লেখার মধ্যে আমার কোনও ইচ্ছাকৃত উসকানি দেওয়ার প্রবণতা কাজ করছে কিনা? এর উত্তর দিয়েই লেখাটা শেষ করতে চাই।

গতকাল রাতভর আমি আমার সন্তানের চোখে জল দেখেছি। দেখেছি তার সমবয়সী একজনের অবহেলাজনিত খুনের কারণে সংবাদমাধ্যমের প্রতি ক্রোধ আর ঘৃণা। একজন পিতা বা মানুষ হিসেবে আমি নিজের বিবেককে বাক্সবন্দি রেখে ঝাঁকের কই হয়ে নীরবতার পক্ষে অবস্থান নিতে পারবো না। সেই ‘কাক কাকের মাংস খায় না’ তত্ত্বে আমার বিশ্বাস নেই। আমি হৃদয়সর্বস্ব মানুষ—পরিচালিত হই আবেগ দিয়েই। আমার আবেগ আর সন্তানের চোখের জলের চেয়ে বড় কোনও প্রতিষ্ঠান প্রথম আলো, কিশোর আলো বা অন্য কিছুই নয়।

একটি অবহেলাজনিত হত্যা যদি বিচারের আওতায় না আসে, তাহলে সুশাসন শব্দটি পরাজিত হয়। পরাজিত হয় মানবিকতা। সে কারণেই আমি তাকিয়ে আছি রাষ্ট্রের দিকে। আমি বিশ্বাস করতে চাই, আমার রাষ্ট্রটি মানবিক। সেখানে আবরারের অবহেলাজনিত মৃত্যুর বিষয়টি রাষ্ট্র আমলে নেবে। আমি তাকিয়ে আছি সময়ের দিকে। এখন যা চলমান সময়, যেটাই তো একদিন ইতিহাস হবে। আমরা কি ইতিহাসে মূল্যায়িত হবো পড়ুয়া আবরারের অবহেলাজনিত হত্যার বিচারের নজির স্থাপন করে, নাকি এই কিশোরের লাশটি কোনও একজন ইতিহাসবিদ একদিন টেনে বের করবেন ইতিহাসের কার্পেটের নিচে থেকে? 

কোনও কোনও ঘটনা থাকে, যেখানে নীরবতা এক ধরনের সমর্থন বা নিজের সাহসহীনতার প্রমাণ হিসাবে হাজির হয়। এই মৃত্যুটিও আমার কাছে তেমনই মনে হয়েছে। যে কারণে নীরবতা নয়, সরব প্রতিবাদটুকু নিজের বিবেকের কাছে এক টুকরো হলেও সান্ত্বনা। কতদিন বাঁচবো জানি না। এটুকু জানি, কেউ যদি প্রশ্ন করেন কখনো, এই অবহেলাজনিত মৃত্যুর পর আপনি কী করেছিলেন? আমি এটুকু তো বলতে পারবো,  আমার দৌড় কলম বা কি বোর্ড পর্যন্ত। সেখানে আমি আমার লড়াই জারি রেখেছিলাম।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী

ইমেইল:  anjanroy.dhaka@gmail.com 

 

/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ