behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

খেলায় খেলায় শেখা

ফারহানা মান্নান১২:৩৯, ডিসেম্বর ০৩, ২০১৫

Farhana Mannanএকজন শিশু তার জন্মের পর থেকেই আশপাশের পরিবেশ থেকে শিখতে পারে। এক্ষেত্রে বাবা এবং মায়ের অবদান বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একজন শিশুকে শিক্ষা দেওয়ার অর্থই হচ্ছে তাকে তার সমকালীন সমাজে বসবাসের জন্য উপযুক্ত করে তোলা। যথাযথ এই শিক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্র হিসেবে স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কেমন হয় যদি বিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিকতার আগেই শিক্ষার শুরুটা করা যায়? আনুষ্ঠানিকভাবে বিদ্যালয়ে ভর্তির আগেই যদি ছেলেমেয়েদের পড়ার প্রস্তুতি হিসেবে শেখানোর শুরু করা যায় তাহলে তাদেরকে আনুষ্ঠানিক শিক্ষার জন্য প্রস্তুত করা সম্ভব। আমাদের দেশে অনেক স্কুলেই প্রাকপ্রাথমিক পর্যায়ে পড়ালেখার কাঠামোবদ্ধ সিলেবাস আছে। আছে আর্লি চাইল্ডহুড নিয়ে কাজ করার মতো প্রতিষ্ঠান। কিন্তু প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ে বা ০ থেকে ৮ বছর বয়সের শিশুদের জন্য কেবলমাত্র খেলাকেই শিক্ষণ-শিখনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে কোনও প্রতিষ্ঠান বা সেন্টারের ধারণা এখনও আমাদের দেশে তেমন জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি।

ডেভিড এলকিন্ড তার একটি কথায় বলেছিলেন; খেলা, ভালবাসা ও কাজের মতোই প্রয়োজনীয়। তিনি ছোট শিশুদের জন্য খেলায় খেলায় শেখার মূল্যবোধকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছেন। তবে একটা ব্যাপার কিন্তু বুঝতে হবে যে খেলায় খেলায় শেখার আলাদা বৈশিষ্ট্য আছে। আর এক্সপ্লোরেশন আর খেলার মধ্যেও একটা পার্থক্য আছে। আর এক শিশুর সাথে আরেক শিশুরও খেলার ধরনের একটা প্রকৃতিগত পার্থক্য আছে। আবার সংস্কৃতি, আশপাশের পরিবেশভেদেও পার্থক্য দেখা যায়। কাজেই গড়পড়তা হিসেবে কেবল খেলতে দিলেই হলো না, আনুষাঙ্গিক অন্যান্য দিকগুলো নিয়েও ভাবা চাই।

আমরা যখন আমাদের ছেলেমেয়েদের নিয়ে পার্কে যাই তখন দেখবেন যে রাইডগুলো তাদের ভীষণ পছন্দের সেগুলোতে তারা বার বার চড়তে চায়। এক্ষেত্রে শিশুদের আগ্রহ তৈরিতে রাইড এবং অভিভাবক উভয়ের ভূমিকাই থাকে। অভিভাবকই দেখবেন মূল প্রেরণা দিয়ে থাকে। এখন যদি আমরা শেখার কথা বলে থাকি তাহলে বইয়ের ভাষায় বলতে হয়, শারীরিক বিকাশ হয়, আবেগিক ও সামাজিক বিকাশের দিকগুলোও পূর্ণতা লাভ করে। একইসাথে একটা খেলা শুরু থেকে শেষ করতে যে পরিপূর্ণ পরিকল্পনা কাজ করে- এর মধ্যে দিয়েই বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ লাভ করে। আসলে খেলাটা হলো প্রেরণা। এটা আসে ভেতর থেকেই। তবে খেলাতে বাচ্চাদের একটা স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ থাকা চাই। শিশুরা যখন সামাজিক কোনও চরিত্রে অভিনয় করে তখন কিন্তু সে একটা সিম্বোলিক আকারে খেলে, আর সেটা হয় নিয়ম মেনে। আর তাই খেলাটা ফোকাস করে খেলার প্রতিই। তবে আর যাই হোক আনন্দের সাথে না খেললে খেলায় মূল আনন্দ কিন্তু পাওয়া যায় না।

পিঁয়াজের প্লে স্কেল অনুযায়ী প্রাথমিক ধাপে জন্ম থেকে দুই বছর বয়স পর্যন্ত পর্যায়ে খেলাগুলো হয় প্র্যাকটিস প্লে এর মাধ্যমে। তবে বিশেষ করে দুই বছরের বাচ্চারা একই খেলা বার বার খেলার মাধ্যমে আনন্দ লাভ করে। এটাকে ওর ভাষায় রিপিটিটিভ প্লে বলে। পরবর্তী ধাপে দুই থেকে সাত বছরের বাচ্চাদের মধ্যে সিম্বোলিক ধরনের খেলার প্রবণতা থাকে। এটা ওরা একা বা দল নিয়েও খেলতে পারে। আর ৭ থেকে ১১ কি ১২ বছরের বাচ্চাদের মধ্যে নিয়ম অনুসরণ করে খেলার প্রবণতাই বেশি থাকে। কাজেই বাচ্চারা খেলতে পছন্দ করে আমরা জানি কিন্তু বয়স অনুযায়ী খেলার ধরণে যে একটা পার্থক্য আছে সেটা কিছুটা বুঝলেও সঠিক বয়সে সঠিক খেলাটা নির্বাচন অনেক ক্ষেত্রেই প্রশ্নের মুখোমুখি হয়। কারণ জীবিকার কারণে যে সকল বাবা-মায়েরা সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ছোটেন তাদের পক্ষে তাদের শিশুদের খেলাগুলোকে বয়স অনুযায়ী চিন্তা করে খেলানোটা বেশ মুশকিল হয়ে দাঁড়ায়। এক্ষেত্রে তাদের জন্য শিশুদের একটা কম্পিউটার কিনে দিয়ে গেমস খেলানোটাই বেশ সহজ বলে মনে হয়। বলছি না কম্পিউটারে খেলায় কোনও বিকাশ হয় না। হয়। বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশটাই বেশি হয়। কিন্তু বিকাশের আরও অনেক দিকতো আছে। তাই না? আমাদের সামাজিক, আবেগিক আর শারীরিকভাবে বিকাশের দিক নিয়েওতো ভাবতে হবে। তবে খেলার মধ্য দিয়ে শিশুর বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে আরও কিছু প্রতিবন্ধকতা কাজ করে। এর মধ্যে আছে দারিদ্র্য, আছে হিংস্রতা, আছে সামাজিক মূল্যবোধগুলো বদলে যাবার বিষয়, আছে স্বল্প পরিসরের অসুবিধা, আছে সবসময় অনুষ্ঠানিকভাবে শিক্ষা গ্রহণের বাড়াবাড়ি। আরও আরও কারণ আছে। কিন্তু শত কারণ থাকলেও শিশুদের তাদের শৈশবের বেড়ে ওঠাটা খেলার মধ্য দিয়েই হওয়া চাই। সেটা আমরা তাদের বাড়িতে খেলতে দেই বা প্লে সেন্টারেই দেই!

জন লক কিন্তু মনে করেন কোনও শিশুই ব্ল্যাংক স্লেট নয়। এদের আপনি দেখবেন ভাষাগত দিকটা না বুঝলেও সিম্বলিক আকারে নিজেদের চাওয়াটা বোঝায়। আমরা মনে করি তারা বোঝে না। কিন্তু তারা আসলে বোঝে ঠিকই কিন্তু প্রকাশ করতে পারে না। কাজেই শিশুদের বিকাশ যদি খেলার মধ্য দিয়ে হয়, সুন্দর সামাজিক পরিবেশের মধ্য দিয়ে করা যায় তাহলে কিন্তু শিশুর বিকাশ একটা পরিপূর্ণতা লাভ করে। কাজেই খেলার মধ্য দিয়ে শিশুর বিকাশের একটা গুরুত্ব আছে। খেলাগুলো আমরা এমনভাবে নির্বাচন করতে পারি যাতে শারীরিক বিকাশের দিকটা গুরুত্ব পায় আবার গল্পে গল্পে করতে পারি বা গানের মধ্য দিয়ে করতে পারি যাতে ভাষাগত দিকটা সম্পূর্ণতা পায়, আবার ছবি আঁকা বা ব্লক খেলার মাধ্যমেও করতে পারি যাতে সিম্বোলিক ধারণাগুলো স্পষ্ট হয় বা নাট্যাভিনয় বা ভূমিকাভিনয় এর মাধ্যমেও করতে পারি, যাতে করে সামাজিক পরিবেশ ও মানুষ সম্পর্কে শিশুর ধারণা বিকাশ লাভ করে। আবার পানি, বালি বা প্লে ডো নিয়েও খেলতে দেওয়া যেতে পারে। এই খেলাগুলো শিশুদের সেন্সরিমোটোরের দিকটা বিকাশে বড় রকমের ভূমিকা রাখে। কাজেই শৈশবে খেলার কোনও বিকল্প নেই।

এখন সুখবর এই যে আমাদের দেশে প্রায় দুই শতাধিকের মতো প্রতিষ্ঠান আছে যারা আর্লি চাইল্ডহুড ডেভেলপমেন্ট নিয়ে কাজ করেন। তাদের বেশিরভাগই বাংলাদেশ ইসিডি নেটওয়ার্কের (ECD) অন্তর্ভুক্ত। এ সংগঠনের যাত্রা শুরু ২০০২ সালে। সরকারি ও বেসরকারি উভয় ধরনের সংস্থাই এই সংগঠনের অন্তর্ভুক্ত। যদিও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানও আছে এর মধ্যে। তবে এগুলো সংস্থা ইসিডি (আর্লি চাইল্ডহুড ডেভেলপমেন্ট) নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে এটা সত্যি বিস্ময়ের ব্যাপার বটে! এরমধ্যে বিশেষ করে ব্র্যাক, ফুলকি, প্ল্যান বাংলাদেশ, সেভ দ্য চিলড্রেন, বাংলাদেশ শিশু একাডেমি, আহছানিয়া মিশনসহ আরও বেশ অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান আছে যারা ইসিডি নিয়ে কাজ করে।

২০১৩ সালে প্রকাশিত এডুকেশন ওয়াচ-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২০০৮ সালের আগ পর্যন্ত প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাটা সরকারি ও বেসরকারি উভয় সেক্টরেই বেশ সীমিত ছিল। তবে বর্তমানে প্রাক-প্রাথমিকে ছেলেমেয়েদের উপস্থিতির সংখ্যা বেড়েছে। তারপরেও একটা উল্লেখযোগ্য হারের ছেলেমেয়ে প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ের আওতাভুক্ত নয়। আর এদের সংখ্যাটা প্রাক-প্রাথমিকে পড়বার উপযুক্ত ছেলেমেয়েদের প্রায় ৪০%। The Multiple Indicators Cluster Survey (MICS) এর ২০০৯-এর রিপোর্ট অনুযায়ী ৩-৫ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে শতকরা ২৪% এরও নিচে ছেলেমেয়েরা যে কোন ধরনের প্রাক-প্রাথমিক প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা গ্রহণ করছে। তবে বাংলাদেশ সরকার ৫ থেকে ৬ বছরের শিশুদের জন্য এক বছরের প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার অনুমোদন দিয়েছে। ২০১১ সালের চাইল্ড পলিসি অনুযায়ী বাংলাদেশের ৩ থেকে ৫ বছরের সকল শিশুর জন্য প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করনের একটা দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা আছে। ইসিসিডি (ECCD = Early Childhood Care and Development) ২০১৩ অনুযায়ী বাংলাদেশের ০ থেকে ৮ বছর বয়স পর্যন্ত সকল শিশুদের জন্য একটা হোলিস্টিক অ্যাপ্রোচ নির্ধারণ করা হয়েছে। কারণ এখনও পর্যন্ত আমাদের দেশের ইসিডি প্রোগ্রামগুলো হোলিস্টিক হয়ে উঠতে পারেনি। বিশেষ করে এখানে স্বাস্থ্যগত দিকের প্রতিই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

তবে বহু প্রতিষ্ঠান আছে। কাজও করছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে প্লে সেন্টারগুলোতেও একটা কাঠামোবদ্ধ সিলেবাস দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। সিলেবাস অনুসরণ করা ভালো কিন্তু প্রাক শৈশবে অনুষ্ঠানিকভাবে সিলেবাস অনুসরণ করে পড়ানোটা কোনও কাজের কথা নয়। কারণ প্লে সেন্টার মানেই হল খেলায় খেলায় শেখা। আর খেলায় খেলায় বেশ একটা কাঠামো অনুসরণ করেই শেখা যায়। আমাদের পদ্ধতিটা অনুসরণ করতে হবে মাত্র। কাজেই যারা ইতিমধ্যেই শিশুদের শৈশবকে আনন্দদায়ক করে গড়ে তুলতে কাজ করে যাচ্ছেন তাদের সাধুবাদ জানাই। মনে রাখা চাই আমরা একটি শিশুর ভবিষ্যত যদি আনন্দ দিয়ে খেলায় খেলায় গড়তে পারি একটা সুন্দর পরিবেশ তাকে দিতে পারি তবে প্রতিটা শিশুই একটা সুন্দর সুখময় শৈশব নিয়ে বড় হবে, বেড়ে উঠবে। আর একটু তলিয়ে দেখলে দেখব যে আনন্দ দিয়ে খেলায় খেলায় শেখাটা শিশুদের ভবিষ্যতের শিক্ষাগত জীবনটাতে সহজ করে গড়ে তোলে। প্রাথমিক পর্যায়ে তাদের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে একটা বড় রকমের আগ্রহ চোখে পড়ে আর ঝরে পড়ার হারের ক্ষেত্রেও একটা পরিবর্তন আমরা দেখতে পাই। তাই শৈশবে খেলার কোনও বিকল্প নেই। আর প্রকৃত অর্থেই প্রতিটি শিশুর প্রথম খেলার সাথী তাদের মা এবং বাবা। সবার আগে তাই তাদেরই দিনের কিছু অংশ তাদের সন্তানদের নিয়ে কাটানো চাই। কারণ একজন বিকশিত সন্তান আমাদের সকলের কাম্য। 

লেখক: শিক্ষা বিষয়ক গবেষক

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune

কলামিস্ট

টপ