behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

মোসাহেবি সংস্কৃতির অনুশীলন

তুষার আবদুল্লাহ১৩:০৬, জানুয়ারি ১৬, ২০১৬

Tushar Abdullahহতবাক আমি। লজ্জিতও। আমাকে হতবাক করেছেন সংস্কৃতির যারা ধারক বলে দাবি করেন তারা। বিনীতভাবে যারা নিজেদের সংস্কৃতির কর্মী বলে দাবি করেন, তাদের নির্লিপ্ততা আমাকে লজ্জিত করেছে। ক্ষুব্ধ হয়েছি সংস্কৃতির প্রতিকৃতির ওপর হামলায়। বাংলাদেশ নামের জনপদের সকল সুন্দরই আমার জন্য গৌরবের। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রতি আবার এক প্রস্থ বেশি দুর্বলতা আছে। কারণ আমার পৈত্রিক ও মাতৃক ভিটা ব্রাহ্মণবাড়িয়া। বাংলার সকল নদীর জল আমার কাছে মাতৃদুগ্ধসম। তিতাসের জল যেন শিরায় বয়ে চলা রক্তধারা।
খুব যে নিয়মিত ব্রাহ্মণবাড়িয়া যাওয়া হয় এমন নয়। তবে বছরে অন্তত একবার জেলা শহর, তার উপজেলা নবীনগরে যাওয়া হয়। এটাকে নিয়মিত বলা যায় কিনা জানি না। শেষ যাওয়া হয়েছিল  ঈদ-উল-আযহার দিন কয়েক আগে। গোধুলী লগ্নে ভেসে বেড়িয়েছি তিতাসের বুকে। চা পান করেছি অদ্বৈতমল্ল বর্মণের মালো পাড়ায়। সেই রাতে আকাশে ছিল জ্যোৎস্না। তিতাস পাড় থেকে শহর হয়ে ঢাকা ফেরার পথে সাংবাদিক বন্ধুরা নিয়ে গেলেন আলাউদ্দিন খাঁ সংগীতাঙ্গনে। রাত তখন আটটা। গিয়ে দেখি সরোদ বাদনে সুরে মোহিত চারদিক। প্রবীণ, তরুণ, কিশোর, শিশু সবাই মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনছেন সরোদ বাদন। আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম। উচ্চাঙ্গ সংগীতের এই শ্রোতারা নিখাদ। তারা সমাজের উচ্চাঙ্গে পৌঁছতে সেখানে উপস্থিত হননি। প্রকৃত অর্থেই তারা উচ্চাঙ্গ মনের ও চিন্তার মানুষ।
অহংবোধের জ্যোৎস্না নেমেছিল সেদিন আমার মনেও। তাই ব্রাহ্মণবাড়িয়া বসেই, চটজলদি ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম- উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের এমন দর্শক ব্রাহ্মণবাড়িয়াতেই সম্ভব। ঢাকায় ফিরেও আমি জনে-জনে সেই অহংকারের কথা, সেই সুন্দর দর্শকের কথা বলে গেছি। ব্রাহ্মণবাড়িয়া যে সংস্কৃতির রাজধানীর গুণমান এখনও ধরে রেখেছে, তা জানান দেওয়াই ছিল আমার উদ্দেশ্য।
মঙ্গলবার আমার সংস্কৃতির সেই রাজধানীর পথে অসুর নেমেছিল। তারাই সুর সম্রাট আলাউদ্দিন খাঁ সঙ্গীতাঙ্গনে হামলা করেছে। পুড়িয়েছে  সুর সম্রাটের স্মৃতিচিহ্ন। অসুরদের হামলা থেকে রক্ষা পায়নি ভাষা আন্দোলনের সৈনিক ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্মৃতি পাঠাগার। ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে ধর্মীয় উগ্রপন্থীরা আস্তানা গড়ছে, এমন খবর ছিল। একাধিকবার তাদের আস্ফালনও দেখেছি। কিন্তু এর আগে কখনও সংস্কৃতির সুরের ওপর চড়াও হয়নি অসুরেরা।
এবার হলো। তারা টার্গেট করেই মাঠে নেমেছিল। যে ছুঁতো ধরে তারা লাঠি-তলোয়ার নিয়ে মাঠে নেমে আসে, তাতে সংস্কৃতির স্থাপনাগুলো তাদের লক্ষ্য হওয়ার কথা ছিল না। কিন্তু হয়েছে। অসুরেরা সকল সুন্দর সুর কেটে দিতে চায়। তারা চায় বাঙালি সংস্কৃতিকে মুছে দিতে। অসাম্প্রদায়িকতার গৌরবকে সাম্প্রদায়িকতার কলঙ্ক দিয়ে ঢেকে দিতে।

মঙ্গলবার অসুরদের সেই তাণ্ডবের পর ভেবেছিলাম সংস্কৃতির চিন্তক শ্রেণি, কর্মীরা সোচ্চার হবেন।

ভাবনা বুঝি একটু ভুলই ছিল আমার।

কারণ ঠোঁটে তাদের যতোই অসাম্প্রদায়িকতার তোপধ্বনি হোক, তারা আসলে ধর্মের রাজনীতির সঙ্গে আপোষ করেই চলতে চান ক্ষমতানীতি যারা করেন। তারা যেমন মৌন থাকেন ভোটের লোভে, তেমনি ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার দৌড়ে এগিয়ে থাকতে সংস্কৃতির স্বঘোষিত সেবকরাও চোখ-কানে তুলো এঁটে আছেন। তাদের সংস্কৃতির ‘যোগ ব্যায়াম’ যে শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক এবং নিজ নিজ রাজনৈতিক দল ও নেতাদের তুষ্ট করার বৃত্তবন্দি, আরেকবার তার প্রমাণ মিললো। ডান-বাম দুই পক্ষের সংস্কৃতি কর্মীরাই ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সঙ্গীতাঙ্গনে হামলার পর থেকে মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছে। অথচ রাজনৈতিক স্বার্থ বা তাদের ব্যবস্থাপত্রে এই সংস্কৃতি কর্মীদেরই আমরা গর্জে উঠতে দেখি। মোসাহেব এই সংস্কৃতি কর্মীরা আসলে অসুরদের কাছেই আত্মসমর্পন করে আছে। তাদের দ্বারা বাঙালি সংস্কৃতির কেবল বাণিজ্যিক প্রদর্শনই হবে, সংস্কৃতির সুরক্ষা হবে না। এই মোসাহেব সংস্কৃতিপ্রেমীদের একথাও জানিয়ে রাখতে চাই—আলাউদ্দিন খাঁ, ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে যারা আঘাত করেছে, তাদের স্ফুলিঙ্গে আপনারও ভস্ম হবেন, ক্ষমতা বা রাজনীতির ঢাল দিয়ে রক্ষা পাবেন না।

পোশাকি সংস্কৃতি কর্মীদের মৌনতা আমাকে লজ্জিত করলেও, আমি এখনও আমার অহংবোধ জিইয়ে রাখার ভরসা পাই। কারণ আমি জানি, দেখছি সারাদেশে অসংখ্য বাতিঘর জ্বলে উঠছে তরুণ আলোয়। যারা এখনও রাজনীতি, ক্ষমতার দাস হয়ে যায়নি। হবার মতো শলতেও কম। তাদের ওপর ভরসা রেখেই বলতে চাই—অসুর, নবপ্রাণের আগুনে ঝলসে যাওয়ার দিন সমাগত। আমার অহংবোধ শিখা জ্বলবে অনির্বাণ।

লেখক: বার্তা প্রধান, সময় টিভি

 

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune

কলামিস্ট

টপ