behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

চেনা পথের পথিক বিএনপি

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা১১:২৫, ফেব্রুয়ারি ০৩, ২০১৬

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজারাজনীতির চেনা ছকেই পা ফেলেছেন খালেদা জিয়া আর তার দল বিএনপি। এখন দলটির একমাত্র রাজনীতি একাত্তরের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধকে কটাক্ষ করা। আর কোনও রাজনীতি নেই দলটির। দলের চেয়ারপারসন প্রথমে বলেছেন, তারপর এখন নেতা পাতিনেতারাও বলছেন। এটাই প্রমাণ করতে উঠেপড়ে লেগেছেন যে, মুখে যতই মুক্তিযুদ্ধের কথা বলুক, দলটির আসল রাজনীতি স্বাধীনতাবিরোধীদের পক্ষে অবস্থান নেওয়া। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরুর পর দলের জন্য এই পথটি আরও স্বচ্ছ হয়েছে।
রাজনীতির চেনা পথের পথিক এই দল। এর নেতা নজরুল ইসলাম খান বলেছেন তারা নিজেরাই জরিপ করে দেখবেন কত শহীদ হয়েছেন একাত্তরের যুদ্ধে। বিএনপির জন্য অবশ্যই এটি প্রকল্প। কারণ আর কোনও কাজ নেইতো এখন। সংসদে নেই, মানুষকে পেট্রোলবোমায় পোড়ানোর রাজনীতি ব্যর্থ হওয়ার পর এখন আন্দোলেনেও নেই। তাই এখন এই প্রকল্প। জ্বালানি তেলের দাম সরকার কমায় না, বিএনপি নীরব, গ্যাস সংকট হয়, বিএনপি নীরব, দুর্নীতি কমে না বলে টিআইবি রিপোর্ট দেয়, বিএনপি নীরব। সরব শুধু স্বাধীনতা যুদ্ধের মীমাংসিত এই সত্যকে কলুষিত করায়। আশা করছি, এমন আকর্ষণীয় প্রকল্পে বিনিয়োগেরও অভাব হবে না। দেশের মানবতাবিরোধী অপরাধীরা আছেন, তাদের অর্থ আছে, আর্থিক প্রতিষ্ঠান আছে, কিন্তু তার চেয়ে বেশি আছে আরেকটি দেশ, পাকিস্তান। এমন প্রকল্পে পাকিস্তান নিশ্চয়ই অর্থ বিনিয়োগ করবে, কারণ তারাই সবচেয়ে বেশি আনন্দিত হন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বিতর্কিত হলে। বিতর্কিত, তাও আবার এমন এক দলের মাধ্যমে, যে দলটির প্রতিষ্ঠাতা নাকি আবার স্বাধীনতার ঘোষক!
রাজনীতির স্রোতে বিএনপি নিজেই নিজেকে এমন এক জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে যে, তারা খেলছেন পুরোনো ছকে। খালেদা জিয়া এবং তার ছেলে তারেক রহমান রাজনীতি করতেই এসেছেন। কাজেই খেলার নিয়মটি দ্রুত রপ্ত করে নেওয়ার আবশ্যিকতা তারা জানেন। তাই এই খেলায় তাদের কৌশল, স্বাধীনতাবিরোধী সব জোটের একক মালিক হওয়া, যেমনটি শুরু করেছিলেন জিয়াউর রহমান নিজে যুদ্ধাপরাধীদের জেলে থেকে ছেড়ে দিয়ে, গোলাম আযমকে দেশে এনে, স্বাধীনতার  স্লোগান বদলে দিয়ে, সাম্প্রদায়িক রাজনীতি করে, স্বাধীনতাবিরোধীদের মন্ত্রিত্ব দিয়ে।
দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া প্রথমে বলেছেন এবং তার সঙ্গে আরও কদর্যভাবে গলা মিলিয়েছেন গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। এবং আশ্চর্যজনকভাবে দুজনেই বলেছেন বিজয়ের মাসে, দুজন মানবতারোধী অপরাধীর ফাঁসি কার্যকরের পর পাকিস্তানের তীর্যক বাংলাদেশবিরোধী, বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী বক্তব্যের পর পর। মুক্তিযুদ্ধকে অপমান করার এমন প্রেক্ষাপট কেবল বিএনপিই পেয়ে থাকে।

বাংলাদেশে সুশীল সমাজের একটি বড় অংশ বিএনপির প্রতি দুর্বল। শেখ হাসিনার সামান্য কথায় তারা যেভাবে প্রতিক্রিয়া দেখান, এবার তারা নিশ্চুপ। তবে কি তারা এই বক্তব্যে বিভ্রান্ত হননি, নাকি বিভ্রান্ত হয়ে শোকে পাথর হয়েছেন?

বিএনপি, জামাতসহ স্বাধীনতাবিরোধীদের কাছে শহীদের সংখ্যা কেবল একটি সংখ্যা। কিন্তু এর সঙ্গে সমগ্র জাতির স্পর্ধা ও ভালোবাসা জড়িত। এর সঙ্গে দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন দেওয়া লাখ লাখ শহীদের স্বজনদের আবেগ ও বেদনা জড়িত। এর সঙ্গে মহান মুক্তিযুদ্ধের অহঙ্কার জড়িত।

বিএনপি নেত্রী, তার  ছেলে এবং দলের কোনও কোনও নেতা প্রায়ই আবার বলে থাকেন বঙ্গবন্ধু (তারা বঙ্গবন্ধু বলেন না, যেমন বলে না জামাতে ইসলামী) শেখ মুজিব স্বাধীনতা চাননি। প্রশ্ন হলো, যদি তিনি না চেয়ে থাকেন, স্বাধীনতাটা এলো কিভাবে? একাত্তরের ১ থেকে ২৫ মার্চ বাংলাদেশ কার নির্দেশে চলেছে? শেখ মুজিব না পাকিস্তান বাহিনীর? জিয়াউর রহমান কার নামে ২৭ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেছিলেন? কার নামে মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ করেছেন? একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনায় যে সরকারটি গঠিত হয়েছিল, সেটিই বা কার নেতৃত্বে? বংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে হয়েছে, আকস্মিকভাবে কোনও মেজরের ডাকে নিশ্চয়ই নয়। তাহলে তো সব ইতিহাসই মিথ্য। 

প্রথমে অনেকেই ভেবেছিলেন, খালেদা জিয়া যা বলেছেন, তার রাজনৈতিক প্রভাব বুঝতে পেরে দলের নেতারা এ নিয়ে আর উচ্চবাচ্য করবেন না। কিন্তু প্রতিদিন বিএনপি নেতারা যেভাবে মুক্তিযুদ্ধ, শহীদ পরিবার, শহীদ বুদ্ধিজীবীদের অপমান করে বক্তব্য রাখছেন, তাতে একথা জলের মতো পরিষ্কার যে,  তারা রাজনীতি করছেন স্বাধীনতাবিরোধীদের খুশি করার জন্যই।

তিনবার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, ৩২ বছর ধরে বিএনপির নেতৃত্ব দিচ্ছেন  খালেদা জিয়া। কখনও শহীদের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলেননি। আজ তুলছেন? কারণ দেশে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার চলছে, যা এই দলটির আদর্শের পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায়, অস্বস্তির বিষয়। বিএনপি নেতারা বলেন, তারাও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার চান, তবে সেটি আন্তর্জাতিক মানের হতে হবে। কিন্তু ক্ষমতায় থাকতে তারা সেই বিচার তারা করেননি। এদেশে মানুষ জানে জামায়াতের নেতা গোলাম আযমের বিচারের দাবিতে শহীদজননী জাহানারা ইমামসহ যে ২৪ জন বিশিষ্ট নাগরিক গণ–আদালত গঠন করেছিলেন, তাঁদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদোহ মামলা দিয়েছিলেন খালেদা জিয়া।

সম্প্রতি মানবতাবিরোধী দায়ে বাংলাদেশে দুই রাজনীতিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার প্রতিক্রিয়ায় পাকিস্তানের সরকার ও রাজনৈতিক মহল যেসব মন্তব্য করেছে, তা ছিল খুবই উস্কানিমূলক। এর মাধ্যমে একাত্তরের পরাজিত পাকিস্তান নিজেদের অপরাধই শুধু আড়াল করছে না, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধটাকেও তারা অস্বীকার করছে। দুঃখজনকভাবে পাকিস্তানের এই অবস্থানকে সমর্থন করে যাচ্ছেন বিএনপি নেত্রী, তার সাহাবিরা।

পাকিস্তান যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর থেকেই পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসর রাজাকার আলবদরদের হাতে নিহত ব্যক্তিদের সংখ্যা কমিয়ে দেখাতে তৎপর ছিল, এখনও আছে। পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই ভাড়াটে লেখকদের দিয়ে ভূয়া ইতিহাসও মাঝে মধ্যে লিখিয়েছে। কিন্তু এবার সম্ভবত সবচেয়ে খুশি পাকিস্তান, কারণ বাংলাদেশের একজন নেত্রী, সাবেক প্রদানমন্ত্রী, যেকোনওভাবেই হোক একজন মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী, তাদের মতো করে বাংলাদেশের ইতিহাস বলছে। রাজনীতি করতে গিয়ে, সরকার বিরোধিতা করতে গিয়ে, পাকিস্তানের পক্ষে এমন স্পষ্ট অবস্থান নিকট অতীতে দেখা যায়নি।

স্বাধীনতার ৪৫ বছরে আমরা। এখনও কত ঘটনা, কত কাহিনি অনুদ্ঘাটিত। কত মানুষ এখনও স্বজনের অপেক্ষায়। সেই স্বজনহারা মানুষদের শুধু অন্তরে আঘাত নয়, খালেদা জিয়া আর দল  পাকিস্তান ও দালালদের স্বার্থ হাসিলের জন্য নতুন করে লড়াই শুরু করেছেন। কিন্তু যে নীতি দেশের মৌলিক চেতনার সঙ্গে যায় না, তার পুনর্বিবেচনা জরুরি। বোঝা দরকার ক্ষমতা এখনও অলীক দূরত্বে।

লেখক: পরিচালক বার্তা, একাত্তর টেলিভিশন

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune

কলামিস্ট

টপ