পদত্যাগ করবেন কি মাহফুজ আনাম?

Send
ফজলুল বারী১৪:৩১, ফেব্রুয়ারি ০৭, ২০১৬

Fazlul Bariবিতর্কিত ১/১১’র সেনা সমর্থিত সরকারের সময় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দুর্নীতিগ্রস্ত দাবি করে ডেইলি স্টারে প্রকাশিত খবরটিকে ‘ভুল’ ছিল বলে স্বীকার করে নিয়েছেন পত্রিকাটির সম্পাদক মাহফুজ আনাম! ডেইলি স্টারের রজত জয়ন্তী উপলক্ষে গত বুধবার এটিএন নিউজের টকশোতে মাহফুজ আনাম স্বীকার করেছেন ওই সময়ে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআইয়ের সরবরাহ করা ‘শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দুর্নীতির খবর’ যাচাই ছাড়া প্রকাশ করে তিনি তার সাংবাদিকতা জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল করেছেন। দেশের মিডিয়ায় এই মূহুর্তে এটিই বড় খবর। কারণ আমাদের সম্পাদকরা সাধারণত এভাবে ভুল স্বীকার করেন না যা মাহফুজ আনাম করেছেন। একই সঙ্গে তিনি খুলে দিয়েছেন আরেকটি প্যান্ডোরার বাক্স! কারণ, এই ভুল স্বীকার ‘বিতর্কিত ১/১১ ও তার পরবর্তী প্রেক্ষাপট’ নিয়ে, সেটিকে নানাভাবে তোষামোদ অথবা পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়ার অভিযোগ আছে বাংলাদেশের মিডিয়ার অনেক রুই কাতলার বিরুদ্ধে! এদের কেউ নানান রিপোর্ট, সম্পাদকীয়, মতামত লিখে ছেপে, সেনা গোয়েন্দা সংস্থার অ্যাসাইনমেন্ট অনুসারে টকশো করে, সেই টকশোগুলোতে বিশেষ কিছু রাজনৈতিক নেতাকে তাদের নেতাদের বিরুদ্ধে বলিয়ে বহুল আলোচিত বিতর্কিত মাইনাস টু’ তথা শেখ হাসিনা-খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে বিতাড়নের নানান ফন্দি-ফিকির করেন! সেই সব ফরমায়েশি টকশোর হাজির অথবা শিকার হয়ে অনেক মেধাবী রাজনীতিক তার দল অথবা মূলধারার রাজনীতি থেকে ছিটকে গেছেন। কিন্তু মিডিয়ার সংশ্লিষ্ট কুশীলবদের কিছু হয়নি! তারা তখনও ‘জ্ঞান বিতরণ’ করেছেন, এখনও করছেন!
মিডিয়ার ভেতরে বাইরে তখন ডিজিএফআইর সে সব ফরমায়েশ বাস্তবায়নের কেতাবি নাম ছিল ‘প্রজেক্ট’! অনেক সাংবাদিক তখন ডিফিএফআই’র অফিসে এমন ‘প্রজেক্ট’ আনতে যেতেন! অথবা ‘প্রজেক্ট’ পৌঁছে দেওয়া হতো তাদের অফিসে অথবা বিশেষ হোটেল-রেস্টুরেন্টের ‘ব্রেকফাস্ট’, ‘লাঞ্চ’, ‘ডিনার টেবিলে’! এমন অনেক প্রজেক্টের সঙ্গে থাকতো টাকার খাম অথবা বান্ডিল! ওয়ান ইলেভেনের পরপর একটি স্কলারশিপ নিয়ে পড়াশুনায় আমি অস্ট্রেলিয়া চলে আসি। আমার পত্রিকার সম্পাদক তখন জেলে। কিন্তু ঢাকা থেকে ওয়াকিবহাল সূত্রগুলো জানাচ্ছিলো, আমার পত্রিকার একজনও ডিজিএফআইর প্রজেক্ট আনতে তাদের অফিসে যাতায়াত করতেন! উনি আবার বিপদে পড়লে আমাকে ফোন করে বলতেন, ‘অমুক রিপোর্টে ডিজিএফআই গরম!’ আমি বলে দিয়েছি,‘এটি সিডনিতে বসে আপনি করেছেন। তাদেরকে আপনার নম্বর দেওয়া হয়েছে। আপনাকে ফোন করলে একই কথা বলে আমাকে বাঁচাইয়েন!’ আমাকে অবশ্য ডিজিএফআইর কেউ কোনও দিন ফোন করেনি। বর্তমানে বিলাতে দায়িত্ব পালনরত এক সাংবাদিকের ‘ডিজিএফআইর সাংবাদিক’ নামীয় বদনাম ছিল। বেচারা একবার সিডনি এসে আত্মপক্ষ সমর্থন অথবা নিজের দল ভারি করতে তৎকালীন প্রজেক্ট সাংবাদিকদের একটি তালিকা দিয়ে গিয়েছিলেন!

মাহফুজ আনাম ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন প্রথিতযশা সাংবাদিক। আমার মতো অনেকের পছন্দের মানুষও। দেশের আরও অনেকের মতো ‘খাম’, ‘বান্ডিলের’ বিনিময়ে তিনি কোনও রকম যাচাই ছাড়া ‘শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দুর্নীতির রিপোর্ট’ ছেপে ডিজিএফআই’র প্রজেক্ট বাস্তবায়নের কাজ করেছেন, এমন ঢালাও মন্তব্য অযথা বিশ্বাস করার কারণ নেই। ডিজিএফআই’র তৎকালীন ‘প্রজেক্ট’ সমূহ বাস্তবায়নে রাজনীতিবিদসহ আরও কিছু শ্রেণি পেশার মানুষের সঙ্গে মিডিয়ার কারা কিভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন অথবা হয়ে গিয়েছিলেন তা ওয়াকিবহালরা জানেন। কিন্তু মাহফুজ আনামের মতো একজন সম্পাদক কিসের আশায় অথবা ভ্রান্তিতে তার দাবিকৃত ‘সাংবাদিকতা জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল’টি করেছেন তা আশাকরি তিনি বলবেন অথবা তাকে বলতে হবে। কারণ তিনি এর জন্য শুধু ভুল স্বীকার করেছেন, দুঃখ প্রকাশ বা ক্ষমা চাননি। তার স্বীকারকৃত ‘বড় ভুল’টির কারণে ব্যক্তিগত সুনামহানি ছাড়া শারীরিক, মানসিকভাবে অপূরণীয় ক্ষতির শিকার হয়েছেন বাংলাদেশের জাতির জনকের কন্যা, আওয়ামী লীগ সভানেত্রী, তৎকালীন বিরোধীদলের নেত্রী, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সময়মতো চিকিৎসা নিতে না পারায় তিনি স্থায়ী শারীরিক ক্ষতির শিকার হয়েছেন। এর মাঝে অবশ্য মাহফুজ আনামের বক্তব্যের একটি প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন শেখ হাসিনার ছেলে ও প্রধানমন্ত্রীর তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজিব ওয়াজেদ জয়। নিজের ফেসবুকে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে জয় ‘সামরিক অভ্যুত্থানে উস্কানি দিতে সাজানো ও মিথ্যা প্রচারণা চালানোর জন্যে’ রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে মাহফুজ আনামের বিচার দাবি করেছেন। এ বিষয়টি আগামীতে কোনও মামলায় গড়াবে কীনা তা ভবিষ্যত বলবে।

বাংলাদেশে জিয়া-এরশাদ নেতৃ্ত্বাধীন সামরিক আমলে ডিজিএফআই প্রভাবিত অথবা শৃংখলিত সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা আজকের সিনিয়র সাংবাদিকদের অনেকেরই কম বেশি আছে। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে দেশের সাংবাদিকতার নতুন এক প্রজন্ম সেই শৃংখল ভাঙতে শেখেন অথবা সাহসী হন। সেই সাহসী সাংবাদিকদের অনেকে আজকের প্রথম আলো-ডেইলি স্টার গ্রুপের পত্রিকা-মিডিয়ার সঙ্গে জড়িত আছেন অথবা ছিলেন। কালের প্রক্রিয়ায় প্রথম আলো-ডেইলি স্টার আজ দেশের সবচেয়ে পাঠকপ্রিয় এবং প্রভাবশালী পত্রিকা। ইংরেজিতে প্রকাশিত হওয়াতে দেশি-বিদেশি নীতি নির্ধারণী অনেক মহলে ডেইলি স্টারের প্রভাব তুলনামূলক বেশি। বাংলাদেশের মিডিয়ার অনেক বিশৃংখলার মধ্যে সাংবাদিকতার নীতিমালা সে সব পত্রিকায় মেনে চলা হয় এর পুরোভাগেও আছে প্রথম আলো-ডেইলি স্টার। এ দুটি পত্রিকার সাংবাদিকরা উচ্চহার বেতনভাতা, গাড়িসহ অনেক সুযোগ-সুবিধা পান এবং বেতনভাতা নিয়মিত পান। পাঠকপ্রিয় এবং বিজ্ঞাপনের আয়-উন্নতিতে সাচ্ছল্যের কারণে এই মিডিয়া হাউজটিতে এমন কোনও আর্থিক দুরাবস্থা নেই বা ১/১১’র সময়ও ছিলো না। সেই মিডিয়া হাউজের পত্রিকায় ডিজিএফআইর সাপ্লাই করা তথ্য যাচাই ছাড়াই দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক নেত্রীর চরিত্রহননের রিপোর্ট ছাপা হয়েছিল, তা এতোদিন বিস্ময়বোধক ছিল। মাহফুজ আনামের ভুল স্বীকারের মাধ্যমে তা নতুন মাত্রা পেলো। বাংলাদেশের কোনও সম্পাদক সাধারণত এভাবে ভুল স্বীকার করেন না। মাহফুজ আনামের ভুল স্বীকারের বিষয়টি বাংলাদেশের সংবাদপত্রের ইতিহাসের ব্যতিক্রমী নজির হয়ে থাকবে।

কিন্তু এই ভুল স্বীকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দায়-দায়িত্বের বিষয়গুলো মাহফুজ আনাম এখনও অনিষ্পত্তিকৃত রেখেছেন। অথবা খোলাসা করেননি। উন্নত বিশ্বের মিডিয়া ব্যক্তিত্বরা এসব ভুল স্বীকারের সঙ্গে বিবেকের তাড়নায় আর কী কী করেন তা মাহফুজ আনাম দেশের অনেকের চেয়ে ভালো জানেন। ভুল স্বীকার করে দায়দায়িত্ব নেওয়ার নজির-মানসিকতা বাংলাদেশের রাজনীতিতে নেই। বাংলাদেশের নানান ট্র্যাজিক ঘটনার পর সংশ্লিষ্টদের দায় দায়িত্ব গ্রহণের বিষয়ে বিদেশের নানা দৃষ্টান্ত উল্লেখ করে দেশের মিডিয়ায় লেখা হয়। ডেইলি স্টারেও লেখা হয়। আর বাংলাদেশের লোভী সেই ব্যক্তিরা ‘আমি দায়দায়িত্ব নিয়ে পদত্যাগ করলে ট্র্যাজেডি থামবে নাকি’ অথবা ‘আমি পদত্যাগ করলে দেশের হইবে কী’ জাতীয় বক্তব্য দেন! এ বিষয়গুলোকেও তুলে ধরা হয় দেশের মিডিয়ায়। দায়দায়িত্ব গ্রহণের তেমন কোনও দৃষ্টান্ত দেশের কোথাও নেই! মাহফুজ আনাম যেহেতু ভুল স্বীকার করে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, সেই ‘ভয়ঙ্কর ভুলের’ দায়দায়িত্ব নিয়ে দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবশালী পত্রিকার সম্পাদকের পদ থেকে পদত্যাগের সৎ সাহস রাখেন কীনা সেটি প্রমাণের দায়দায়িত্বও তার। ‘আমি পদত্যাগ করলে অভাগা মিডিয়ার হইবে কী’ জাতীয় বক্তব্য দেওয়ার মতো ব্যক্তি নিশ্চয় প্রিয় সম্পাদক মাহফুজ আনাম নন।

লেখক: অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী সাংবাদিক

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ