হিলারি ‘আফা’ আসছেন!

Send
মাসুদা ভাট্টি
প্রকাশিত : ১৭:০৭, মার্চ ১৪, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:২৪, মার্চ ১৪, ২০১৬

ভারতের কংগ্রেস সরকারকে বিপুল ভোটে পরাজিত করে যখন নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপি সরকার গঠন করে তখন বাংলাদেশের ভেতরে ও বাইরে শেখ হাসিনা-বিরোধী শক্তিটি এতো জোরে বগল বাজাতে শুরু করেছিল যে, সেই শব্দে এদেশে ভয়ঙ্কর এক ত্রাসের সৃষ্টি হয়েছিল। মনে হচ্ছিলো, এই বুঝি বাংলাদেশ তার স্বাধীনতা সমেত উল্টে পড়ে। কিন্তু কার্যত দেখা গেলো সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। মোদি-সরকার বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে বন্ধুত্বতো বজায় রাখলোই একই সঙ্গে বাংলাদেশকে পাশে নিয়ে দু’দেশের উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ব্যাপারে অত্যন্ত আগ্রহী হয়ে উঠলো এবং এখনও যার ধারাবাহিকতা বর্তমান। পারষ্পারিক সম্পর্ক যখন উন্নয়নতন্ত্রে বদলায় তখন দু’টি দেশের সম্পর্ক ভিন্ন মাত্রা লাভ করে। একই কথা প্রযোজ্য চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, চীনের জন্য গোটা বাংলাদেশকে উৎসর্গ করলেও কিন্তু এদেশের কারও কিছু এসে যেতো না, কেবল চীনের জায়গায় ভারতের নামটি উচ্চারিত হলেই সকলে তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠেন। আজকে যদি রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র ভারতের সঙ্গে নির্মিত না হয়ে যদি চীনের সঙ্গে হতো তাহলে বিরোধিতার চিত্রটি কি এরকম হতো? আমার তাতে ঘোরতর সন্দেহ আছে।

বাংলাদেশ এখন একটি সত্যিকার অর্থে নতুন অর্থনৈতিক মাত্রায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে খেলুড়ে হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে বিশ্বের তিনটি প্রধান অর্থনৈতিক শক্তি ভারত-চীন-রাশিয়ার সঙ্গে সমানভাবে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। ফ্রান্সের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপনের চুক্তি সই করেছে। আটলান্টিকের অপর পাড়ে বাংলাদেশের যাতায়াত ক্রমশই কমছে। এটা নিশ্চিত ভাবেই ভালো চোখে দেখছে না দীর্ঘকাল ধরে বাংলাদেশের গণমানুষের শক্তিকে খাঁটো করে দেখে আসা শক্তিটি। এই শক্তিটি আবার একা নয়, তাদের নিজস্ব একটি বলয়শক্তি রয়েছে। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে, সম্প্রতি বাংলাদেশ বিষয়ে যে ক’টি নেতিবাচক সংবাদ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে শিরোনাম হয়েছে তার বেশিরভাগই এসেছে এই মিত্রবলয় থেকে। যেমন- অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট টিমকে বাংলাদেশকে না পাঠানো, জঙ্গি হামলার আশঙ্কা বা নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে; যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশ থেকে কোনও কার্গো বিমান অবতরণে নিষেধাজ্ঞা আরোপ, বাংলাদেশে আইএস জঙ্গি রয়েছে তা স্বীকার করার জন্য চাপ প্রয়োগ ইত্যাদি ঘটনাবলী। কিন্তু এসকল ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ অত্যন্ত দৃঢ়তার পরিচয় দিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সম্পর্ক নষ্ট না করেও যে কোনও নেতিবাচক প্রচারণায় যে দৃঢ়তা দেখানো সম্ভব তা এখন বাংলাদেশ দেখাতে পারছে।

কিন্তু বাংলাদেশের ভেতরে এই মিত্রবলয়ের যে দেশিয় মুরিদরা রয়েছেন তারা আশা করে আছেন যে, আসছে নভেম্বরে হয়তো পরিস্থিতি সম্পূর্ণ পাল্টে যাবে। যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে তাদের সম্পূর্ণ আশা-ভরসার কলসি হয়ে দাঁড়িয়েছেন হিলারি রডহ্যাম ক্লিনটন। তারা মনে করছেন যে, তিনি ক্ষমতায় এলেই বাংলাদেশের ক্ষমতায় তাদেরকে বসিয়ে দিতে সক্ষম হবেন। কিন্তু পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতায় রাজনীতিরও যে বদল হয়েছে তা হয়তো এরা ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না। যেমনটি মোদি-সরকারের ক্ষেত্রে ভাবা হয়েছিল যে, মোদি ক্ষমতায় এলেই শেখ হাসিনার বিদায় ঘটবে কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে ঠিক তার উল্টো ঘটনা, তেমনই হিলারি ক্ষমতা গ্রহণ করলেই পরিস্থিতি পাল্টে যাবে। মজার ব্যাপার হলো, এই যে দেশিয় গোষ্ঠীটির বিদেশি নির্ভর ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্ন এ নিয়ে কিন্তু কারোরই কোনও প্রশ্ন নেই। কোনও এক বিচিত্র কারণে তাদের বিদেশ-নির্ভরতা হালাল হয়ে যায়। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঘটনাকে যদি আমরা একত্রিত করে দেখি তাহলে আমাদের বুঝতে অসুবিধে হয় না যে, এই বিদেশি-নির্ভর বাংলাদেশি শক্তিটি আগামি নভেম্বরে হিলাটি ক্লিনটনের ক্ষমতায় আসার আগেই বাংলাদেশকে অস্থির করার ক্ষেত্র তৈরি করছেন, যাতে তিনি ক্ষমতায় আসা মাত্র তাদের ক্ষমতায় যাওয়ার আশা পূরণ করতে পারেন। প্রায়ই ঢাকার বিভিন্ন সান্ধ্য আসরে তাদেরকে আনন্দে বিগলিত হতে-হতে বলতে শুনি, ‘হিলারি আফা আসতেছেন’। দুঃখের বিষয় হলো, তাদের স্বপ্নের বেলুনটি এতোটাই চুপসানো যে, বেচারাদের জন্য সত্যিই দুঃখ লাগে। একাত্তরে পাকিস্তানি ও পাকিস্তানপন্থীরা ভেবেছিল যে, সপ্তম নৌবহর আসবে তাদেরকে উদ্ধার করতে, যে কোনও সময় চীন ভারত আক্রমণ করবে; এই কিছুদিন আগে অনেকেই ভেবেছিলেন যে, এই যে মোদি এলেই শেখ হাসিনার বিদায় ঘটবে, আবার এখন অনেকেই ভাবতে শুরু করেছেন, হিলারি এলেই শেখ হাসিনার বিদায় ঘটবে---- এদের সবার কাছে সব কথার শেষ কথা হলো শেখ হাসিনার বিদায়; এতো বিরোধিতার জন্যও বোধ করি ভাগ্য নিয়ে জন্মাতে হয়, শেখ হাসিনা সত্যিই তার বাবার মতোই ভাগ্যবান।

লেখক: কলামিস্ট

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ