‘এত পানি জীবনে দেহি নাই’

Send
আরিফুল ইসলাম, কুড়িগ্রাম
প্রকাশিত : ২৩:০০, আগস্ট ১৩, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ২৩:৪০, আগস্ট ১৩, ২০১৭

আশ্রয়কেন্দ্রে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন আব্দুল ছালাম মিয়া (ছবি- প্রতিনিধি)

‘সকালে ঘুম থাকি উঠি দেহি, ঘরের ভিতরত পানি। ঘর থাকি ব্যারে দেহি, চাইরো পাকে পানি। এত পানি জীবনে দেহি নাই।’ গত কয়েকদিনের টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় নিজের বসতভিটায় পানি ওঠা নিয়ে এসব কথা বলেন কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার নাওডাঙ্গা ইউনিয়নের পূর্ব ফুলমতি গ্রামের আব্দুস ছালাম (৭০)। একই এলাকার সাহেদ আলী (৭২) নামে অন্য এক বৃদ্ধও একই কথা জানান। বাড়িঘরে বন্যার পানি ওঠায় তারা এখন আশ্রয় নিয়েছেন নাওডাঙ্গা ডিএস দাখিল মাদ্রাসায়।

কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়ন বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে। এসব ইউনিয়নের প্রায় প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এখন আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। বন্যা কবলিতরা নিজেদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ও গবাদি পশু নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন এসব আশ্রয়কেন্দ্রে। শনিবার (১২ আগস্ট) রাত থেকেই তারা আশ্রয় নিতে শুরু করেন।

এদিকে, বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা বন্যাদুর্গতরা খাদ্য সংকটে ভুগছেন বলে অভিযোগ করেছেন। অনেকে জানান, অসুস্থ হয়ে পড়লেও তারা চিকিৎসা সেবা পাচ্ছেন না। তবে স্থানীয় প্রশাসন বলছে, আশ্রিতদের জন্য শুকনো খাবারের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

গবাদি পশু নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে বানভাসীরা (ছবি- প্রতিনিধি)

নাওডাঙ্গা ডিএস দাখিল মাদ্রাসা, পশ্চিম ফুলমতি বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়, নাওডাঙ্গা স্কুল অ্যান্ড কলেজসহ ফুলবাড়ী উপজেলার কয়েকটি আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, স্থানীয় কিছু ব্যক্তির উদ্যোগে বন্যাদুর্গতদের মাঝে সামান্য খাবার সরবরাহ করা হলেও সরকারিভাবে ওইসব আশ্রয়কেন্দ্রে কোনও খাবার পৌঁছায়নি।

নাওডাঙ্গা ডিএস দাখিল মাদ্রাসায় আশ্রয় নেওয়া আরসোনা বেগম (৭০) ও সাত মাসের শিশু রুমানা সর্দি-জ্বরে ভুগছেন। একই আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা ফারুক (৮) ও অঞ্জনা খাতুনের (১৩) পায়ে ঘা দেখা দিয়েছে। কিন্তু তারা কোনও ধরনে স্বাস্থ্যসেবা পাননি বলে জানান।

এ ব্যাপারে ফুলবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দেবেন্দ্র নাথ ঊরাঁও এর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

এদিকে, জেলার নয়টি উপজেলায় বন্যার পানি প্রবেশ করায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন দুর্গতরা। সদর উপজেলার ছয়টি ইউনিয়ন বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে।

বন্যার পানিতে তলিয়ে যাওয়া এলাকা (ছবি- প্রতিনিধি)

স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, রবিবার (১৩ আগস্ট) সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ধরলা নদীর পানি ফেরিঘাট পয়েন্টে বিপদসীমার ১৩৪ সেন্টিমিটার এবং ব্রহ্মপুত্রের পানি চিলমারী পয়েন্টে বিপদসীমার ৪৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়া তিস্তা ও দুধকুমারের পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে।

সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের সাড়ে পাঁচ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন বলে নিশ্চিত করেছেন ওই  ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আইয়ুব আলী সরকার। এর মধ্যে অনেক পরিবার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আশ্রয় নিলেও সরকারিভাবে এখনও কোনও খাবার পৌঁছানো সম্ভব হয়নি বলেও জানান তিনি। তিনি আরও জানান, ১০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ পাওয়া গেলেও তা আগামীকাল (১৪ আগস্ট) বিতরণ করা হবে।

এদিকে, সদরের হলোখানা ও ভোগডাঙ্গা ইউনিয়নের প্রায় ১৫ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে সদরের কাঁঠালবাড়ী ইউনিয়নের তিন হাজার পরিবার।

রাস্তাঘাট ডুবে যাওয়ায় ভোগান্তিতে পড়েছেন দুর্গতরা (ছবি- প্রতিনিধি)

হলোখানা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান উমর ফারুক বলেন, ‘আমার ইউনিয়নে প্রায় আট হাজার পরিবার পানবিন্দি রয়েছে, এর মধ্যে অনেকেই বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন। কিন্তু তাদের কাছে এখনও সরকারিভাবে কোনও খাবার পৌঁছায়নি।’

কাঁঠালবাড়ী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান রেদওয়ানুল হক দুলাল জানান, তার ইউনিয়নের বানভাসীদের রাত থেকে খাবার সরবরাহ করা হবে।

জেলা প্রশাসক আবু সালেহ মোহাম্মদ ফেরদৌস খান জানান, চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে, বরাদ্দ আসবে। আর বরাদ্দ আসলে তা বিতরণ করা হবে। আগের কিছু মজুদ ছিল, তা দুর্গতদের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে।

/এমএ/

লাইভ

টপ