প্রথম শত্রুমুক্ত হয়েছিল যশোর

Send
তৌহিদ জামান, যশোর
প্রকাশিত : ১৯:২২, ডিসেম্বর ০২, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:৫৫, ডিসেম্বর ০৫, ২০১৭

বিজয়ের গল্পমুক্তিযুদ্ধে অনন্য ইতিহাস সৃষ্টিকারী জেলার নাম যশোর। মুক্তি ও মিত্রবাহিনীর যৌথ আক্রমণ এবং মুক্তিকামী মানুষের প্রতিরোধে যশোর প্রথম শত্রুমুক্ত হয়। ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর সম্মিলিত আক্রমণে টিকতে না পেরে যশোর সেনানিবাস থেকে খুলনায় পালিয়ে যায় পাকসেনারা। যশোরের মাটিতে উড়ানো হয় বিজয়ের প্রথম পতাকা। মানুষের গগনবিদারি ‘জয়বাংলা স্লোগান’ প্রকম্পিত করে আকাশ-বাতাস। হাজার-হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন মুক্তির আনন্দে শামিল হতে। পাকহানাদারমুক্ত প্রকৃতির নির্মল বাতাসে শ্বাস নিতে।

মুক্তিযুদ্ধকালীন ১১টি সামরিক সেক্টরের মধ্যে যশোর ছিল ৮ নম্বর সেক্টর। মূলত বৃহত্তর যশোর ও কুষ্টিয়া জেলা, ফরিদপুর ও খুলনা জেলার কিছু অংশ ছিল ৮ নম্বর সেক্টরের আওতায়। এর সদর দফতর ছিল যশোরের বেনাপোলে। এ সেক্টরের প্রথম কমান্ডার ছিলেন মেজর আবু ওসমান চৌধুরী। আগস্ট মাস থেকে সেক্টর কমান্ডারের দায়িত্ব নেন মেজর এমএ মঞ্জুর। তার অধীনে ছিলেন ক্যাপ্টেন আবু ওসমান চৌধুরী ও ক্যাপ্টেন নাজমুল হুদা। এ সেক্টরের অধীনে মুক্তিযোদ্ধাদের সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এর বাইরে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় ছিল বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স (বিএলএফ)। এ বাহিনীর প্রধান ছিলেন আলী হোসেন মনি এবং ডেপুটি প্রধান ছিলেন রবিউল আলম।

জাসদের কেন্দ্রীয় কার্যকরী সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা রবিউল আলম জানান, বিএলএফ’র নেতৃত্বে বৃহত্তর যশোর জেলায় (যশোর, ঝিনাইদহ, মাগুরা, নড়াইল) একাধিক সশস্ত্র মুক্তিবাহিনী গড়ে ওঠে। তাদেরকে বিভিন্নভাবে প্রশিক্ষিত করা হয়। এ বাহিনীর সদস্যরা সম্মুখযুদ্ধে বীরোচিত লড়াইয়ে অংশ নেন।

পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টির (এমএল) জেলা কমিটির নেতাকর্মীরাও মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। প্রথমে পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টির (এমএল) নেতৃত্বে গড়ে ওঠা বাহিনীর নেতা ছিলেন নুর মোহাম্মদ। পরে এর দায়িত্ব নেন বিমল বিশ্বাস।

বিশিষ্ট লেখক সাবেক শ্রমিকনেতা মোস্তাফিজুর রহমান কাবুল জানান, পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যরা অক্টোবর পর্যন্ত বৃহত্তর যশোরের বিস্তীর্ণ এলাকায় প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। কিন্তু, ‘দুই কুকুরের লড়াই’ তত্ত্বে দলের কেন্দ্রীয় কমিটি মুক্তিযুদ্ধে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে অক্টোবর মাসে দলের নেতাকর্মীরা যুদ্ধে বিরতি দেন।

অন্যদিকে, পাকিস্তানি বাহিনীর ১০৭নম্বর ব্রিগেড মোতায়েন ছিল। এর কমান্ডার ছিলেন বিগ্রেডিয়ার হায়াত খান। যশোর সেনানিবাস থেকে শত্রু বাহিনী ৬টি জেলা নিয়ন্ত্রণ করত।

প্রথম শহীদ চারুবালা ধর

যশোরের মানুষ মুক্তিযুদ্ধের আনুষ্ঠানিক শপথ নেন ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ। এদিন যশোর কালেক্টরেটের সামনে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে যশোরবাসী শপথ নেয়। শহরের রাজপথে বের হয় মিছিল। মিছিলটি শহীদ সড়কে (তৎকালীন কেশবলাল রোড) পৌঁছলে হানাদার বাহিনী গুলি চালায়। এতে শহীদ হন চারুবালা ধর নামে এক নারী। তিনিই ছিলেন মুক্তি সংগ্রামে যশোরের প্রথম শহীদ। মুক্তিকামী মানুষ শহীদ চারুবালার লাশ নিয়েই শহরে মিছিল চালিয়ে যায়। এরপর থেকেই যশোরে সংগঠিত হতে থাকে প্রতিরোধ। নেতৃত্ব দেয় সংগ্রাম পরিষদ। ভোলা ট্যাংক রোডের তৎকালীন ইপিআর দফতরে সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে ছাত্রজনতার সশস্ত্র প্রশিক্ষণ শুরু হয়।

মুক্তিযুদ্ধের প্রস্ততি হিসেবে ২৩ মার্চ কালেক্টরেট চত্বরে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী কুচকাওয়াজ করে। সেনানিবাসে সব ধরনের সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়।

২৬ মার্চ রাতে তৎকালীন জাতীয় সংসদ সদস্য মসিয়ূর রহমানকে তার বাসভবন থেকে ধরে যশোর সেনানিবাসে নিয়ে পাকিস্তানি বাহিনী হত্যা করে। ২৯ মার্চ পাক হানাদার বাহিনী যশোর শহর ছেড়ে সেনানিবাসে চলে যায়। ৩০ মার্চ যশোর সেনানিবাসের বাঙালি সৈনিকরা ক্যাপ্টেন হাফিজের নেতৃত্বে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। ৩১ মার্চ কমিউনিস্ট নেতা শেখ আবদুস সবুর ও আরও কয়েকজনের নেতৃত্বে নড়াইল অস্ত্রাগার থেকে সংগৃহীত অস্ত্রসহ বিশাল একটি বাহিনী যশোর আসে। তারা তৎকালীন ইপিআর-এর সহযোগিতায় বিস্ফোরক সংগ্রহ করে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগার অভিমুখে রওনা হয়। জেলের তালা ভেঙে কারাগারে থাকা প্রখ্যাত কমিউনিস্ট নেতা কমরেড অমল সেনসহ বহু রাজবন্দি ও সাধারণ বন্দিদের মুক্ত করে। পরে এ বাহিনী যশোর সেনানিবাস ঘেরাও করে। তিন দিন অবরুদ্ধ থাকার পর ক্যান্টনমেন্ট থেকে গোলা ছুড়তে থাকে পাকিস্তানি বাহিনী। এ সময় শেখ সবুরের নেতৃত্বাধীন হালকা অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত বাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হয়।

৪ এপ্রিল পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে প্রচন্ড যুদ্ধে লে. আনোয়ারসহ চারজন শহীদ হন। কুমিল্লার শাহরস্তি থানার সন্তান শহীদ লে. আনোয়ারের বীরত্বগাথা আজও অমলিন।

যশোর-ঝিনাইদহ সড়কের বারীনগর বাজারের অদূরে কাজী নজরুল ইসলাম কলেজের সামনে এ বীর শহীদ শান্তিতে ঘুমিয়ে আছেন।

৪ এপ্রিল পাকবাহিনী ট্যাংক, সাঁজোয়া যান, কামানসহ শহরে হামলা চালায়। অত্যাধুনিক অস্ত্রের সামনে টিকতে না পেরে মুক্তিযোদ্ধারা পিছু হঠতে বাধ্য হন। শুরু হয় পাকআর্মিদের নিষ্ঠুরতা। তারা শহরের নিরস্ত্র মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করতে থাকে। পাকবাহিনীর গণহত্যায় পুরো শহর পরিণত হয় বধ্যভূমিতে। শান্ত ভৈরবের পানি লাল হয় শহীদের রক্তে। পাকবাহিনীর এ বর্বরতা অব্যাহত থাকে জুলাই পর্যন্ত। ইতোমধ্যে স্বাধীনতাযুদ্ধের গতিধারা পাল্টে যায়। পাকবাহিনীর বর্বরতার পাশাপাশি পাল্টা আঘাত হানতে শুরু করেন মুক্তিযোদ্ধারা।  প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধারা যশোর শহর ও অন্যান্য এলাকায় হানাদার বাহিনীর ক্যাম্পে প্রচন্ড আক্রমণ চালাতে থাকেন।

চৌগাছার জগন্নাথপুরের যুদ্ধ : ঐতিহাসিক মল্লযুদ্ধ

যশোরের রণাঙ্গনের সবচেয়ে বড় যুদ্ধটি সংঘটিত হয় চৌগাছার জগন্নাথপুর ও মসিয়ূর নগরে। ২০ নভেম্বর মুক্তি ও মিত্রবাহিনী ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগণার বয়রা সীমান্তপথে যশোর সেনানিবাস দখলে অভিযান শুরু করে। ঝিকরগাছার ছুটিপুর থেকে মুক্তিবাহিনী যশোর সেনানিবাস লক্ষ্য করে কামানের গোলা নিক্ষেপ শুরু করে। সেনানিবাসকে অবরুদ্ধ করতে বয়রা-কাবিলপুর-গরিবপুর হয়ে এগোতে থাকে ট্যাংকবাহিনী। এদিন ছিল ঈদের দিন। সকালে চৌগাছার জগন্নাথপুরের মানুষ তৈরি হচ্ছে ঈদ উদযাপনের জন্য। এমনই এক সময় হানাদার পাকবাহিনীর ২০/২৫টি গাড়ি ঢোকে জগন্নাথপুর (বর্তমানে মুক্তিনগর) গ্রামে। ঈদের দিন মানুষ নামাজ পড়বে, মিষ্টিমুখ করবে। এটাই হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বুকে গুলিবিদ্ধ হয়ে পাখির মত লুটিয়ে পড়েছে মানুষ। বর্বর পাঞ্জাবি সেনারা দেখামাত্রই গুলি চালাতে থাকে। একদিনেই তারা হত্যা করে ৩০ জনকে; যাদের সবাই নিরীহ, গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষ। সংসদ সদস্য মসিয়ূর রহমানের ভাই আতিয়ার রহমানসহ আরও দুজনকে পুড়িয়ে মারলো ওই দানবরা। বাড়ির পর বাড়ি আগুন জ্বালিয়ে ছারখার করে দিল। অসহায় মানুষ তাদের প্রাণ বাঁচাতে যে যেদিক পারলো, পালালো। এরপরও কিছু মানুষ বাপ-দাদার ভিটে আঁকড়ে পড়ে ছিলেন। সন্ধ্যায় ছদ্মবেশধারী চার মুক্তিযোদ্ধা এসে তাদেরও অন্যত্র চলে যাওয়ার পরামর্শ দিলেন। বললেন, রাতে বড় ধরনের যুদ্ধ হবে। জনমানবশূন্য নীরব নিস্তব্ধ জগন্নাথপুর গ্রাম সহসাই প্রকম্পিত হয়ে ওঠে গোলাগুলির শব্দে। শুরু হয় ভয়ংকর যুদ্ধ। মসিয়ূর নগরসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামও পরিণত হয় যুদ্ধক্ষেত্রে।

মুক্তি আর মিত্রবাহিনী অবস্থান নেয় জগন্নাথপুর গ্রামের চাড়ালের বাগানে। ট্যাংকবহর নিয়ে পাকবাহিনী গ্রামে ঢোকামাত্রই তাদের সাতটি ট্যাংক ধ্বংস করে দেয় মিত্রবাহিনী। এক পর্যায়ে পশ্চিমপাড়ার তেঁতুলতলায় অবস্থান নেয় মিত্রবাহিনী। সেখান থেকেই তারা গোলা ছুঁড়ছিল। সেসময় পাকবাহিনী ছিল বাঁশবাগানে। প্রচন্ড গোলাগুলির শব্দের সঙ্গে হাজারো সৈন্যের গগনবিদারি চিৎকার, আর চেঁচামেচি। দীর্ঘসময় ধরে যুদ্ধ চলায় গুলি তখন শেষের দিকে। দু’পক্ষই চলে আসে কাছাকাছি। একশ’ গজের মধ্যে। জগন্নাথপুর স্কুল মাঠে শুরু হয় হাতাহাতি, মল্লযুদ্ধ। বেলা ১১টা পর্যন্ত চলে তাণ্ডব।

২২ নভেম্বর আবারও বিমান হামলা চালায় পাকবাহিনী। মিত্রবাহিনীও পাল্টা বিমান হামলা চালিয়ে পাকিস্তানের তিনটি স্যাবর জেট জঙ্গি বিমান ভূপাতিত করে। ধবংস করে আরও সাতটি ট্যাংক ও বহু সাঁজোয়া গাড়ি। পিছু হটতে বাধ্য হয় পাকবাহিনী। মিত্রবাহিনী শক্ত ঘাঁটি গাড়ে জগন্নাথপুরে। এ যুদ্ধে দু’পক্ষের সহস্রাধিক সৈনিক মারা যায়। মুক্তিবাহিনী এরপর মিত্রবাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে হামলার পর হামলা চালাতে থাকে। এগিয়ে যেতে থাকে যশোরের অভিমুখে। ইতিহাসে এটি জগন্নাথপুরের যুদ্ধ নামে খ্যাত।

এ যুদ্ধে পাকবাহিনীর ৯৬জন নিহত এবং মুক্তিবাহিনীর ৫৭ জন শহীদ হন। শহীদদের মধ্যে ১৯জনের নাম পাওয়া যায়। পরবর্তীতে এখানে একটি স্মৃতিসৌধে তাদের নাম লিপিবদ্ধ করা হয়।

অ্যাডভোকেট তজিবর রহমান। যশোরের চৌগাছা উপজেলার খোর্দ্দ সিংহঝুলি (বর্তমান নাম- মসিয়ূরনগর) গ্রামের বাসিন্দা। সেইসময় তার বয়স ৮-৯ বছর। তিনি বলেন, ‘আমার ধারণা- মসিয়ুর রহমানের গ্রামের বাড়ি বলেই এখানে আমাদের বাড়ির দহলিজ ঘরে ঘাঁটি গাড়ে পাকবাহিনী। মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে খাবার এবং খবর পৌঁছে দিতাম আমি ও আমার মা মরিয়ম বিবি।’

তিনি জানান, পাকবাহিনী তার চাচা এলাহী বক্স, চাচাতো ভাই আলী বক্স, আলী বক্সের মা, আরেক চাচা লোকমান বক্সের স্ত্রীকে গুলি করে হত্যা করে। সেদিন তাদের গ্রামের মোট ১৭জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। যুদ্ধের সময় তাদের গ্রামের সব বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয় হানাদাররা।

একই গ্রামের বাসিন্দা শাহজাহান বিশ্বাস বলেন, ‘২০ নভেম্বর থেকে পাকবাহিনীর সঙ্গে মিত্র ও মুক্তিবাহিনীর তুমুল যুদ্ধ হয়। কোনও পক্ষেরই বাঙ্কার ছিল না। সম্মুখযুদ্ধ যাকে বলে। দুদিন পর ২২ নভেম্বর দু’পক্ষেরই গোলা বারুদ শেষ হয়ে যায়। এরপর মুখোমুখি অবস্থান নেয় পাকবাহিনী ও যৌথবাহিনী। বেলা ১১টার দিকে দু’পক্ষের হাতাহাতি যুদ্ধ হয়।’

যুদ্ধে তাদের গ্রামের মোট ২২জন শহীদ হন বলে তিনি জানান।

৬ ডিসেম্বর যশোর মুক্ত দিবস

হানাদার বাহিনী যশোরের চৌগাছা উপজেলার সলুয়া বাজারে তৈরি করে অগ্রবর্তী ঘাঁটি। এসময় যশোর সেনানিবাসের তিন দিকেই মিত্র বাহিনী ও মুক্তিবাহিনী শক্ত ঘাঁটি গেড়ে বসে। প্রতিরোধ যুদ্ধের শেষ অভিযান চলে ৩, ৪ ও ৫ ডিসেম্বর। এ তিন দিন যশোর অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে পাক হানাদার বাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রচন্ড যুদ্ধ হয়। এ সময় মিত্রবাহিনীও সীমান্ত এলাকা থেকে যশোর সেনানিবাসসহ পাক আর্মিদের বিভিন্ন স্থাপনায় বিমান হামলা ও গোলা নিক্ষেপ করে। একপর্যায়ে পর্যুদস্ত পাকবাহিনী ৫ ডিসেম্বর থেকে পালাতে শুরু করে। এদিন সকাল ও দুপুরে পাকিস্তানের নবম ডিভিশনের সঙ্গে ভারতীয় নবম পদাতিক ও চতুর্থ মাউন্টেন ডিভিশনের প্রচন্ড লড়াই হয়। বিকালেই পাক সেনা অফিসাররা বুঝে যান, যশোর দুর্গ আর কোনোভাবেই রক্ষা করা সম্ভব নয়। বেনাপোল অঞ্চলে দায়িত্বরত লে. কর্নেল শামসকে নওয়াপাড়ার দিকে দ্রুত সরে যাওয়ার নির্দেশ দেন বিগ্রেডিয়ার হায়াত। আর নিজের ব্রিগেড নিয়ে রাতের আঁধারে খুব গোপনে যশোর ক্যান্টনমেন্ট থেকে তিনি পালিয়ে যান খুলনার দিকে। পালানোর সময় ৫ ও ৬ ডিসেম্বর শহরতলীর রাজারহাটসহ বিভিন্ন স্থানে মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে তাদের প্রচন্ড লড়াই হয়। ৬ ডিসেম্বর বিকালে মিত্র বাহিনীর কমান্ডার জেনারেল বারাতের নেতৃত্বে মিত্র ও মুক্তি বাহিনী সেনানিবাসে ঢুকে দখলে নেয়।

সংস্থাপন মন্ত্রণালয় প্রকাশিত ‘যশোর গেজেটিয়ার’-এ উল্লেখ করা হয়েছে, ৬ তারিখ সন্ধ্যা হতে না হতেই পাকবাহিনীর সবাই যশোর ক্যান্টনমেন্ট ত্যাগ করে পালিয়ে যায়। ৭ ডিসেম্বর বেলা সাড়ে ১১টা নাগাদ ৮ নম্বর সেক্টরের অধিনায়ক মেজর মঞ্জুর ও মিত্র বাহিনীর নবম ডিভিশনের কমান্ডার মেজর জেনারেল দলবীর সিং যশোরে প্রবেশ করেন। তখনও তারা জানতেন না যে যশোর ক্যান্টনমেন্ট শূন্য। তারা বিস্মিত হন কোনও প্রতিরোধ না দেখে।

মুক্তিযোদ্ধা সংসদ যশোর জেলা কমান্ডার রাজেক আহমদ বলেন, ‘৬ ডিসেম্বরেই আমরা যশোর শহর থেকে শত্রু সেনাদের বিতাড়িত করি। কিন্তু, সেদিন যশোর শহর ছিল জনশূন্য। ফলে পরদিন ৭ ডিসেম্বর বিজয় মিছিল বের হয়।’

প্রসঙ্গত, স্বাধীনতার পর থেকে ৭ ডিসেম্বরকেই যশোর মুক্ত দিবস হিসেবে পালন করা হতো। কিন্তু, মুক্তিযোদ্ধা ও ইতিহাসবিদদের দেওয়া তথ্যমতে ২০১০ সাল থেকে ৬ ডিসেম্বর যশোর মুক্ত দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে।

৮ ডিসেম্বর যশোর শহরের নিরাপত্তার দায়িত্ব নেয় মুক্তিবাহিনী।

১০ ডিসেম্বর প্রথম শত্রুমুক্ত জেলা যশোরের জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব নেন ওয়ালিউল ইসলাম। ১১ ডিসেম্বর প্রথম শত্রুমুক্ত জেলা যশোরে টাউন হল মাঠে জনসভা হয়। সেখানে ছিলেন মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ ও অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম প্রমুখ। অফিস-আদালতে কার্যক্রম শুরু হয় ১২ ডিসেম্বর।

স্বাধীন বাংলার প্রথম জনসভায় বক্তৃতা করেন তাজউদ্দিন আহমেদ

১১ ডিসেম্বর বাঙালি জাতির একটি স্মরণীয় দিন। আর যশোরবাসীর জন্য এ দিনটি গৌরব ও অহংকারের। এ দিন যশোরের মাটিতে পাক হানাদারবাহিনীর কবলমুক্ত স্বাধীন বাংলার প্রথম জনসভা হয়। ভাষণ দিয়েছিলেন মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ।

১৯৭১ সালের ১১ ডিসেম্বর যশোর টাউন হল ময়দানে এ বিজয় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। মুক্তবাংলার প্রথম এ জনসভায় প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ সমবেত জনতার উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘আর ধ্বংস নয়, যুদ্ধ নয়। এই মুহূর্তে কাজ হলো যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে গড়ে তোলা।’

সেদিন তিনি সর্বস্তরের মানুষকে স্বাধীনতাযুদ্ধের চেতনায় দেশ পুনর্গঠনে আত্মনিয়োগ করার আহ্বান জানিয়েছিলেন।

অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামসহ জনসভায় অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সংসদ সদস্য ফণিভূষণ মজুমদার, রওশন আলী, মোশাররফ হোসেন, তবিবর রহমান সরদার, এমআর আকতার মুকুল ও জহির রায়হান প্রমুখ।

জনসভায় প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ যশোরের তৎকালীন ডিসি ওয়ালি উল ইসলাম এবং কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কাঞ্চন ঘোষালকে নির্দেশ দেন, আইনশৃঙ্খলায় যেন কোনও অবনতি না হয়।

একইসঙ্গে জনতাকে আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আপনারা আইন নিজের হাতে তুলে নেবেন না। অপরাধী যেই হোক তাকে আইনের হাতে সোপর্দ করবেন।’

বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স’র (বিএলএফ) ডেপুটি প্রধান রবিউল আলম ওই সমাবেশে ছিলেন। তিনি জানান বক্তব্যের এক পর্যায়ে তাজউদ্দিন আহমেদ বলেছিলেন, ‘স্বাধীন এ দেশে ধর্ম নিয়ে আর রাজনীতি চলবে না। আর তাই জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ ও নেজামে ইসলামকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলো।’

মুক্ত স্বদেশের মাটিতে অনুষ্ঠিত প্রথম এ জনসভার খবর সংগ্রহের জন্য উপস্থিত ছিলেন লন্ডনের ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকার সাংবাদিক পিটার গিল, নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকার সিডনি এসএইচ সানবার্গ, ওয়াশিংটন পোস্ট’র প্রতিনিধিসহ বহু বিদেশি সাংবাদিক।

এর আগে ৬ ডিসেম্বর বিকালের মধ্যেই যশোর শহর থেকে হানাদার বাহিনী পালিয়ে চলে যায়। এদিন বিকালে মিত্র বাহিনীর কমান্ডার জেনারেল বারাতের নেতৃত্বে মিত্র ও মুক্তিবাহিনী সেনানিবাসে প্রবেশ করে দখল নেয়। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে মুক্তির আনন্দে উচ্ছ্বসিত মুক্তিযোদ্ধা-জনতার ঢল নামে শহরে। পাড়া মহল্লায়ও চলে খণ্ড খণ্ড আনন্দ মিছিল। মুক্তির আনন্দে ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে আনন্দে উল্লাস করে গোটা জেলার মানুষ। 

এরপর ১১ ডিসেম্বর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ পেট্রাপোল-বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করে যশোরে আসেন।

১১ ডিসেম্বর জনসভার বিষয়ে কথা হয় তৎকালীন তরুণ মুক্তিযোদ্ধা ইয়াকুব কবিরের সঙ্গে। জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক মুক্তিযোদ্ধা ইয়াকুব কবির বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা বেশ উত্তেজিত ছিলাম। সকাল থেকেই যশোর টাউন হল মাঠে অবস্থান করতে থাকি। নেতারা বেনাপোল দিয়ে যশোরে প্রবেশ করেন। আমরা ক’জন মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ, অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামসহ নেতাদেরকে সার্কিট হাউজের সামনে থেকে স্বাগত জানিয়ে সভাস্থলে আনি।’

তিনি বলেন, ‘প্রথমে তাদের ভুল-ভালভাবে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। আমরা তখন নতুন; নিয়ম-কানুন তেমন একটা বুঝি না। তাই, কেউ কিছু মনেও করেননি।’

নেতারা কী কী বলেছিলেন তা স্পষ্ট মনে করতে পারেননি এ মুক্তিযোদ্ধা। তবে, নেতারা স্বাধীন বাংলার প্রথম জেলা যশোরে উপস্থিত হয়ে বেশ উচ্ছ্বসিত ছিলেন। নেতারা সমাগতদের উদ্দেশে প্রতিহিংসাপরায়ণ না হতে, কারও কোনও ক্ষতি না করা, প্রশাসনে সহযোগিতা এবং সবাইকে সুশৃঙ্খল থাকার নির্দেশনা দিয়েছিলেন বলে জানান তিনি।

জনসভায় তিনি ছাড়াও মুক্তিযোদ্ধা রবিউল আলম, মোহাম্মদ আলী স্বপনসহ বহু সতীর্থ উপস্থিত ছিলেন।

তথ্যসূত্র:

১.   যশোরের মুক্তিযোদ্ধাদের সাক্ষাৎকার

২.   ‘মুক্তিযুদ্ধে যশোর’- আসাদুজ্জামান আসাদ

৩.  ‘যশোর গেজেটিয়ার’

৪.   ‘পুলিৎজার বিজয়ী সাংবাদিক সিডনির চোখে যশোরের মুক্তিযুদ্ধ’-৬ ডিসেম্বর ২০১৪, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা

৫.   বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত যশোরের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে প্রকাশিত সংবাদ ও নিবন্ধ

 

 

/এনআই/

লাইভ

টপ