৩৫৬ পাকিস্তানি সেনার আত্মসমর্পণে মুক্ত হয় চাঁদপুর

Send
ইব্রাহিম রনি, চাঁদপুর
প্রকাশিত : ০৭:৫৮, ডিসেম্বর ০৮, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ০৭:৫৯, ডিসেম্বর ০৮, ২০১৭

চাঁদপুরের বড় স্টেশন মোলহেডে নির্মিত স্মারকস্তম্ভ রক্তধারামুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস চাঁদপুরে ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ আর তাণ্ডব চালায় পাকিস্তানি বাহিনী। শহরে তারা আটটি টর্চার সেল স্থাপন করে। এসব সেলে মুক্তিযোদ্ধা, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী, সমর্থক ও তাদের পরিবারের সদস্য এবং হিন্দুদের ধরে এনে দিনের পর দিন অকথ্য নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করা হতো। এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, এই ৮ সেলেই ১৫ হাজারের বেশি মানুষকে হত্যা করে হানাদার বাহিনী। এছাড়া, নারীদের ধরে এনে এসব সেলে আটকে রেখে দিনের পর দিন ধর্ষণ করা হতো। পরে হত্যা করে তাদের লাশ জেলার বিভিন্ন নদীতে ভাসিয়ে দিত পাকিস্তানি সেনারা। তাদের এ বর্বরতার অবসান ঘটে ৮ ডিসেম্বর। এদিন ৩৫৬ জন পাকিস্তানি সেনা  মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে আত্মসমর্পণ করে। মুক্ত হয় চাঁদপুর।  

মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ৪ এপ্রিল দুটি সেভারজেট বিমান থেকে সারা চাঁদপুর শহরে শেলিংয়ের মাধ্যমে প্রথম আক্রমণ চালায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। এতে পুরান বাজার ও বড় স্টেশন এলাকায় দুজন শহীদ হন। তারও আগে ২৮ মার্চ চাঁদপুরে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। শহরের মহিলা কলেজে মুক্তিবাহিনী হেডকোয়ার্টার স্থাপন করে। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের পরপরই চাঁদপুরে সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে শুরু হয় সশস্ত্র যুদ্ধের প্রশিক্ষণ। সংগঠিত হতে শুরু করেন স্বাধীনতাকামী মানুষজন।

স্মৃতিস্তম্ভ অঙ্গীকার৮ এপ্রিল বিকালে হানাদার সদস্যরা বিশাল গাড়ি বহর নিয়ে কুমিল্লা সেনানিবাস থেকে চাঁদপুরের উদ্দেশে যাত্রা  শুরু করে। পথে  মুদাফফরগঞ্জ ও হাজীগঞ্জে মুক্তিবাহিনীর আক্রমণের মুখে পড়ে তাদের গাড়িবহর। এ আক্রমণে হতচকিত হয়ে চাঁদপুর শহরের অদূরে সরকারি কারিগরি উচ্চ বিদ্যালয়ে গিয়ে আশ্রয় নেয় পাকিস্তানি সেনারা। এসময় পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তারা ওয়াপদা রেস্ট হাউস এবং জেলা পরিষদের ডাকবাংলোতে অবস্থান নেয়।

এরপর মুক্তিযুদ্ধের পুরোটা সময়জুড়েই একদিকে চলতে থাকে হানাদার বাহিনীর নৃশংসতা। অন্যদিকে, প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তাদের জবাব দিতে থাকেন মুক্তিযোদ্ধারা। বিভিন্ন স্থানে মার খেতে থাকে হানাদারেরা।

চাঁদপুরের বড় স্টেশন, টেকনিক্যাল স্কুল, ওয়াপদা রেস্ট হাউস, পুরানবাজার পুলিশ ফাঁড়িসহ আটটি স্থানে টর্চার সেল তৈরি করে হানাদার বাহিনী। এসব টর্চার সেলে মুক্তিযোদ্ধাসহ আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থক ও হিন্দুদের ধরে এনে হত্যা, নির্যাতন এবং নারীদের ধর্ষণ করে হত্যার পর ডাকাতিয়া, মেঘনা ও পদ্মা নদীতে লাশ ফেলে দিতো তারা। মুক্তিযোদ্ধাদের এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, চাঁদপুরের আটটি টর্চার সেলে ১৫ হাজারের বেশি মানুষকে হত্যা করে পাকিস্তানি বাহিনী।

৭ ডিসেম্বর চিতোষী, হাজীগঞ্জ, মুদাফরগঞ্জ, বাবুরহাট, ফরিদগঞ্জ ইত্যাদি এলাকায় মুক্তিবাহিনী ও মিত্র বাহিনীর তীব্র আক্রমণের মুখে হানাদার বাহিনী টিকতে না পেরে গভীর রাতে নৌপথে পালিয়ে যেতে থাকে। ৮ ডিসেম্বর সকালের দিকে মিত্র বাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধারা ট্যাংক নিয়ে চাঁদপুর প্রবেশ করেন। ১৯৭১ সালের এই দিনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করে মুক্তিযোদ্ধারা চাঁদপুর অঞ্চলকে শত্রুমুক্ত করেন। ৩৫৬ জন পাকিস্তানি হানাদার সেদিন মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে আত্মসমর্পণ করে। মুক্ত হয় চাঁদপুর।  ৮ ডিসেম্বর চাঁদপুর মুক্ত দিবস হিসেবে পালন করা হয়।

৮ ডিসেম্বর চাঁদপুরে প্রবেশ করা মিত্র বাহিনীর প্রথম ট্যাংকের দায়িত্বে ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা জীবন কানাই চক্রবর্তী। সেদিনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, মিত্র বাহিনীর প্রথম ট্যাংকে আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। চাঁদপুরে আমি প্রথম আসি। এরপর এই ট্যাংক বড় স্টেশনের দিকে যায়। এ সময় লোকজন খবর দেয় দুটি জাহাজ ঢাকার দিকে যাচ্ছে। এ সময় আমরা তাদের ওপর আক্রমণের চেষ্টা চালাই। কিন্তু তারা ছিল ট্যাংকের রেঞ্জের বাইরে। পরে ভারতীয় বিমান বাহিনীকে আহ্বান করা হলে তারা এসে আক্রমণ করে। একপর্যায়ে সবচেয়ে বড় জাহাজটিতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। অবস্থা বেগতিক দেখে জাহাজের ৩৫৬ জন পাকিস্তানি হানাদার সদস্য আত্মসমর্পণ করে। পরে তাদের চাঁদপুরের কোড়ালিয়ার উল্টো দিকের একটি চর থেকে শহরের নৌ টার্মিনালে আনা হলে বিক্ষুব্ধ জনতা তাদের ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু করে। পরে মিত্র বাহিনীর সদস্যরা তাদের নিয়ে যায় এবং জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এদিন চাঁদপুর থানার সামনে বিএলএফ বাহিনীর প্রধান রবিউল আউয়াল কিরণ চাঁদপুরে প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন।

জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমান্ডার এম এ ওয়াদুদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের পর থেকে বিভিন্ন গ্রামে প্রশিক্ষণ শুরু হয়। বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সংগ্রাম কমিটির নেতৃত্বে অস্ত্র নিয়ে আমরা সবাই পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করি। ’

তিনি আরও বলেন, ‘চাঁদপুরের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয় ২৮ মার্চ। শহরের মহিলা কলেজে আমাদের হেডকোয়ার্টার করা হয়। ৭ এপ্রিল চাঁদপুরে পাকিস্তানি বাহিনী বিমান হামলা করে। এতে পুরাণবাজারে এক নারী নিহত হন। কুমিল্লা থেকে হানাদার বাহিনীর বিরাট একটি দল টেকনিক্যাল স্কুলে এসে অবস্থান নেয়। সেখান থেকে ওইদিন রাতে চাঁদপুর শহরে হামলা চালায় তারা। এ অবস্থায় শহর থেকে সব লোকজন সরিয়ে আমরা সারারাত যুদ্ধ করি। এক পর্যায়ে আমাদের গোলাবারুদ শেষ হয়ে যাওয়ায় পরদিন সকাল ৮টার দিকে আমরা ফরিদগঞ্জ উপজেলার পাইকপাড়া হাইস্কুলে নতুন ক্যাম্প করি। এই ফাঁকে পাকিস্তানি বাহিনী চাঁদপুর শহরে ঢুকে পড়ে। এরপর অসংখ্য যুদ্ধের পরে আমরা আবার ৮ ডিসেম্বর চাঁদপুরকে শত্রুমুক্ত করে আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই।’

তিনি জানান, ৭ ডিসেম্বর মিত্র বাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে শাহরাস্তি ও সদরের চাঁনখারপুল এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধ হয়। শেষ পর্যন্ত হানাদার বাহিনী পরাজিত হয়। প্রায় ২০০ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন।

চাঁদপুরে যারা শহীদ হয়েছেন তাদের স্মরণে শহরে লেকের ওপর দৃশ্যত ভাসমান স্মৃতিস্তম্ভ ‘অঙ্গীকার’, চাঁদপুরের প্রথম চার জন শহীদের স্মরণে ‘মুক্তিসৌধ’, শহরের পাঁচ রাস্তার মোড়ে সব শহীদের স্মরণে ‘শপথ ফোয়ারা’ ও চাঁদপুর বড় স্টেশনের বধ্যভূমিতে ‘রক্তধারা’ নির্মাণ করা হয়েছে।

 

/এসএসএ/এএম/

লাইভ

টপ