দেশ স্বাধীন হলেও রাজবাড়ী মুক্ত হয় ১৮ ডিসেম্বর

Send
রাজবাড়ী প্রতিনিধি
প্রকাশিত : ১৮:৫৯, ডিসেম্বর ১৩, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ২১:২৭, ডিসেম্বর ১৩, ২০১৭

 শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণে স্মৃতিস্তম্ভ

 

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হলেও রাজবাড়ী মুক্ত হয় ১৮ ডিসেম্বর। কারণ  এখানে বিহারী, পাকিস্তানী বাহিনী ও রাজাকারা এক হয়ে যুদ্ধ অংশ নেয়। তাই ১৬ তারিখ দেশ স্বাধীন হলেও রাজবাড়ী বিহারী ও রাজকারদের দখলে থাকায় ও তারা আত্মসমর্পণ না করায় রাজবাড়ী মুক্ত হতে দেরি হয়।

পতাকা উত্তোলন: রাজবাড়ীতে সর্ব প্রথম স্বাধীনতার পতাকা উড়ান আওয়ামী লীগ নেতা নাজিবর রহমান। তার সঙ্গে ছিলেন লতিফ বিশ্বাস , আমজাদ হোসেন, চিত্তরঞ্জন গুহ, ফরিদ আহম্মেদ। মজিব বিল্ডিং এর উপরে ৭ মার্চ মহান স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন করা হয়।

রাজবাড়ীতে যুদ্ধ:৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে ঐতিহাসিক ভাষণ দেন তাতে তিনি পরিষ্কারভাবে নিজেদের প্রস্তুত করার নির্দেশ দেন। এর ওপর ভিত্তি করে এ দেশের মুক্তিকামী মানুষ নিজেদের প্রস্তুত করতে শুরু করে। ২৫ মার্চ পাকিস্তানী বাহিনীর আক্রমণের পর সারাদেশে স্বাধীনতার যুদ্ধ শুরু হয়। এসময় রাজবাড়ী জেলা শহরের রেলওয়ে মাঠে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ শুরু হয়। ১৯৭১ সালের ২১ এপ্রিল ভোর ৫টার দিকে পাকিস্তানী বাহিনীরা গান বোটে করে পদ্মা নদী পার হয়ে গোয়ালন্দ ঘাট দিয়ে রাজবাড়ী শহরে ঢুকে। এই খবর নিমিষে রাজবাড়ী শহর ও গ্রামগঞ্জে ছাড়িয়ে পরে। সাধারণ মানুষ তখন শহর থেকে গ্রামে গিয়ে আশ্রয় নিতে থাকে। আর বিহারীরা অস্ত্র হাতে সাধারণ মানুষকে হত্যার জন্য শহরে নেমে পরে। অন্যদিকে পাকিস্তানী বাহিনী রাজবাড়ী শহরে ঢোকার সময় রাস্তার আশপাশের বাড়ি-ঘর আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। বাজারে আগুন লাগিয়ে দেয়। তখন রাজবাড়ীতে শুধু আগুন আর আগুন। সে সময় পাকিস্তানী বাহিনী ও বিহারীরা হাজার হাজার নারী-পুরুষকে নির্মমভাবে হত্যা করে। রাজবাড়ীতে থেকে অনেকে ভারতে গিয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়। ভারতে ট্রেনিং শেষে ১১ জনের একটি গ্রুপ অস্ত্র নিয়ে বাংলাদেশে আসেন। ওই প্লাটুনের কমান্ডার ছিলেন, বাকাউল আবুল হাসেম। তিনি তার গ্রুপ নিয়ে রাজবাড়ী শহর থেকে ৩/৪ মাইল ভিতরে রশোড়া গ্রামে মুক্তি বাহিনীর ক্যাম্প স্থাপন করেন। তার পাশে আরও  একটি ক্যাম্প ছিল জলিল মিয়ার ক্যাম্প ।

পাঁচুরিয়ায় ছিল ইসলাম কমান্ডারের ক্যাম্প। নদীতে ছিল কামরুল হাছান লালন  এর ক্যাম্প। মাটি পাড়ায় ছিল মজিব বাহিনীর সিরাজ আহমেদ এর ক্যাম্প। রাজবাড়ীতে মোটামুটি  ৮টি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ করেন। তারপরও পাংশা ও কুষ্টিয়া থেকে আরও কয়েকটি গ্রুপ রাজবাড়ীতে এসে যুদ্ধে অংশ নেয়। রাজবাড়ীতে অনেক বড় ধরনের যুদ্ধ হয়।

রাজবাড়ীতে মুক্তিযুদ্ধে যারা শহীদ হন: আব্দুল আজিজ খুশি, আ. ছাদেক, পাংশার আ. রফিক, আ. শফিকসহ আরও অনেকে শহীদ হন। যুদ্ধে আহত হন বাকাউল আবুল হাসেম,  ইলিয়াছ মিয়া,  শহিদউদ্দিন, আ. গফুর ও হাতেম আলীসহ অনেকে।

মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণে স্মৃতিসৌধ

মুক্তিযোদ্ধা এস এম নওয়াব আলী বলেন, ‘১৯৭১ সালে রাজবাড়ী সরকারি কলেজে পড়া অবস্থায় বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে আমি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেই। তৎকালীন গোয়ালন্দ সাব ডিবিশনের হাইকমান্ড জিল্লুল হাকিম কমান্ডার এবং আব্দুল মালেকের আন্ডারে দেশ মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ করি। শহীদ আব্দুল আজিজ খুশি আমার বন্ধু ছিল। সে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালিন সময় নভেম্বর মাসে জেলা সদরের আহলাদীপুর ব্রিজের কাছে রাজাকারদের গুলিতে শহীদ হয়। সারা বাংলাদেশ ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দেশ শত্রুমুক্ত হলেও রাজবাড়ী তখনো বিহারীদের দখলে ছিল। পরে যশোরের আকবর বাহিনী, পাংশার জিল্লুল হাকিমের বাহিনীসহ অন্য জায়গা থেকে  আসা মুক্তিযোদ্ধারা  সম্মিলিতভাবে যুদ্ধ করে রাজবাড়ীকে শত্রুমুক্ত করে। নতুনদের প্রতি আমাদের প্রত্যাশা  ‘তারা যেন স্বাধীনতার চেতানাকে ধারণ করে, বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলাদেশ গড়ে তুলে।’

জেলা সদরের খানখানাপুর এলাকার মুক্তিযোদ্ধা রেজাউল করিম লাল বলেন,‘স্বাধীনতা যুদ্ধ ছিল বাঙালির অস্তিত্বের যুদ্ধ। তখন আমরা কলেজে পড়ি। আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে রাজবাড়ী থেকে হেঁটে ইন্ডিয়ায় কাজী হেদায়েত হোসেন কল্যানি ক্যাম্পে যাই। সেখানে ১৫ দিন থাকার পর উত্তর প্রদেশের দেরাদুনে মুজিব বাহিনীর  ট্রেনিং এ যাই। সেখানে আমাদের অস্ত্র নিয়ে ট্রেনিং দেওয়া হয়। ট্রেনিং শেষে আমাদের কলকাতায় নিয়ে আসা হয়। কলকাতার ব্যারাকপুর থেকে আমাদের অস্ত্র দেওয়া হয়। দেশে ঢুকে আমাদের টার্গেট ছিল রাজবাড়ী। রাজবাড়ীতে এসে সবাই এক হই এবং তখন আমাদের লিডার ছিল সিরাজ ভাই। সিরাজ ভাইয়ের নেতৃত্বে আমরা রাজবাড়ীতে যুদ্ধ করি।’

রাজবাড়ী জেলার পাংশা থানার মুক্তিযোদ্ধা নাসিরুল হক সাবু জানান,‘স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রাক্কালে একদিন আমরা ১০/১২ জন যুবক স্থানীয় অরূপ দত্তের বাড়িতে বসে ছিলাম। সে সময় রেডিওতে একটা গান বাজলো ‘মোরা একটি ফুল কে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি-মোরা একটি ফুলের হাসির জন্য অস্ত্র ধরি’ সেদিনই আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম আমরা যুদ্ধ করবো। তারপরের দিন আমরা ভারতে উদ্দেশে রওনা দেই। পরে ভারতের বনগ্রাম ট্রেনিং সেন্টারে গিয়ে ভর্তি হই। সেখান থেকে আমাদের চাকরিয়ায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেখানে ২৬ দিন ট্রেনিং নেই। তারপর যশোরের বুনোগাতিতে গিয়ে যুদ্ধ করি। ওই যুদ্ধে ২১ জন রাজাকার ও পাকিস্তানী বাহিনী মারা যায়। পরে ৮ নম্বর সেক্টরে আমরা মেজর মঞ্জুর আন্ডারে যুদ্ধ করি। পরে রাজবাড়ীতে এসে পাকিস্তানী বাহিনী ও বিহারীদের সঙ্গে আমাদের যুদ্ধ হয়। সেখানে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা আহত হয়।

তিনি আরও বলেন,‘একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গর্ববোধ করি। নতুন প্রজন্মের সঠিক ইতিহাস জানা দরকার। দেশের জন্য, জাতির জন্য, নতুন প্রজন্মকে গড়ে তুলতে হবে।’

 আরও পড়ুন: স্মৃতিসৌধ নির্মিত না হওয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে শহীদদের স্বারক চিহ্নগুলো

/জেবি/

লাইভ

টপ