নিহত পুতুর পরিবারের সবাই মাদক ব্যবসায় জড়িত

Send
নাজমুল হুদা নাসিম, বগুড়া
প্রকাশিত : ২১:৫৩, জুলাই ১৩, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ২৩:০৯, জুলাই ১৩, ২০১৮

নিহত পুতু সরকারবগুড়ায় ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত মাদক ব্যবসায়ী পুতু সরকারের পুরো পরিবারই বছরের পর বছর ধরে মাদক ব্যবসায়ে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ব্যবসা ছাড়াও ক্ষমতাসীন দলের প্রভাব খাটিয়ে ভূমি দখল, জুয়া, চাঁদাবাজিসহ নানান বেআইনি কর্মকাণ্ডেরও অভিযোগ রয়েছে পরিবারটির বিরুদ্ধে। কিশোরী ধর্ষণের মামলায় কারাগারে বন্দি বগুড়ার আলোচিত শ্রমিক লীগ নেতা তুফান সরকার হালো নিহত পুতু সরকারের  ভাই। ২০১৭ সালের ২৮ জুলাই তুফানকে গ্রেফতার করা হয়।

উল্লেখ্য, বৃহস্পতিবার (১২ জুলাই) দিবাগত রাতে পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয় মাদক ব্যবসায়ী পুতু সরকার।

পুতু সরকারের বাবার নাম মজিবর রহমান। সে বগুড়া শহরের চকসুত্রাপুর এলাকায় রিকশা চালাতো। পরে চামড়ার ব্যবসা শুরু করে। মজিবর রহমানের সাত ছেলেরা হলো— জাহাঙ্গীর সরকার, মতিন সরকার, পুতু সরকার, ঝুমুর সরকার, সোহাগ সরকার, ওমর সরকার ও  তুফান সরকার।

বগুড়া সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) সনাতন চক্রবর্তী ও অন্যরা জানান, মতিন ও তুফান সরকারের সহোদর পুতুর বিরুদ্ধে সদর ও শিবগঞ্জ থানায় মাদক আইনে পাঁচটি মামলা রয়েছে। সে জেলার শীর্ষ তালিকাভুক্ত মাদক ব্যবসায়ী।

পুলিশ ও নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এলাকাবাসীরা জানিয়েছে, সাত ভাইয়ের মধ্যে জাহাঙ্গীর সরাসরি রাজনীতি ও মাদক ব্যবসায় জড়িত নয়। অন্য সবাই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের যুব ও শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। এই পরিবারের সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসা করে আসছে।বগুড়ায় ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতি আওয়ামী লীগ ও যুবলীগে বিভক্ত হওয়ায় এ পরিবারকে প্রয়োজনে ব্যবহার করা হয়। এ সুযোগে তারা ভূমি দখল, জুয়া, চাঁদাবাজি, খুন, চোরাচালান, অস্ত্রবাজি, মাদক ব্যবসা করে থাকে। ভাইদের কেউ কেউ অল্প সময়ে কোটিপতি হয়ে গেছে। প্রশাসনের কর্মকর্তা ও দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা এসব জানলেও কেউ কখনও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি।

বগুড়ায় মাদক ব্যবসায়ী ও শহর  শ্রমিক লীগের আহ্বায়ক তুফান সরকার ২০১৭ সালের ১৭ জুলাই  কলেজে ভর্তির নামে এক ছাত্রীকে চকসুত্রাপুরের বাড়িতে ডেকে নিয়ে ধর্ষণ করে। হত্যার হুমকি দেওয়ায় ওই ছাত্রী এ ঘটনা কাউকে জানাতে পারেনি। তুফানের স্ত্রী আশা খাতুন ঘটনা জানতে পেরে উল্টো ওই ছাত্রীকে দোষারোপ করে। এরপর আশা খাতুন ২৮ জুলাই সন্ত্রাসী পাঠিয়ে ওই ছাত্রী ও তার মাকে বাড়ি থেকে তুলে এনে  পৌর কাউন্সিলর মার্জিয়া হাসান রুমকির (আশার বোন) বাড়িতে আটকে রাখে। সেখানে মা ও মেয়েকে মারধর, শ্লীলতাহানী এবং মাথা ন্যাড়া করে দেওয়া হয়। ঘটনাটি জানাজানি হলে তোলপাড় শুরু হয়। ছাত্রীর মা সদর থানায় ১০ জনের নামে মামলা করেন। পুলিশ ২-৩ দিনের অভিযানে তুফান সরকার, তার স্ত্রী আশা, শ্যালিকা পৌর কাউন্সিলর রুমকি, শাশুড়ি রুমাসহ কয়েকজনকে গ্রেফতার করে। তাদের বিরুদ্ধে চার্জশিট হয়েছে। তুফানকে শ্রমিক লীগ থেকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়। স্থানীয় সরকার রুমকিকে কাউন্সিলর পদ থেকে সাময়িক বরখাস্ত করে।  আসামিদের অনেকে জামিনে বের হলেও তুফান বর্তমানে জেলে আছে। তার বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টাসহ কয়েকটি মামলা রয়েছে।

এ ঘটনার পর তুফানের ভাই মতিন সরকারকেও শহর যুবলীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়। তার বিরুদ্ধে একাধিক হত্যা ও অস্ত্র মামলা আছে। বেশ কয়েক বছর আগে অস্ত্রসহ গ্রেফতার হয়েছিল মতিন। ওই মামলায় তার ২৭ বছর সাজা হয়। এছাড়া, র‌্যাব সদস্যরা তাকে মাদক, জুয়ার সরঞ্জাম ও নগদ টাকাসহ গ্রেফতার করে। পরবর্তীতে দলীয় প্রভাবে ও অর্থের বিনিময়ে ওইসব মামলা থেকে খালাস পায় সে। মতিনকে গ্রেফতার করায় এক র‌্যাব কর্মকর্তাকে চট্টগ্রামে শাস্তিমূলক বদলি হতে হয়েছিল। শহরের চকসূত্রাপুর এলাকার উজ্জ্বল নামে এক যুবককে হত্যা মামলায় মতিন সরকার প্রধান আসামি ছিল। মতিন প্রকাশ্যে চলাফেরা ও ডিসি-এসপির সঙ্গে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিলেও আদালত থেকে তাকে পলাতক দেখানো হয়। সরকারি খরচে তার জন্য একজন স্টেট ডিফেন্স নিয়োগ ছিল।  যুবলীগ থেকে মতিনকে বহিষ্কার করলে পুলিশ তাকে গ্রেফতারের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল নেতাদের পরামর্শে মতিন আদালতে আত্মসমর্পণ ও পরে জামিনে ছাড়া পান। সম্প্রতি মতিন সরকার প্রধানমন্ত্রীর দাওয়াতে ইফতার মাহফিলে অংশ নেওয়ায় বগুড়াবাসী হতবাক হয়েছেন।

বগুড়ার দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তারা বলেছেন, পুতু সরকারের পুরো পরিবারই মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তারাই জেলার শীর্ষ  মাদক ব্যবসায়ী। ক্ষমতাসীন দলের ছত্রছায়ায় থাকায় ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তাদের গ্রেফতার করা সম্ভব হয় না।

এদিকে মাদক ব্যবসায়ী পুতু সরকার নিহতের ঘটনায় সদর থানার এসআই আবদুল জোব্বার শুক্রবার (১৩ জুলাই) বিকালে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে গুলি, নেশা জাতীয় ট্যাবলেট হেফাজতে রাখা ও একই উদ্দেশ্যে হত্যা করায় অজ্ঞাত সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে একটি মামলা (নম্বর-৬৩) করেন। সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) কামরুজ্জামান মিয়া জানান,  মামলা রেকর্ড করা হয়েছে।

সদর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ ইন্সপেক্টর ফরিদ উদ্দিন জানান, শুক্রবার দুপুরে বগুড়া শজিমেক হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে পুতুর লাশ তার বাবা মজিবর সরকারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বাদ আসর চকসুত্রাপুর মাদ্রাসায় জানাজা শেষে তার লাশ নামাজগড় আঞ্জুমান করবস্থানে দাফন করা হয়।

পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ পুতু সরকারের মৃত্যুতে শহরের চকসুত্রাপুর এলাকাবাসীদের কোনও প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায়নি। কেউ এ ব্যাপারে কোনও মন্তব্য করতেও রাজি হননি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ২-৩ জন বলেছেন, পুলিশ ২ দিন আগেই পুতুকে গ্রেফতার করে। ‘বন্দুকযুদ্ধের’নামে তাকে হত্যা করা হয়েছে। এ ব্যাপারে পরিবারের কেউ কথা বলতে রাজি হননি। মেজো ভাই ‘বহিষ্কৃত’ শহর যুবলীগ নেতা মতিন সরকার ফোন ধরেননি। মতিনের বন্ধুরা জানিয়েছেন, পরিবারের সবাই শোকে মুহ্যমান। পুতুর মৃত্যুর ব্যাপারে কারও কোন বক্তব্য নেই।

আরও পড়ুন: সেই তুফান সরকারের ভাই পুতু ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত

 

/এনআই/এপিএইচ/

লাইভ

টপ