‘আগুনে সব পুড়ে ছাই, আছে খালি পরনের কাপড়টাই’

Send
হুমায়ুন মাসুদ, চট্টগ্রাম
প্রকাশিত : ০৭:৫৭, আগস্ট ১৩, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ০৭:৫৭, আগস্ট ১৩, ২০১৮

 

আগুনে সব হারিয়ে মাথায় হাত ক্ষতিগ্রস্ত নারীর‘গ্রামের বাড়িতে নতুন ঘর তুলবো, তাই ছেলেমেয়েদের ভালো কিছু না খাইয়ে টাকা জমিয়েছিলাম। আমার জমানো সব টাকা পুড়ে গেছে। মানুষের দেওয়া ২০টি নতুন কাপড় ছিলো। সেগুলোও পুড়ে ছাই হয়েছে। পরনের কাপড় ছাড়া এখন আর কিছুই নেই।’
কান্নাজড়িত কন্ঠে কথাগুলো বললেন দক্ষিণ হাতিয়া উপজেলার হাজেরা খাতুন। এক ছেলে ও তিন মেয়ে নিয়ে স্বামী পরিত্যক্তা এই নারী চট্টগ্রাম নগরীর চান্দগাঁও থানাধীন ফরিদারপাড়ার খন্দকার কলোনিতে থাকতেন। রবিবার (১২ আগস্ট) সকালে ওই কলোনিতে আগুন লাগে। এতে হাজেরা খাতুনের ঘরের আসবাবের সঙ্গে তার হাজারও কষ্টে জমানো সঞ্চয়ও পুড়ে ছাই হয়েছে।আগুনে সব হারিয়ে অঝোরে চোখের জল ফেলছেন ক্ষতিগ্রস্ত নারী
হাজেরা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মানুষের বাসায় কাজ করে বেতন যা পেতাম, সব জমিয়ে রাখতাম। ছেলেমেয়েদের কখনও ভালো কিছু কিনে দিতাম না। মানুষের দেওয়া খাবার এনে সবাই খেতাম। আমার ওই কষ্টের টাকা সব পুড়ে গেলো। এখন আমার সব কিছু শেষ। থাকবো কোথায়, খাবো কি, কিছুই জানি না।’
শুধু হাজেরা নন; ফরিদারপাড়ার খন্দকার কলোনিতে ঘটে যাওয়া অগ্নিকাণ্ডে তার মতো আরও ৪০টি পরিবার সব হারিয়ে এখন পথে বসেছে। কলোনিতে কাঁচা, আধা-পাকা মিলিয়ে প্রায় ৪০টি ঘর ছিল। একটি ঘরও আগুন থেকে রক্ষা পায়নি। প্রতিটি ঘরে একটি করে পরিবার থাকতো। হাজেরার মতো তারাও সর্বস্ব হারিয়েছে।
রবিবার দুপুরে খন্দকার কলোনিতে গিয়ে দেখা গেলো, পোড়া টিন-কাঠ-আসবাবের মাঝে সিমেন্টের খুঁটিগুলো কেবল মাথা উঁচু করে আছে। আর সব পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। ছাইয়ের স্তূপে নির্বাক হয়ে বসে থাকতে দেখা গেলো ঘরগুলোর বাসিন্দাদের।ছাইয়ের স্তূপে নির্বাক হয়ে বসে আছেন এক ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি
রংপুর জেলার জুলেখা বেগম গত ২৬ বছর ধরে এই কলোনিতে থাকেন। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ছেলেকে রেখে কাজে গিয়েছিলাম। আগুনে সব পুড়ে গেছে। ছোট ছেলে কিছুই বের করতে পারে নাই। আগুন লাগার পর ও দ্রুত বেরিয়ে যায়।’
জুলেখা আরও বলেন, ‘সকালে কাজ করার সময় বাসাওয়ালী আমাকে বলে খালা সাত নম্বর রোডের কোথায় নাকি আগুন লাগছে। আমি বলি, ভাবি, কয়েক দিন আগে একবার আমাদের কলোনিতে আগুন লেগেছে। আরেকবার লাগলে সব কিছু শেষ হয়ে যাবে। পাশে বস্তির একটা ছেলে ওই বাসায় ময়লা নিতে গিয়ে আমাকে বলে, তোমার ঘরের সবকিছু পুড়ে গেছে। এরপর এসে দেখি, সব পুড়ে গেছে। এখন পরনের জামাটাই খালি আছে।’
প্রায় ২২ বছর ধরে এই কলোনিতে বাস করে আসছেন রংপুরের জরিনা বেগম। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সকালে অন্যের বাসায় কাজ করতে গিয়েছিলাম। এসময় শুনতে পাই, আমাদের কলোনিতে আগুন লেগেছে। দ্রুত এসে দেখি, আগুনে সব পুড়ে গেছে। পরনের কাপড় ছাড়া আর কিছুই নেই।’আগুনে সব হারিয়ে দিশেহারা এক নারী
একই বস্তিতে তার দুই মেয়ে রহিমা বেগম ও আলেয়া বেগম তাদের পরিবার নিয়ে থাকেন। সর্বনাশা আগুনে তারাও সব কিছু হারিয়েছেন।
জরিনা বেগম বলেন, ‘এই কলোনিতে আমরা ৫ পরিবার থাকতাম। আমার দুই মেয়ে ও দুই বোন তাদের পরিবার নিয়ে এই কলোনিতে থাকতো। আগুনে তাদেরও সব কিছু পুড়ে গেছে।’
স্বামীকে নিয়ে খন্দকার কলোনিতে থাকতেন ভোলার মারজু আক্তার। আগুনে তার জমানো ৫০ হাজার টাকা, এক ভরি স্বর্ণ ও কাপড়চোপড় সব পুড়ে গেছে।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে মারজু বলেন, ‘স্বামী এবং এক মেয়েকে নিয়ে এই কলোনিতে থাকতাম। দু’জনে কাজ করি। আমি বাসাবাড়িতে কাজ করি, আর আমার স্বামী সিএনজি চালায়। ঘরে আমাদের জমানো ৫০ হাজার টাকা ছিল, এক ভরি স্বর্ণও ছিল। সব কিছু পুড়ে গেছে।’কিছু অংশ পোড়া একহাজার ও একশ’ টাকার কয়েকটি নোট হাতে এক নারী
কিছু অংশ পোড়া একহাজার ও একশ’ টাকার কয়েকটি নোট দেখিয়ে তিনি বলেন, ‘এই টাকাগুলো পেয়েছি। এগুলো ছাড়া আর কিছুই আগুনের হাত থেকে রক্ষা পায়নি। সব কিছু পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।’
গত সাত মাস ধরে এই কলোনীতে থাকছেন নোয়াখালীর বয়াচর এলাকার পারভিন। বাংলা ট্রিবিউনকে এই নারী বলেন, ‘আমার স্বামী রিকশা চালায়, গত কয়েক দিন ধরে সিএনজি অটোরিকশা চালানো শিখছেন। লাইসেন্সের জন্য ধার করে এনে ১০ হাজার টাকা বাসায় রেখেছিলাম। সব টাকা আগুনে পুড়েছে। এখন কিভাবে ধার শোধ করবো?’

/এমএ/

লাইভ

টপ