‘ধান চাষ এখন পাপ’

Send
হেদায়েৎ হোসেন, খুলনা
প্রকাশিত : ১২:৪৩, মে ২১, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:৫৭, মে ২১, ২০১৯

জমি থেকে ধান নিয়ে ফিরছেন কৃষকরা‘আর ধান চাষ করবো না। জমিতে ঘের কেটে  মাছ চাষ করবো। ধান চাষ এখন পাপ। রোপণের সময় বীজ সংকট, চারা বড় হলে পানি সংকট এবং কাটার সময় শ্রমিক সংকট। আর বিক্রির সময় দাম নেই। কোথায় যাবে কৃষক?’ এভাবেই হতাশার কথা জানালেন রূপসা খাজরা এলাকার কৃষক আনোয়ার হোসেন। শুধু আনোয়ারই নয়, খুলনার অধিকাংশ কৃষকই এবার ধান নিয়ে বিপাকে পড়েছেন।
খুলনা জেলায় এ বছর ৫৯ হাজার ৫৩০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। ইতোমধ্যেই ৯৯ শতাংশ জমির ধান কাটা হয়ে গেছে। এখন ধান নিয়েই বিপাকে কৃষক। সরকারিভাবে ধান-চাল সংগ্রহ চললেও স্বস্তিতে নেই কৃষক। কারণ কৃষকদের কাছ  থেকে সরাসরি ধান সংগ্রহের চেয়ে মিলারদের কাছ থেকে অনেকগুণ বেশি চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে কৃষকরাও সরকারি গুদামে ধান বিক্রি করতে তদবিরে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
খুলনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের পরিচালক কৃষিবিদ পঙ্কজ কান্তি মজুমদার বলেন,  ‘কৃষকের ভোগান্তির শেষ নেই। বেশি দামে শ্রমিক দিয়ে ধান কাটাতে হয়েছে। মাড়াই করতেও খরচ হয়েছে বেশ। খুলনা থেকে এবার ১৯৩০ মেট্রিকটন ধান পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এতোসব করে হতাশ কৃষক। কৃষক ঋণের টাকা শোধ করে সুদের চাপ থেকে মুক্ত হতে অনেকটা বাধ্য হয়েই কম দামেই ধান বিক্রি করছেন। আবার উপজেলা পর্যায়ে মধ্যস্বত্বভোগীরা কৃষকের নাম দিয়ে ধান বিক্রির একাধিক কার্ড হাতিয়ে নিয়েছেন বলেও অভিযোগও রয়েছে।
ডুমুরিয়া রংপুর ইউনিয়নের কৃষক মৃণাল বলেন,  ‘এবার প্রয়োজনের বাইরে ধান চাষ করিনি। গতবার অনেক ক্ষতি হয়েছে। আমার নামে ধান বিক্রির কার্ড হয়েছে, আর আমি জানি না। কার্ড দিয়ে কারা ধান বিক্রি করেছে, তাও জানি না। এলাকায় কিছু লোক রয়েছে। তারা খাদ্য অফিসে যোগযোগ করে কার্ড করে নেয়। তারা আবার গবিব কৃষকের কাছ থেকে কম দামে ধান কিনে মজুত রাখে।’

রূপসা উপজেলার কাজদিয়া গ্রামের রবিউল বলেন,  ‘সরাসরি ধান বিক্রি করতে গেলে ধানের আদ্রতায় সমস্যা হয়। সে ধান চলে না। কিন্তু খাদ্য অফিসের কিছু নিজস্ব লোক রয়েছে, তারা যে ধানই নেয়, তাই চলে।’

জমি থেকে ধান নিয়ে ফিরছেন কৃষকরারূপসা আজগড়া এলাকার জাফর বলেন,  ‘আস্তে আস্তে কৃষক ধানের আবাদ করা বাদ দেবে। দেশে ধান-চালের অভাব হয় না। কিন্তু বিদেশ থেকে এনে মজুত করলে তো দাম কমে যাবে। বারবার কৃষকরা মার খাচ্ছে। ধান লাগতে যে খচর তা ধান বিক্রি ওঠে না।’
খর্ণিয়া এলাকার জাহাঙ্গীর সরদার জানান, বছরের এই সময়ে শ্রমিক সংকট থাকে। কারণ এই সময়ে ইট ভাটায় বেশি টাকা দিয়ে শ্রমিক নেয়। অনেক শ্রমিক আবার অন্য পেশায় চলে গেছে। আবার অনেক শ্রমিকরা দল বেঁধে থাকে। তারা সবাই জোট বেঁধে দাম বেশি চায়। না হলে কেউ কাজ করবে না। ফলে বাধ্য হয়ে বেশি টাকা দিয়ে শ্রমিক নিতে হয়।
ডুমুরিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোসাদ্দেক হোসেন বলেন, ‘আমরা প্রকৃত কৃষকের তালিকা করে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে জমা দেবো।’
খুলনা জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯ সালের বোরো সংগ্রহ মৌসুমে খুলনার ৯টি উপজেলায় ধান-চাল সংগ্রহ চলছে। ধান ক্রয় কেন্দ্র না থাকায় শুধু দিঘলিয়া উপজেলায় কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান কেনা হবে না। ২৫ এপ্রিল থেকে শুরু হয়ে এই সংগ্রহ ৩১ আগস্ট পর্যন্ত চলবে। এই মৌসুমে খুলনায় আতপ  চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ ১ হাজার ৪২৭ মেট্রিকটন। আর সেদ্ধ চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ১৬ হাজার ৩৪৩ মেট্রিকটন। কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান ক্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ হয়েছে ১ হাজার ৯১৩ মেট্রিকটন। কেজি প্রতি আতপ চাল সংগ্রহ মূল্য ৩৫ টাকা, সেদ্ধ চাল ৩৬ টাকা। আর ধান সংগ্রহ মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ২৬ টাকা। জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের তালিকাভুক্ত ১৮১ জন মিলার চাল সংগ্রহের জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন। যারা এরই মধ্যে ২ হাজার ৫০০ মেট্রিকটন চাল সরবরাহ করেছেন। তালিকাভুক্ত কৃষক ছাড়া অন্য কোনও কৃষক ধান সরবরাহ করতে পারবেন না। একজন কৃষক সর্বনিম্ন ১২০ কেজি থেকে সর্বোচ্চ তিন টন পর্যন্ত ধান সরবরাহ করতে পারবেন। 
খুলনা জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মুহাম্মদ তানভীর রহমান বলেন, ‘লক্ষ্যমাত্রা পূরণে কিছুটা সময় লাগবে। তারপরও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আশাবাদী।’

 

/এসটি/

লাইভ

টপ