লালমোহন পৌরসভা ও ১১ ইউনিয়নে দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচন বন্ধ

Send
আহাদ চৌধুরী তুহিন, ভোলা
প্রকাশিত : ১৭:২৭, জুলাই ২১, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:৩৪, জুলাই ২১, ২০১৯

 

আগের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরাভোলার লালমোহন পৌরসভা ও ১১টি ইউনিয়নে এক যুগ ধরে নির্বাচন বন্ধ রয়েছে। সীমানা নির্ধারণের মামলার কারণে এসব এলাকায় নির্বাচন হচ্ছে না। এক ইউপি চেয়ারম্যানসহ একাধিক ইউপি সদস্য মৃত্যুবরণের পর তাদের শূন্য পদেও নির্বাচন হচ্ছে না। একই ব্যক্তি দীর্ঘ বছর ধরে ক্ষমতার চেয়ারে  থাকায় নাগরিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বাসিন্দারা। দ্রুত নির্বাচনের জোর দাবি জানিয়েছেন তারা।

জেলা নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, লালমোহন উপজেলার পশ্চিম চর উমেদ, কালামা, চরভূতা ও লর্ডহার্ডিঞ্জ ইউনিয়ন এবং লালমোহন পৌরসভা; তজুমদ্দিন উপজেলার বড় মংলচড়া ও সোনাপুর ইউনিয়ন; দৌলতখান উপজেলার চরপাতা ইউনিয়ন; চরফ্যাশন উপজেলার নুরাবাদ, আহাম্মদপুর, আসলামপুর ও ওমরপুর ইউনিয়নে সীমানা নির্ধারণ সংক্রান্ত জটিলতা নিয়ে মামলা থাকার কারণে দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচন বন্ধ রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে ভোলা জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. আলাউদ্দিন আল মামুন বলেন, ‘সীমানা নির্ধারণ সংক্রান্ত জটিলতায় উচ্চ আদালতে মামলা থাকার কারণে লালমোহন পৌরসভাসহ ১১টি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন করা যাচ্ছে না। এর আগে আমরা বন্ধ থাকা চারটি ইউনিয়নে মামলা নিষ্পত্তি হওয়ার পর নির্বাচন সম্পন্ন করেছি।’

নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, লালমোহন পৌরসভার সবশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে ২০১০ সালের ১০ ডিসেম্বর। এতে মেয়র পদে নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের এমদাদুল ইসলাম তুহিন। বরিশাল বিভাগের ২৪টি পৌরসভার প্রত্যেকটি ৯টি করে ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত হলেও লালমোহন পৌরসভার মেয়র তা ১২টি ওয়ার্ডে উন্নীত করার জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন। তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মন্ত্রণালয় ২০১৬ সালের ১৩ জুন লালমোহন পৌরসভাকে ১২টি ওয়ার্ডে উন্নীত করে গেজেট প্রকাশ করে। তারপরও এই পৌরসভায় নির্বাচন হচ্ছে না।

এ প্রসঙ্গে পৌর মেয়র এমদাদুল ইসলাম তুহিন বলেন,  ‘পাশের কালমা ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কিছু অংশকে পৌরসভার ১০ নম্বর, ৬ নম্বর ওয়ার্ডের কিছু অংশকে পৌরসভার ১১ নম্বর ও  চরভূতা ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডকে পৌরসভার ১২ নম্বর ওয়ার্ড করে গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে।’ সাড়ে তিন বছর আগে গেজেট প্রকাশ করা হলেও এখনও কেন নির্বাচন হচ্ছে না জানতে চাইলে মেয়র বলেন, ‘চরভূতা ইউনিয়নের এক ব্যক্তির সীমানা নির্ধারণের মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ার কারণে নির্বাচন হচ্ছে না।’

নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, লালমোহন উপজেলার তিনটি ইউপির সবশেষ নির্বাচন হয় ২০১১ সালের ৩১ মার্চ। এরমধ্যে কালমা ইউপির চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন মো. আকতার হোসেন, চরভূতা ইউপি চেয়ারম্যান আক্তারুজ্জান টিটব ও লর্ডহার্ডিঞ্জ ইউপিতে আবুল কাশেম মিয়া।

লালমোহন উপজেলার ৭নম্বর পশ্চিম চরউমেদ ইউনিয়নে সবশেষ নির্বাচন হয়েছে ২০০৩ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি। এতে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন আবু ইউসুফ। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত এই ইউনিয়নে আর কোনও নির্বাচন হয়নি। ২০১৮ সালে মৃত্যুবরণ করেন এই ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ড ইউপি সদস্য মো. মোহাসিন হাওলাদর। ২০১১ সালে ইউনিয়নটির একটি ভোটকেন্দ্র বিচ্ছিন্ন চর কচুয়াখালীতে স্থানান্তরের দাবি জানিয়ে সিরাজুল হক নামের এক ব্যক্তি উচ্চ আদালতে মামলা করেন।

এ প্রসঙ্গে ইউপি চেয়ারম্যান আবু ইউসুফ বলেন, ‘ইউনিয়নটিকে দুই ভাগে ভাগ করার কথা রয়েছে। যার কারণে নির্বাচন বন্ধ রয়েছে।’

২০০৩ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি তজুমদ্দিন উপজেলার সোনাপুর ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন হাসান মাসুদ বাবুল। প্রায় দেড় যুগ দায়িত্বে থাকার পর চেয়ারম্যান হাসান বাবুল এ বছরের ১২ মার্চ মারা যান। তার মৃত্যুর পর ৪নম্বর ওয়ার্ড ইউপি সদস্য মো. কামাল হোসেন প্যানেল চেয়ারম্যান হিসেবে বর্তমানে দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে ২০১৮ সালের ১৭ অক্টোবর মারা যান ১ নম্বর ওয়ার্ড ইউপি সদস্য আবুল খায়ের মাস্টার। তার আগে ২০১৪ সালের ৪ জানুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন ১, ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ড সংরক্ষিত মহিলা ইউপি সদস্য হাসনা বেগম। একই বছর ২৭ মে মারা যান ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ড সংরক্ষিত মহিলা ইউপি সদস্য মনোয়ারা বেগম।  

প্যানেল চেয়ারম্যান মো. কামাল হোসেন জানান, চেয়ারম্যান ও চার জন ইউপি সদস্য মৃত্যুবরণ করায় ভোটাররা তাদের নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। পাশের এলাকার সঙ্গে সীমানা নির্ধারণের মামলা থাকায় এখানেও নির্বাচন বন্ধ রয়েছে।

২০০৩ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি পাশের বড় মলংচড়ায় ইউনিয়ন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হন মো. নুরনবী সিকদার। তারপর থেকে এই ইউনিয়নে এখন পর্যন্ত আর কোনও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। এরমধ্যে ২০১৬ সালের জুন মাসে ১, ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সংরক্ষিত মহিলা ইউপি সদস্য খতেজা বেগম মারা যান। ২০০৫ সাল থেকে ৪, ৫ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সংরক্ষিত মহিলা ইউপি সদস্য আরজু আনাম পরিষদের সব দায়িত্ব পালনে অনুপস্থিত রয়েছেন। ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সংরক্ষিত মহিলা ইউপি সদস্য জান্নাতুল ফেরদাউস সরকারি চাকরি করার কারণে তিনিও পরিষদের কার্যের তালিকায় অনুপস্থিত রয়েছেন।

বড় মলংচড়ায় ইউপি চেয়ারম্যান মো. নুরনবী সিকদার বলেন, ‘২ নম্বর ওয়ার্ড ও পাশের সোনাপুর ইউনিয়নের চার নম্বর ওয়ার্ডের সীমানা নির্ধারণের জটিলতার মামলা থাকার কারণে এই ইউনিয়নে গত ১৬ বছরের বেশি সময় ধরে নির্বাচন হচ্ছে না।’

চরফ্যাশন উপজেলার নুরাবাদ ইউনিয়নে সর্বশেষ নির্বাচন হয়েছে ২০১১ সালের ২ জুন। এতে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন মো. মোস্তাফিজুর রহমান। একই ইউনিয়নের কিছু অংশ কেটে নতুন আহম্মদপুর ইউনিয়ন গঠন করা হয়। মামলার কারণে সেটিরও নির্বাচন বন্ধ রয়েছে। একই উপজলের আসলামপুর ইউনিয়নে ২০১১ সালের ২ এপ্রিল নির্বাচন হয়। চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন একেএম সিরাজুল ইসলাম। এই ইউনিয়নের কিছু অংশ কেটে নতুন ওমরপুর ইউপি গঠন করা হয়। সীমানা নির্ধারণের মামলা থাকায় এই ইউনিয়নেও নির্বাচন বন্ধ রয়েছে।

দৌলতখান উপজেলার চরপাতা ইউনিয়নে সবশেষ নির্বাচন হয়েছে ২০১১ সালের ২৯ মার্চ। চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন আওয়ামী লীগের মোশারফ হোসেন। বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ তুলে চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে মামলা থাকার কারণে তাকে অপসারণ করা হয়। ২০১৭ সালের ২২ জুন থেকে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করে আসছেন ৫ নম্বর ওয়ার্ড ইউপি সদস্য মো. হেলাল উদ্দিন। ২০১৭ সালের ২৮ ডিসেম্বর এই ইউনিয়নে ভোটগ্রহণের তারিখ থাকলেও তা বন্ধ হয়ে যায়।

সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আবু তাইয়েব বলেন, ‘জনগণের মৌলিক চাহিদা আদায়ের জন্য শিগগিরই এ ইউনিয়নে নির্বাচন দেওয়া হোক।’ 

 

/এনআই/

লাইভ

টপ