বিনিয়োগে বাধার শিকার খুলনার নতুন উদ্যোক্তারা

Send
খুলনা প্রতিনিধি
প্রকাশিত : ০৭:৫০, সেপ্টেম্বর ১১, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ০৭:৫০, সেপ্টেম্বর ১১, ২০১৯

উদ্যোক্তাখুলনায় সরকারি দফতরের কর্মকর্তাদের সহযোগিতা ও আন্তরিকতার অভাবে নতুন উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে নানা ভোগান্তির মুখে পড়ছেন। নিবন্ধন বা লাইসেন্স পেতে উদীয়মান উদ্যোক্তারা প্রতিটি ধাপেই বাধা পাচ্ছেন। ঘুষ ছাড়া কোনও কাজই হচ্ছে না। অভিযোগ রয়েছে- বিনিয়োগে আগ্রহী উদ্যোক্তারা সরকারি বিভিন্ন দফতরে বাড়তি টাকা না দিয়ে কোনও কাজই শেষ করতে পারছেন না। ঘুষ না দিয়ে সরকারি নিয়ম মাফিক কাজ করতে গেলে নাজেহাল হচ্ছেন। এর ফলে বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। সরকার দেশে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে সচেষ্ট হলেও খুলনায় বিভিন্ন দফতরে নতুন উদ্যোক্তারা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
রবিউল ইসলাম নামে একজন নতুন উদ্যোক্তা জানান, একটি প্লাস্টিক ফ্যাক্টরি করার আগ্রহ রয়েছে তার। ফেলে দেওয়া প্লাস্টিক বোতল কাটিং করে বিদেশে রফতানির পরিকল্পনা করছেন। কয়েকজন বায়ারের সঙ্গে যোগাযোগও হয়েছে। তারা দ্রুত রফতানির জন্য অর্ডারও করেছেন। কিন্তু সরকারি দফতরের নানা কারসাজিতে তিনি পেরে উঠছেন না।
তিনি বলেন, ‘একদিনে তিনি আয়কর প্রত্যয়নপত্র পেয়েছেন। কিন্তু ভ্যাট নিবন্ধন নিতে গিয়ে প্রায় সাত দিন ঘুরেছেন। এখনও তিনি রফতানি নিবন্ধন করতে পারেননি। এরপর অন্যান্য অনেক কাজ বাকি রয়েছে। প্রতিটি কাজেই নির্ধারিত ফি’র বাইরে অতিরিক্ত টাকা দিতে হয়।’
উদীয়মান নারী উদ্যোক্তা তছলিমা খাতুন বলেন, ‘সরকারি বিভিন্ন দফতরে লাইসেন্স বা অনুমোদন নিতে হলে অনলাইনে আবেদন করতে হয়। অনলাইনে আবেদনের পর মূলকপি নিয়ে সরাসরি যোগাযোগ করতে হয়। তখনই সরকারি অফিসের লোকজন নানা ভুল-ত্রুটি খুঁজে বের করেন। এসব নিয়ে কথা বললে কাজ হবে না বলেও জানিয়ে দেন। কিন্তু নির্ধারিত ফি’র বাইরে বকশিশ দিলে আর কোনও সমস্যা হয় না। তখন কাগজপত্র কম থাকলেও কাজ হয়ে যায়।’
বিনিয়োগে আসা নতুন উদ্যোক্তা মো. রেজাউল হাসান জানান, একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে চান তিনি। এতে মানুষের কর্মসংস্থান হবে। পাশাপাশি বিদেশে রফতানির মাধ্যমে দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারবেন। যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে ফিরে এমনটাই ভাবছেন তিনি। সে অনুযায়ী কাগজপত্র সংগ্রহের জন্য বিভিন্ন দফতরে ছোটাছুটি করেছেন। কিন্তু নতুন উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগে আনার ব্যাপারে সরকারি দফতরের কর্মকর্তাদের উদাসীনতা দেখা যায়।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন বা লাইসেন্স নিতে সরকারি ফি ছাড়াও অতিরিক্ত ফি দিতে হয়। বাড়তি টাকা না দিলে দিনের পর দিন ঘুরতে হয়। তখন কাগজপত্র ঠিক থাকার পরও এটা নেই, ওটা নেই বলে ঘোরাতে থাকে। অহেতুক কালক্ষেপণ করা হয়।’
তবে এ বিষয়ে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন করপোরেশনের খুলনা বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক প্রণব কুমার রায় বলেন, উদীয়মান উদ্যোক্তাদের সরকারি বিভিন্ন দফতরের ভোগান্তি দূর করতে সরকারের একটি বিশেষ উদ্যোগ রয়েছে। তারই আলোকে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ ও বিনিয়োগ বিকাশে বহুমুখী কার্যক্রম নিয়ে কাজ চলছে। এসব কার্যক্রম বাস্তবায়িত হলে নতুন উদ্যোক্তাদের আর কোনও ধরনের হয়রানি বা ভোগান্তিতে পড়তে হবে না।
তিনি বলেন, গত ২৫ আগস্ট থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত উদ্যোক্তা নিবন্ধনের জন্য রেজিস্ট্রেশন বুথ স্থাপন করা হয়। ওই সময়ের মধ্যে মহানগরীর ১২টি পয়েন্ট এবং বিভাগের ১০ জেলার বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে ১৫ হাজার ৮৭৯ জন নতুন উদ্যোক্তা নিবন্ধন করেছেন। তাদের মধ্য থেকে যাচাই-বাছাই শেষে প্রকৃত উদ্যোক্তাদের সহযোগিতা করার পরিকল্পনা রয়েছে। বিনিয়োগের জন্য নতুন উদ্যোক্তাদের সহযোগিতা করার জন্য প্রয়োজনীয় সব দফতরে চিঠি দিয়ে জানিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এ কাজটি সম্পন্ন হলে উদীয়মান বা নতুন উদ্যোক্তাদের লাইসেন্স বা নিবন্ধন পেতে অসুবিধা হবে না।
খুলনা ভ্যাট কমিশনারেট কার্যালয়ের কমিশনার মো. মোস্তবা আলী বলেন, এখন ভ্যাট নিবন্ধনের জন্য অনলাইনে আবেদন করতে হয়। অনলাইনে আবেদন করার সময় কোনও ভুল হলে আমাদের কাছে আসতে হয়। অনলাইনে আবেদনে সব ঠিক থাকলে তিন কর্মদিবসের মধ্যে ভ্যাট নিবন্ধন দিয়ে দেওয়া হয়। তিনি বলেন, এ অফিসে আগে একটি প্রকল্পের আওতায় হেল্প ডেস্ক ছিল। অনেকে অনলাইনে আবেদন করার আগে হেল্প ডেস্ক থেকে সাহায্য নিতে পারতেন। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ায় হেল্প ডেস্কটি এখন নেই। তাই এখন অফিসে আসলে আমাকে দেখিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু কাগজপত্রে ভুল থাকলে সেটি নিয়ে অসুবিধায় পড়তে হয়। অনেক ক্ষেত্রে ভুল ঠিক করা সম্ভব হয় না। এছাড়া এ অফিসে জনবল সঙ্কট রয়েছে। তাই যথাযথ সেবা দিতে অসুবিধা হয়।
খুলনার কর কমিশনার প্রশান্ত কুমার রায় বলেন, যে কেউ পাঁচ মিনিটে অনলাইনে আবেদনের মাধ্যমে ই-টিআইএন সনদ নিতে পারছেন। নতুন উদ্যোক্তাদের আয়কর প্রত্যয়নপত্র আবেদনের একদিনের মধ্যে সরবরাহ করা হয়। এক্ষেত্রে কোনও অভিযোগ দেওয়ার সুযোগ নেই। এ ধরনের অভিযোগ পেলে তদন্ত করে তাৎক্ষণিক কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।
উল্লেখ্য, একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে প্রথমেই নতুন উদ্যোক্তাকে সংশ্লিষ্ট এলাকার ট্রেড লাইসেন্স নিতে হয়। এরপর পর্যায়ক্রমে ই-টিআইএন, আয়কর প্রত্যয়নপত্র, ভ্যাট নিবন্ধন, চেম্বার অব কমার্সের সনদ, আমদানি-রফতানি নিবন্ধন, বিনিয়োগ বোর্ডের নিবন্ধন, ফায়ার লাইসেন্স, পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্র দরকার হয়। এছাড়া সুনির্দিষ্ট ব্যবসার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সরকারি দফতরের অনুমোদন নিতে হয়। এতগুলো সরকারি দফতরের কাজ শেষ করতে সময় লাগে ৩ থেকে ৬ মাস। বিভিন্ন দফতরের সরকারি ফি ছাড়াও ঘুষ হিসেবে বাড়তি টাকা দিতে হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন দফতরে সরকারি কর্মকর্তাদের কাছে গিয়ে তদবির করতে হয়।

 

/ওআর/

লাইভ

টপ