‘যুদ্ধের প্রতিটি দিনের কথা আজও মনে আছে’

জহিরুল ইসলাম খান, মাদারীপুর০৮:৪৭, ডিসেম্বর ২৪, ২০১৫

শওকত খলিফামুক্তিযোদ্ধারা খেয়ে না খেয়ে জীবন বাজি রেখে এনেছেন এই স্বাধীনতা। তাদের কষ্টের ফল এখনও বাংলায় প্রতিষ্ঠিত হয়নি। স্বাধীনতার এত বছর পরও মুক্তিযোদ্ধার কৃতিত্বের সম্মান অনেকে দেন না। মুক্তিযোদ্ধারা আজ অভাবে দিন কাটাচ্ছেন। কেউ রিকশা চালাচ্ছেন, কেউ অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে রয়েছেন। তাদের দেখার কেউ নেই। পত্র-পত্রিকায় যখন দেখি মুক্তিযোদ্ধারা সার্টিফিকেট হাতে ভিক্ষা করছেন, তখন হৃদয়টা ভেঙে যায়। মাদারীপুরের উত্তর দুধখালীর মুক্তিযোদ্ধা শওকত খলিফা এভাবেই তার ক্ষোভের কথা বলেন।

স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধে যাওয়া দেশের বীর সন্তানদের একজন শওকত খলিফা। মুক্তিযুদ্ধের দসময় মিঠাপুর লক্ষ্মীনারায়ণ উচ্চ বিদ্যালয়ের ৮ম শ্রেণির ছাত্র ছিলেন। অভাবের তাড়নায় লেখাপড়া ছেড়ে কাজে নেমে পড়তে হয়েছিল তার। তবে জাতির সংকটকালে সব ছেড়েছুড়ে যুদ্ধে যেতে পিছপা হননি সেদিনের কিশোর শওকত।

যুদ্ধের স্মৃতি মনে করতে গিয়ে শওকত বলেন,  তিনি বলেন, সংসারে অভাবের কারণে লেখাপড়া ছেড়ে সিলেটে ধান কাটতে যাই। সেখানে শুনতে পাই দেশে যুদ্ধ লেগেছে। ধান কাটা শেষে আমরা বাড়ির দিকে রওনা দেই। আমাদের নৌকা শিবচরের শেখপুর ঘাটে থামে। সকালে নাস্তা খাওয়ার সময় সেখান থেকে মিঠাপুরের দিকে ধোঁয়া দেখি। শুনি বিকট শব্দও। আমি ও খলিল মুন্সী দৌড়াতে-দৌড়াতে মিঠাপুরে আমাদের এলাকায় আসি। সেখানে কানাই ডাক্তারের বাড়িতে দেখি লোকজন নেই, বাড়ি-ঘর জ্বলছে। কিছু লোক লুটপাট করছেন। টুপি মাথায় একজন ছিলেন।

শওকত বলেন, যারা লুট করছিলেন, তারা আমাদের ধাওয়া দেন। আমি ও খলিল বাড়ি এসে খুন্তি নিয়ে ওদের ধাওয়া দেই। আমাদের বাড়িতে কেউ ছিল না। আমরা কাঁথা ভিজিয়ে আগুন নেভাই। আমরা যখন আসি তখন দুপুর। তারিখ ছিল ৫ জ্যৈষ্ঠ বৃহস্পতিবার। মিলিটারিরা যখন চলে গেলে আমরা এগিয়ে যাই। বাড়ির পশ্চিম দিকে দেখতে পাই, কয়েকটি লাশ পড়ে আছে। হিন্দুপাড়ার দিকে যেতে যেতে দেখি লাশ আর লাশ। একটি বাগানের মধ্যে পড়ে রয়েছে এক সাথে সাত থেকে আটটি লাশ। এক মায়ের বুকের ওপর শোয়া দেখলাম একটি শিশু। মা ও শিশু দুজন জড়াজড়ি অবস্থায় মরে আছে।

সেদিন পাকিস্তানি মিলিটারি মিঠাপুর থেকে কালিরবাজার পর্যন্ত গণহত্যা ও বাড়ি-ঘরে অগ্নিসংযোগ করে। হিন্দু এলাকায় প্রতিটি বাড়িতে মানুষ হত্যা করেছিল। যারা বাড়ি ছেড়ে ঝোপ-জঙ্গলে পালিয়েছিল তাদেরও রেহাই হয়নি। কারণ এসব ঝোপ-জঙ্গল দেখিয়ে দেওয়ার জন্যও বাঙালি ছিল। সেদিন ছোবাহান চৌধুরী, লতিফ হাওলাদার, হাবিব মাস্টার, মজিবর, রব খালাসির মদদে মিলিটারিরা এই গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ চালায়।

মিলিটারি চলে যাওয়ার পর পালিয়ে যাওয়া লোকজন ফিরতে থাকে। লাশের মধ্যে স্বজনদের লাশ খুঁজে বের করে। কে বেঁচে আছে, কে মরে গেছে তা সেদিন কেউ বলতে পারেনি। স্বজনদের হারিয়ে সবাই আহাজারি করে। এলাকায় তখন ভয়াবহ পরিস্থিতি। পাড়ায়-পাড়ায় তখন বহু লাশ। যারা জীবিত ছিল তারা ছিল নির্ভীক। লাশগুলোকে একসঙ্গে করে ১৭ থেকে ১৮ জনকে গুপি ঠাকুরের বেতঝাড়ে মাটি চাপা দেওয়া হয়। মানুষের মাঝে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। কেউ বুঝে উঠতে পারিনি কেন এই হত্যাকাণ্ড হলো।

ওই আক্রমণের কিছুদিন পর ভোররাতে মা ঘুম থেকে ডেকে উঠিয়ে বলে, মিলিটারি আইছে। তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠে বাড়ির সামনে এসে দেখি লোকজন ছোটাছুটি করছে। আমরাও দৌড়াতে দৌড়াতে নকুল সাহার বাড়ির পেছনে জঙ্গলে পালালাম। মিলিটারি চলে গেলে আমরা শিকদার বাড়ি (বর্তমান জমাদ্দার বাড়ি) আসি। এসে দেখি একটি রুমের মধ্যে ১৮টি লাশ পড়ে রয়েছে। রুমের ভেতর রক্ত। ওখানে নিতাই ঠাকুর পিঠে ও হাতে বেয়নেটের আঘাত খেয়েও বেঁচে থাকে। বাকি ১৭ জনকে একসঙ্গে মাটি চাপা দেওয়া হয়। তাদের যেখানে মাটি চাপা দেওয়া হয় সেখানে বর্তমানে কৃষি ব্যাংক কালিরবাজার শাখা অবস্থিত।

একের পর এক হত্যাকাণ্ড দেখে আমরা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে গেলাম। ভাবতে লাগলাম এভাবে চলতে থাকলে জীবন বাঁচানো যাবে না। যুদ্ধে যাওয়ার জন্য মনস্থির করলাম। এর মধ্যে বিমানবাহিনীতে চাকরিরত নূর ইসলাম ও রইসউদ্দিন ভাই পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পালিয়ে আসে। তারা খোঁজ করতে থাকে কারা যুদ্ধে যাবে। ১৮ জনের একটি দল তৈরি হয়ে যায়। দিন তারিখ ঠিক করলাম। যাওয়ার দিন মাকে বলি আমি ভাবির বাড়ি যাই। সেখানে থেকে যাওয়ার সময় মায়ের উদ্দেশে একটি চিঠি লিখি। চিঠিতে মাকে জানাই আমার জন্য কান্নাকাটি করলে ওরা বাড়ি-ঘর জ্বালিয়ে দেবে। পথের খরচ জোগাতে ভাবির কানের স্বর্ণের দুল নিয়ে রওনা হই।

এক সপ্তাহ পর আমরা এক রাতের বেলা ভারতের উদ্দেশে রওনা হই। আমাদের দলে ছিল শহীদ রইসউদ্দিন, নুর ইসলাম, খলিল মুন্সী, মোশারেফ বেপারী, ইয়াছিন, জহির মিয়া, রফিক, এসকান্দার হাওলাদার, জালাল ও ধূরাইলের কয়েকজন।

ট্রেনিং শেষ করে যশোর আসি। যশোরের এক যুদ্ধে রইসউদ্দিন ভাই শহীদ হয়। তাকে সেখানে কবর দেই। যুদ্ধ দিনের ঘটনা অনেক। যুদ্ধের প্রতিটি দিনের কথা আজও মনে আছে।

স্বাধীনতার এত বছর পরও মুক্তিযোদ্ধার কৃতিত্বের সম্মান অনেকে দেন না। মুক্তিযোদ্ধারা খেয়ে না খেয়ে জীবন বাজি রেখে এনেছেন এই স্বাধীনতা। তাদের কষ্টের ফল এখনও বাংলায় প্রতিষ্ঠিত হয়নি। মুক্তিযোদ্ধারা আজ অভাবে দিন কাটাচ্ছেন। কেউ রিকশা চালাচ্ছেন, কেউ অসুস্থ অবস্থায় বিছানে পড়ে রয়েছেন। তাদের দেখার কেউ নেই।

/এফএস/এমএনএইচ/

লাইভ

টপ