Vision  ad on bangla Tribune

‘বিকৃত মুখের মরদেহকে আমার মনে করে ওরা দাফন করে’

সাইফুল ইসলাম, শ্রীমঙ্গল০০:১৩, মার্চ ২৭, ২০১৬

স্বাধীন বাংলা গড়ার প্রত্যয় নিয়ে বাংলার বীর মুক্তিযোদ্ধারা নিজের জীবনের বিনিময়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করে বাংলাদেশকে শত্রুমুক্ত করেন। তাদেরই একজন  মৌলভীবাজার মহকুমার তৎকালীন ছাত্রলীগ সভাপতি দেওয়ান আব্দুল ওয়াহাব চৌধুরী। চোখের সামনে দেখেছেন সহকর্মীদের মৃত্যু। যুদ্ধের বাস্তবতায় অনেকের লাশের ওপর দিয়ে হেঁটে যেতে হয়েছে। সে সময়ের নারীদের করুণ আর্তনাদ তাকে আজও  যেন পীড়িত করে। 

তিনি ১৯৫১ সালের ১৭ ডিসেম্বর মৌলভীবাজার সদর উপজেলার ৪নং আপার কাগাবালা ইউনিয়নের আতানগিরি গ্রামে দেওয়ান পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। মা-বাবার একমাত্র পুত্রসন্তান হওয়ায় ছিলেন সকলের বিশেষ স্নেহের পাত্র। ছয় ফুটের ওপর লম্বা, রং উজ্জ্বল ফর্সা, দেখতে খুব সুন্দর। বিশেষ আদর করতেন বলেই পরিবারের সবাই যুদ্ধে যেতে নিষেধ করেন তাকে।

মুক্তিযোদ্ধা দেওয়ান আব্দুল ওয়াহাব চৌধুরী

১৯৬৬ সালে এসএসসি ও ১৯৬৮ সালে মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। ১৯৬৭ সালে মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ সংসদ নির্বাচনে ছাত্রলীগ প্যানেল থেকে তিনি একমাত্র সমাজকল্যাণ সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হন।

যাদের মনে দেশকে স্বাধীন করার স্বপ্ন তাদেরকে কি আর বাধা দিয়ে রাখা যায়? মহকুমা ছাত্রলীগের সভাপতি থাকায় তরুণ ছাত্র সমাজকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন মুক্তিযোদ্ধা দেওয়ান আব্দুল ওয়াহাব চৌধুরী। বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে এক আলাপচারিতায় সেসব দিনের স্মৃতিচারণ করেন। 

দেওয়ান আব্দুল ওয়াহাব চৌধুরী বলেন, ২৩ মার্চ আমার সভাপতিত্বে মৌলভীবাজার চৌমুহনী পয়েন্টে ঐতিহাসিক রেন্ডি গাছের নিছে পাকিস্তানের জাতীয় পতাকা পুড়িয়ে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়। এসময় আমার সঙ্গে ছিলেন মোহাইমীন সালেহ (জুড়ী), মাহমুদুর রহমান(পরবর্তীতে আয়কর উকিল), আলহাজ জয়নাল আহমদ প্রমুখ। আমাদের এই উদ্দ্যোগের কথা শুনে বড়লেখা, জুড়ী, কুলাউড়া, রাজনগর ও শ্রীমঙ্গল উপজেলায়ও পতাকা উত্তোলন করা হয়।

শমসেরনগরে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর প্রতিরোধের কারণে পতাকা উত্তোলন করা সম্ভব হয়নি। পরে ২৫ তারিখ মৌলভীবাজার থেকে আমার নেতৃত্বে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের নিয়ে সকাল ১১টায় শমসেরনগর যাই। এই দিন শমসেরনগর বাজারে পাকিস্তানের পতাকা নামিয়ে বাংলাদেশের পতাকা  উত্তোলন করা হয়।

পরদিন ২৬ মার্চ সারা দেশে কারফিউ জারি করা হয়। এদিন পাকিস্তানি-হানাদার বাহিনী বামকেশ ঘোষ, তখনকারএমএসসি; আজিজুর রহমানকে, বর্তমান মৌলভীবাজার জেলা পরিষদ প্রশাসক; সকাল বেলা গ্রেফতার করে তাদের কাছ থেকে আমার তথ্য নিয়ে আমার আরামবাগস্থ বাড়িতে আসে।

পাকিস্তানি-বাহিনী আসার খবর পেয়ে আমি বাড়ি থেকে অন্যস্থানে চলে যাই। তারা আমাকে না পেয়ে বাড়ি তছনছ ও ভাঙচুর করে। ওইদিন সন্ধ্যায় যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে ছাত্রলীগ কর্মীদের নিয়ে শহরতলীর সৈয়ারপুরে মিটিং করি।

২৭ মার্চ শমসেরনগরে পাকিস্তানিদের সঙ্গে যুদ্ধ হলে ১১ জন মুক্তিযোদ্ধা মারা যান। কারণ এসময় আমাদের কোনও প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় জিনিষপত্র ছিল না। এ ঘটনার পর পাকিস্তানিরা মৌলভীবাজার ছেড়ে সিলেটের উদ্দ্যেশে যাত্রা শুরু করলে আমরাও তাদের পিছু ধরি।

সদর উপজেলার কামালপুরে ২৮/২৯ এপ্রিল কমান্ডার মানিক চৌধুরী, মেজর সিআর দত্ত ও বেঙ্গল রেজিমেন্টদের সঙ্গে আনসার ও মুজাহিদদের নেতৃত্বে হানাদার বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করে এখান থেকে তাদের বিতাড়িত করা হলে শেরপুরে আস্তানা গাড়ে। যুদ্ধ করে সেখান থেকেও তাদেরকে বিতাড়িত করা হয়।

এপ্রিলের শেষের দিকে পাকিস্তানি-বাহিনী বিমান দিয়ে অসহায় বাঙালির উপর হামলা চালায়। আত্মরক্ষার জন্য আমরা হবিগঞ্জের খোয়াই বর্ডার দিয়ে ভারতে প্রবেশ করি। এসময় আমার সঙ্গে ছিলেন আজিজুর রহমান, শওকতুল ওয়াহিদ, হারুণ মিয়া। বাগানের বক্স গাড়ি দিয়ে ভারত যাই। গাড়িটি ড্রাইভ করেছিলেন হারুন ভাই।

ভারত ঢুকে বিএসএফ এর কাছে গাড়ি রেখে আমরা আসাম আসি। সেখানে গিয়ে আমাদের সিলেট অঞ্চলের অনেক মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে দেখা হয়। আসামে কয়েক দিন অবস্থানের পর ২০ অথবা ২২ মে আমাকে আগরতলায় আসার আহ্বান করেন আ স ম আব্দুর রউফ। খবর পেয়ে আমি দেরি না করে তাড়াতাড়ি এসে ওনার সঙ্গে দেখা করি। তিনি বলেন, প্রশিক্ষণের জন্য আপনার এলাকার লোক প্রস্তুত করেন। প্রশিক্ষণার্থীদের তালিকা করতে থাকি।

মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশকে ৪টি এলাকায় ভাগ করে চারজন সেক্টর কমান্ডার শেখ ফজলুল হক মনি, সিরাজুল আলম খান, আব্দুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমদকে দায়িত্ব প্রদান করা হয়। এসময় আমি ও আমার সহযোগীরা ইন্দিরা গান্ধীর সহযোগিতায় সামরিক বোয়িং বিমানে ভারতের উত্তর প্রদেশের দেরাদুনে প্রশিক্ষণের জন্য চলে যাই।

চার নম্বর সেক্টর কমান্ডারের অধীনে তখন সারা বাংলাদেশের ৭শ’ জন মুক্তিযোদ্ধা অংশগ্রহণ করেন। আমাদের প্রশিক্ষণের ইনচার্জ ছিলেন লেফট্যানেন্ট জেনারেল উবান। তবে প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন মেজর মালহোত্রা। ১৯৭১ সালের মে মাস থেকে প্রশিক্ষণ শুরু করি এবং জুলাই মাসের শেষের দিকে আসামবাড়ি, আগরতলা হয়ে ৬/৭ জনের দলে বিভক্ত হয়ে বাংলাদেশে ঢুকে পড়ি। এর আগে হাফলং এর প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধারা ও আমরা ভারতের রাতাছড়ায় একত্রিত হই।

ভারতের দেরাদুনে প্রথম ব্যাচে সিলেট বিভাগের মধ্যে আমরা নয়জন প্রশিক্ষণ গ্রহণ করি। তখন সিলেটের মিছবাহউদ্দিন আহমেদ ছিলেন আমাদের গ্রুপের স্কোয়ার্ডান লিডার এবং আমি ছিলাম ডেপুটি স্কোয়ার্ডান লিডার। মৌলভীবাজারের প্রশিক্ষণ প্রাপ্তরা হলেন, মৌলভীবাজারের মরহুম আব্দুল মুকিত, শ্রীমঙ্গলের মোহন সোম ও শিশির সোম, জুড়ীর সালেহ আহমেদ, রাজনগরের রফিকউদ্দিন রানা, বিগ্রেডিয়ার আব্দুস সালাম।

দুঃখের কথা হলো, সাতগাঁও হয়ে দিনারপুরে আসার পথে মুকিত, রানু, শহীদ, শিশির সোম গেরিলা যুদ্ধে শহীদ হন। এসময় আমাদের এক মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মুমিন (খালিশপুরের) পাকিস্তানি বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে আমাদের অবস্থান ও আমার সম্বন্ধে পাকিস্তানি বাহিনীকে জানিয়ে দেন। পাকিস্তানি-বাহিনী আমাকে দিনারপুর পাহাড়ে চতুর্দিক থেকে ঘেরাও করে ফেলে। আমি তখন নবীগঞ্জের দিকে চলে যাই।

এসময় পাকিস্তানি বাহিনী আমার মা ফয়জুন্নেছা খানম চৌধুরীকে ধরে নিয়ে প্রথমে গজনাইপুর ও পরে শ্রীমঙ্গলে পিস কমিটির সভাপতি দেওয়ান রশীদের বাসায় রাখে। সেপ্টেম্বর মাসের দিকে জগন্নাথপুরে গেরিলা যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার সময় জানতে পারি মাকে তারা ধরে নিয়ে গেছে। আমাকে ধরার জন্য আমার মাকে দেওয়ান রশীদের বাসায় প্রায় এক মাস আটকে রাখে।

একসময় পাকিস্তানি বাহিনীর কাছে খবর যায় মাধবপুর বাগানে আমার লাশ পাওয়া গেছে। পাকিস্তানিবাহিনী বাগানে গিয়ে একটি  বিকৃত মুখমণ্ডলের মরদেহ উদ্ধার করে। বিকৃত মুখের মরদেহকে আমার মনে করে ওরা দাফন করে। দাফন সম্পন্ন করার পর আমার মায়ের কাছে এসে সান্ত্বনা দিতে থাকে। অক্টোবরের প্রথম দিকে আমার মা আথানগিরির বাড়িতে ফিরে আসেন।

আমি মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে সাতগাঁওয়ের বোঙ্গেশ বাড়ির টিলায় ও সাতহালের টেকই গ্রামের আজিম মিয়ার বাড়িতে থাকি। তারপর দিনারপুর পাহাড়ে অবস্থান নেই। এসময় আমাদের খাবার দাবার থেকে শুরু করে সবকিছু দেখাশোনা করেন আথানগিরি গ্রামের আমার বন্ধু মরহুম চেরাগ আলী, পানিউন্দা গ্রামের মোমিন মেম্বার ও ধনাই মিয়া।

একদিন পাহাড়ের পাশে এক তরুণী মেয়ের কান্নার আওয়াজ শুনতে পেলাম। চতুর্দিক চেয়ে দেখতে পেলাম পাকিস্তানি কুলাঙ্গাররা মেয়েটিকে হাতে ধরে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে। তাদের সঙ্গে একটা খণ্ডযুদ্ধ বাঁধে। একসময় কুলাঙ্গাররা পালিয়ে চলে যায়। মেয়েটা রক্ষা পায়।

১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমরা যারা বাংলাদেশ লিবারেশন ফ্রন্ট (মুজিব বাহিনী) ও বঙ্গবন্ধুর সৈনিক হিসেবে মিছবাহউদ্দিন, আলতাফ ভাই, মাহমুদসহ সব মুক্তিযোদ্ধারা রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসের সপ্তাহ খানেকের ভেতরে বঙ্গবন্ধুর কাছে অস্ত্র জমা দিই। 

যে উদ্দ্যেশ নিয়ে দেশ স্বাধীন করেছিলাম তা এখনও বাস্তবায়িত হয়নি। বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের ভাষণে বলেছিলেন, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি, কিন্তু মুক্তি পাইনি। আমরা একটি পতাকা, স্বাধীন বাঙালি জাতি ও বাংলাদেশ নামে একটি ভুখণ্ড পেয়েছি। মুক্তি পাওয়ার জন্য ১৬ কোটি মানুষের মৌলিক অধিকার বাস্তবায়ন করতে হবে। এটা মুক্তিযোদ্ধাদের দাবি। 

/এইচকে/

লাইভ

টপ