ব্লুমবার্গ-এর বিশ্লেষণহিজবুল্লাহ দমনের সৌদি প্রচেষ্টা কি সফল হবে?

Send
বিদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত : ১৮:১৩, নভেম্বর ১৫, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:৫৯, নভেম্বর ১৫, ২০১৭

ইরান সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহকে দমন করতে লেবাননকে নিশানা বানিয়েছে সৌদি আরব। দেশটির ধর্মভিত্তিক ক্ষমতায়নের ভারসাম্য ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপের মাধ্যমে আরও একটি পররাষ্ট্রনৈতিক সফর চালাতে চাইছে রিয়াদ। হিজবুল্লাহকে নিঃসঙ্গ করতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে জোটবদ্ধ প্রচেষ্টা জারি রেখেছে তারা। তবে লেবাননের শিয়া জনতার কাছে হিজবুল্লাহ এক রক্ষাকবচের নাম। সংগঠনটির জন্য সুরক্ষা কবচের ভূমিকায় রয়েছে খোদ দেশটির সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডল। এছাড়াও রয়েছে তেহরানের অর্থ সহায়তা। সে কারণে হিজবুল্লাহ দমনের সৌদি প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত খুব একটা সফল হবে না বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। 

লেবাননেন প্রধানমন্ত্রী হারিরি ও সৌদি বাদশাহ সালমান

পদত্যাগের ঘোষণা দেওয়ার সময় লেবাননের প্রধানমন্ত্রী সাদ হারিরি হিজবুল্লাহ ও ইরানকে আক্রমণের নিশানা বানিয়েছিলেন। ৪ নভেম্বর রিয়াদে সরাসরি টেলিভিশন সম্প্রচারে নিজের জীবননাশের আশঙ্কা জানিয়েছিলেন তিনি। তখন থেকেই লেবানন আটকা পড়ে ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যকার বিরোধের জালে। তবে লেবাননের অন্য রাজনৈতিক ও সশস্ত্র দলগুলো হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে নামার কোনও ইঙ্গিত দেয়নি। বরং বিদেশি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে দেশটি।

বস্টনের নর্থ ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির মিডল ইস্ট সেন্টারের সহ-পরিচালক ডেনিস সুলিভান বলেন, সশস্ত্র গোষ্ঠীটি অক্ষত অবস্থায় সংকট উতরে গেলে সংগঠনটির প্রধান হাসান নাসরাল্লাহ ‘কোনও কিছু না হারিয়েই জিতে যাবেন’।

সামনে কী অপেক্ষা করছে

এখনও মঞ্চস্থ হয়নি হারিরিকে নিয়ে সৌদি নাটকের শেষাঙ্ক। রবিবার তিনি শিগগিরই দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন। তবে ইরানকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেছেন, হিজবুল্লাহ অন্য দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করলেই কেবল তিনি তার পদত্যাগপত্র প্রত্যাহার করে নেবেন। আর এটাই ছিল রিয়াদের জন্মগ্রহণকারী হারিরি ও তার বাবা রফিকের সমর্থক দেশ সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের চাওয়া। সৌদি দাবি অনুযায়ী, হারিরির পদত্যাগের পরপরই রিয়াদের উদ্দেশে ইয়েমেন থেকে ছোড়া ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রটির নেপথ্যে রয়েছে হিজবুল্লাহ।

হিজবুল্লাহর জনভিত্তি বাড়ছে

অন্যদিকে, যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের অধীনে আরও সক্রিয় একটি পররাষ্ট্র নীতিমালা তৈরি করছে সৌদি সরকার। মিত্রকে আবারও ইয়েমেনের ক্ষমতায় বসাতে ২০১৫ সাল থেকে ইয়েমেনে বোমা হামলা চালাচ্ছে তারা। কাতারের বিরুদ্ধে জোটবদ্ধ অবরোধেরও নেতৃত্ব দিচ্ছে সৌদি আরব।

হিজবুল্লাহ কিভাবে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল?

হিজবুল্লাহ প্রধান হাসান নাসরাল্লাহ দুইবার হারিরির পদত্যাগ নিয়ে কথা বলেছেন এবং দুই বক্তৃতাতেই তার আচরণ শান্ত ও বন্ধুত্বপূর্ণ ছিল। সুন্নিদের সঙ্গে সংঘাতের আশঙ্কা ঘুচিয়ে তার কণ্ঠে শোনা গিয়েছিল সন্মিলনের সুর। ওই দুই বক্তৃতায় নাসরাল্লাহ সৌদি আরব থেকে হারিরির ফিরে আসার দাবি জানিয়েছিলেন। হারিরিকে ‘সৌদি আরবে আটক’ উল্লেখ করে তিনি বলেছিলেন, ‘রাজনৈতিক বিভাজন’ সত্ত্বেও তিনি হারিরিকে ফেরত চান।

বৈরুতভিত্তিক লেভান্ত ইনস্টিটিউট ফর স্ট্রাটেজিক অ্যাফেয়ার্স এর প্রধান সামি নাদের নাসরাল্লাহর এ অবস্থানকে কৌশল হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, এ কৌশলটি নেওয়া হয়েছিল সৌদি আরবের পদক্ষেপকে হেয় করার জন্য। ওই যুক্তির মাধ্যমে নাসরাল্লাহ সংকটকে আন্তর্জাতিক আইনের দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে যেতে পেরেছিলেন। অন্যান্য আঞ্চলিক সংঘাতে সংগঠনটির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তখন ঢাকা পড়ে যায়। নাদের বলেন, হিজবুল্লাহ লেবানন সরকারের অংশ এবং সংগঠনটির জন্য রাজনৈতিক ছত্রছায়া প্রয়োজন। সেই ছত্রছায়া যা হিজবুল্লাহর ওপর মার্কিন অবরোধ জোরালো হওয়ার সময় হারিরি সংগঠনটিকে দিয়েছিলেন।  

সৌদি সরকার কী করার চেষ্টা করছিল?

হারিরির পদত্যাগের কয়েকদিন আগে সৌদি আরবের উপসাগরবিষয়ক মন্ত্রী থামের আল সাবহান টুইটারে বলেছিলেন, তার দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধে হিজবুল্লাহর অংশগ্রহণ নিয়ে লেবাননের সরকার ও জনগণ নীরব ভূমিকা পালন করায় তিনি বিস্মিত। মূলত ইয়েমেনে চলমান সংঘাতে সৌদি জোটের বিরুদ্ধে হিজবুল্লাহর লড়াইকে ইঙ্গিত করেন থামের। জনস হপকিনস ইউনিভার্সিটি স্কুল অব এডভান্সড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের মিডল ইস্ট স্টাডিজবিষয়ক শিক্ষক সানাম ভাকিল একে সৌদি আরবের কৌশল হিসেবে উল্লেখ করেছেন। কৌশলটি হলো-অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্রসহ লেবাননের অভ্যন্তরে পীড়া দেওয়া এবং সেদেশের ভেতরে হিজবুল্লাহর প্রতি সমর্থন কমিয়ে আনা। ধারণাটি নেওয়া হয়েছে ২০০৫ সালের ঘটনা থেকে। তখন হারিরির বাবা রফিক হারিরি নিহত হওয়ার পর বিক্ষোভের মুখে সিরীয়দেরকে লেবানন থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়।

মধ্যপ্র্যাচ্যের শিয়া-সুন্নি মানচিত্র

ভাকিল বলেন, সৌদি আরব ভাবছে ২০০৫ সালের মতো করেই এবারও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ও জনগণের চাপ তৈরি করা যাবে। তবে লেবাননের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিমণ্ডল দ্বারা সুরক্ষিত থাকা ১৯৮০ এর দশকের এ সংগঠনটির ক্ষেত্রে তা হয়নি।

সৌদি সরকার এখন কী করতে পারে?

লেবাননের সেক্রেটারিয়ান পাওয়ার শেয়ারিং চুক্তির আওতায় গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কিছু বিধি রয়েছে। তাহল- লেবাননের প্রধানমন্ত্রীকে অবশ্যই সুন্নি হতে হবে, প্রেসিডেন্টকে ম্যারোনাইট খ্রিস্টান (বিশেষ গোষ্ঠীর সিরীয় খ্রিস্টান) হতে হবে এবং পার্লামেন্ট স্পিকারকে হতে হবে শিয়া। ১৯৭৫-১৯৯০ সালের গৃহযুদ্ধের সময়ে শান্তি হারিয়ে গিয়েছিল। যদিও সিরিয়া থেকে ১০ লাখেরও বেশি শরণার্থী বিশেষ করে সুন্নি শরণার্থী লেবাননে প্রবেশ করায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সংঘাত আরও বেড়ে গেছে। হিজবুল্লাহ শিয়াদের রক্ষক আর খ্রিস্টানরা চাইছে তাদের স্বার্থের সুরক্ষা দিতে। তবে ওয়াশিংটনের মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক বিলাল সাব বলেন সৌদি আরবের জন্য ইরান এবং লেবাননের হিজবুল্লাহকে সরাসরি আঘাত করার সুযোগ সীমিত। হারিরি সংকট হিজবুল্লাহর জন্য মাথাব্যথা মাত্র। আইটি বিশেষজ্ঞ বিশারা আবু জালেইলির মতে, লেবাননের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া হলে তা উল্টো সৌদি আরবকেই তোপের মুখে ফেলবে।

ইসরায়েলের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হিজবুল্লাহ

বিশারা বলেন, পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো যদি লেবাননের বিরুদ্ধে অবরোধ আরোপ করে তবে হিজবুল্লাহর চেয়ে সুন্নি, খ্রিস্টান ও দ্রুজদেরকে বেশি মূল্য দিতে হবে। লেবানন হিজবুল্লাহর চেয়ে সুন্নি, খ্রিস্টান এবং দ্রুজ গোষ্ঠীর মানুষকে হিজবুল্লাহর চেয়ে চড়া মূল্য দিতে হবে। বৈরুতের হামরা স্ট্রিটে তিনি আরও বলেন, ‘হিজবুল্লাহ ইরান থেকে অর্থ পাবে, সেকারণে তাদের ওপর অবরোধের প্রভাব পড়বে না। তারা অর্থনৈতিকভাবে আমাদের গলায় ফাঁস পড়াতে চাচ্ছে যেন আমরা হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে দাঁড়াই। এটা হবে না।’

 

/এফইউ/বিএ/

লাইভ

টপ