মৃত হিন্দু স্ত্রী’র ‘শ্রাদ্ধ’ করতে গিয়ে মুসলিম স্বামীর দুর্ভোগ

Send
বিদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত : ১৯:৩৯, আগস্ট ০৯, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:৪৭, আগস্ট ০৯, ২০১৮

স্ত্রী নিবেদিতা ঘটক ছিলেন হিন্দু। আর স্বামী ইমতিয়াজুর রহমান মুসলিম। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পার্সি বিভাগে পড়াশোনা করেছেন ইমতিয়াজুর। আর নিবেদিতার পড়াশোনা বাংলায়। ধর্মীয় বিশ্বাসের পার্থক্য তাদের প্রেমে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। ১৯৯৮ সালে ভারতের বিশেষ বিবাহ আইনের আওতায় বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হন তারা। বিভিন্ন অঙ্গের অকার্যকারিতার কারণে গত সপ্তাহে মারা যান নিবেদিতা। ধর্মীয় আচারের প্রতি একনিষ্ঠ নিবেদিতাকে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মতো করেই দাহ করার সিদ্ধান্ত নেয় পরিবার। মৃত্যুর আগে নিবেদিতা কিছু বলে যেতে না পারলেও পরিবার একেই তার শেষ ইচ্ছে বলে ধরে নেয়। মৃত্যুর দিনই ‘নিগাম বোধ ঘাটে’ তার দাহ করা হয়। একটি মন্দিরে দেওয়া হয় শ্রাদ্ধ আয়োজনের বুকিং। তবে মন্দির কমিটির গ্যাড়াকলে পড়ে বাদ হয়ে যায় সে অনুষ্ঠান। তবে নিবেদিতার স্বামী ও পরিবারও দমে যায়নি। বিভিন্ন সংগঠনের দুয়ারে দুয়ারে শ্রাদ্ধ আয়োজনের জন্য ঘুরতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত বুধবার (৮ আগস্ট) সফল হন তারা।

ইমতিয়াজুর
নিবেদিতার স্বামী কলকাতার বাসিন্দা ইমতিয়াজুর বলেন, “চিত্তরঞ্জন পার্ক কালি মন্দির সোসাইটিতে গত ৬ আগস্ট আমরা একটি জায়গা ভাড়া নিই এবং এর জন্য ১৩০০ রুপি অগ্রিম পরিশোধ করি। ১২ আগস্ট সেখানে শ্রাদ্ধের অনুষ্ঠান হওয়ার কথা ছিল। তবে এক ঘণ্টা পর অফিস থেকে আমার কাছে একটি ফোন আসলো। ওপাশ থেকে এক ভদ্রলোক বারা বার আমার নাম জিজ্ঞেস করতে লাগলো। এরপর তিনি বলেন, ওই অনুষ্ঠান করা যাবে না। আমি কারণ জানতে চাইলাম। তিনি বাংলা ভাষায় শুধু বললেন, ‘আপনি বুঝে নিন’।”

‘ফোনকারী ব্যক্তি আমাকে জমা দেওয়া টাকাগুলো ফিরিয়ে নিতে বলেন। আমি তা নিতে অস্বীকৃতি জানাই। বলি, ওই টাকা আমি আমার স্ত্রীর শ্রাদ্ধ আযোজনের জন্য জমা দিয়েছিলাম এবং তারা তা রেখে দিতে পারে।’ বলে যান ইমতিয়াজুর। রশিদ দেখিয়ে জানান, মেয়ে ইহিনি আমব্রিনের নামে বুকিংটি দেওয়া হয়েছিল।


পশ্চিম বঙ্গে বাণিজ্যিক কর দফতরের সহকারি কমিশনার হিসেবে কাজ করছেন ইমতিয়াজুর। আর নিবেদিতা কলকাতা স্কুলে বাংলা ও সংস্কৃতি পড়াতেন। কেন নিবেদিতার শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠান বাতিল করা হলো সে ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে সিআর পার্ক কালি মন্দির সোসাইটির সভাপতি আশিতভ ভৌমিক বলেন, ‘আমরা মন্দিরটির তদারককারি এবং প্রতি দুই বছর পর পর আমাদের নির্বাচিত করা হয়। আমরা হিন্দু ধর্মীয় আচার পাল্টে ফেলতে পারি না। অবশ্য, এ ব্যাপারে আমি তদন্ত করব এবং অনুষ্ঠানটি বাতিলের কারণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করব।’

১৫ দিন আগে নিবেদিতার শরীরে প্রতিস্থাপনের জন্য লিভার দান করেছিলেন বোন কৃত্তিকা। তিনি জানান, নিগাম বোধ ঘাটে কোনও ধরনের ঝঞ্জাট ছাড়াই নিবেদিতার শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হয়েছে। শেষকৃত্যের জন্য মন্দির কর্তৃপক্ষের আপত্তির বিষয়টি একেবারেই বিপরীত চিত্র। পেশায় প্রত্নতত্ত্ববিদ কৃত্তিকা বলেন, ‘আমি ছাড়া শেষকৃত্যে যারা উপস্থিত ছিলেন তারা সবাই আমার ভগ্নিপতির পরিবারের সদস্য। মুসলিমরা ওই শেষকৃত্য আয়োজন করেছিল। এ নিয়ে কেউ আমাদের প্রশ্ন করেনি।’

ইমতিয়াজুর মনে করেন, ধর্ম হলো ব্যক্তিগত বিষয়। তিনি বলেন, ‘আমার স্ত্রী ধর্মীয় আচারের প্রতি একনিষ্ঠ এবং ও যেভাবে চাইতো সবকিছু আমি সেভাবেই করার চেষ্টা করেছিলাম।’ ইমতিয়াজুর ও নিবেদিতা প্রসঙ্গে কৃত্তিকা বলেন, ‘ওরা সবসময় একে অপরের ধর্মীয় বোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিল।’

ইমতিয়াজুর ও নিবেদিতার মেয়ে ইহিনি আমব্রিনের নামের প্রথম অংশটি মায়ের দেওয়া আর দ্বিতীয় অংশটি দিয়েছিলেন বাবা। সে দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী। টাইমস অব ইন্ডিয়াকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইহিনি বলেন, ‘‌আমার মায়ের বয়স ৪৬ বছর ছিল। শেষ ইচ্ছে জানিয়ে রাখার মতো বয়সও তার হয়নি। কিন্তু তিনি যেভাবে জীবন কাটিয়েছেন তাতে আমরা মনে করেছি তাকে দাহ করলেই তিনি খুশি হবেন।’

ইমতিয়াজুর ও তার পরিবার কলকাতায় বসবাস করে। দুই মাস আগে নিবেদিতার চিকিৎসার জন্য তারা দিল্লিতে একটি ফ্ল্যাট ভাড়া করেছি। তবে কৃত্তিকা এখনও চিকিৎসাধীন থাকায় আরও কিছুদিন দিল্লিতে থাকতে হবে তাদের। গত কয়েকদিন ধরে কৃত্তিকা ও ইমতিয়াজুর মিলে নিবেদিতার শ্রাদ্ধ আয়োজনের জন্য বেশ কয়েকটি সংগঠনের শরণাপন্ন হয়েছে। যেকোনওভাবেই হোক অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকে তারা। আর শেষ পর্যন্ত বুধবার (৮ আগস্ট) একটি বাংলা সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে আশার খবর পান তারা। কৃত্তিকা বলেন, ‘সন্ধ্যায় তারা ফোন করে আমাদেরকে শ্রাদ্ধ আয়োজনের প্রস্তাব দিলো। বৃহস্পতিবার সবকিছু চূড়ান্ত হবে।’

/এফইউ/

লাইভ

টপ