ভারত-পাকিস্তান ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছিল

Send
বিদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত : ১৯:৪৩, মার্চ ২৩, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:৪৩, মার্চ ২৩, ২০১৯

ভারতীয় বৈমানিক অভিনন্দন বর্তমানের বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার পর ভারত ও পাকিস্তান পরস্পরের বিরুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছিল। অভিনন্দনের কোনও ক্ষতি করা হলে সম্ভাব্য সব ব্যবস্থা নেওয়ার অনুমোদন দিয়েছিল ভারত সরকারের শীর্ষ নেতৃত্ব। পাকিস্তানে হামলার জন্য ১২টি ক্ষেপণাস্ত্র ভারত প্রস্তুত করেছ রেখেছিল। অন্যদিকে পাকিস্তান দাবি করেছে, তারাও প্রায় সমসংখ্যক ভারতীয় স্থাপনা লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রস্তুতি নিয়েছিল। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি ভারতীয় ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আশঙ্কায় বেশ কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে দিয়েছিল দেশটি। ব্ল্যাক আউটের মধ্যে পড়েছিল রাজধানী ইসলামাবাদেরও অনেক এলাকা। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমস গত ২৭ ফেব্রুয়ারিতে পাল্টাপাল্টি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রস্তুতির বিষয়ে দুই দেশের বিভিন্ন সূত্র ছাড়াও কথা বলেছে যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট কূটনীতিকদের সঙ্গে। জানা গেছে, অন্যান্য দেশের মধ্যস্থতায় শেষ পর্যন্ত কমে আসে উত্তেজনা। স্থগিত হয় ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পরিকল্পনা।গত ১৪ ফেব্রুয়ারি কাশ্মিরের পুলওয়ামায় ভারতীয় ‘সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ ফোর্সের’ গাড়িবহরে আত্মঘাতী বোমা হামলায় বাহিনীটির অন্তত ৪০ সদস্য প্রাণ হারান। পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গিগোষ্ঠী জইশ-ই-মোহাম্মদ হামলার দায় স্বীকার করে। মঙ্গলবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) ভারতীয় বিমানবাহিনী পাকিস্তাননিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরের আকাশসীমায় ঢুকে বিমান হামলা চালায়। তাদের দাবি, পাকিস্তানের ভেতরে থাকা জইশ-ই-মোহাম্মদের ঘাঁটিই ছিল তাদের লক্ষ্য এবং এতে বহু জঙ্গি নিহত হয়েছে। অন্যদিকে ২৭ ফেব্রুয়ারি সকালে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরের উদ্দেশে যুদ্ধবিমান পাঠায়। তাদের বাধা দেয় ভারতীয় জঙ্গি বিমান। সেখানে বিধ্বস্ত হয় বৈমানিক অভিনন্দন বর্তমানের মিগ টোয়েন্টি ওয়ান বাইসন বিমানটি। হিন্দুস্তান টাইমস বিভিন্ন সূত্রগুলোর কাছ থেকে পাওয়া তথ্য থেকে লিখেছে, দুই দেশের ‘অস্বস্তিকর’ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ওই সময় প্রায় ‘ভেঙে পড়ার’ পর্যায়ে চলে গিয়েছিল।
উইং কমান্ডার অভিনন্দন বর্তমানের যদি কোনও ক্ষতি করা হয়, তাহলে সম্ভাব্য সব ব্যবস্থা গ্রহণের আদেশ দিয়ে রেখেছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এ বিষয়ে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা র-এর সেক্রেটারি অনীল ধাসমানা যোগাযোগ করেছিলেন পাকিস্তানের আইএসআইয়ের প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল অসীম মুনিরের সঙ্গে। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেছিলেন, অভিনন্দন বর্তমানের কোনও ক্ষতি হলে তাতে দুই দেশের উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পাবে। ভারত চাইছিল, পাকিস্তান তাদের বৈমানিককে ফেরত দিক। এরকম পরিস্থিতিতে ভারত যে রাজস্থানে ১২টি ভূমি থেকে ভূমিতে আঘাত হানতে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করে রেখেছে, সে বিষয়েও মুনিরের সঙ্গে তার আলোচনা হয়।
র-এর ধাসমানা যেমন একদিকে আইএসআইয়ের মুনিরের সঙ্গে আলোচনা করেছেন, অন্যদিকে তেমনি ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল আলোচনা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন ও মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেওর সঙ্গে। ধাসমানা ও দোভাল আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের সঙ্গেও কথা বলেছেন, যাতে অভিনন্দন বর্তমানের মুক্তির বিষয়ে ইমরান খান সরকারের ওপর চাপ দেওয়া যায়।
ভারতের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে ১২টি ক্ষেপণাস্ত্র প্রস্তুত রাখার বিষয়ে জানা গেলেও পাকিস্তানের দাবি, ভারত অন্তত ৯টি ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের প্রস্তুতি নিয়েছিল। ইসলামাবাদের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করেছিলেন, ২৭ ফেব্রুয়ারি রাত ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে এই হামলা হতে পারে। পাল্টা জবাব হিসেবে পাকিস্তান ১৩টি ক্ষেপণাস্ত্র প্রস্তুত করে ভারতীয় লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার জন্য। ভারতীয় ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আশঙ্কায় ইসলামাবাদ, লাহোর করাচিসহ বিভিন্ন শহরের বেশ কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এই ব্ল্যাক আউটের স্থানগুলোতে ছিল পাকিস্তানি সামরিক স্থাপনা থেকে দেশটির সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের থাকার জন্য নির্ধারিত কলোনি পর্যন্ত। লাহোর ও করাচির স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছ থেকে জানা গেছে, লাহোরের ‘আসকারি হাউজিং সোসাইটি’ এবং ‘মালির ক্যান্টনমেন্ট’ এই ব্ল্যাক আউটের আওতায় ছিল।
হিন্দুস্তান টাইমস লিখেছে, সাম্প্রতিক বিষয়ে দোভাল ও বোল্টনের মধ্যে আলোচনা হচ্ছে ১৪ ফেব্রুয়ারির পুলওয়ামা হামলার পরের দিন থেকেই। সেসময়ই বোল্টন ভারতের আত্মরক্ষার অধিকারের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন থাকার কথা জানিয়ে দেন। ১৭ মার্চে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছিল, ভারত-পাকিস্তান পরস্পরের বিরুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছিল। তৃতীয় দেশের হস্তক্ষেপে তা স্থগিত হয়। ভারতের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা জন বোল্টনের সঙ্গে গত ২৭ ফেব্রুয়ারি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর বিষয়ে কোনও আলোচনা করেছিলেন কি না বা করলেও ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা ১২টি ছিল কি না তা নিয়ে প্রশ্ন করা হয় হোয়াইট হাউসের সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তাকে। কিন্তু তিনি কোনও মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান।
ভারতের ‘কেবিনেট সিকিউরিটি কমিটির’ একজন সদস্য হিন্দুস্তান টাইমসকে বলেছেন, ‘পারমাণবিক হামলার বিষয়ে কোনও সিদ্ধান্ত ছিল কি না জানি না। কিন্তু পাকিস্তানের হাতে আটক ভারতীয় বৈমানিকের কিছু হলে যেকোনও ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে সবুজ সংকেত দিয়ে রেখেছিলেন প্রধানমন্ত্রী মোদি। ভারত ২৭ ফেব্রুয়ারি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জন্য প্রস্তুত ছিল।’ ২৭ ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তান সেনা সদরের পক্ষ থেকে ভারতকে জানিয়ে দেওয়া হয়, ধৃত ভারতীয় বৈমানিককে ফিরিয়ে দেওয়া হবে। আর এ বিষয়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ২৮ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেবেন সংসদে। রাওয়ালপিন্ডি ভারতকে আরও আশ্বস্ত করে, পুলওয়ামা হামলার দায় স্বীকার করা জইশ-ই-মোহাম্মদ ও তার প্রধান মাসুদ আজহারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
২৭ ফেব্রুয়ারি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আশঙ্কা যে আসলেই ছিল তার স্বীকৃতি পাওয়া গেছে ২৮ ফেব্রুয়ারি ইমরান খানের সংসদে দেওয়া ভাষণেও। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি জানি গত রাতে পাকিস্তানের ওপর ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হওয়ার আশঙ্কা ছিল। তবে সে আশঙ্কা নস্যাৎ করে দেওয়া হয়েছে।’ হিন্দুস্তান টাইমস জানিয়েছে, এই ঘটনাপ্রবাহের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব ও আরব আমিরাত পাকিস্তানকে উত্তেজনা থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দিয়েছিল। এমন কী যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টকমের (সেন্ট্রাল কমান্ড) কমান্ডার কথা বলেছিলেন রাওয়ালপিন্ডিতে অবস্থিত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সদর দফতরে। সব মিলিয়ে পাকিস্তান ১ মার্চ মুক্তি দেয় ভারতীয় বৈমানিক অভিনন্দন বর্তমানকে। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভিয়েতনামের হ্যানয়তে বলেছিলেন, ‘ভারত-পাকিস্তানের কাছ থেকে আশাবাদী সংবাদ পাওয়া গেছে।’ তিনি দুই দেশের মধ্যে সংকট নিরসনে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতার কথা উল্লেখ করেন।

/এএমএ/এএ/

লাইভ

টপ