‘ভারত মাতা কি জয়’ ইস্যুতে দেওবন্দের পাশে জামায়াত

Send
বিদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত : ১০:০৮, এপ্রিল ০৪, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১০:৩৯, এপ্রিল ০৪, ২০১৬

‘ভারত মাতা কি জয়’ স্লোগান নিয়ে ভারতের ঐতিহ্যবাহী ইসলামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দারুল উলুম দেওবন্দের ফতোয়াকে সমর্থন করেছে জামায়াতে ইসলামী হিন্দ। শনিবার দিল্লিতে দলের প্রধান কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে দলটির আমির মাওলানা সাইয়্যেদ জালালউদ্দিন উমরি তার দলের এ অবস্থানের কথা জানান। 

মাওলানা সাইয়্যেদ জালালউদ্দিন উমরি বলেন, মুসলিমরা এই স্লোগান দিতে পারেন না। ‘ভারত কী জয়’ স্লোগান সবাই দেয়। এটা সবার কাছে গ্রহণযোগ্য, এ নিয়ে কোনও বিতর্ক নেই। কিন্তু ‘ভারত মাতা কী জয়’ বলা সম্ভব নয়। কারণ ইসলাম সেই অনুমতি দেয় না। দেশাত্মবোধের সঙ্গে এই স্লোগানকে যুক্ত করে দেওয়া পুরোপুরি ভুল।

তিনি বলেন, জাতীয়তাবাদ নিয়ে অহেতুক বিতর্ক সৃষ্টি করে সাম্প্রদায়িক ও ফ্যাসিবাদী শক্তি বৃদ্ধি করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে সামাজিক মেরুকরণ সৃষ্টি করে দেশের ঐক্য এবং অখণ্ডতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা হচ্ছে।

মাওলানা সাইয়্যেদ জালালউদ্দিন উমরি

এর আগে বৃহস্পতিবার দারুল উলুম দেওবন্দের ফতোয়ায় বলা হয়েছে, মুসলিমরা একত্ববাদ বা এক আল্লাহতে বিশ্বাস করেন। আল্লাহ ছাড়া তারা অন্য কাউকে উপাসনা করতে পারেন না। ‘ভারত মাতা কী জয়’ বলা দেশকে পূজা করার শামিল। এটা আপাতদৃষ্টিতে উপাসনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হওয়ায় তা শিরক। ফলে ‘ভারত মাতা কী জয়’ স্লোগান দেওয়া মুসলিমদের জন্য বৈধ নয়।

দেওবন্দ বলছে, ভারত আমাদের মাতৃভূমি। আমরা একে ভালোবাসি। কিন্তু এই দেশকে আমরা সৃষ্টিকর্তা বা উপাস্য মনে করি না। তবে দেওবন্দের ফতোয়ায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ভারতের উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো।

১ এপ্রিল ২০১৬ শুক্রবার এ বিষয়ে নিজ দলের কঠোর অবস্থানের কথা জানায় ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির সহযোগী সংগঠন শিবসেনা। দলটির নেতা প্রতাপ সরনাইক বলেন, “দারুল উলুম কে, যারা ভারত মাতা কি জয়ের বিরুদ্ধে ফতোয়া বের করেছে? যে মাটিতে আমরা জন্ম নিয়েছি, তাকে আমরা মা, আম্মি ইত্যাদি বিভিন্ন ধর্মের মানুষ ভিন্ন ভিন্ন নামে ডাকি। ভারতে থাকতে হলে ‘ভারত মাতা কি জয়’ বলতে হবে। যদি তা না বলা হয়, আমরা শিবসেনা স্টাইলে তার জবাব দেব।”

অন্যদিকে, প্রখ্যাত সুন্নি আলেম মাওলানা খালিদ রশিদ ফিরিঙ্গী মহলি বলেছেন, “এ দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে মুসলিমরাও জীবন উৎসর্গ করেছে করেছে। মুসলিমরা যখন বলেছে, ‘সারে জাহা সে আচ্ছা, হিন্দুস্তা হামারা’ তখন এ নিয়ে কোনও বিতর্ক হওয়া উচিত নয়।”

মাওলানা খালিদ রশিদ বলেন, ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ ধ্বনি মুসলিমরা দিয়েছে। এখন ‘ভারত মাতা কী জয়’ বলাকে জোর করে ইস্যু তৈরি করা হচ্ছে। এ নিয়ে ফতোয়া দেওয়ারও কোনও প্রয়োজন নেই। মুসলিমরা ‘জয় হিন্দ’ এবং ‘হিন্দুস্তান জিন্দাবাদ’ স্লোগান দিয়ে আসছে।

বিজেপি নেতা শাহনওয়াজ হুসেন অবশ্য বলেছেন, ‘ভারত মাতা কী জয় আমরা আগেও বলতাম, এখনো বলি এবং তা বলতেই থাকব।’

এর আগে ২৬ মার্চ ২০১৬ শনিবার ‘ভারত মাতা কি জয়’ স্লোগান দিতে অস্বীকার করার ‘অপরাধে’ তিন মাদ্রাসা ছাত্রকে পিটিয়েছে একদল দুর্বৃত্ত। হামলার শিকার ছাত্ররা দিল্লির একটি মাদ্রাসার শিক্ষার্থী বলে নিশ্চিত করেছে পুলিশ।

ঘটনার দিন বিকেলে মাদ্রাসার পাশের মাঠে হাঁটতে গেলে একদল লোক ওই ছাত্রদের ‘ভারত মাতা কি জয়’ স্লোগান দিতে বলেন। ওই স্লোগান দিতে অস্বীকার করলে তাদের ওপর হামলা চালানো হয়। এতে এক ছাত্রের কাঁধ ভেঙে গেছে বলে জানিয়েছে দিল্লি পুলিশ।

হামলার ঘটনায় ছাত্ররা পুলিশ কন্ট্রোল রুমে ফোন করলে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাদের আহত অবস্থায় উদ্ধার করে। ছাত্ররা জানান, তাদের লাঠি দিয়ে পেটানো হয়।

‘ভারত মাতা কি জয়’ স্লোগান অস্বীকার করাকে ভারতের সংবিধানের প্রতি অসম্মান বলে মনে করে দেশটির ক্ষমতাসীন দল বিজেপি। চলতি মাসে দিল্লিতে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) জাতীয় কার্যনির্বাহী বৈঠকে নিজেদের এমন অবস্থানের কথা জানায় দলটি। বৈঠকে গৃহীত প্রস্তাবে বলা হয়, বাক স্বাধীনতার যুক্তিতে দেশবিরোধী, জাতিবিরোধী বক্তব্যকে কোনওভাবে ছাড় দেওয়া হবে না।

বৈঠকের শুরুতেই নিজের বক্তব্যে বিজেপি’র সর্বভারতীয় সভাপতি অমিত শাহ বলেন, জাতীয়তাবাদের আদর্শ আমাদের বিশ্বাস ও জীবন দর্শনকে নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে এ দেশের বিরুদ্ধে কোনও রকম আক্রমণ বিজেপি বরদাশত করবে না।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, ‘‘দেশ বা জাতির কোনও রকম সমালোচনা বরদাশত করা হবে না।’’ অন্যদিকে ভারতের অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি বলেছেন, ভারত মাতা কি জয়- এই স্লোগান নিয়ে কোনও বিতর্ক উঠতে পারে না। তবে বিজেপি’র এমন কঠোর অবস্থানের সমালোচনা করেছেন দেশটির রিরোধী রাজনীতিকরা।

সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি বলেন, ‘‘জাতীয়তাবাদ নিয়ে বিজেপির গলায় যেন জর্জ বুশেরই কণ্ঠস্বর! হয় তুমি আমাদের বন্ধু; না হলে তুমি জঙ্গি! এখানে হয় তুমি বিজেপি সমর্থক, না হলেই তুমি দেশবিরোধী!’’

বিজেপি নেতৃত্ব মনে করছেন, জাতীয়তাবাদ নিয়ে এই বিতর্ক যত গড়াবে, ততই তাদের লাভ। জাতীয়তাবাদের হাওয়া সরকারের প্রতি এক ধরনের সমর্থন তৈরি করবে। সরকারের আর্থিক নীতির বিরুদ্ধে অসন্তোষ থেকে অন্যত্র মানুষের নজর ঘোরাবে। উগ্র হিন্দুত্ববাদী মতবাদ প্রচারের পক্ষেও অনুকূল আবহাওয়া তৈরি হবে। সূত্র: পিটিআই, এনডিটিভি, দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস।

/এমপি/

লাইভ

টপ