ট্রাভেলগ রাঙামাটিতে রঙিন দিন

Send
মুনিফ আম্মার
প্রকাশিত : ২১:১৮, এপ্রিল ১৯, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২১:৪৩, এপ্রিল ২১, ২০১৯

রাঙামাটিসারারাত জেগে থাকার পরও সকালে কারও চোখে ঘুম নেই। নেই মানে, নেই। উল্টো এমন একটা ব্যাপার, যেন মাত্র ঘুম থেকে গা ঝাড়া দিয়ে উঠেছে সবাই। নানান হুমকি-ধমকি দিয়েও কাউকে বিছানায় পাঠানো যাচ্ছে না। সবার একই কথা— আর একটু! ভাবখানা এমন যে, সূর্যোদয়টা দেখে পরে না হয় খানিকটা গা এলিয়ে নেওয়া যাবে।

কিন্তু সারারাত বাস জার্নি, তার ওপর চট্টগ্রামের পর থেকেই পাহাড়ি উঁচু-নিচু পথের ঝাঁকি, শরীর বলে তো একটা বিষয় আছে! নাহ, কারও এ নিয়ে ভাবনা নেই। অগত্যা আমিও ওদের দলে ভিড়ে গেলাম। তখনই চোখের সামনে এক নতুন আলো জ্বলে উঠলো। কী বিস্ময়কর সুন্দর! কুয়াশাঘেরা পাহাড়ের ওপার থেকে একটু একটু করে জেগে ওঠা সেদিনের সূর্য যে না দেখেছে, তাকে কোনোভাবেই বোঝানো যাবে না। কাপ্তাই লেকের পানিতে দিনের আলোর রঙ অদ্ভুত মায়া নিয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে। আমরা সবাই অভিভূত হয়ে তাকিয়ে আছি।

রাঙামাটিকে রাঙিয়ে সূর্যের জেগে ওঠার এই দৃশ্য হোটেল নাদিশার ছাদ থেকে দেখছিলাম। রিজার্ভ বাজারে যেখানে ঢাকার বাস এসে ইঞ্জিন বন্ধ করে দেয়, সেখানেই হোটেলটি। রাঙামাটির ছেলে সাগর ওয়াহিদ আগে থেকেই আমাদের জন্য বুকিং দিয়ে রেখেছিল। আলো ফোটার আগেই পৌঁছে গেছি। বাস থেকে নামতেই সাগরের হাসিমুখ। এই ভোরে তাকে অপেক্ষায় দেখে প্রথমে একটু অবাক হলাম। পরে অবশ্য জেনেছি, এখানকার মানুষ ভোর হওয়ার আগেই জেগে ওঠে, বেরিয়ে পড়ে।

রাঙামাটিরোদ ঝলমলে দিন। একরুমে তিনজন করে থাকার বন্দোবস্ত। শুনেছি, যেখানে তিন মাথা এক হয়, সেখানে সব পণ্ড হয়ে যায়। তিন পাগলে হলো মেলা প্রবাদ তো আর এমনি এমনি হয়নি! আমাদের দশা ওরকমই। আর কারও ঘুমের বালাই নেই। খানিকটা সময় গল্প আর বিছানায় এপাশ-ওপাশ করেই কাটলো। আর থাকা যাচ্ছে না। রাঙামাটির রঙ দেখতে বেরিয়ে পড়লাম। শুনবো জল পাহাড়ের কবিতা।

খুব সাদামাটা শহর। মফস্বল হলে যা হয় আর কি! উঁচু উঁচু দালান নেই, সড়কে যানজট চোখে পড়লো, অযাচিত কোলাহলও কান ঝালাপালা করে না। শহরটার চারপাশে কেবল জলের মাঠ। কাপ্তাই লেকে ঘেরা পুরো শহরের যেদিকেই চোখ যাবে, সেদিকেই জলের দেখা মিলবে। দৃষ্টিকে একটু দূরে পাঠালেই আটকে যাবে পাহাড়ের সৌন্দর্যে। মানুষগুলোও শান্ত, সুন্দর। পাহাড়ি পথ বলে এখানে ঢাকার মতো রিকশা চলে না। পুরো শহরে একটা রিকশারও দেখা পাইনি। তবে টেম্পু, ট্যাক্সি আছে অনেক। যেকোনও জায়গায় যখন তখন যেতে ট্যাক্সি পাওয়া যায়।

ঝুলন্ত ব্রিজে লেখক ও তার ভ্রমণসঙ্গীরাসকালের নাশতা সেরে দললবেঁধে ঝুলন্ত ব্রিজ দেখতে চলে গেলাম। ছোটবেলায় বাসার কোনও না কোনও ক্যালেন্ডারে এই সেতুর ছবি থাকতো। তখন থেকে এটি পরিচিত। পর্যটন মোটেলের পাশে ঝুলন্ত ব্রিজ। শহরের পাশেই। ১০ মিনিটের পথ। মূলত দুই পাহাড়ের মাঝখানে ব্রিজটি তৈরি হয়েছে। নিচে কাপ্তাই লেক। ব্রিজে ওঠার আগেই একটা সাইনবোর্ডে কিছু সতর্কবার্তা চোখে পড়ে। কিন্তু কে মানে কার কথা! সবাই যার যার মতো করেই চলছে। তবে বেশিরভাগ মানুষই ব্রিজে দাঁড়িয়ে ছবি ও সেলফি তোলায় ব্যস্ত দেখলাম।

ওপারের পাহাড় পেরিয়ে আদিবাসী গ্রাম। পর্যটকদের জন্য বাজারও বসে প্রতিদিন। সেখানে পাহাড়ি ফল থেকে চোখ ফেরানো কঠিন। বিশেষ করে পাকা কলা, পেঁপে, আনারস ও ডাব দেখে মনে হবে কোনটা রেখে কোনটা খাই! পাহাড়টাতে খুব একটা পাহাড়ি আমেজ নেই। কোলাহলে মুখর চারপাশ। তবে পাহাড়ের পাদদেশে নামলেই জল এসে পা ছুঁয়ে যাবে। সেখানে রঙিন নৌকায় চড়তে ইচ্ছে হবে তখনই। সুন্দর, ছোট্ট নৌকায় চড়ে হেলেদুলে আশপাশ ঘুরে দেখা আনন্দের। তবে আমরা এ বেলায় নৌকা চড়ার ইচ্ছেটাকে ভাসতে দিলাম না। কারণ পরদিন সারাবেলা জলে কাটবে আমাদের। বরকল ও শুভলংয়ে আমাদের যাত্রা হবে নৌকাতেই।

রাঙামাটিশহরেই সেরেছি দুপুরের খাবার। ক্লান্ত বলে ক্ষুধাও বেশি লেগেছিল। কয়েক পদের পর্দা, ছোট মাঝের ঝোল, লেকের বড় মাছ, চেপা শুঁটকি, চাপিলা মাছ ভাজি; সব মিলিয়ে মনে হলো, আহ কী অমৃত! ভরপুর কিংবা গলা অবধি খেয়েও জনপ্রতি গুনতে হয়েছে মাত্র ২২০ টাকা। সে হিসেবে বলতে হয়, রাঙামাটি শহরে খাবারের দাম তুলনামূলক কম। তবে শুনেছি, কোনও কোনও রেস্তোরাঁ নাকি ‘গলা কাটে’। তবে দেখেশুনে খাওয়া উপভোগ করলে এসব ঝামেলায় পড়ার কথা না।

রাঙামাটির বিকাল কেটেছে জেলা পরিষদ পার্ক ও পুলিশের তৈরি পলওয়েল পার্কে। প্রকৃতির সঙ্গে কৃত্রিম নানান জিনিস রয়েছে পার্কে। তবে বিকাল কাটানোর জন্য ভালো জায়গা। পলওয়ে পার্কের ব্যবস্থাপনা দারূণ। অনেক বড় বড় জেলায়ও এমন সুন্দর পার্ক চোখে পড়েনি। কাপ্তাই লেকের সুবাদে হয়তো পার্কটিকে আরও বেশি সুন্দর লাগছে। পার্কের পাশে লেকের পাড় ঠিক সমুদ্র সৈকতের মতো। চৌকিও পাতা আছে কিছু। সকালে হোটেলের ছাদ থেকে যে সূর্যটাকে উঠতে দেখেছি, বিকালে এখানে শুয়ে তাকে বিদায় জানানোর অনুভূতি ছিল দারুণ!

রাঙামাটিতে লেখক ও তার ভ্রমণসঙ্গীরাখুব ভোরে এই শহর জাগে বলে ঘুমিয়েও পড়ে জলদি। রাত ৮টা বাজতেই নীরব হয়ে যায় চারপাশ। হাতেগোনা কয়েকটি দোকান আর রেস্তোরাঁ খোলা থাকে ১০টা পর্যন্ত। জোনাকি ও ঝিঁঝিঁর সঙ্গে গল্প করার ইচ্ছে থাকলে এখানকার রাত উত্তম। কেউ জ্বালাতে আসবে না। সুবিধামতো লেকের পাড়ে কোনও একটা জায়গায় বসে অনেকটা সময় কাটানো যায়। এজন্য জুতসই জায়গা শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ। সেখান থেকে রাতের লেক, জলের ছলছল সুর ও পাহাড়ের ঘুমিয়ে থাকা দেখলে উঠতে ইচ্ছে হবে না! খুব সকালে জেগে ওঠার তাড়া না থাকলে রাতটা হয়তো এভাবেই কাটিয়ে দিতাম।
ছবি: মুজতাহিদ হাসান, আলী মুসা চৌধুরী ও লেখক

/জেএইচ/
টপ